ব্যাংক খাতে আস্থা ধরে রাখা কঠিন

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১: ৫৮
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

কিছুদিন পরপর খেলাপি ঋণের যে পরিস্থিতি সামনে আসছে, তাতে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে আরও। পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয়তা নেই, তা নয়। তবে ‘উদার’ নীতি সহায়তায়ও খেলাপি ঋণ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। নতুন ধারায় পরিস্থিতি মোকাবিলা প্রয়োজন বলেও মনে হচ্ছে।

সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ এ মুহূর্তে সর্বাধিক খেলাপি ঋণের বোঝা বহনকারী দেশ। অন্তর্বর্তী শাসনামলে পাঁচটি সংকটগ্রস্ত ব্যাংক একীভূতকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রক্রিয়াটি এখনও চলমান। এ ব্যাংকগুলোর ৮০ শতাংশেরও বেশি ঋণখেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয়ও খেলাপি ঋণ ৫০ শতাংশের বেশি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ শাসনামলেই মূলত এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। হিসাবের মারপ্যাঁচে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার ব্যবস্থাও হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে মিলেছিল আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা। নির্ধারিত নিম্ন সুদে ব্যাংকঋণ জুগিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্তও হয়েছিল। নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ না করে ঋণ আত্মসাৎ এবং অনেক ক্ষেত্রে তা পাচারও করে দেওয়া হয়। সেইসব অর্থ ব্যাংকে ফিরে না এসে অর্থনীতিতে বিনিয়োজিত হলেও কিছু কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। তাতে বাড়তি ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হলে অন্যান্য খাত হতো উপকৃত। প্রবৃদ্ধিও বাড়তো।

আওয়ামী লীগ শাসনামলে খেলাপি ঋণ আড়ালের পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে দেখানোটাও হয়ে গিয়েছিল রীতি। এজন্য আবার ব্যবহৃত হয়েছে বিবিএস। গণঅভ্যুত্থানের পর এসব প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করাটাও হয়ে ওঠে বড় দাবি। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও সঠিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া জরুরি। নইলে প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণে দেখা দেবে সংকট। আর ব্যাংক খাতের সংকট মোচন এবং এর সুষ্ঠু পরিচালনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপযুক্ত নীতি ও জোরালো নজরদারি একান্ত প্রয়োজন।

খেলাপি ঋণ উদ্ধারের চিত্রটি কিন্তু মোটেও উৎসাহব্যঞ্জক নয়। নির্বাচিত সরকারের ছয় মাসেও যে এ ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটেনি, তা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় স্পষ্ট। নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি হচ্ছে না, সেটা নিশ্চিত করাও এ মুহূর্তে জরুরি। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা অবশ্য এখন কম। সুদের হার বেড়েছে; জ্বালানি সংকট তীব্রতর। এসব কারণে ইচ্ছা থাকলেও সময়মতো ঋণ পরিশোধ এখন কঠিন।

একটা সময় পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ঘিরে সংকট বেশি দেখা যেত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে। কালক্রমে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এতে মূলধারা হয়ে উঠলে সেগুলোতেও খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। তা সত্ত্বেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত সমস্যাটি সংকটে পরিণত হয়নি। গণঅভ্যুত্থানে সরকারটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রকৃত হিসাবায়নে বেরিয়ে আসে ব্যাংক খাতের দুর্দশা। তৎকালীন গভর্নর নতুন কিছু পদক্ষেপও নেন খাতটিকে টেনে তুলতে। দুর্দশার প্রকৃত চিত্র সামনে আসায় তখন সিংহভাগ ব্যাংকের ওপর থেকে আমানতকারীদের আস্থা উঠে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে আবার উদ্বেগ সৃষ্টি হয় শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের অর্থায়নে মুখ্য ভূমিকায় থাকা ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

খেলাপি ঋণের একাংশ অনিচ্ছাকৃতভাবে সৃষ্ট। তবে রাজনৈতিক ও অন্যান্য যোগাযোগে বিপুল পরিমাণ ঋণ জোগানোই হয়েছিল আত্মসাতের জন্য। একশ্রেণির ব্যাংক কর্মকর্তাও এতে জড়িত। ব্যাংকে গচ্ছিত জনগণের অর্থ আত্মসাৎকারী এই সব পক্ষকে চিহ্নিত করার কাজে কতখানি অগ্রগতি হয়েছে, সেটাও প্রশ্ন। খেলাপি ঋণ উদ্ধারের চিত্রটি কিন্তু মোটেও উৎসাহব্যঞ্জক নয়। নির্বাচিত সরকারের ছয় মাসেও যে এ ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটেনি, তা সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় স্পষ্ট। নতুন করে খেলাপি ঋণ তৈরি হচ্ছে না, সেটা নিশ্চিত করাও এ মুহূর্তে জরুরি। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা অবশ্য এখন কম। সুদের হার বেড়েছে; জ্বালানি সংকট তীব্রতর। এসব কারণে ইচ্ছা থাকলেও সময়মতো ঋণ পরিশোধ এখন কঠিন। পৌনঃপুনিক ছাড় দিয়েও তাই ব্যাংকে অর্থ ফেরানো যাচ্ছে না। সরকারকে বরং করের অর্থ জুগিয়ে সংকটগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় জ্বালানি সংকট মোকাবিলার মতো করে ব্যাংক খাত উদ্ধারেও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। নজিরবিহীন খেলাপি ঋণে ভারাক্রান্ত ব্যাংক খাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও আমাদের সংকটে ফেলতে পারে। ব্যাংক খাতের একের পর এক খারাপ খবরে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখাও কঠিন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত