মতামত
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান প্রাথমিকভাবে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের নিরীহ দাবি নিয়ে শুরু হলেও, তা সময়ের পরিক্রমায় এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত সহিংসতার কারণে পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বিপ্লবে রূপ নিয়েছিল। এই বিপ্লবের দিনগুলোর মধ্যে ১৮ জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন রাষ্ট্রীয় ফরমান ও ভীতির কারণে স্তব্ধপ্রায়, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই দিনে ঢাকা শহরে অভাবনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
১৬ জুলাইয়ের রক্তপাত ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মনস্তত্ত্ব
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সব সময় ‘দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের’ ওপর নির্ভর করে। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার বলেছেন, সেনাবাহিনী এবং শাসকদলের পেটুয়া বাহিনী এই দমনমূলক কাঠামোর অংশ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই এই কাঠামোর নগ্ন রূপ প্রকাশ পায়। এদিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে শহীদ ওয়াসিমসহ মোট ছয়জন আন্দোলনকারী শাহাদাত বরণ করেন। আবু সাঈদের সেই আত্মদানের দৃশ্যটি মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনগণের মধ্যে এক তীব্র মানসিক ও রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটায়। শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নেন, রক্তের ওপর দিয়ে আর কোনো আপস নয়; ফ্যাসিজমকে বিতাড়িত না করে তারা আর পেছনে ফিরে তাকাবেন না।
কিন্তু একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার যখন তার অস্তিত্বের সংকট টের পায়, তখন সে আন্দোলনকে ভৌগোলিক ও কাঠামোগতভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় সরকার তড়িঘড়ি করে সারা দেশের সকল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে এবং ওই রাতেই শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এটি ছিল ফুকো-কথিত ‘বায়োপলিটিক্স’ বা জৈব-রাজনীতির ধ্রুপদি প্রয়োগ, যেখানে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শারীরিক অবস্থান ও জমায়েতকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আবাসিক হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চরম দ্বিধা ও নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। ঢাকায় যাদের কোনো স্থায়ী আবাস নেই, তাদের বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। ফলে ১৭ জুলাইয়ের সকালটি ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতার। আন্দোলন কীভাবে চলবে, কোথায় জমায়েত হবে—এই প্রশ্নগুলো যখন সবাইকে ভাবিয়ে তুলছিল, ঠিক তখনই ইতিহাসের মঞ্চে নতুন এক প্রতিরোধকামী সত্তার আবির্ভাব ঘটে।
১৭ জুলাইয়ের রূপরেখা: বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরোধের সূচনা
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপস্থিতি যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা পূরণ করতে এগিয়ে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘অরাজনৈতিক’ বা ‘বিচ্ছিন্ন’ শ্রেণি হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। কিন্তু চব্বিশের বিপ্লব আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্যবাদের তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে প্রমাণ করেছে, যখন রাষ্ট্রের নিপীড়ন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণিও তাদের কমফোর্ট জোন বা স্বস্তির বলয় থেকে বেরিয়ে আসে।
১৭ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করেন যে, আন্দোলনের কেন্দ্র এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা হল হতে পারবে না। তারা একটি নতুন রূপরেখা তৈরি করেন। এই রূপরেখার মূল ভিত্তি ছিল—‘শহুরে গেরিলা কৌশল’ বা বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরোধ। তারা সিদ্ধান্ত নেন, পুরো ঢাকাকে বিভিন্ন ব্লকে ভাগ করে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো দখল করা হবে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের মনোযোগ ও শক্তিকে বিক্ষিপ্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে। এই তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তটিই মূলত ১৮ জুলাইয়ের মহাকাব্যিক প্রতিরোধের ব্লু-প্রিন্ট ছিল।
১৮ জুলাইয়ের রণাঙ্গন: ঢাকা অচল এবং অভাবনীয় প্রতিরোধ
ফরাসি তাত্ত্বিক অঁরি লেফেভ্যর তার ‘রাইট টু দ্য সিটি’ তত্ত্বে বলেছেন, শহরের সাধারণ মানুষের অধিকার রয়েছে শহরের স্থানগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক দাবির মঞ্চ হিসেবে দাবি করার। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার রাজপথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন।
এদিন সকাল থেকেই উত্তরার বিএনএস সেন্টার থেকে জমজম টাওয়ার পর্যন্ত বিশাল এলাকা শিক্ষার্থীরা দখল করে নেন। এই এলাকার প্রতিরোধের নেতৃত্বে ছিল নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে আসে শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিটি ইউনিভার্সিটির হাজার হাজার শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভূতপূর্ব এক সংহতি স্থাপন করে মাইলস্টোন কলেজ, উত্তরা কলেজসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। উত্তরা পরিণত হয় এক রণক্ষেত্রে, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
একই সময়ে মিরপুর এলাকায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। অন্যদিকে, রামপুরা, বাড্ডা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ এই অঞ্চলের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে রাজপথে নেমে আসে।
এই সমন্বিত প্রতিরোধের ফলে ঢাকা শহর সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সারা দেশে।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের নগ্ন সন্ত্রাস এবং ৬০ জনের বেশি শাহাদাত
হান্নাহ আরেন্ট তাঁর ‘অন ভায়োলেন্স’ গ্রন্থে বলেছেন, ক্ষমতা যখন বিলুপ্তির পথে থাকে, তখনই সহিংসতার সবচেয়ে নগ্ন প্রকাশ ঘটে। ১৮ জুলাইয়ের দুপুরে পুলিশ, র্যাব এবং স্বৈরাচারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা সম্মিলিতভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সেদিন কোনো রাবার বুলেট বা টিয়ারশেল নয়, সরাসরি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। শুধু ১৮ জুলাইয়েই ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিহত হন। শত শত শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত হন।
শহীদ আসিফ, মুগ্ধ ও ফাইয়াজ: প্রতিরোধের নতুন তাত্ত্বিক প্রতীক
বিপ্লবের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি থাকে না, তারা হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের আদর্শিক প্রতীক। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আসিফ হাসান ছিলেন উত্তরা ফ্রন্টের আন্দোলনে। রাষ্ট্রীয় বাহিনি প্রায় ৭৫টি গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেয় তাঁর শরীর। আসিফের এই আত্মদান উত্তরা এলাকার আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে এবং সাধারণ মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে।
মিরপুর ও উত্তরা ফ্রন্টের আরেক অবিস্মরণীয় নাম মুগ্ধ। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের প্রাক্তন এবং পরবর্তীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। চারদিকে যখন বৃষ্টির মতো গুলি চলছে, টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় যখন চোখ মেলা দায়, তখন মুগ্ধ তাঁর পিঠে পানির বাক্স নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছুটে বেড়িয়েছেন। তার সেই কালজয়ী বাক্য—‘পানি লাগবে, পানি?’—আজও মানুষের কানে বাজে। মুগ্ধর এই কাজটিকে তাত্ত্বিকভাবে ‘অ্যাসথেটিকস অব কেয়ার’ বা যুদ্ধক্ষেত্রে সহমর্মিতার নন্দনতত্ত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। রাষ্ট্র যেখানে বুলেট দিচ্ছে, মুগ্ধ সেখানে জীবনধারণের মৌলিক উপাদান ‘পানি’ দিয়ে সেই বুলেটের জবাব দিচ্ছিলেন। ঘাতকের বুলেট মুগ্ধর কপাল ভেদ করে যায়। তবে তার সেই হাসিমুখ আর এক বোতল পানি ফ্যাসিবাদের কফিনে সবচেয়ে বড় পেরেকটি ঠুকে দেয়।
ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ ১৮ জুলাই ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকায় শহীদ হন। যদিও তিনি কলেজের ছাত্র, কিন্তু ১৮ জুলাইয়ের সার্বিক প্রতিরোধে তার শাহাদাত বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ফাইয়াজের মতো কিশোরদের রক্ত রাজপথে ঝরার পর দেশের অভিভাবক শ্রেণি আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি।
চিকিৎসা বঞ্চনা, গণগ্রেপ্তার এবং ‘স্টেট অব এক্সেপশন’
ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেন তাঁর ‘স্টেট অব এক্সেপশন’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র কীভাবে আইন স্থগিত করে মানুষকে ‘বেয়ার লাইফ’ বা নগ্ন জীবনে পরিণত করে, যার কোনো আইনি বা মানবাধিকার থাকে না।
১৮ জুলাই এবং তৎপরবর্তী সময়ে আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। পেটুয়া গুন্ডাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে পাহারা বসায়। যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিলেন, তাদের চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ব্লক রেইড দিয়ে মেসে, বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। চিকিৎসা পাওয়ার মতো একটি মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার এই রাষ্ট্রীয় পলিসি ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। রাষ্ট্র মূলত শিক্ষার্থীদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল—ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে জীবনের কোনো মূল্য রাষ্ট্রের কাছে নেই। কিন্তু এই নিপীড়ন হিতে বিপরীত হয়। মানুষের ভয় ভেঙে যায় এবং ক্ষোভের দাবানল সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
জুলাই আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
প্রথমত, শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছিল, আন্দোলন কেবল গুটিকয়েক সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে হচ্ছে। কিন্তু ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামেন, তখন রাষ্ট্রের সেই বয়ান বা ন্যারেটিভ পুরোপুরি ধসে পড়ে। এটি প্রমাণ করে যে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং এটি একটি সর্বজনীন গণদাবি।
দ্বিতীয়ত, আগে ছাত্র আন্দোলন মানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা শাহবাগকেন্দ্রিক জমায়েত বোঝাত। কিন্তু ১৮ জুলাই প্রমাণ করেছে, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মিরপুর—শহরের প্রতিটি অংশই হয়ে উঠতে পারে প্রতিরোধের কেন্দ্র। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজ নিজ ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি ‘আরবান মবিলিটি’ বা শহুরে গতিশীলতার সৃষ্টি করেছিল, যা পুলিশের পক্ষে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, কার্ল মার্কসের শ্রেণি সংগ্রাম তত্ত্বে সাধারণত বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের দ্বন্দ্বের কথা বলা হলেও, নব্য-উদারতাবাদী কাঠামোতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি মিশ্র শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। এদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত। ১৮ জুলাইয়ের প্রতিরোধে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাস্তায় নেমে আসা এবং জীবন দেওয়া প্রমাণ করে, ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সমাজের প্রতিটি স্তরকে এমনভাবে শ্বাসরুদ্ধ করেছিল যে, শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে সবাই এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছিল।
চতুর্থত, আসিফের শরীরে ৭৫টি গুলি, মুগ্ধর শহীদ হওয়া বা ফাইয়াজের রক্ত—এগুলো কেবল মৃত্যুর পরিসংখ্যান নয়। এগুলো ছিল ভয়ের সংস্কৃতিকে জয় করার এক একটি সোপান। ১৬ জুলাইয়ের পর যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, ১৮ জুলাইয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই অকুতোভয় আত্মত্যাগ সেই দ্বিধাকে এক অদম্য সাহসে রূপান্তরিত করে। অসংখ্য মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করে। যারা এত দিন আন্দোলন নিয়ে নীরব বা নিরপেক্ষ ছিলেন, তারাও রাস্তায় নেমে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি পর্যায় রক্তে কেনা। তবে ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য দিন হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। এদিন রাষ্ট্র ভেবেছিল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলেই আন্দোলনের কফিন চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয়ে যাবে। কিন্তু তারা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিরায়ও একই দেশপ্রেমের রক্ত প্রবাহিত।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান প্রাথমিকভাবে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের নিরীহ দাবি নিয়ে শুরু হলেও, তা সময়ের পরিক্রমায় এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কাঠামোগত সহিংসতার কারণে পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বিপ্লবে রূপ নিয়েছিল। এই বিপ্লবের দিনগুলোর মধ্যে ১৮ জুলাই ২০২৪ বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন রাষ্ট্রীয় ফরমান ও ভীতির কারণে স্তব্ধপ্রায়, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই দিনে ঢাকা শহরে অভাবনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
১৬ জুলাইয়ের রক্তপাত ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মনস্তত্ত্ব
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সব সময় ‘দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের’ ওপর নির্ভর করে। ফরাসি দার্শনিক লুই আলথুসার বলেছেন, সেনাবাহিনী এবং শাসকদলের পেটুয়া বাহিনী এই দমনমূলক কাঠামোর অংশ। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই এই কাঠামোর নগ্ন রূপ প্রকাশ পায়। এদিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে শহীদ ওয়াসিমসহ মোট ছয়জন আন্দোলনকারী শাহাদাত বরণ করেন। আবু সাঈদের সেই আত্মদানের দৃশ্যটি মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং জনগণের মধ্যে এক তীব্র মানসিক ও রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটায়। শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নেন, রক্তের ওপর দিয়ে আর কোনো আপস নয়; ফ্যাসিজমকে বিতাড়িত না করে তারা আর পেছনে ফিরে তাকাবেন না।
কিন্তু একটি স্বৈরতান্ত্রিক সরকার যখন তার অস্তিত্বের সংকট টের পায়, তখন সে আন্দোলনকে ভৌগোলিক ও কাঠামোগতভাবে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় সরকার তড়িঘড়ি করে সারা দেশের সকল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে এবং ওই রাতেই শিক্ষার্থীদের হল ছেড়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। এটি ছিল ফুকো-কথিত ‘বায়োপলিটিক্স’ বা জৈব-রাজনীতির ধ্রুপদি প্রয়োগ, যেখানে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শারীরিক অবস্থান ও জমায়েতকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আবাসিক হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চরম দ্বিধা ও নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন। ঢাকায় যাদের কোনো স্থায়ী আবাস নেই, তাদের বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। ফলে ১৭ জুলাইয়ের সকালটি ছিল এক অদ্ভুত শূন্যতার। আন্দোলন কীভাবে চলবে, কোথায় জমায়েত হবে—এই প্রশ্নগুলো যখন সবাইকে ভাবিয়ে তুলছিল, ঠিক তখনই ইতিহাসের মঞ্চে নতুন এক প্রতিরোধকামী সত্তার আবির্ভাব ঘটে।
১৭ জুলাইয়ের রূপরেখা: বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরোধের সূচনা
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুপস্থিতি যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা পূরণ করতে এগিয়ে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘অরাজনৈতিক’ বা ‘বিচ্ছিন্ন’ শ্রেণি হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। কিন্তু চব্বিশের বিপ্লব আন্তোনিও গ্রামসির ‘হেজিমনি’ বা আধিপত্যবাদের তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে প্রমাণ করেছে, যখন রাষ্ট্রের নিপীড়ন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণিও তাদের কমফোর্ট জোন বা স্বস্তির বলয় থেকে বেরিয়ে আসে।
১৭ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করেন যে, আন্দোলনের কেন্দ্র এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা হল হতে পারবে না। তারা একটি নতুন রূপরেখা তৈরি করেন। এই রূপরেখার মূল ভিত্তি ছিল—‘শহুরে গেরিলা কৌশল’ বা বিকেন্দ্রীকৃত প্রতিরোধ। তারা সিদ্ধান্ত নেন, পুরো ঢাকাকে বিভিন্ন ব্লকে ভাগ করে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো দখল করা হবে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রযন্ত্রের মনোযোগ ও শক্তিকে বিক্ষিপ্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে। এই তাত্ত্বিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তটিই মূলত ১৮ জুলাইয়ের মহাকাব্যিক প্রতিরোধের ব্লু-প্রিন্ট ছিল।
১৮ জুলাইয়ের রণাঙ্গন: ঢাকা অচল এবং অভাবনীয় প্রতিরোধ
ফরাসি তাত্ত্বিক অঁরি লেফেভ্যর তার ‘রাইট টু দ্য সিটি’ তত্ত্বে বলেছেন, শহরের সাধারণ মানুষের অধিকার রয়েছে শহরের স্থানগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক দাবির মঞ্চ হিসেবে দাবি করার। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার রাজপথে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন।
এদিন সকাল থেকেই উত্তরার বিএনএস সেন্টার থেকে জমজম টাওয়ার পর্যন্ত বিশাল এলাকা শিক্ষার্থীরা দখল করে নেন। এই এলাকার প্রতিরোধের নেতৃত্বে ছিল নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে আসে শান্ত-মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়, উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিটি ইউনিভার্সিটির হাজার হাজার শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভূতপূর্ব এক সংহতি স্থাপন করে মাইলস্টোন কলেজ, উত্তরা কলেজসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা। উত্তরা পরিণত হয় এক রণক্ষেত্রে, যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না।
একই সময়ে মিরপুর এলাকায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, প্রাইম বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। অন্যদিকে, রামপুরা, বাড্ডা ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ এই অঞ্চলের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একযোগে রাজপথে নেমে আসে।
এই সমন্বিত প্রতিরোধের ফলে ঢাকা শহর সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে সারা দেশে।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের নগ্ন সন্ত্রাস এবং ৬০ জনের বেশি শাহাদাত
হান্নাহ আরেন্ট তাঁর ‘অন ভায়োলেন্স’ গ্রন্থে বলেছেন, ক্ষমতা যখন বিলুপ্তির পথে থাকে, তখনই সহিংসতার সবচেয়ে নগ্ন প্রকাশ ঘটে। ১৮ জুলাইয়ের দুপুরে পুলিশ, র্যাব এবং স্বৈরাচারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা সম্মিলিতভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সেদিন কোনো রাবার বুলেট বা টিয়ারশেল নয়, সরাসরি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়। শুধু ১৮ জুলাইয়েই ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় প্রায় ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিহত হন। শত শত শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ ও গুরুতর আহত হন।
শহীদ আসিফ, মুগ্ধ ও ফাইয়াজ: প্রতিরোধের নতুন তাত্ত্বিক প্রতীক
বিপ্লবের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি থাকে না, তারা হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের আদর্শিক প্রতীক। নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আসিফ হাসান ছিলেন উত্তরা ফ্রন্টের আন্দোলনে। রাষ্ট্রীয় বাহিনি প্রায় ৭৫টি গুলি করে ঝাঁঝরা করে দেয় তাঁর শরীর। আসিফের এই আত্মদান উত্তরা এলাকার আন্দোলনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে এবং সাধারণ মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে।
মিরপুর ও উত্তরা ফ্রন্টের আরেক অবিস্মরণীয় নাম মুগ্ধ। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের প্রাক্তন এবং পরবর্তীতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। চারদিকে যখন বৃষ্টির মতো গুলি চলছে, টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় যখন চোখ মেলা দায়, তখন মুগ্ধ তাঁর পিঠে পানির বাক্স নিয়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছুটে বেড়িয়েছেন। তার সেই কালজয়ী বাক্য—‘পানি লাগবে, পানি?’—আজও মানুষের কানে বাজে। মুগ্ধর এই কাজটিকে তাত্ত্বিকভাবে ‘অ্যাসথেটিকস অব কেয়ার’ বা যুদ্ধক্ষেত্রে সহমর্মিতার নন্দনতত্ত্ব হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। রাষ্ট্র যেখানে বুলেট দিচ্ছে, মুগ্ধ সেখানে জীবনধারণের মৌলিক উপাদান ‘পানি’ দিয়ে সেই বুলেটের জবাব দিচ্ছিলেন। ঘাতকের বুলেট মুগ্ধর কপাল ভেদ করে যায়। তবে তার সেই হাসিমুখ আর এক বোতল পানি ফ্যাসিবাদের কফিনে সবচেয়ে বড় পেরেকটি ঠুকে দেয়।
ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ ১৮ জুলাই ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকায় শহীদ হন। যদিও তিনি কলেজের ছাত্র, কিন্তু ১৮ জুলাইয়ের সার্বিক প্রতিরোধে তার শাহাদাত বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ফাইয়াজের মতো কিশোরদের রক্ত রাজপথে ঝরার পর দেশের অভিভাবক শ্রেণি আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি।
চিকিৎসা বঞ্চনা, গণগ্রেপ্তার এবং ‘স্টেট অব এক্সেপশন’
ইতালিয়ান দার্শনিক জর্জিও আগামবেন তাঁর ‘স্টেট অব এক্সেপশন’ তত্ত্বে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র কীভাবে আইন স্থগিত করে মানুষকে ‘বেয়ার লাইফ’ বা নগ্ন জীবনে পরিণত করে, যার কোনো আইনি বা মানবাধিকার থাকে না।
১৮ জুলাই এবং তৎপরবর্তী সময়ে আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়নি। পেটুয়া গুন্ডাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোতে পাহারা বসায়। যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিলেন, তাদের চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়। অসংখ্য শিক্ষার্থীকে ব্লক রেইড দিয়ে মেসে, বাড়িতে অভিযান চালিয়ে রিমান্ডে নেওয়া হয়। চিকিৎসা পাওয়ার মতো একটি মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করার এই রাষ্ট্রীয় পলিসি ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল। রাষ্ট্র মূলত শিক্ষার্থীদের একটি বার্তা দিতে চেয়েছিল—ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে জীবনের কোনো মূল্য রাষ্ট্রের কাছে নেই। কিন্তু এই নিপীড়ন হিতে বিপরীত হয়। মানুষের ভয় ভেঙে যায় এবং ক্ষোভের দাবানল সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
জুলাই আন্দোলনে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
প্রথমত, শাসকগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে প্রচার করে আসছিল, আন্দোলন কেবল গুটিকয়েক সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের ইন্ধনে হচ্ছে। কিন্তু ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামেন, তখন রাষ্ট্রের সেই বয়ান বা ন্যারেটিভ পুরোপুরি ধসে পড়ে। এটি প্রমাণ করে যে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং এটি একটি সর্বজনীন গণদাবি।
দ্বিতীয়ত, আগে ছাত্র আন্দোলন মানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা শাহবাগকেন্দ্রিক জমায়েত বোঝাত। কিন্তু ১৮ জুলাই প্রমাণ করেছে, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মিরপুর—শহরের প্রতিটি অংশই হয়ে উঠতে পারে প্রতিরোধের কেন্দ্র। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের নিজ নিজ ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি ‘আরবান মবিলিটি’ বা শহুরে গতিশীলতার সৃষ্টি করেছিল, যা পুলিশের পক্ষে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, কার্ল মার্কসের শ্রেণি সংগ্রাম তত্ত্বে সাধারণত বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের দ্বন্দ্বের কথা বলা হলেও, নব্য-উদারতাবাদী কাঠামোতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটি মিশ্র শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন। এদের একটি বড় অংশ মধ্যবিত্ত বা উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আগত। ১৮ জুলাইয়ের প্রতিরোধে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির রাস্তায় নেমে আসা এবং জীবন দেওয়া প্রমাণ করে, ফ্যাসিবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ন সমাজের প্রতিটি স্তরকে এমনভাবে শ্বাসরুদ্ধ করেছিল যে, শ্রেণি-পার্থক্য ভুলে সবাই এক মোহনায় এসে মিলিত হয়েছিল।
চতুর্থত, আসিফের শরীরে ৭৫টি গুলি, মুগ্ধর শহীদ হওয়া বা ফাইয়াজের রক্ত—এগুলো কেবল মৃত্যুর পরিসংখ্যান নয়। এগুলো ছিল ভয়ের সংস্কৃতিকে জয় করার এক একটি সোপান। ১৬ জুলাইয়ের পর যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, ১৮ জুলাইয়ের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই অকুতোভয় আত্মত্যাগ সেই দ্বিধাকে এক অদম্য সাহসে রূপান্তরিত করে। অসংখ্য মানুষ নতুন করে ভাবতে শুরু করে। যারা এত দিন আন্দোলন নিয়ে নীরব বা নিরপেক্ষ ছিলেন, তারাও রাস্তায় নেমে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রতিটি পর্যায় রক্তে কেনা। তবে ১৮ জুলাই ২০২৪ তারিখটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অনন্য দিন হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। এদিন রাষ্ট্র ভেবেছিল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলেই আন্দোলনের কফিন চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয়ে যাবে। কিন্তু তারা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল যে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিরায়ও একই দেশপ্রেমের রক্ত প্রবাহিত।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ
.png)

জুলাই আন্দোলনে শহীদ আবু সাঈদের মৃত্যু আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিলেও আমাকে সরাসরি রাজপথে নামতে বাধ্য করেছিল শিশু রিয়া গোপের মর্মান্তিক মৃত্যু। ছাদে খেলতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া ওই শিশুটির জায়গায় আমি বারবার আমার নিজের সন্তানকে কল্পনা করছিলাম।
২ ঘণ্টা আগেজুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালনের সময় আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি তাদের, যারা ৫ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত সেই আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন। ছাত্র-তরুণরা পুরোভাগে থাকলেও দেশের সর্বস্তরের মানুষ শামিল হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও সরকারের অপবাদ ও বেপরোয়া
২ ঘণ্টা আগে
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান যেন নব্বইয়ের সেই আকাঙ্ক্ষারই এক নতুন পুনরাবৃত্তি, যেখানে জনগণ আবারও একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের দাবি তুলেছে।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভিত গড়ে উঠেছে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রা এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর। সেই কারণেই দুই দেশের সম্পর্কে যখন টানাপোড়েন দেখা দেয়, তখন অনেক সময় আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি প্রতীকী কিছু পদক্ষেপও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
৪ ঘণ্টা আগে