জঙ্গিবাদের শেকড়, জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্ভারতা

প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৮: ৩২
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

জঙ্গি ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের অস্বীকারের সংস্কৃতি যেমন আছে। প্রতিপক্ষ দমনে জঙ্গি কার্ড ব্যবহারের অভিযোগও বেশ পুরোনো। এরকম সব কারণে কখনোই প্রকৃত অর্থে জঙ্গি নির্মূল করা যায়নি। বরং জঙ্গিরা নানা ফর্মে সমাজের নানা পরিসরে মিশেছিল। এখনও আছে।

কেউ একদিনে জঙ্গি হয়ে ওঠে না। তেমনি কোনো দেশে একদিনে বা এক মাসে জঙ্গিবাদের বিস্তার ঘটে না। মানুষ খুন করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কেউ চট করে রাজি হয় না। এর পেছনে থাকে এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা। ধর্মীয় তাগিদ ছাড়াও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার বা আইনের শাসন না থাকলেও জঙ্গিবাদ তৈরি হতে পারে। একসময় মনে করা হতো যে শুধু মাদ্রাসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষিতরাই চরমপন্থা বা জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এখন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও জঙ্গিবাদে পা বাড়াচ্ছে।

আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ থেকে যুদ্ধ করতে আফগানিস্তান গিয়েছিলেন অনেক মুজাহিদ। দেশে ফিরে এখানে তাঁরা জিহাদ করার পটভূমি তৈরি করতে থাকেন। মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি তাদের সমর্থন না দিলেও ইসলামিক বা ইসলাম নামধারী দলগুলোর পরোক্ষ সমর্থন তারা পান। আফগানফেরত ওই যুবকরা দেশে ফিরে এসে বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনে যুক্ত হন। অনেকে বাংলাদেশে ইসলামি অনুশাসন কায়েমের স্বপ্ন নিয়ে হরকাতুল জিহাদের মতো সংগঠন গড়ে তোলেন। তাদের লক্ষ্য সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটিয়ে নতুন ধরনের সরকারব্যবস্থা চালু করা। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সংগঠনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা না থাকায় তারা বিভিন্ন স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা চালাতে শুরু করে।

১৯৮৯ সালে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি বাংলাদেশ (হুজি-বি) প্রতিষ্ঠা করেন যশোরের মনিরামপুরের মওলানা আবদুর রহমান ফারুকী। কিন্তু ওই বছরই আফগানিস্তানের খোস্তে মাইন অপসারণের সময় মওলানা ফারুকী নিহত হন। এর তিন বছরের মাথায় ১৯৯২ সালের এপ্রিলে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করে হুজি-বি। আফগানফেরত মুজাহিদদের অনেকে এর সঙ্গে যুক্ত হন।

১৯৯৯ সালের ১৮ জানুয়ারি হরকাতুল জিহাদের কয়েকজন সদস্য কবি শামসুর রাহমানের বাসায় গিয়ে তার প্রাণনাশের চেষ্টা করে। ওই বছরের ৬ মার্চ যশোরের টাউন হল ময়দানে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর জাতীয় সম্মেলনে দুটি শক্তিশালী বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে ১০ জন নিহত হয়। ২০০০ সালের ২০ ও ২৩ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থল ও হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের দূরনিয়ন্ত্রিত দুটি শক্তিশালী বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায়ও সন্দেহের তীর ছিল হরকাতুল জিহাদের দিকে। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, ওই বছরের ৩ জুন গোপালগঞ্জ জেলার মুকসুদপুরের বানিয়ারচর চার্চে বোমা হামলার পেছনেও দায়ী করা হয় এই সংগঠনককে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে অন্যতম বড় জঙ্গি হামলা ২০১৬ সালে রাজধানীর হোলি আর্টিজান বেকারিতে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের কারণেই জঙ্গিবাদ নিয়ে কোনো সতর্কবার্তাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সম্প্রসারণ ও সংগঠনটির সেল গঠনের চেষ্টা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। একে ‘অনুমাননির্ভর’ বলে মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন সরকার আমলে নিচ্ছে না। সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি তিনি নিজে পড়েননি; গণমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছেন। মন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিবেদনে হয়তো কিছু পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তবে না দেখে এ বিষয়ে মন্তব্য করা সম্ভব নয়। গণমাধ্যমে প্রতিবেদনটির বিষয়ে যতটুকু জেনেছি সেখানে অনুমান করা হয়েছে যে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। অনুমাননির্ভর কোনো রিপোর্টের ওপর আমরা নির্ভর করতে পারি না।’

প্রতিবেদনটি সঠিক না ভুল, তার তথ্য ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণ আরও বেশি গুরুত্ব ও মনোযোগ দাবি করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই যখন বলছেন যে তিনি প্রতিবেদনটি পড়েননি, তখন সেটিকে অনুমাননির্ভর বলে মন্তব্য করার ভিত্তিটিও স্পষ্ট নয়। সরকারের হাতে থাকা গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে দেখা এবং বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করাই বরং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হওয়া উচিত।

সম্প্রতি বেশ কিছু ঘটনায় দেশে জঙ্গি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সাভারে নতুন ধরনের বোমা উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক যেমন তৈরি হয়েছে। জঙ্গি ও উগ্রবাদীদের পরবর্তী লক্ষ্য কী—তা নিয়েও ভীতি তৈরি হয়েছে। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো সংগঠিত তৎপরতা রয়েছে, সেটি তদন্তের বিষয়। তবে কোনো ঘটনার পেছনে প্রমাণ ছাড়া বড় কোনো রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সম্পর্ক খোঁজাও সমানভাবে সতর্কতার দাবি রাখে।

বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদী রাজনীতি ও জঙ্গিবাদ পুরোপুরি নির্মূলের পেছনে একটি বড় অন্তরায় অস্বীকারের সংস্কৃতি। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জঙ্গি ইস্যুকে গুরুত্বই দেয়নি। ওই সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার সাজ্জাত আলী বলেছিলেন, ‘দেশে কোনো জঙ্গি নেই। আছে ছিনতাইকারী।’ আবার সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের দুটি পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই বলে দাবি করেছেন। ডা. জাহেদ উর রহমান বলছেন— দেশে জঙ্গি রয়েছে, তবে সরকার তা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। একই সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এই দুই ধরনের বক্তব্য থেকে প্রশ্ন ওঠে, দেশের জঙ্গি পরিস্থিতি সম্পর্কে রাষ্ট্রের প্রকৃত মূল্যায়ন কী।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী বিভিন্ন সংগঠনের তৎপরতা অনেক আগে থেকেই ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটি আরও বেশি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাদের একটি বিরাট অংশই জামিনে মুক্ত হয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু করে। কিন্তু কারা, কোন মামলায় এবং কী প্রক্রিয়ায় মুক্ত হয়েছেন, আর তাদের মধ্যে কারা পরে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন—সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত গুম কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জঙ্গিরা এক ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করেছে, স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। অনেক জায়গায় বিক্ষোভ ও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছে। সেখানে তারা কালেমা লেখা কালো পতাকা ব্যবহারও করেছে। আইডেন্টিটি প্রকাশ করার চেষ্টা করেছে।

সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালীন বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা ওড়ানোর প্রতিবাদ হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কালো অক্ষরে কালেমা লেখা সাদা পতাকা ওড়ানো এবং শোডাউনের বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। তখন এই প্রশ্ন উঠেছিল যে এই বছর হঠাৎ করে কী এমন হলো যে খেলার সঙ্গে ধর্মকে গুলিয়ে কালেমার পতাকা উড়াতে হলো? এর মধ্য দিয়ে কোনো ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়ার চেষ্টা করেছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার।

সুতরাং কে কোন অভিপ্রায় নিয়ে কী করেন, সেখানে নজর রাখা জরুরি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে আমলে না নেয়ার মধ্য দিয়ে সরকার যতই আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করুক না কেন, উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো কতটা সংগঠিত হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা দরকার।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো কতটা সংগঠিত ও শক্তিশালী হতে পেরেছে? দেশে বড় ধরনের নাশকতা চালানোর মতো ক্ষমতা তাদের আছে কি? এসব বিষয়ে সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তথ্য আছে? দেশে দুজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা থেকে শুরু করে আরও নানা ঘটনায় গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই দায়ী করা হয়েছে। সুতরাং সরকারের গোয়েন্দা বাহিনীগুলো দেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি আতঙ্ক নিয়ে কতটা সতর্ক এবং উগ্রবাদীদের বিষয়ে তাদের কাছে সত্যিই কী পরিমাণ তথ্য আছে—সেটি নিয়ে ভাববার অবকাশ রয়েছে।

জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকেই মনে করেন যে বাংলাদেশে বড় আকারের সংগঠিত জঙ্গি হামলার ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু হোলি আর্টিজানের ঘটনার পরে অনেকগুলো অভিযানের মধ্য দিয়ে জঙ্গিদের দমন করা গেলেও তাদের শেকড় উপড়ে ফেলা যায়নি। তাছাড়া উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো রঙ ও চরিত্র বদলে নতুন পরিচয়ে সামনে আসে। তাছাড়া রাজনৈতিক অস্থিরতা, কারাগার থেকে জঙ্গিদের মুক্তি, অনলাইন র‍্যাডিক্যালাইজেশন এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে চরমপন্থী প্রচারণা ভবিষ্যতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হয়।

তাই অস্বীকার নয়, জঙ্গিবাদের ন্যূনতম কোনো ইঙ্গিতও থাকলেও তা আমলে নিয়ে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো সরকারের দায়িত্ব। জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে অন্ধভাবে সত্য ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যাচাই না করে তাকে অনুমাননির্ভর বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব জঙ্গিবাদ আছে কি নেই—এই বিতর্কে জয়ী হওয়া নয়; বরং জঙ্গিবাদের সামান্যতম পুনরুত্থানের সংকেত থাকলেও তা শনাক্ত করা এবং বড় বিপদে পরিণত হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া।

বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস গ্যাস-বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট এবং তার ফলে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের মধ্যে কেটেছে। সরকারের হানিমুন পিরিয়ড শেষ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জ্বালানি সংকটের সমাধান করে অর্থনীতির চাকা সচল করা যেমন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনেক ইস্যু মোকাবিলাও তাকে করতে হচ্ছে। তার ওপর ধর্মীয় উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ যদি নতুন করে বিপদ তৈরি করে, তাহলে সরকারের পক্ষে দেশ চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

জঙ্গিবাদের শেকড়, জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্ভারতা