সরকারের ১৮০ দিন/ছয় মাসে শিল্প-সংস্কৃতিতে কতটা বদল এলো

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

মাত্র ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কোনো সরকারকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে এই সময়ের অগ্রাধিকার, মানসিকতা ও কাজের ধরন থেকে ভবিষ্যৎ পথচলা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসন, এরপর দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বিএনপির ক্ষমতায় আসা; এই প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের ছয় মাসের হিসাব সাধারণ মানুষের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ।

বিএনপির সামনে রয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার—একদিকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনে গড়ে ওঠা কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কারের চেষ্টা ও নানা সীমাবদ্ধতা। সংস্কৃতি অঙ্গনেও সেই উত্তরাধিকারের ছাপ স্পষ্ট।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও লেখক-শিল্পীর স্বাধীনতা—সবকিছুর ওপরই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব থাকে। একটি সরকার সংস্কৃতিকে কীভাবে দেখে, তার প্রতিফলন দেখা যায় কোন বই সরকারি অর্থে কেনা হচ্ছে, কারা পুরস্কৃত হচ্ছেন, রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পী-সাহিত্যিকরা কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন। তাই নতুন সরকারের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—আগের সময়ের তুলনায় কী বদলেছে, আর কী বদলায়নি।

এই পরিবর্তনের প্রথম দৃশ্য দেখা যায় অমর একুশে বইমেলায়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও মেলা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তখন প্রশ্ন উঠেছিল, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থায় বইমেলার চরিত্র কি বদলাবে? নির্বাচনের কারণে এবার অমর একুশে বইমেলা প্রচলিত সময়ের পরে ২৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়। মেলার প্রতিপাদ্য ছিল ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলার উদ্বোধন করেন এবং একই অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করা হয়।

তবে উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতিই পরিবর্তনের প্রমাণ নয়। মেলা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, প্রকাশকদের সঙ্গে বাংলা একাডেমির সম্পর্ক কেমন, বই প্রকাশ ও বিক্রির পরিবেশ কতটা স্বস্তিদায়ক এবং মেলার বাইরেও বইয়ের বাজার সক্রিয় রাখতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, এসবের ওপর নির্ভর করে আসল পরিবর্তন। সরকারের সাংস্কৃতিক দর্শন বড় আয়োজনের মঞ্চে যতটা প্রকাশ পায়, তার চেয়ে বেশি ধরা পড়ে এসব প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হয় ১২ ফেব্রুয়ারি আর ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভা ও নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মাত্র আটদিন পর বইমেলা শুরু হওয়ায় নতুন সরকারের পক্ষে আয়োজনের বড় পরিবর্তন বা পরিবেশ স্বাভাবিক করার সুযোগ ছিল না। ফলে ২০২৬ সালের মেলাও আগের বছরের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। বড় যেকোনো আয়োজনের সাফল্য মানুষের নিরাপত্তা, স্বাভাবিক জনজীবন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত।

প্রকাশনা শিল্পের জন্য রাষ্ট্রের বড় প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাদের মধ্যে সরকারি গ্রন্থাগার ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি বই কেনায় রাজনৈতিক পক্ষপাত ও পছন্দের লেখক-প্রকাশককে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বই নির্বাচন ও সরকারি ক্রয়ে পুরোনো বলয় কতটা ভাঙছে, সেটিই প্রকাশনা খাতে নতুন সরকারের অন্যতম পরীক্ষা।

প্রকাশনা খাতকে শুধু ফেব্রুয়ারির বইমেলাকেন্দ্রিক বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর সচল রাখতে সরকারি গ্রন্থাগারগুলোতে নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে বই কেনা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বইয়ের সরবরাহ বাড়ানো, নতুন পাঠক তৈরির কর্মসূচি এবং বই বিক্রির স্থায়ী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে প্রকাশকের আয় শুধু বইমেলার কয়েক সপ্তাহের বিক্রির ওপর নির্ভর করবে না; সারা বছর বই প্রকাশ, বিপণন ও বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলা একাডেমি কী আয়োজন করছে, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো বাংলা ভাষা ও জ্ঞানচর্চার জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার কার্যকারিতা কতটা। ভাষা ও সাহিত্যভিত্তিক রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু বইমেলা আয়োজন বা পুরস্কার দেওয়ায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। গবেষণা, অভিধান প্রণয়ন, অনুবাদ, দুর্লভ গ্রন্থ সংরক্ষণ, বাংলা ভাষার প্রসার, সাহিত্যিক ঐতিহ্য রক্ষা ও নতুন প্রজন্মের জ্ঞানচর্চায় ভূমিকা রাখাই মূল দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে প্রতিষ্ঠানটি কতটা সক্রিয় ও সময়োপযোগী হয়ে উঠছে, বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে সেটিও দেখার বিষয়।

আওয়ামী লীগ আমলের কর্তৃত্ববাদী আচরণ, দমন-পীড়ন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিজ্ঞতা; অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার-চেষ্টা; এবং নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় মূল প্রশ্নটি হলো, সংস্কৃতি কি এবার সত্যিই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জায়গা থেকে নাগরিকের স্বাধীন সৃজনশীলতার পরিসরে এগোচ্ছে?

শিল্পকলা একাডেমির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। আওয়ামী লীগ আমলে রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক আনুগত্য ও দলীয় প্রভাব ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেই কাঠামোয় পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। এখন নেতৃত্বে পরিবর্তনের চেয়ে বড় প্রশ্ন—শিল্পীদের জন্য প্রতিষ্ঠানটি কতটা উন্মুক্ত, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ ও স্বাধীন সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ কতটা বাড়ছে। সেখানেই পরিবর্তনের গভীরতা বোঝা যাবে।

সরকার বদলের সঙ্গে রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার ধরনেও পরিবর্তন আসবে, এমন প্রত্যাশা ছিল। আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যে কেন্দ্রীভূত ছিল। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে যোগ্যতা ও কাজ কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটিই এই পরিবর্তনের অন্যতম মাপকাঠি।

আওয়ামী লীগ আমলে মতপ্রকাশের ওপর চাপ, সেন্সরশিপ ও রাজনৈতিক আনুগত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের বড় আলোচনার বিষয় ছিল। ১৭ বছরের দুঃশাসনে অতিষ্ঠ মানুষের মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা তৈরি হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের নানা ক্ষেত্রে বদল আসবে, তৈরি হবে মুক্ত ও স্বাভাবিক পরিবেশ। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সেই প্রত্যাশার পরীক্ষা—সরকার কি নিজের পছন্দের সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরি করছে; নাকি সরকারবিরোধী, সমালোচনামূলক ও ভিন্নমতের শিল্পী-সাহিত্যিকদেরও সমান জায়গা দিচ্ছে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক সাফল্য এখানেই; সরকারের প্রশংসার চেয়ে বড় বিষয়—সরকারের সমালোচনাও কতটা নিরাপদে করা যাচ্ছে।

সংস্কৃতির বিকেন্দ্রীকরণও নতুন সরকারের কাজের একটি মাপকাঠি। ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলার শিল্পী, নাট্যদল, সংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো কতটা সুযোগ পাচ্ছে; তার ওপরই নির্ভর করবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কতটা রাজধানীর বাইরে বিস্তৃত হচ্ছে। শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক আয়োজন দিয়ে সাংস্কৃতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হলেই বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্য পূরণ হবে।

আওয়ামী লীগ আমলের কর্তৃত্ববাদী আচরণ, দমন-পীড়ন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করার অভিজ্ঞতা; অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার-চেষ্টা; এবং নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় মূল প্রশ্নটি হলো, সংস্কৃতি কি এবার সত্যিই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের জায়গা থেকে নাগরিকের স্বাধীন সৃজনশীলতার পরিসরে এগোচ্ছে?

বিএনপি সরকারের সাংস্কৃতিক সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সৃষ্টিশীলতার জন্য কতটা মুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, ঢাকার বাইরে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা কতটা বিস্তৃত হচ্ছে এবং ভিন্ন মত ও রুচির জন্য কতটা বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হচ্ছে—তার ওপর। বিএনপির প্রথম ছয় মাস তাই কেবল একটি সরকারের প্রাথমিক কর্মকাণ্ডের হিসাব নয়; আগামী দিনের সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রচিন্তা কোন পথে এগোবে, তারও একটি প্রাথমিক রেখাচিত্র।

হানিফ রাশেদীন: কবি ও সাংবাদিক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

ছয় মাসে শিল্প-সংস্কৃতিতে কতটা বদল এলো