লেখা:

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ‘গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স’ প্রকাশ করে। এতে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের জীবনমান তুলনা করা হয়। সর্বশেষ ৭ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকা ১৭১তম স্থানে রয়েছে, এর পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দুটি শহর। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা ধারাবাহিকভাবে এ তালিকার একেবারে নিচের দিকে অবস্থান করছে।
নিঃসন্দেহে ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এবং নাগরিক সেবার নানা ঘাটতি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। সঙ্গে এটাও সত্য, ঢাকার মতো একটি দ্রুতবর্ধনশীল উন্নয়নশীল দেশের মহানগরী কেবল পশ্চিমা নগর মানদণ্ডে মূল্যায়ন করলে তার প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
ইআইইউ-এর এ প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ঢাকার অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে অবসবাসযোগ্য শহরের প্রমাণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু ইআইইউ-এর মূল্যায়ন সূচক এর নিরিখে ঢাকার বাসযোগ্যতা বোঝার জন্য এর উদ্দেশ্য, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। অনেকের ধারণা, গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স হলো বিশ্বের বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষের জীবনমান পরিমাপের একটি বৈশ্বিক সূচক। তবে, বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) কোনো দাতব্য বা উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান অথবা জাতিসংঘের মতো মানব উন্নয়ন সূচক প্রস্তুতকারী সংস্থা নয়। এটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য ইকনোমিস্ট গ্রুপ-এর একটি বাণিজ্যিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান। এর মূল কাজ হলো বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুজাতিক কোম্পানিকে ব্যবসায়িক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও নীতিগত পরামর্শ প্রদান করা।
ইআইইউ-প্রতিবছর সাধারণত জুন মাসে গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স (জিএলআই) নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বিশ্বের ১৭৩টি প্রধান শহরের জীবনযাত্রার মানকে বহুমাত্রিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ৩০টিরও বেশি গুণগত ও পরিমাণগত সূচক ব্যবহার করে প্রতিটি শহরকে ০–১০০ স্কেলে স্কোর প্রদান করা হয়, যেখানে ১০০ মানে সর্বোচ্চ জীবনযাত্রার মান নির্দেশ করে। মূল্যায়নের জন্য ইআইইউ মূলত পাঁচটি মূল মানদণ্ড ব্যবহার করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে-স্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তা (২৫%), স্বাস্থ্যসেবার মান (২০%), সংস্কৃতি ও পরিবেশ (২৫%), শিক্ষা ব্যবস্থা (১০%) এবং নগর অবকাঠামো (২০%)। প্রতিটি বিভাগে একাধিক সূচক অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেগুলোকে গুণগতভাবে বিশ্লেষণ করে সংখ্যায় রূপান্তর করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী তারা সরকারি পরিসংখ্যান, সেকেন্ডারি ডাটাবেজ, স্থানীয় বিশ্লেষক এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চলতি বছরের শহরগুলোর জীবনযাত্রার মান তুলনামূলকভাবে উপস্থাপন করে থাকে। আন্তর্জাতিক তুলনার জন্য এটি একটি কার্যকর কাঠামো হলেও, এর মূল্যায়নের ক্ষেত্র স্বাভাবিকভাবেই সীমিত।
২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্সে ১৪০টি শহর অন্তর্ভুক্ত ছিল, পরে ২০২০ সাল থেকে এটি সম্প্রসারিত হয়ে ১৭৩টি শহরের তুলনামূলক মান প্রকাশ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় শহরগুলো ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা সাত বছর ধরে প্রথম স্থানে থাকার পর ২০২৫ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন ৯৮.০ স্কোর নিয়ে শীর্ষে উঠে আসে এবং ২০২৬ সালেও সেই অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভিয়েনা, আর শীর্ষ দশে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনি, সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ও জেনেভা, জাপানের ওসাকা, নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড, কানাডার ভ্যাঙ্কুভার, এবং অস্ট্রেলিয়ার আরেক শহর অ্যাডিলেড। অন্যদিকে, তালিকার নিম্ন দশে রয়েছে তেহরান, হারারে, কিয়েভ, পোর্ট মোর্সবী, লাগোস, আলজিয়ার্স, করাচি, ঢাকা, ত্রিপোলি এবং দামেস্ক। ঢাকা ৪২.০ স্কোর নিয়ে ১৭১ তম অবস্থানে রয়েছে।
তবে, ইআইইউ-এর গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স-এর মূল উদ্দেশ্য কোনো শহরের সাধারণ নাগরিকদের জন্য ‘বসবাসের সবচেয়ে সেরা শহর’ চিহ্নিত করা নয়। এটি মূলত একটি বাণিজ্যিক তুলনামূলক মূল্যায়ন টুল, যা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার জন্য তৈরি। বিশেষ করে তারা এটি ব্যবহার করে থাকে বিনিয়োগ কৌশল নির্ধারণ, প্রবাসী কর্মী নিয়োগ বা বিদেশে কর্মরত কর্মকর্তাদের স্থানান্তর, কর্মপরিবেশ মূল্যায়ন এবং ‘হার্ডশিপ অ্যালাউন্স’ নির্ধারণে। অর্থাৎ, ইনডেক্সটি কিছু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত-সহায়ক সূচকে বিভিন্ন শহরের বসবাসযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে নির্ধারণ করে যার প্রয়োগ ক্ষেত্র মূলত কর্পোরেট ও নীতিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ।
এছাড়াও, এ ইনডেক্সের মূল্যায়ন পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এতে আবাসন খরচ বা জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। উচ্চপদস্থ বিদেশি কর্মকর্তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি তৈরি হওয়ায় পশ্চিমা সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়। এর ফলেই ইউরোপ, ওশেনিয়া এবং উত্তর আমেরিকার শহরগুলো প্রায় সবসময় শীর্ষে থাকে, আর উন্নয়নশীল বিশ্বের মহানগরীগুলো নিচের দিকে অবস্থান করে।
অন্যদিকে, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা পরিবেশ, আয় বৃদ্ধি, আবাসনের সামর্থ্য, সামাজিক সংহতি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে সরাসরি মূল্যায়িত হয় না। অথচ উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের জন্য এসকল উপাদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, এই সূচকগুলো প্রায়শই নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে বিশেষজ্ঞের মতামতের ওপর বেশি নির্ভরশীল, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল নগর পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়।
ইআইইউ সূচকের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো এটি শহরের আকার, জনসংখ্যা এবং জনঘনত্বের প্রভাবসহ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে না। ফলে ছোট ও দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত, উচ্চ আয়ের শহরগুলোই শীর্ষে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েনা, জুরিখ বা কোপেনহেগেনের মতো শহরগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট এবং উচ্চমানের অবকাঠামো ও জনসেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরী, যেখানে দুই কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করে। দ্রুত নগরায়ণ, গ্রাম-শহর অভিবাসন, সীমিত ভূমি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অব্যাহত জনসংখ্যার চাপ-সব মিলিয়ে ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি জটিল।
মাত্র কয়েক লাখ বা কয়েক মিলিয়ন মানুষের জন্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ এবং দুই কোটিরও বেশি মানুষের একটি দ্রুতবর্ধনশীল মহানগর পরিচালনার চ্যালেঞ্জ এক নয়। কিন্তু ইআইইউ-এর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে এই কাঠামোগত পার্থক্যের জন্য কোনো পৃথক বিশ্লেষণ বা ওজন নেই। ফলে ঢাকা, মুম্বাই বা লাগোসের মতো বৃহৎ শহরগুলোকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়, যেভাবে তুলনামূলকভাবে ছোট ও পরিকল্পিত শহরগুলোকে করা হয়। এর ফলে মহানগরীর প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সূচকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
যুদ্ধ, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা সংকট, দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা শহরগুলোর বাস্তবতা এক নয়। তাই একটি সামগ্রিক স্কোরের ভিত্তিতে ভিন্ন ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের শহরগুলোর তুলনা করা সম্ভব হলেও তার ব্যাখ্যা অবশ্যই প্রেক্ষাপটনির্ভর হওয়া উচিত। একটি শহরের অবস্থানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে বরং একটি নির্দিষ্ট মূল্যায়ন কাঠামোর ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শহর মূল্যায়নের ধারণা এখন অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ইউএন-হ্যাবিট্যাট-এর সিটি প্রসপারিটি ইনিশিয়েটিভ (সিপিআই) একটি শহরের উন্নয়ন মূল্যায়নে উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, জীবনমান, সামাজিক সমতা ও অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশগত দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং নগর সুশাসন ও আইনি কাঠামো- এই ছয়টি মাত্রাকে সমান গুরুত্ব দেয়। একইভাবে, নগর উন্নয়ন মূল্যায়নে অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং সুশাসনকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘ পরিসংখ্যান কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত এই ফ্রেমওয়ার্কটি এসডিজি-১১ এবং নিউ আরবান অ্যাজেন্ডা অর্জনে শহরগুলোর অগ্রগতি ট্র্যাক করতে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের আরবান সাসটেইনেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক দেখায় যে একটি টেকসই ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশ ও সম্পদ দক্ষতা, নিম্ন কার্বন ও জলবায়ু সহনশীলতা, এবং কার্যকর সুশাসন ও সমন্বিত পরিকল্পনার সমন্বয় অপরিহার্য। ওইসিডি-ও তাদের মোস্ট ইনক্লুসিভ গ্রোথ ইন সিটিস এবং আরবান ওয়েল-বিয়িং নীতিমালায় কর্মসংস্থান, আবাসন, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক নগর মূল্যায়নের আন্তর্জাতিক ধারা এখন বহুমাত্রিক মূল্যায়নের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ফলে, ঢাকার মতো একটি মহানগরীর বাসযোগ্যতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচকগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো যথেষ্ট নয়।
অর্থনীতিতে পরিচিত ‘এগ্লোমারেশন ইকোনোমিজ’ বা পুঞ্জীভবন অর্থনীতি ধারণা অনুযায়ী বড় শহরে মানুষ, শিল্প, বাজার এবং সেবার কেন্দ্রীভবনের ফলে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। তবে, একই সঙ্গে যানজট, দূষণ, আবাসন সংকট এবং অবকাঠামোর ওপর চাপও বাড়ে। অর্থাৎ মহানগরীর সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ- দুটিই একই সঙ্গে বিদ্যমান থাকে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, অধিকাংশ করপোরেট সদর দপ্তর, বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক সেবা খাত, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশও ঢাকা মহানগর ও এর আশপাশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে ঢাকা শুধু প্রশাসনিক রাজধানী নয়; এটি দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, আর্থিক কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বব্যাংকের ‘ট্রান্সফর্মিং মেট্রো ঢাকা’-প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ এবং দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ এর উৎস। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মোট নগর জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ ঢাকা মহানগর এলাকায় বসবাস করে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অনেকাংশেই ঢাকার আরও উৎপাদনশীল, দক্ষ ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তরের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান চিকিৎসা, এবং উন্নত জীবিকার আশায় ঢাকায় আসে। এটি যেমন নগর অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি এটিও নির্দেশ করে যে ঢাকা এখনও দেশের সবচেয়ে বড় সুযোগের শহর। যদি শহরটি সম্পূর্ণভাবে বসবাসের অনুপযোগী হতো, তবে দীর্ঘমেয়াদে এখানে মানুষের ধারাবাহিক অভিবাসন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের এই ঘনত্ব তৈরি হতো না। অথচ ইআইইউ-এর সূচকে এ বিষয়গুলো পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যায়।
এ লেখার উদ্দেশ্য অবশ্যই এটি প্রমাণ করা নয় যে ঢাকা একটি আদর্শ বাসযোগ্য শহর। মূলত দীর্ঘস্থায়ী বায়ুদূষণ, তীব্র জলাবদ্ধতা, তীব্র যানজট, উন্মুক্ত জলাশয় ও সবুজায়ন হারিয়ে যাওয়া, অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অনিয়ন্ত্রিত নগর সম্প্রসারণই ঢাকার বাস্তব সমস্যা। এই বহুবিধ সমস্যার টেকসই সমাধানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দীর্ঘমেয়াদি সুসমন্বিত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত কৌশলগত বিনিয়োগ এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এর গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একটি মূল্যায়ন কাঠামো হলেও এটি মূলত একটি সুনির্দিষ্ট কর্পোরেট উদ্দেশ্যে তৈরি। ফলে এর সূচকগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যেমন বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, তেমনি এটিও মনে রাখতে হবে যে এই ইনডেক্স স্থানীয় নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনমান, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কিংবা উন্নয়নশীল বিশ্বের মহানগরীর নিজস্ব বাস্তবতাকে সামগ্রিকভাবে প্রতিফলিত করতে পারে না।
ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাগুলো অনস্বীকার্য, তবে একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে ঢাকার বিশাল অবদান, অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। একটি শহরের প্রকৃত বাসযোগ্যতার মূল্যায়ন তখনই অর্থবহ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়, যখন তার দৃশ্যমান সংকটগুলোর পাশাপাশি তার উৎপাদনশীলতা, জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান এবং রূপান্তরের সামর্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখন সময় এসেছে একটি স্বকীয় 'জাতীয় নগর বাসযোগ্যতা সূচক' প্রণয়ন করার। জাতিসংঘের ইউএন-হ্যাবিট্যাট, ওইসিডি এবং বিশ্বব্যাংকের বহুমাত্রিক নগর মূল্যায়ন কাঠামো থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি সমন্বিত দেশীয় সূচক তৈরি করা যেতে পারে, যা দেশের বিভিন্ন শহরের বাস্তব চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক ভূমিকা, জলবায়ু ঝুঁকি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের জীবনমানকে নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করবে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে ‘গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স’ প্রকাশ করে। এতে বিশ্বের ১৭৩টি শহরের জীবনমান তুলনা করা হয়। সর্বশেষ ৭ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঢাকা ১৭১তম স্থানে রয়েছে, এর পরেই যুদ্ধবিধ্বস্ত দুটি শহর। গত কয়েক বছর ধরে ঢাকা ধারাবাহিকভাবে এ তালিকার একেবারে নিচের দিকে অবস্থান করছে।
নিঃসন্দেহে ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় বহু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, এবং নাগরিক সেবার নানা ঘাটতি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। সঙ্গে এটাও সত্য, ঢাকার মতো একটি দ্রুতবর্ধনশীল উন্নয়নশীল দেশের মহানগরী কেবল পশ্চিমা নগর মানদণ্ডে মূল্যায়ন করলে তার প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না।
ইআইইউ-এর এ প্রতিবেদন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ঢাকার অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে অবসবাসযোগ্য শহরের প্রমাণ হিসেবে দেখেন। কিন্তু ইআইইউ-এর মূল্যায়ন সূচক এর নিরিখে ঢাকার বাসযোগ্যতা বোঝার জন্য এর উদ্দেশ্য, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। অনেকের ধারণা, গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স হলো বিশ্বের বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষের জীবনমান পরিমাপের একটি বৈশ্বিক সূচক। তবে, বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) কোনো দাতব্য বা উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান অথবা জাতিসংঘের মতো মানব উন্নয়ন সূচক প্রস্তুতকারী সংস্থা নয়। এটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য ইকনোমিস্ট গ্রুপ-এর একটি বাণিজ্যিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান। এর মূল কাজ হলো বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বহুজাতিক কোম্পানিকে ব্যবসায়িক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও নীতিগত পরামর্শ প্রদান করা।
ইআইইউ-প্রতিবছর সাধারণত জুন মাসে গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স (জিএলআই) নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বিশ্বের ১৭৩টি প্রধান শহরের জীবনযাত্রার মানকে বহুমাত্রিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ৩০টিরও বেশি গুণগত ও পরিমাণগত সূচক ব্যবহার করে প্রতিটি শহরকে ০–১০০ স্কেলে স্কোর প্রদান করা হয়, যেখানে ১০০ মানে সর্বোচ্চ জীবনযাত্রার মান নির্দেশ করে। মূল্যায়নের জন্য ইআইইউ মূলত পাঁচটি মূল মানদণ্ড ব্যবহার করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে-স্থিতিশীলতা বা নিরাপত্তা (২৫%), স্বাস্থ্যসেবার মান (২০%), সংস্কৃতি ও পরিবেশ (২৫%), শিক্ষা ব্যবস্থা (১০%) এবং নগর অবকাঠামো (২০%)। প্রতিটি বিভাগে একাধিক সূচক অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেগুলোকে গুণগতভাবে বিশ্লেষণ করে সংখ্যায় রূপান্তর করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী তারা সরকারি পরিসংখ্যান, সেকেন্ডারি ডাটাবেজ, স্থানীয় বিশ্লেষক এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চলতি বছরের শহরগুলোর জীবনযাত্রার মান তুলনামূলকভাবে উপস্থাপন করে থাকে। আন্তর্জাতিক তুলনার জন্য এটি একটি কার্যকর কাঠামো হলেও, এর মূল্যায়নের ক্ষেত্র স্বাভাবিকভাবেই সীমিত।
২০০৪ সালে প্রথম প্রকাশিত গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্সে ১৪০টি শহর অন্তর্ভুক্ত ছিল, পরে ২০২০ সাল থেকে এটি সম্প্রসারিত হয়ে ১৭৩টি শহরের তুলনামূলক মান প্রকাশ করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় শহরগুলো ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে অবস্থান করছে। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা সাত বছর ধরে প্রথম স্থানে থাকার পর ২০২৫ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন ৯৮.০ স্কোর নিয়ে শীর্ষে উঠে আসে এবং ২০২৬ সালেও সেই অবস্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভিয়েনা, আর শীর্ষ দশে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ও সিডনি, সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ও জেনেভা, জাপানের ওসাকা, নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড, কানাডার ভ্যাঙ্কুভার, এবং অস্ট্রেলিয়ার আরেক শহর অ্যাডিলেড। অন্যদিকে, তালিকার নিম্ন দশে রয়েছে তেহরান, হারারে, কিয়েভ, পোর্ট মোর্সবী, লাগোস, আলজিয়ার্স, করাচি, ঢাকা, ত্রিপোলি এবং দামেস্ক। ঢাকা ৪২.০ স্কোর নিয়ে ১৭১ তম অবস্থানে রয়েছে।
তবে, ইআইইউ-এর গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স-এর মূল উদ্দেশ্য কোনো শহরের সাধারণ নাগরিকদের জন্য ‘বসবাসের সবচেয়ে সেরা শহর’ চিহ্নিত করা নয়। এটি মূলত একটি বাণিজ্যিক তুলনামূলক মূল্যায়ন টুল, যা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার জন্য তৈরি। বিশেষ করে তারা এটি ব্যবহার করে থাকে বিনিয়োগ কৌশল নির্ধারণ, প্রবাসী কর্মী নিয়োগ বা বিদেশে কর্মরত কর্মকর্তাদের স্থানান্তর, কর্মপরিবেশ মূল্যায়ন এবং ‘হার্ডশিপ অ্যালাউন্স’ নির্ধারণে। অর্থাৎ, ইনডেক্সটি কিছু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত-সহায়ক সূচকে বিভিন্ন শহরের বসবাসযোগ্যতা তুলনামূলকভাবে নির্ধারণ করে যার প্রয়োগ ক্ষেত্র মূলত কর্পোরেট ও নীতিগত সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ।
এছাড়াও, এ ইনডেক্সের মূল্যায়ন পদ্ধতি ও তথ্য সংগ্রহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এতে আবাসন খরচ বা জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। উচ্চপদস্থ বিদেশি কর্মকর্তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি তৈরি হওয়ায় পশ্চিমা সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়। এর ফলেই ইউরোপ, ওশেনিয়া এবং উত্তর আমেরিকার শহরগুলো প্রায় সবসময় শীর্ষে থাকে, আর উন্নয়নশীল বিশ্বের মহানগরীগুলো নিচের দিকে অবস্থান করে।
অন্যদিকে, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা পরিবেশ, আয় বৃদ্ধি, আবাসনের সামর্থ্য, সামাজিক সংহতি এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্সে সরাসরি মূল্যায়িত হয় না। অথচ উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকদের জন্য এসকল উপাদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, এই সূচকগুলো প্রায়শই নাগরিকের বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে বিশেষজ্ঞের মতামতের ওপর বেশি নির্ভরশীল, যা দ্রুত পরিবর্তনশীল নগর পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়।
ইআইইউ সূচকের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হলো এটি শহরের আকার, জনসংখ্যা এবং জনঘনত্বের প্রভাবসহ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে আলাদাভাবে বিবেচনা করে না। ফলে ছোট ও দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত, উচ্চ আয়ের শহরগুলোই শীর্ষে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েনা, জুরিখ বা কোপেনহেগেনের মতো শহরগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট এবং উচ্চমানের অবকাঠামো ও জনসেবা নিশ্চিত করতে সক্ষম।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরী, যেখানে দুই কোটিরও বেশি মানুষ বসবাস করে। দ্রুত নগরায়ণ, গ্রাম-শহর অভিবাসন, সীমিত ভূমি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অব্যাহত জনসংখ্যার চাপ-সব মিলিয়ে ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি জটিল।
মাত্র কয়েক লাখ বা কয়েক মিলিয়ন মানুষের জন্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ এবং দুই কোটিরও বেশি মানুষের একটি দ্রুতবর্ধনশীল মহানগর পরিচালনার চ্যালেঞ্জ এক নয়। কিন্তু ইআইইউ-এর মূল্যায়ন পদ্ধতিতে এই কাঠামোগত পার্থক্যের জন্য কোনো পৃথক বিশ্লেষণ বা ওজন নেই। ফলে ঢাকা, মুম্বাই বা লাগোসের মতো বৃহৎ শহরগুলোকে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়, যেভাবে তুলনামূলকভাবে ছোট ও পরিকল্পিত শহরগুলোকে করা হয়। এর ফলে মহানগরীর প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সূচকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
যুদ্ধ, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা সংকট, দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা শহরগুলোর বাস্তবতা এক নয়। তাই একটি সামগ্রিক স্কোরের ভিত্তিতে ভিন্ন ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের শহরগুলোর তুলনা করা সম্ভব হলেও তার ব্যাখ্যা অবশ্যই প্রেক্ষাপটনির্ভর হওয়া উচিত। একটি শহরের অবস্থানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে বরং একটি নির্দিষ্ট মূল্যায়ন কাঠামোর ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করাই অধিক যুক্তিসংগত।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শহর মূল্যায়নের ধারণা এখন অনেক বিস্তৃত হয়েছে। ইউএন-হ্যাবিট্যাট-এর সিটি প্রসপারিটি ইনিশিয়েটিভ (সিপিআই) একটি শহরের উন্নয়ন মূল্যায়নে উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো, জীবনমান, সামাজিক সমতা ও অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশগত দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং নগর সুশাসন ও আইনি কাঠামো- এই ছয়টি মাত্রাকে সমান গুরুত্ব দেয়। একইভাবে, নগর উন্নয়ন মূল্যায়নে অর্থনীতি, সমাজ, পরিবেশ, সংস্কৃতি এবং সুশাসনকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে। ২০২২ সালে জাতিসংঘ পরিসংখ্যান কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত এই ফ্রেমওয়ার্কটি এসডিজি-১১ এবং নিউ আরবান অ্যাজেন্ডা অর্জনে শহরগুলোর অগ্রগতি ট্র্যাক করতে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের আরবান সাসটেইনেবিলিটি ফ্রেমওয়ার্ক দেখায় যে একটি টেকসই ও বাসযোগ্য শহর গড়ে তুলতে শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশ ও সম্পদ দক্ষতা, নিম্ন কার্বন ও জলবায়ু সহনশীলতা, এবং কার্যকর সুশাসন ও সমন্বিত পরিকল্পনার সমন্বয় অপরিহার্য। ওইসিডি-ও তাদের মোস্ট ইনক্লুসিভ গ্রোথ ইন সিটিস এবং আরবান ওয়েল-বিয়িং নীতিমালায় কর্মসংস্থান, আবাসন, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নাগরিক অংশগ্রহণকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ আধুনিক নগর মূল্যায়নের আন্তর্জাতিক ধারা এখন বহুমাত্রিক মূল্যায়নের দিকে অগ্রসর হয়েছে। ফলে, ঢাকার মতো একটি মহানগরীর বাসযোগ্যতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচকগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো যথেষ্ট নয়।
অর্থনীতিতে পরিচিত ‘এগ্লোমারেশন ইকোনোমিজ’ বা পুঞ্জীভবন অর্থনীতি ধারণা অনুযায়ী বড় শহরে মানুষ, শিল্প, বাজার এবং সেবার কেন্দ্রীভবনের ফলে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়। তবে, একই সঙ্গে যানজট, দূষণ, আবাসন সংকট এবং অবকাঠামোর ওপর চাপও বাড়ে। অর্থাৎ মহানগরীর সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ- দুটিই একই সঙ্গে বিদ্যমান থাকে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, অধিকাংশ করপোরেট সদর দপ্তর, বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক সেবা খাত, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা এবং তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশও ঢাকা মহানগর ও এর আশপাশকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। ফলে ঢাকা শুধু প্রশাসনিক রাজধানী নয়; এটি দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, আর্থিক কার্যক্রম এবং কর্মসংস্থানের কেন্দ্রবিন্দু।
বিশ্বব্যাংকের ‘ট্রান্সফর্মিং মেট্রো ঢাকা’-প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বাংলাদেশের মোট জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ এবং দেশের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ এর উৎস। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মোট নগর জনসংখ্যার প্রায় ৩৬ শতাংশ ঢাকা মহানগর এলাকায় বসবাস করে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অনেকাংশেই ঢাকার আরও উৎপাদনশীল, দক্ষ ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তরের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ শিক্ষা, কর্মসংস্থান চিকিৎসা, এবং উন্নত জীবিকার আশায় ঢাকায় আসে। এটি যেমন নগর অবকাঠামোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তেমনি এটিও নির্দেশ করে যে ঢাকা এখনও দেশের সবচেয়ে বড় সুযোগের শহর। যদি শহরটি সম্পূর্ণভাবে বসবাসের অনুপযোগী হতো, তবে দীর্ঘমেয়াদে এখানে মানুষের ধারাবাহিক অভিবাসন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমের এই ঘনত্ব তৈরি হতো না। অথচ ইআইইউ-এর সূচকে এ বিষয়গুলো পুরোপুরি উপেক্ষিত থেকে যায়।
এ লেখার উদ্দেশ্য অবশ্যই এটি প্রমাণ করা নয় যে ঢাকা একটি আদর্শ বাসযোগ্য শহর। মূলত দীর্ঘস্থায়ী বায়ুদূষণ, তীব্র জলাবদ্ধতা, তীব্র যানজট, উন্মুক্ত জলাশয় ও সবুজায়ন হারিয়ে যাওয়া, অপর্যাপ্ত গণপরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং অনিয়ন্ত্রিত নগর সম্প্রসারণই ঢাকার বাস্তব সমস্যা। এই বহুবিধ সমস্যার টেকসই সমাধানে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দীর্ঘমেয়াদি সুসমন্বিত পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত কৌশলগত বিনিয়োগ এবং তার কঠোর বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)-এর গ্লোবাল লিভঅ্যাবিলিটি ইনডেক্স আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একটি মূল্যায়ন কাঠামো হলেও এটি মূলত একটি সুনির্দিষ্ট কর্পোরেট উদ্দেশ্যে তৈরি। ফলে এর সূচকগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যেমন বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, তেমনি এটিও মনে রাখতে হবে যে এই ইনডেক্স স্থানীয় নাগরিকদের প্রাত্যহিক জীবনমান, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি কিংবা উন্নয়নশীল বিশ্বের মহানগরীর নিজস্ব বাস্তবতাকে সামগ্রিকভাবে প্রতিফলিত করতে পারে না।
ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাগুলো অনস্বীকার্য, তবে একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে ঢাকার বিশাল অবদান, অভ্যন্তরীণ শক্তি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকেও খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। একটি শহরের প্রকৃত বাসযোগ্যতার মূল্যায়ন তখনই অর্থবহ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়, যখন তার দৃশ্যমান সংকটগুলোর পাশাপাশি তার উৎপাদনশীলতা, জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান এবং রূপান্তরের সামর্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখন সময় এসেছে একটি স্বকীয় 'জাতীয় নগর বাসযোগ্যতা সূচক' প্রণয়ন করার। জাতিসংঘের ইউএন-হ্যাবিট্যাট, ওইসিডি এবং বিশ্বব্যাংকের বহুমাত্রিক নগর মূল্যায়ন কাঠামো থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন একটি সমন্বিত দেশীয় সূচক তৈরি করা যেতে পারে, যা দেশের বিভিন্ন শহরের বাস্তব চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক ভূমিকা, জলবায়ু ঝুঁকি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের জীবনমানকে নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করবে।
.png)

চলমান গ্যাস সংকটে এলপিজির দাম বাড়ার খবর হতাশা আরও বাড়াবে। সাধারণত রান্নায় এই গ্যাস ব্যবহৃত। বাসাবাড়িতে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। গ্রামেও লাকড়ির বদলে এর ব্যবহার বৃদ্ধি লক্ষণীয়। মাঝে এলপিজির দাম অনেক বাড়ার পর দুই দফায় কমেছিল। যানবাহনেও এলপিজির ব্যবহার বাড়ছে। তাদের
১৬ ঘণ্টা আগে
সংবিধান জাতির সম্মিলিত স্বপ্নের প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা। রাজনীতির ঝড়, ক্ষমতার পালাবদল, জনআকাঙ্ক্ষার উত্থান-পতন এসবের মাঝখানে এই নীরব অক্ষের চারদিকে একটি জাতির রাজনৈতিক বিশ্ব আবর্তিত হয়। সংবিধান কেবল আইনের গ্রন্থ নয়। সংবিধান জাতির স্মৃতি, সংগ্রামের দলিল। ভবিষ্যতের সঙ্গে করা এক নৈতিক চুক্তি।
১৭ ঘণ্টা আগে
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার জ্ঞানচর্চার মান, গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সত্যের প্রতি অঙ্গীকারে। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য শুধু নতুন তথ্য প্রকাশ নয়, বরং এমন নির্ভরযোগ্য জ্ঞান সৃষ্টি করা, যা সমাজ, বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখে।
২০ ঘণ্টা আগে
সিপিডির গবেষণায় একটি পরিসংখ্যান বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কাঁচামরিচের খুচরা মূল্য খামারের মূল্যের তুলনায় ১১৬ শতাংশ বেশি, আলুর ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ৮৭ শতাংশ। প্রশ্ন উঠেছে—এই ব্যবধান কি অস্বাভাবিক, নাকি বৈশ্বিক মানদণ্ডে স্বাভাবিক? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই তাকাতে হয
২১ ঘণ্টা আগে