বিশ্বের শীর্ষ ৫ ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান
স্ট্রিম ডেস্ক

কেউ আপনার কাছে টাকা ধার চাইলে প্রথমেই হয়তো ভাববেন, তিনি টাকা ফেরত দিতে পারবেন তো? তার আয় কেমন, আগের ঋণ আছে কি না, সময়মতো টাকা পরিশোধ করার অভ্যাস আছে কি না—এসব দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন।
বড় অঙ্কের টাকা ধার দেওয়ার ক্ষেত্রেও মূল প্রশ্নটা একই। শুধু পার্থক্য হলো, এখানে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতা অনেক বড়। একদিকে থাকতে পারে একটি বহুজাতিক কোম্পানি, ব্যাংক বা কোনো দেশের সরকার, অন্যদিকে থাকতে পারে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চাওয়া প্রতিষ্ঠান বা বিনিয়োগকারী।
এই ঝুঁকিটা বোঝার কাজেই আসে ক্রেডিট রেটিং। সহজ ভাষায়, ক্রেডিট রেটিং হলো কোনো কোম্পানি, সরকার বা ঋণপত্রের ধার করা টাকা ও সুদ সময়মতো পরিশোধ করার সক্ষমতা সম্পর্কে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন। এই মূল্যায়ন সাধারণত এএএ, এএ, এ, বিবিবি কিংবা আরও নিচের বিভিন্ন রেটিং দিয়ে প্রকাশ করা হয়। রেটিং যত ওপরে, সাধারণত ঋণ পরিশোধে ঝুঁকি তত কম বলে বিবেচিত হয়।
বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান এই কাজটি করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নাম এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস, মুডিজ রেটিংস ও ফিচ রেটিংস। এর বাইরে নির্দিষ্ট খাত বা অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে মর্নিংস্টার ডিবিআরএস ও এএম বেস্টের।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস
ক্রেডিট রেটিংয়ের জগতে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস। এর ইতিহাস শুরু উনিশ শতকে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের একটি বিভাগ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ধরনের ঋণপত্রের ক্রেডিট ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে।
ধরা যাক, কোনো কোম্পানি বাজার থেকে বড় অঙ্কের টাকা ধার করতে চায়। বিনিয়োগকারীরা জানেন না, পাঁচ বা দশ বছর পর কোম্পানিটি সেই টাকা ফেরত দিতে পারবে কি না। এসঅ্যান্ডপি তখন কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা, ব্যবসার ধরন, শিল্পখাত, প্রতিযোগিতা, ব্যবস্থাপনা, ঋণের কাঠামো এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে।
শুধু বর্তমান অবস্থাই নয়, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি খারাপ হলে কোম্পানিটি কতটা সামলাতে পারবে, সেটিও দেখা হয়। এসঅ্যান্ডপি বলছে, তাদের রেটিং নির্ধারণে পরিমাণগত তথ্যের পাশাপাশি গুণগত বিষয়ও বিবেচনা করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষকদের কমিটি রেটিং নির্ধারণ করে।
তাদের রেটিং স্কেলে এএএ থেকে ডি পর্যন্ত বিভিন্ন স্তর রয়েছে। অর্থাৎ একটি অক্ষর বা অক্ষরসমষ্টির মাধ্যমে বিশাল পরিমাণ আর্থিক তথ্যকে তুলনামূলকভাবে সহজ একটি সংকেতে প্রকাশ করা হয়।
এ কারণে এসঅ্যান্ডপির একটি রেটিং শুধু একটি কোম্পানির জন্য নয়, সেই কোম্পানিকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মুডিজ রেটিংস
ক্রেডিট রেটিংয়ের আরেকটি বড় নাম মুডিজ রেটিংস। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু বিশ শতকের শুরুতে। বর্তমানে এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ঋণপত্রের ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণ করে। মুডিজ বলছে, তাদের রেটিং হলো কোনো আর্থিক দায় ভবিষ্যতে কীভাবে পরিশোধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, সে সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার মতো মতামত।
মুডিজের রেটিং স্কেলে সবচেয়ে ওপরে রয়েছে এএএ, এরপর এএ, এ, বিএএ এবং আরও নিচের বিভিন্ন স্তর। একেবারে নিচের দিকে গেলে ঋণঝুঁকি বাড়ে এবং খেলাপির আশঙ্কাও বেশি বলে ধরা হয়।
তবে এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি—ক্রেডিট রেটিং মানেই কোনো বিনিয়োগ লাভজনক হবে, এমন নিশ্চয়তা নয়। বরং রেটিং মূলত ঋণঝুঁকি বোঝায়।
মুডিজ এখন শুধু প্রচলিত আর্থিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন খাতের ঝুঁকি বিশ্লেষণে তথ্য, গবেষণা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে এবং পরিবেশ, সামাজিক ও সুশাসন-সংক্রান্ত বিষয়ও ক্রেডিট বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করে।

ফিচ রেটিংস
ফিচ রেটিংস বিশ্বের বহুল পরিচিত ‘বিগ থ্রি’ ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠানের একটি। এসঅ্যান্ডপি ও মুডিজের সঙ্গে যার নাম প্রায়ই একসঙ্গে আসে।
ফিচ বিভিন্ন দেশের সরকার, কোম্পানি, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ঋণপত্রের ক্রেডিট ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে। এখানে মূল প্রশ্ন একই। যে ব্যক্তি, কোম্পানি বা সরকার টাকা ধার করছে, সে সেই টাকা ফেরত দিতে কতটা সক্ষম?
এর উত্তর খুঁজতে ফিচ শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের আজকের হিসাব দেখে থেমে থাকে না। ব্যবসার পরিবেশ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণের কাঠামো এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকিও বিশ্লেষণের অংশ।
ফিচের রেটিং স্কেলও এএএ থেকে ডি পর্যন্ত বিস্তৃত। ফলে একজন বিনিয়োগকারী বা ঋণদাতা খুব দ্রুত বুঝতে পারেন কোনো ঋণপত্রের আপেক্ষিক ঋণঝুঁকি কোন পর্যায়ে রয়েছে।
ক্রেডিট রেটিংয়ের ক্ষেত্রে এই তুলনাযোগ্যতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন বিনিয়োগকারীকে হয়তো একই সময়ে কয়েকটি কোম্পানি বা দেশের ঋণপত্রের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। আলাদা আলাদা আর্থিক হিসাব পড়ার পাশাপাশি একটি স্বীকৃত রেটিং সেই তুলনাকে সহজ করে।
মর্নিংস্টার ডিবিআরএস
তালিকার চতুর্থ নাম মর্নিংস্টার ডিবিআরএস। প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৯৭৬ সালে, তখন নাম ছিল ডমিনিয়ন বন্ড রেটিং সার্ভিস বা ডিবিআরএস।
বর্তমানে মর্নিংস্টার ডিবিআরএস নিজেকে বিশ্বের চারটি বৃহৎ ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠানের একটি হিসেবে পরিচয় দেয়। তাদের রেটিংয়ের আওতায় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকার এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠামোবদ্ধ ঋণপণ্য রয়েছে।
তাদের কাজও মূলত একই—একজন ঋণগ্রহীতা বা একটি ঋণপত্রের ঋণঝুঁকি সম্পর্কে স্বাধীন মতামত দেওয়া। তবে মর্নিংস্টার ডিবিআরএসের একটি ইস্যুয়ার রেটিং সাধারণত সেই প্রতিষ্ঠান বা সরকারের ঋণ পরিশোধে খেলাপির আশঙ্কা সম্পর্কে তাদের মূল্যায়নকে প্রকাশ করে। এরপর সেই মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট বন্ড বা অন্য ঋণপত্রের রেটিং নির্ধারণে একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

এএম বেস্ট
শেষের প্রতিষ্ঠানটি একটু আলাদা। এএম বেস্ট মূলত বিমা খাতের ওপর বিশেষভাবে মনোযোগী।
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু ১৮৯৯ সালে এবং এটি বিমা কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য মূল্যায়নের জন্য পরিচিত।
আপনি যখন কোনো বিমা কোম্পানিকে প্রিমিয়াম দেন, তখন আসলে ভবিষ্যতের একটি প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করছেন। আজ আপনি টাকা দিচ্ছেন, কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা অন্য কোনো বিমা-দাবি উঠলে ভবিষ্যতে কোম্পানিকে টাকা দিতে হবে। তাই বিমা কোম্পানির আর্থিক শক্তি কতটা—এটা জানা গুরুত্বপূর্ণ।
এএম বেস্টের ক্রেডিট রেটিং সেই সক্ষমতা মূল্যায়নে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানটি বিমা কোম্পানির ব্যালান্সশিটের শক্তি, পরিচালনাগত কার্যক্রম, ব্যবসার অবস্থান এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় বিশ্লেষণ করে। তাদের নিজস্ব রেটিং ব্যবস্থায় বিমা কোম্পানির আর্থিক শক্তি ও দায় মেটানোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
এই বিশেষায়িত কাজের কারণেই সাধারণ করপোরেট রেটিং প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিমা খাতে এএম বেস্টের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
.png)
-40e58c.jpeg)







