পুলিশের পোশাক বিভ্রাট ও রিব্র্যান্ডিংয়ের প্রয়োজনীয়তা

সাজ্জাদ সাব্বির
সাজ্জাদ সাব্বির

প্রকাশ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২: ০৮
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

ঢাকার রাস্তায় এখন পুলিশ দেখলে মাঝে মাঝে মনে হতে পারে যে একই বাহিনীর কয়েকটি সংস্করণ দেখছি। কারও গায়ে হাসিনা সরকারের সময়কার পরিচিত সবুজ ও নীল পোশাক, কারও গায়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চালু করা নতুন পোশাক, কোথাও আবার বিএনপি সরকারের সময়ে নির্ধারিত নতুন ইউনিফর্ম। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর আয়রন-গ্রে রঙের নতুন পোশাক চালুর মাত্র সাত মাস পর, ২০২৬ সালের জুনে আবার গাঢ় নীল ও হালকা জলপাই রঙের শার্ট এবং খাকি প্যান্টে ফেরার সিদ্ধান্ত হয়। ফলে পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতার মধ্যে একই শহরে একই বাহিনীর পোশাকে তিন সময়ের গল্প দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যটা একটু হাস্যকর। মনে হতে পারে পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্মেরও বুঝি নির্বাচন আছে, সরকার বদলালে পোশাকের ফলাফলও বদলায়।

হাস্যরসের জায়গাটি বাদ দিলে বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের পোশাক রাষ্ট্রের একটি দৃশ্যমান প্রতীক। একজন পুলিশ সদস্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে তার পোশাকের মাধ্যমে নাগরিক বুঝতে পারেন তিনি কোন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। সেই পোশাকের রং, নকশা, ব্যাজ, গাড়ি, সরঞ্জাম এবং সামগ্রিক উপস্থিতি মিলেই পুলিশের একটি ভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটি তৈরি হয়।

আধুনিক ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনে একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তৈরি হয় তার লোগো দিয়ে শুরু হয়ে কর্মীদের পোশাক, অফিস, গাড়ি, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, ভাষা এবং আচরণ পর্যন্ত। ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্দেশ্য মানুষের সামনে একটি নির্দিষ্ট পরিচয় ও প্রতিশ্রুতি ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই ধারণা প্রযোজ্য।

জুলাইয়ের পর পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের আলোচনা তাই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। হাসিনা সরকারের সময়কার সবুজ ও নীল পোশাকের সঙ্গে জুলাইয়ের সহিংসতার অসংখ্য ছবি ও ভিডিও মানুষের স্মৃতিতে যুক্ত হয়েছে। সেই পোশাক পরা পুলিশ সদস্যদের হাতে অস্ত্র ছিল, রাস্তায় গুলি চলেছে, মানুষ নিহত হয়েছে। এসব দৃশ্য ভবিষ্যতের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।

পুলিশের পোশাক একবার ঠিক করা হোক। এরপর পুলিশকে এমনভাবে গড়ে তোলা হোক, যাতে পোশাক দেখেই মানুষ একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে: এই বাহিনী ক্ষমতার পাহারাদার নয়, জনগণের নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান।

নতুন পোশাক নিশ্চিতভাবেই সেই স্মৃতি মুছে ফেলবে না। ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না। পোশাক পরিবর্তন অতীতের দায় থেকেও কোনো প্রতিষ্ঠানকে মুক্ত করে না। বরং নতুন পোশাকের অর্থ তৈরি হবে নতুন আচরণ, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও নাগরিকের প্রতি দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে। দৃশ্যমান পরিচয় বদলে একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যায়ের সূচনা করা যায়।

তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে একটি বাস্তব প্রশ্নও জড়িত—বারবার পোশাক বদলানোর খরচ কে বহন করবে? ২০২৫ সালে নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহে দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট ৭৬ কোটি টাকার চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একই পোশাক পরিবর্তনের এক বছরের মধ্যেই আবার নকশা ও রং বদলের উদ্যোগ নেওয়া হলে জনঅর্থের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানের পুরোনো পরিচয় থেকে নতুন পরিচয়ের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিজ্যুয়াল সিম্বল মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। যোগাযোগবিজ্ঞানে পরিচয় নির্মাণের এই দিকটি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। মানুষ কোনো প্রতিষ্ঠানকে তার কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতীক, রং, পোশাক ও দৃশ্যমান আচরণের মাধ্যমেও চিনে। কিন্তু পুলিশের ক্ষেত্রে এই দৃশ্যমান পরিচয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের আস্থা তৈরি করা। পুলিশের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার পোশাকে নয়; নাগরিকের সঙ্গে তার আচরণ ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার মধ্যেও।

তবে এখানেই বর্তমান পোশাক বিভ্রাটের সমস্যাটি সামনে আসে। হাসিনা সরকারের পোশাকের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন পোশাক এসেছে। এখন বিএনপি সরকারের সময়ে আবার নতুন পোশাক নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে রাস্তায় একই সময়ে বিভিন্ন সময়ের পোশাক পরা পুলিশ সদস্য দেখা যাচ্ছে। এটি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো ভিজ্যুয়াল কমিউনিকেশন নয়। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে নতুন পোশাকের সরবরাহও ধাপে ধাপে শুরু হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে পুরোনো ও নতুন পোশাকের সহাবস্থান কিছু সময় থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পরিবর্তন যেন আবার আরেকটি পরিবর্তনের অপেক্ষায় না থাকে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশ সংস্কার একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, তদন্ত, জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো সময় নিয়ে সংস্কার করতে হবে। ইউনিফর্ম সেই সংস্কারের বিকল্প নয়। এটি সংস্কারের দৃশ্যমান একটি অংশ মাত্র।

একটি প্রতিষ্ঠানের রিব্র্যান্ডিংয়ের অন্যতম ভিত্তি হলো ভিজ্যুয়াল কনসিসটেন্সি। একটি নতুন পরিচয় চালু হলে সেটিকে ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করতে হয়। একটি কোম্পানি নতুন লোগো চালু করে যদি পুরোনো লোগোও বছরের পর বছর ব্যবহার করে, মানুষের মনে ব্র্যান্ড পরিচয় পরিষ্কার হয় না। পুলিশের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি কাজ করে। রিব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।

বিএনপি সরকারের বর্তমান পোশাক যদি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারযোগ্য, কার্যকর এবং পেশাদার হয়, তাহলে সেটিকে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ে পরিণত করা উচিত। দ্রুত সময়ের মধ্যে এই রিব্র্যান্ডিংয়ের কাজটি শেষ করা উচিত। রাস্তায় বিভিন্ন পোশাকের পুলিশ দেখা কিছুটা দৃষ্টিকটুও বটে। তবে ‘স্থায়ী’ মানে শুধু একটি রং স্থির করে দেওয়া নয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া, পুলিশের কাজের ধরন, চলাচলের সুবিধা, সরঞ্জাম বহনের প্রয়োজন, দৃশ্যমানতা এবং মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও পোশাক নির্ধারণে বিবেচনায় রাখা দরকার।

পোশাকের পাশাপাশি পুলিশের গাড়ির বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে অনেক সময় সাধারণ পিকআপ, নছিমন কিংবা বিভিন্ন ধরনের যানকে পুলিশের কাজে ব্যবহার করতে দেখা যায়। প্রয়োজনের সময় যেকোনো যান ব্যবহার করা বাস্তবতার অংশ। কিন্তু নিয়মিত পুলিশিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের গাড়ি, নির্দিষ্ট রং, নির্দিষ্ট গ্রাফিক্স এবং নির্দিষ্ট মার্কিং থাকা উচিত।

রাস্তায় দূর থেকে একটি গাড়ি দেখেই যেন বোঝা যায় এটি বাংলাদেশ পুলিশের গাড়ি। একটি প্রতিষ্ঠানের ভিজ্যুয়াল পরিচয়ের জন্য এই স্বীকৃতিযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে একটি বাস্তব প্রশ্নও জড়িত—বারবার পোশাক বদলানোর খরচ কে বহন করবে? ২০২৫ সালে নতুন পোশাকের কাপড় সরবরাহে দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট ৭৬ কোটি টাকার চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। একই পোশাক পরিবর্তনের এক বছরের মধ্যেই আবার নকশা ও রং বদলের উদ্যোগ নেওয়া হলে জনঅর্থের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

পুলিশের থানাগুলোর সাইনেজ, অফিসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চিঠিপত্র, পরিচয়পত্র, ব্যাজ, মোটরসাইকেল, হেলমেট এবং অন্যান্য সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও একটি অভিন্ন ডিজাইন সিস্টেম তৈরি করা যেতে পারে। অবশ্য সব ইউনিটের কাজ এক নয়। তাই অভিন্নতার অর্থ সব ইউনিটের জন্য হুবহু একই পোশাক বা নকশা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ভিন্নতা রেখেও একটি অভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ভিজ্যুয়াল পরিচয় তৈরি করা যায়।

এখানে ডিজাইনের পাশাপাশি আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ব্র্যান্ডিং তত্ত্বে ব্র্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মানুষ একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের প্রতিটি মুহূর্তে সেই প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা পায়।

নাগরিক থানায় গেলে পুলিশ সদস্য কীভাবে তার সঙ্গে কথা বললেন? অভিযোগ কীভাবে গ্রহণ করা হলো? পুলিশ সদস্যের পোশাক পরিচ্ছন্ন ছিল কি না? তার বডি ল্যাংগুয়েজ কেমন ছিল? তিনি উত্তেজিত পরিস্থিতি কীভাবে সামলালেন? তার প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা কেমন? এসব অভিজ্ঞতা মিলেই পুলিশের ব্র্যান্ড তৈরি হবে।

তাই পুলিশের রিব্র্যান্ডিংয়ের সঙ্গে ফিটনেস, গ্রুমিং, বডি ল্যাংগুয়েজ, যোগাযোগ দক্ষতা, মানসিক স্বাস্থ্য, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটিকেও যুক্ত করতে হবে। আধুনিক পুলিশকে সাইবার অপরাধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্রতারণা, সংগঠিত অপরাধ এবং আধুনিক সংকট ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে।

একজন পুলিশ সদস্যের চেহারায় আত্মবিশ্বাস থাকবে, পোশাকে পরিচ্ছন্নতা থাকবে, আচরণে সংযম থাকবে, কথাবার্তায় পেশাদারিত্ব থাকবে। এই ধারাবাহিকতা তৈরি হলে ইউনিফর্মের ডিজাইনও তার অর্থ পাবে।

বর্তমান নতুন পোশাকের নকশা যদি গ্রহণযোগ্য হয়, সেটিকে আরও পরিশীলিত করে দীর্ঘমেয়াদি স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। বারবার পোশাক বদলানোর মধ্যে আধুনিকতা নেই। স্থায়ী মানদণ্ড তৈরি করার মধ্যেই আধুনিকতা আছে।

পুলিশ সংস্কার একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, তদন্ত, জবাবদিহি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তি এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো সময় নিয়ে সংস্কার করতে হবে। ইউনিফর্ম সেই সংস্কারের বিকল্প নয়। এটি সংস্কারের দৃশ্যমান একটি অংশ মাত্র।

তার মাঝেও একটি কাজ এখনই করা যায়। পুলিশের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউশনাল ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি গাইডলাইন তৈরি করা যায়। সেখানে ইউনিফর্ম থেকে গাড়ি, ব্যাজ থেকে থানার সাইনেজ, গ্রুমিং থেকে বডি ল্যাংগুয়েজ, ডিজিটাল উপস্থিতি থেকে নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ, সবকিছুর নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকবে। এর সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিও থাকা দরকার—সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের মৌলিক ভিজ্যুয়াল পরিচয় যেন বদলে না যায়।

মনে রাখতে হবে পুলিশের ব্র্যান্ড কোনো সরকারের ব্র্যান্ড নয়। এটি রাষ্ট্রের ব্র্যান্ড। সরকার পরিবর্তন হবে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হবে, সময় পরিবর্তন হবে। পুলিশের পরিচয় সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বারবার নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন নেই। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত তার ধারাবাহিকতা।

পুলিশের পোশাক একবার ঠিক করা হোক। এরপর পুলিশকে এমনভাবে গড়ে তোলা হোক, যাতে পোশাক দেখেই মানুষ একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে: এই বাহিনী ক্ষমতার পাহারাদার নয়, জনগণের নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান।

সাজ্জাদ সাব্বির: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক সংগঠক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত