সন্ধ্যার পর বন্ধ নৌযান, রাঙ্গাবালীতে নেই স্বাস্থ্যসেবা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

দিনে চললেও সন্ধ্যার পর রাঙ্গাবালীতে বন্ধ থাকে নৌযান চলাচল। স্ট্রিম ছবি
দিনে চললেও সন্ধ্যার পর রাঙ্গাবালীতে বন্ধ থাকে নৌযান চলাচল। স্ট্রিম ছবি

পটুয়াখালীর মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন উপজেলা রাঙ্গাবালী। বঙ্গোপসাগর ও নদীবেষ্টিত এই উপজেলায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌযান। সন্ধ্যা নামার পরই অন্যান্য উপজেলা ও জেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে জরুরি প্রয়োজন বা মুমূর্ষু রোগী পরিবহনে স্থানীয় বাসিন্দারা ভোগান্তিতে পড়েন।

রাঙ্গাবালীর তিন দিকে বুড়া গৌরাঙ্গ, তেঁতুলিয়া ও আগুনমুখা নদী, একদিকে বঙ্গোপসাগর। জেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন। এর মধ্যে চারটি ইউনিয়ন আবার উপজেলার সদর থেকে বিচ্ছিন্ন। দুর্গম এই চরাঞ্চলের বাসিন্দা প্রায় দুই লাখ মানুষ। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনেক দিন ধরে একটি ফেরি চালুর দাবি করে আসছেন উপজেলাবাসী। যদিও তার কোনো অগ্রগতি নেই।

উপজেলা থেকে জেলা কিংবা শহরে যেতে হলে আগুনমুখা পাড়ি দিতে হয়। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কোড়ালিয়া ঘাটে স্পিডবোট চলাচল করে। দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর পর একটি খেয়া ও সারা দিনে দুইটি লঞ্চ ছেড়ে যায় গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়া এবং পানপট্টির উদ্দেশে। এই দুই ঘাট থেকে যেতে হয় শহরে।

মঙ্গলবার উপজেলার কোড়ালিয়া স্পিডবোট ঘাটের টিকিট অপেক্ষা করছিলেন রহমান হাওলাদার। তিনি ডাক্তার দেখানের যাচ্ছিলেন জেলা শহর পটুয়াখালীতে। তিনি বলেন, ‘যেতে যেতেই দুপুর হয়ে যাবে। ডাক্তার দেখাতে বিকেল। আজ আর ফেরার কোনো সুযোগ নেই। আগামীকাল ফিরতে হবে। আমাদের আসলে দুঃখের কোনো শেষ নেই। আমাদের উপজেলায় না আছে ভালো চিকিৎসা, না আছে হাসপাতাল।’

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মাতুব্বর বলেন, ‘চিকিৎসা হতে শুরু করে অনেক কিছুর জন্য আমাদের শহরে যেতে হয়। আর বাধ্য হয়েই এই ভয়াল আগুনমুখা নদী পাড়ি দিতে হচ্ছে। আর যেখানেই যাই না কেন, সেদিন আর ফিরতে পারি না। কারণ, সন্ধ্যার পর সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মানুষের তো সমস্যা হতে সময় লাগেনা যদি রাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে তখন এ উপজেলা থেকে অন্য কোথায় যাওয়ার কোনো উপায় নাই। অনেক সময় বেশি সিরিয়াস রোগী বেশি টাকায় ট্রলার ভাড়া করে যেতে হয়। তাও আবহাওয়া খারাপ থাকলে সেটিও সম্ভব না।’

উপজেলার কোড়ালিয়া ও গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়ার রুটে স্পিডবোটের ইজারদার কামরুল মৃধা জানান, ‘সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত স্পিডবোট চলাচল করে। সন্ধ্যার পর স্পিডবোট চলাচল করা সম্ভব না। আবহাওয়া খারাপ থাকলে আর নদী উত্তাল থাকলে দিনেই স্পিডবোট বন্ধ থাকে। বিশেষ করে বর্ষার সময় আগুনমুখা নদী অনেক উত্তাল থাকে। এসময় স্পিডবোট চলাচল করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আমরা সব সময় যাত্রীর নিরাপত্তায় লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে নিই।’

স্থানীয়রা জানান, রাঙ্গাবালী থেকে জেলা সদরও আশেপাশের উপজেলায় যাতায়েত প্রধান ভরসা ট্রলার ও লঞ্চ। এ উপজেলায় ছয় ইউনিয়নের চারটি ইউনিয়নে যেতে হয় নদী পথে। উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে যেতে হলেও পাড়ি দিতে হয় বুড়োগৌরাঙ্গ নদী, চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নে যেতে এবং আসতে পাড়ি দিতে হয় আগুনমুখা নদী এবং বড়বাইশদিয় ও মৌডুবি ইউনিয়নে দাড়ছিড়া নদী পাড়ি দিতে হয়। তবে চরমোন্তাজ ও চালিতাবুনিয়া ইউনিয়ন সন্ধ্যার পর সব নৌ-যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

চিকিৎসা সংকট

নদী ও সাগরবেষ্টিত দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালী ২০১২ সালে প্রশাসনিক যাত্রা শুরু হলেও এখনো চালু হয়নি সরকারি হাসপাতাল। জ্বর-সর্দির প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া জটিল কোনো রোগের ব্যবস্থা নেই এখানে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মেলে সীমিত প্রাথমিক চিকিৎসা।

জটিল কিছু হলেই রোগীকে ছুটতে হয় গলাচিপা, পটুয়াখালী সদর কিংবা বরিশাল। রাঙ্গাবালীর কোনো মানুষ গুরুতর অসুস্থ হলে সবচেয়ে কাছের গন্তব্য ৩০ কিলোমিটার দূরের গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উত্তাল আগুনমুখা নদী পেরিয়ে সেখানে পৌঁছানোর পর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনে যদি জেলা সদরে যেতে হয়, তবে পাড়ি দিতে হয় আরও ৩৩ কিলোমিটার সড়কপথ। এই ৬৩ কিলোমিটারের ব্যবধানেই অনেক সময় নিভে যায় একটি প্রাণ।

২০২৩ সালে ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ শুরু হলেও ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর তা এখন বন্ধ।

উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. কামাল পাশা বলেন, ‘কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে যেতে হলে আগুনমুখা পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু সন্ধ্যার পর তো সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আমরা এ বিষয়ে উপজেলায় প্রত্যেক মিটিংয়ে আলোচনা করি। আগুনমুখা একটি ফেরি এবং উপজেলার যে সরকারি হাসপাতালটি চালু করার জন্য বলি।’

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমরা স্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি আমাদের অবগত করেছেন, ইতিমধ্যে দুইটি কার্যাদেশ পেয়ে গেছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুত হাসপাতালের কাজটি শেষ হবে।’

এ বিষয়ে পটুয়াখালী-৪ আসনের (কলাপড়া-রাঙ্গাবালী) সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আগুনমুখা নদীতে ফেরির চালুর জন্য আমরা চেষ্টা করছি, অলরেডি আমি একটা ডিও লেটার দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে আমার এ ব্যাপারে কথা হয়েছে।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত