
দেশের অন্যতম ব্যস্ত মহাসড়ক ঢাকা-আরিচার মানিকগঞ্জ অংশে অবাধে চলছে নিষিদ্ধ থ্রি-হুইলার। বানিয়াজুরি থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক।
এমনকি মানিকগঞ্জে থাকা দুটি হাইওয়ে থানার সামনে দিয়েও নিয়মিত এসব যান চলাচল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬(৪) ধারায় সড়ক বা মহাসড়কে চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ওই ধারার ব্যাখ্যায় নসিমন, করিমন, ভটভটি, ইজিবাইক, মোটরচালিত রিকশা বা ভ্যান এবং অনুরূপ শ্রেণির যানবাহনের কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে মানিকগঞ্জের মহাসড়কে বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

সরেজমিনে দেখা যায়, বানিয়াজুরি থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চলছে থ্রি-হুইলার। বাসস্ট্যান্ড ও বাজার এলাকায় যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে এসব যান। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। দ্রুতগতির বাস ও অন্যান্য যানবাহনকে অনেক সময় হঠাৎ গতি কমাতে বা দিক পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ জেলায় মহাসড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় দুটি হাইওয়ে থানা রয়েছে। এর মধ্যে বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে চারটি এবং নিয়মিত মামলা হয়েছে সাতটি। আগস্টে দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে তিনটি এবং নিয়মিত মামলা চারটি।
তবে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে বিপুলসংখ্যক থ্রি-হুইলার চলাচল করলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কে ইজিবাইক ও অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের জোকা এলাকায় ইজিবাইকচালক মোবারক হোসেনের সঙ্গে কথা হয় স্ট্রিমের। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন বরঙ্গাইল থেকে বানিয়াজুরি পর্যন্ত আট থেকে দশটা ট্রিপ মারি। বড় রাস্তায় যাত্রী ভালো পাওয়া যায়, তাই আয় ভালো।’
বরঙ্গাইল এলাকার একটি সিএনজি স্টেশনে মতিন নামের এক চালক বলেন, ‘সব কথা তো খুলে বলা যায় না। তবে তাঁদের (পুলিশ) কথা না শুনলে মামলা খেতে হয়। আমরা মহাসড়কে চলি, ফলে কিছু কথা তো শুনতেই হয়।’
উথুলী বাসস্ট্যান্ড এলাকার একাধিক থ্রি-হুইলারের মালিক ও চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু ম্যানেজ করেই মহাসড়ক ব্যবহার করি।’
বানিয়াজুরি বাসস্ট্যান্ডে পথচারী শরিফুল ইসলাম জানান, বাসস্ট্যান্ডগুলোতে আঞ্চলিক ও দূরপাল্লার বাসের পাশাপাশি থ্রি-হুইলারগুলো হুড়োহুড়ি করে চলাচল করে। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ পথচারীরা আতঙ্কিত থাকি। এই বুঝি শরীরের ওপর গাড়ি তুলে দেয়। মহাসড়কে যত্রতত্র অবাধে থ্রি-হুইলার চলাচলের কারণে প্রতিনিয়তই ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে।’
সেলফি পরিবহনের চালক সৌরভ আহমেদ বলেন, ‘মহাসড়কের আশপাশের রাস্তা থেকে হঠাৎ করেই অনেক অটোরিকশা-থ্রি-হুইলার মূল মহাসড়কে উঠে যায়। এতে অধিকাংশ সময় বাস-ট্রাক লেন পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। তখন উল্টো দিক থেকে গাড়ি চলে আসলে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়া তাদের এলোপাতাড়ি চলাচলের কারণে আমাদের বেশ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।’
নীলাচল পরিবহনের চালক আনিস মিয়া বলেন, ‘ইদানীং মহাসড়কে থ্রি-হুইলারের আনাগোনা অনেক বেড়ে গেছে। তারা যেখানে সেখানে ব্রেক করে যাত্রী ওঠানামা করায়। এ কারণে আমাদের গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হয়।’

মানিকগঞ্জ জেলা বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস ও অটোটেম্পো ওনার্স গ্রুপের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক লিটন বলেন, মহাসড়কে দূরপাল্লার পরিবহনের পাশাপাশি আঞ্চলিক যানবাহন চলাচল করা স্বাভাবিক। তবে থ্রি-হুইলার চলাচলের কারণে বড় যানবাহনের চালকদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় থ্রি-হুইলারের এলোপাতাড়ি চলাচলের ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। ছোট গাড়ি হওয়ায় বেশিরভাগ সময় এতে থ্রি-হুইলারের চালক ও যাত্রীরা হতাহত হন। কিন্তু শুধু বড় যানবাহনের চালকদের বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনকে অনুরোধ করা হলেও, এখন পর্যন্ত কোনো সুফল পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
বরঙ্গাইল হাইওয়ে-সংলগ্ন সিএনজি মালিক সমিতির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মহাসড়কে না উঠলে গ্যাস পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়েই সকালে মহাসড়কে উঠতে হয়। স্থানীয় যাত্রীরা আশপাশের এলাকায় যেতে চাইলে বড় গাড়িগুলো সেখানে থামে না। এ কারণে তাঁরা যাত্রী পরিবহনের জন্য মহাসড়কে ওঠেন। মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ বলে কোনো আইনের কথা তাঁদের জানা নেই বলেও দাবি করেন তাঁরা।
মানিকগঞ্জ বিআরটিএ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মাহবুব কামাল বলেন, ‘কোনোভাবেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিংবা সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার মহাসড়কে চলতে পারবে না। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।’
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার জানান, মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশকে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে। মাঝেমধ্যেই অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল অবৈধ ও প্রাণঘাতী। মহাসড়ক নিরাপদ করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানার ওসি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘সারাদেশের সব মহাসড়কেই তো থ্রি-হুইলার চলছে।’ মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের জনবল সংকট আছে, কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি।’
.png)
-40e58c.jpeg)



-4aac43-256x144.webp)
-b04cb2-256x144.webp)
