মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ: আবেগের চেয়ে বাস্তবতার হিসাব কেন জরুরি?

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭: ২৫
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা আমাদের সামনে একটি নতুন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট মক্কায় যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তাতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে এসেছে, সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ইতিবাচকতা কি যথেষ্ট বিশ্লেষণের ফল, নাকি সাময়িক আবেগের প্রতিফলন? বাংলাদেশের মতো একটি ঘনবসতিপূর্ণ, আমদানিনির্ভর ও বহুমাত্রিক বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা রাষ্ট্রের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর দ্রুত দেওয়া উচিত নয়।

চুক্তিটির কাঠামো ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা মডেলের কাছাকাছি। কোনো সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটি সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে, এমনটাই বলা হয়েছে চুক্তিতে।

তুরস্ক নিজেই জানিয়েছে, ভবিষ্যতে অন্য দেশের জন্যও চুক্তির দরজা খোলা থাকবে। তার মানে বাংলাদেশ যদি যোগ দেয়, তাহলে সেটা শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা থাকবে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাবে সামরিক বাধ্যবাধকতা, যা প্রয়োজনে অবস্থান নেওয়ার দাবি রাখে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেওয়ার জন্য প্রস্তুত, যার ফলাফল আমরা এখনো পুরোপুরি অনুমান করতে পারছি না।

মক্কা চুক্তির পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয় এভাবে যে, এতে যোগ দিলে বাংলাদেশ একটি বড় নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে চলে যাবে। শুনতে ভরসার মতো লাগে। কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার আর বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কি একই রকম? লোহিত সাগর, ইরান পরিস্থিতি, ইসরায়েল, সিরিয়া বা উপসাগরীয় শক্তির টানাপোড়েন, এসবের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবাস্তবতার সরাসরি সম্পর্ক নেই। অন্য অঞ্চলের যুদ্ধভাবনা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়াটা বিচক্ষণতা হবে কি? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে বের করতে হবে।

এটা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রশ্ন নয়। জ্বালানি বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ, মুসলিম বিশ্বে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান, এসবের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। একটি সম্ভাব্য সুবিধার জন্য একাধিক দরজা একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া কোনো রাষ্ট্রনীতির লক্ষণ হতে পারে না।

ভূগোলের হিসাবটাও এখানে ফেলে রাখা যায় না। বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার, দক্ষিণে সমুদ্রপথ, আর অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভরশীল আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর। এমন অবস্থানে পররাষ্ট্রনীতির একটি ভুল সিদ্ধান্তও একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি করতে পারে।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের আগ্রহ ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। এই সম্ভাবনাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রকৃতি বহুস্তরীয়। সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, অভিবাসন, নিরাপত্তা, এই সবকিছু প্রতিদিনের হিসাব। প্রতিবেশীর সঙ্গে এই হিসাব মেলানোর কৌশল দূরের কোনো জোটের ওপর দাঁড় করানো যায় না।

ইরান প্রসঙ্গটিও এড়ানো যায় না। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান শক্তির সমীকরণে ইরানকে বাদ দিয়ে কোনো বাস্তব হিসাব করা কঠিন। বাংলাদেশ যদি এমন একটি জোটে যোগ দেয়, যার রাজনৈতিক পাঠ সহজে ইরানবিরোধী হিসেবে ধরা পড়তে পারে, তাহলে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় তিক্ততা তৈরি হবে। এটা কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের প্রশ্ন নয়। জ্বালানি বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ, মুসলিম বিশ্বে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান, এসবের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। একটি সম্ভাব্য সুবিধার জন্য একাধিক দরজা একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া কোনো রাষ্ট্রনীতির লক্ষণ হতে পারে না।

সমুদ্রপথ ও বাণিজ্যের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর, বাব আল মান্দেব বা হরমুজ প্রণালির মতো পথগুলো আজ বিশ্ববাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ প্রত্যক্ষভাবে কোনো যুদ্ধের পক্ষ না হয়েও এসব পথের অনিশ্চয়তার প্রভাব টের পায়। তাহলে বাংলাদেশের ভূমিকা কী হওয়া উচিত। উত্তেজনা কমানোর পক্ষে থাকা, নাকি কোনো এক পক্ষের সামরিক ছাতার নিচে ঢুকে নিজেকে প্রতিপক্ষের তালিকায় তোলা। আমদানিনির্ভর একটি অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিরাপদ সরবরাহপথ, স্থিতিশীল বাণিজ্য পরিবেশ এবং বহুমুখী সম্পর্ক। সামরিক শিবিরভুক্তি এই তিনটিকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

মক্কা চুক্তিকে অনেকে মুসলিম ঐক্যের ভাষায় তুলে ধরেন। এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তিনটি রাষ্ট্র একসঙ্গে চুক্তি করলেই তা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে না, এই সহজ সত্যটা বারবার ভুলে যাওয়া হয়। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নিজস্ব রাষ্ট্রস্বার্থ আছে, আর তাদের পারস্পরিক হিসাবও একরৈখিক নয়। তিনটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আলাদা, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার আলাদা, এমনকি আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ নিয়ে ধারণাও এক নয়।

বাংলাদেশের পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মিয়ানমার, দক্ষিণে সমুদ্রপথ, আর অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভরশীল আমদানি, রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ওপর। এমন অবস্থানে পররাষ্ট্রনীতির একটি ভুল সিদ্ধান্তও একাধিক দিক থেকে চাপ তৈরি করতে পারে।

সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সিরিয়া বা মুসলিম ব্রাদারহুড প্রশ্নে অতীতে যে দূরত্ব দেখা গেছে, তা এই নতুন চুক্তির ফলে রাতারাতি মুছে গেছে বলে ধরে নেওয়া বাস্তবতাবর্জিত হবে। এই দেশগুলোর সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় নিরাপত্তা কাঠামোর রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তুরস্ক নিজেই ন্যাটোর সদস্য, সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক দীর্ঘদিনের, আর পাকিস্তান চীনের সঙ্গে কৌশলগত নৈকট্যের জন্য পরিচিত। এতগুলো ভিন্নমুখী স্বার্থ একটি জোটের ছাতার নিচে জড়ো হলে সেই জোট ভবিষ্যতে কোন দিকে বাঁক নেবে, তা আগেভাগে বলা কঠিন।

বাংলাদেশ আজ নাম লেখালে আগামী দিনে এই পরস্পরবিরোধী স্বার্থের কোনো একটির চাপ আমাদের ওপরও এসে পড়তে পারে। সেই চাপ সামলানোর মতো প্রস্তুতি আমাদের সত্যিই আছে কিনা, সেটাই আসল প্রশ্ন। আমার মতে, এই জোটকে শুধু ধর্মীয় আবেগের বয়ানে পড়লে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া হবে। রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আবেগের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নেওয়া যায় না, নেওয়া উচিতও নয়।

চুক্তি স্বাক্ষরের তিন সপ্তাহ না পেরোতেই এর ভৌগোলিক সম্প্রসারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সদস্য যুক্ত হলে জোটের পরিসর পূর্ব ভূমধ্যসাগর থেকে পারস্য উপসাগর হয়ে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এই বিস্তার শুধু মানচিত্রের রেখা বদলানোর বিষয় নয়, জোটে যত বেশি দেশ যুক্ত হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও তত জটিল ও কম পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে দাঁড়াবে। এই সম্প্রসারণের গতি যত দ্রুত, বাংলাদেশের জন্য চিন্তাভাবনার সময় তত কম, আর অন্য দেশগুলো সারিবদ্ধভাবে আগ্রহ দেখানোয় পিছিয়ে থাকার একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপও তৈরি হয়।

কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্ত মানেই কি ভালো সিদ্ধান্ত? ইতিহাস বলে, তাড়াহুড়ায় নেওয়া কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত পরে ভারী মূল্য দাবি করে, আর একটি জোটে ঢোকা সহজ হলেও প্রয়োজনে বেরিয়ে আসা বা শর্ত পুনর্বিন্যাস করা প্রায় সময়ই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তাড়াহুড়া না করে বিষয়টির প্রতিটি দিক ঠান্ডা মাথায় যাচাই করা, স্বল্পমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার বদলে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের নিরিখে সিদ্ধান্ত নেওয়া।

উত্তেজনা কমানোর পক্ষে থাকা, নাকি কোনো এক পক্ষের সামরিক ছাতার নিচে ঢুকে নিজেকে প্রতিপক্ষের তালিকায় তোলা। আমদানিনির্ভর একটি অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিরাপদ সরবরাহপথ, স্থিতিশীল বাণিজ্য পরিবেশ এবং বহুমুখী সম্পর্ক। সামরিক শিবিরভুক্তি এই তিনটিকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তি আছে। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা এবং অযথা বৈরিতার পথে না যাওয়া। এই নীতি দুর্বলতার নয়, বুদ্ধিমান রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয়। বাংলাদেশের শক্তি কেবল অস্ত্রে মাপা যায় না। এই শক্তি আসে জনশক্তি থেকে, অর্থনীতির প্রাণশক্তি থেকে, বন্দর ও বাণিজ্য থেকে, প্রবাসী সমাজ থেকে, বহুপাক্ষিক পরিসরে গ্রহণযোগ্য অবস্থান থেকে। সামরিক জোটে ঢুকে এই পরিসর সংকুচিত করলে সেটা আত্মরক্ষার পথ হবে না।

নিরাপত্তা আমদানি করে টেকসই করা যায় না। অন্যের ছাতার নিচে সাময়িক স্বস্তি মিললেও স্থায়ী নিরাপত্তা তৈরি হয় নিজের ভিত মজবুত করার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের প্রয়োজন সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন, সমুদ্রনিরাপত্তা জোরদার করা, সাইবার সক্ষমতা বাড়ানো, জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক প্রশস্ত করা। এই কাজগুলো ধীর ও কম আকর্ষণীয়, কিন্তু টেকসই পথ এটাই।

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়বে, এই ধারণার পক্ষে শক্ত ভিত এখনো দেখা যায়নি। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বিরোধ, ইরান প্রশ্ন, সমুদ্রপথের টানাপোড়েন, প্রতিবেশী সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ মিলিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের এখন দরকার ঠান্ডা মাথার রাষ্ট্রনীতি, আবেগ নয়, হিসাবের কলকব্জা খুঁটিয়ে দেখা। দূরের যুদ্ধে নাম লেখানো নয়, নিজের ঘর শক্ত করা। এই কারণেই বলা দরকার, মক্কা চুক্তির সম্ভাবনা যতটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হচ্ছে, বাস্তবতা এখনো ততটাই দূরে।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: প্রাবন্ধিক ও বিশ্লেষক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত