ইসলামী ব্যাংকের বিদ্যমান সংকট ও বাস্তবতা

ফরহাদ জাকারিয়া
ফরহাদ জাকারিয়া

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২৬, ১৩: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক

এখন বলা অত্যুক্তি হবে না, দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি গভীর সংকটে নিমজ্জিত। জুনের ১ তারিখে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণকে কেন্দ্র করে মতিঝিলের প্রধান কার্যালয়ের সামনে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে সংকটটি প্রকাশ পেয়েছে আরও ব্যাপকভাবে।

বস্তুত ইসলামী ব্যাংকে সংকটের সূত্রপাত ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, মালিকানা বদলের পর। পরবর্তীতে মালিক পক্ষ হিসেবে আসা একটি শিল্পগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় মদদে ব্যাংকটিকে যেভাবে লুট করেছে, তা দেশ তো বটেই—বিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে নজিরবিহীন। এতে কেবল ব্যাংকটির আর্থিক স্বাস্থ্যই দুর্বল হয়নি; অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে দেশের ব্যাংক খাতেও।

২০২২ সালের নভেম্বরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যাংকটির বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারির খবর প্রকাশ পায়। এসব তথ্য সামনে আসার পর সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা আমানত তুলতে শুরু করেন ব্যাপকভাবে। ফলে একটা পর্যায়ে ব্যাংকটি ব্যর্থ হয় চাহিদামতো আমানত ফেরত দিতে।

দেশীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পরিচালন মুনাফা অর্জনকারী ব্যাংকটি এক সময় পরিণত হয় লোকসানি প্রতিষ্ঠানে। শুধু তাই নয়, নগদ তারল্য সংরক্ষণ থেকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখাসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যূনতম শর্ত পরিপালনের মতো সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে ব্যাংকটি।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে নতুন বোর্ড দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংকটি ধীরে ধীরে আমানতকেন্দ্রিক সংকট কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছিল। মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল– যাদের কাছে তাদের আমানত নিরাপদ, তারাই রয়েছে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্বে। ওই সময় ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকেও গ্রাহকদের নিশ্চিত করা হয়েছিল, এক টাকাও আর তসরুপ হতে দেওয়া হবে না। এটাই ছিল গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারের মূল কারণ।

ব্যাংকটি এখন এমন এক পরিস্থিতিতে যে, গ্রাহকরাও ঊর্ধ্বতন মহল থেকে চাচ্ছেন এমন নিশ্চয়তা। কিন্তু ঋণের মাধ্যমে টাকা লুটকারী সেই শিল্পগোষ্ঠীর ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় ফিরে আসার বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে যে ‘খবর’ প্রচার হচ্ছে, তাতে গ্রাহকদের উল্লেখযোগ্য অংশই সম্ভবত আর আস্থা রাখতে পারছেন না এ ব্যাংকে।

বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর একজন সংসদ সদস্য সম্প্রতি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক জামায়াতে ইসলামীর নয় এবং এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জামায়াতের কোনও এমপি নেই।

তার বক্তব্যে সত্যতা থাকলেও এটা অনস্বীকার্য, ব্যাংকটি বিনির্মাণ ও পরিচালনায় দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে। ​ইসলামী ব্যাংককে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে আসার জন্য যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন, তাদের সিংহভাগ ছিলেন জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী। শুরু থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দাঁড় করাতে এবং দেশে ইসলামী ব্যাংকিং প্রচলনে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। হয়তো তাদের উদ্দেশ্য ছিল এ ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে ইসলামী ধারার ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করা। মানবিক ব্যাংকিং ও গণমুখী নানা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কারণেও মানুষের আস্থায় সেই ব্যাংক পরিণত হয়েছে মহীরুহে। তারই ফলে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক ষষ্ঠমাংশ এখন এই ব্যাংকের নেটওয়ার্কে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চ্যানেল ব্যবহার করেই আসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স। পরিচালনা পর্ষদ কিংবা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে আনা পরিবর্তনে সৃষ্ট আতঙ্কের প্রভাব শুধু দেশের আমানতকারীদের ওপর পড়বে না; তা সংক্রমিত হতে পারে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের মাঝেও। এর প্রবাহ ব্যাহত হলে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি।

​এটা সত্য, এই জনবল ও ব্যবস্থাপনার অধীনে ব্যাংকটি যতদিন পরিচালিত হয়েছিল, ততদিন গ্রাহকদের আমানত ছিল নিরাপদ; ঠিক তেমনি ব্যাংকও পর্যায়ক্রমে পাচ্ছিল সাফল্য। এক পর্যায়ে ইসলামী ব্যাংক পেরেছিল বিশ্বের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় স্থান করে নিতে। এই সাফল্য কেবল দক্ষ পরিচালনার কারণে আসেনি; এর পেছনে বড় কারণ ছিল দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা গ্রাহকদের আমানতের নিরাপত্তাকে দিয়েছিলেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব। একই সাথে দেশের অভ্যন্তরে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ, রপ্তানিমুখি শিল্প প্রসারে সহযোগিতা এবং রেমিট্যান্স আহরণের মাধ্যমে ব্যাংকটি পরিণত হয়েছিল সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম সহযোগী। এখন ব্যাংকটির এই দুরবস্থায় রক্তক্ষরণ শুধু এর নির্মাতাদেরই হচ্ছে না; হচ্ছে সব অংশীজনের।

মনে রাখা প্রয়োজন, যেকোনো ব্যাংকের টিকে থাকার মূল ভিত্তিই হলো গ্রাহকদের অবিচল আস্থা। এতে যদি ফাটল ধরে, তবে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। ইসলামী ব্যাংকে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে বিভিন্ন পর্যায়ের গ্রাহক থেকে যে বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ব্যাংকটিতে সংকট আরও ঘনীভূত হবে বলেই মনে হয়। এ অবস্থায় ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত খোদ ব্যাংক খাতের ভেতরের অনেকেই। আর ঘটনাটি ঘটলো নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মোটামুটি তিন মাসের মধ্যে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠবে, পরিচালনা পর্ষদের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যানের পদত্যাগের পেছনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কি কোনো ইঙ্গিত ছিল? যে ধারায় ব্যাংকটি তার অবস্থান পুনরুদ্ধার শুরু করেছিল, তাতে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার শীর্ষ পর্যায়ে রদবদল কি জরুরি ছিল? এমন রদবদলে গ্রাহকদের মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্কে ব্যাংকটি থেকে যে আমানত বেরিয়ে যাবে, তাতে লাভ কার? আর এতে ব্যাংকটিতে সংকট নতুনভাবে দেখা দিলে সরকারের জন্যও কি তা ইতিবাচক হবে?

ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নতুন যে চেয়ারম্যান দেওয়া হয়েছে, তার রাজনৈতিক মতাদর্শ ও অতীতের কিছু কর্মকাণ্ড নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। এসব প্রশ্নকে অবশ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অংশ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ। তবে এটা ঠিক, সংকটে থাকা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে এমন ব্যক্তিদেরই থাকা উচিত, যাদের ওপর নির্দ্বিধায় আস্থা রাখতে পারেন গ্রাহকরা। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এর বিপরীত চিত্র। এর পেছনে নীতিনির্ধারণী মহলের উদ্দেশ্য কী, তা অবশ্য অস্পষ্ট। প্রশ্ন হলো, এ ধারায় অগ্রসর হয়ে ব্যাংকটির বিদ্যমান সংকট কি সামলানো যাবে? আর ইসলামী ব্যাংকের সংকট সামলানো না গেলে তার যে প্রভাব অর্থনীতিতে পড়বে, সেই ধাক্কা কি মোকাবিলা করা যাবে সহজে?

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের চ্যানেল ব্যবহার করেই আসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স। পরিচালনা পর্ষদ কিংবা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে আনা পরিবর্তনে সৃষ্ট আতঙ্কের প্রভাব শুধু দেশের আমানতকারীদের ওপর পড়বে না; তা সংক্রমিত হতে পারে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীদের মাঝেও। এর প্রবাহ ব্যাহত হলে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে অর্থনীতি।

একই শিল্পগোষ্ঠী দ্বারা লুট হওয়ায় ইসলামী ধারার আরও কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে সম্প্রতি। নাম ও লোগো পরিবর্তন হলেও ব্যাংকটির শাখাগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করছে আগের ঠিকানায়। চাহিদানুযায়ী আমানত ফেরত দিতে না পারায় এর কোনো কোনো শাখায় গ্রাহকদের তালা দেওয়ার উদাহরণও দেখা গেছে।

এ পরিস্থিতিতে যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো সিদ্ধান্তে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আস্থায় ফাটল ধরে– তা পুরো ব্যাংক খাতের জন্যই হতে পারে হিতে বিপরীত। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত হবে এমন যোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিকে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষ দায়িত্বে নিয়োজিত করা, যিনি এর লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারে রাখতে পারবেন দৃঢ় ভূমিকা। একই সঙ্গে পুনরুদ্ধার করতে পারবেন গ্রাহকদের আস্থা।

ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যে পরিমাণ– এত বড় অংকের খেলাপি বিনিয়োগ নিয়ে কোনো ব্যাংক কতদিন স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, সেটাও বড় প্রশ্ন। ব্যাংকটি প্রভিশন সংরক্ষণে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সময় নিয়েছে অবশ্য। এখন কথা হলো, পরপর দু’বছর শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিতে না পারায় ব্যাংকটির ক্যাটাগরি ‘এ’ থেকে ‘জেডে’ অবনমন হয়েছে ইতোমধ্যে। কোনো ব্যাংক যখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হয় এবং শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড দিতে পারে না, তখন আন্তর্জাতিক ব্যাংকিংয়েও তার কিছু সুবিধা সংকুচিত হয়। বলা বাহুল্য, এটা ব্যাংকটির ঘুরে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়াকেই করবে প্রলম্বিত। এতে বিশেষ করে দেশের বাইরের অংশীজনরা ব্যাংকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে কিছু করার থাকবে না।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখা জরুরি, ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ লুট হয়েছে রাষ্ট্রীয় মদদে আর এর সিংহভাগই নেওয়া হয়েছে দেশের বাইরে। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ছাড়া এ অর্থ পুনরুদ্ধার যেমন অসম্ভব, তেমনি সেটা উদ্ধার ছাড়া ঘুরে দাঁড়ানোর বিকল্প পথও খোলা নেই ব্যাংকটির সামনে। এজন্য সরকারের উচিত হবে– ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং লুট হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। কারণ ইসলামী ব্যাংক বাঁচলে চূড়ান্তভাবে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো ব্যাংক খাতে। এর সুফল পাবে অর্থনীতি। এটা অনস্বীকার্য, যে যেই প্রতিষ্ঠান গড়ে, তার চাইতে বেশি সহানুভূতি অন্য কারও থাকতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠনেও এর প্রতিফলন রাখতে হবে।

লেখক: ব্যাংকার

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত