নির্দলীয় স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির চ্যালেঞ্জ কী?

এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং সিরাজগঞ্জ পৌরসভার আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে দুই সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী সাইদুর রহমান বাচ্চু এবং হাজী আব্দুস সাত্তারের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) তা ব্যাপক সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুপুরে দুপক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো শহর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ঘটনায় উভয়পক্ষের আহত হন অন্তত ২০জন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে যা ঘটতে পারে—সিরাজগঞ্জের এই ঘটনায় হয়তো তার কিছু ইঙ্গিত মিলছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করতে চায় ইসি। বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সাথে বৈঠক শেষে এ কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার। যদিও সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা পরিষদের নির্বাচন কবে হবে—তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পরে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইউনিয়ন পরিষদ বাদে স্থানীয় সরকারের সকল প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশের ৩২৩টি পৌরসভার মেয়র অপসারণ করে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা বাদে ৬১টি জেলা পরিষদেও প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। সরিয়ে দেওয়া হয় ৪৯৩ উপজেলা চেয়ারম্যানকে। অর্থাৎ, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে দেশের স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত চালাচ্ছিলেন আমলারা। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে অনেক জায়গায় আমলাদের সরিয়ে দলীয় লোকদের বসানো হয়।
সংবিধানের ৫৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ তার মানে, অভ্যুত্থানের পরে স্থানীয় সরকারপ্রতিষ্ঠানে যে অনির্বাচিত আমলাদের বসিয়ে দেয়া হলো এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে আমলাদের সরিয়ে যে দলীয় লোকদেরকেই প্রশাসক হিসেবে বসানো হলো, সেটি সংবিধানের এই বিধানের লঙ্ঘন।
এবার আসা যাক আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার তথা বিএনপির চ্যালেঞ্জ বিষয়ে। বিএনপি ২০০৬ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ১৯ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। এই দীর্ঘ সময় সরকারের নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপি নেতারা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। অনেকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল হয়ে গেছে। বছরের পর বছর কারাগারে এবং গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে থাকায় অনেকের সংসার ভেঙে গেছে বলেও শোনা যায়। প্রায় দুই দশক পরে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি যখন ক্ষমতায় এলো। দলের নেতাকর্মীরা, বিশেষ করে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্তরা দুই দশকের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন—এটিও হয়তো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেটি কোন প্রক্রিয়ায়?
ক্যাডারভিত্তিক দলের মতো বিএনপির নেতাকর্মীরা দল থেকে সরাসরি আর্থিক সহযোগিতা বা বেতন পান না। ফলে তাদেরকে দলীয় পরিচয় কাজে লাগিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেই অর্থ উপার্জন করতে হয়। অনেকে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির পথও বেছে নেন। প্রত্যেকে নিজের এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে চান। দলীয় পদ-পদবি এবং জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। কেননা পদ-পদবি থাকলে বা জনপ্রতিনিধি হতে পারলে টাকা উপার্জন করা সহজ। প্রতিটি এলাকাতেই বিএনপির মতো বড় দলে সমান ক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক নেতা থাকেন। তাই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তৈরি হয় একাধিক গ্রুপ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দেখা যায় প্রতিটি আসনে একাধিক আগ্রহী প্রার্থী। যারা শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পান না, তাদের অনেকে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। তাদের কেউ জয়ী হয়েও আসেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হয় না। দল থেকেও কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ নেই। তবু এটা সত্য যে দলীয় সমর্থনের বাইরে কারো পক্ষে জয়ী হয়ে আসা কঠিন। যে কারণে আসন্ন স্থানীয় সরকার, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী হতে আরও আগেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। অর্থাৎ তাদের পোস্টারে দলের নাম বা প্রতীক না থাকলেও ভোটাররা ঠিকই জানবেন কে কোন দলের প্রার্থী।
একটা সময় পর্যন্ত সৎ, যোগ্য এবং ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত সমাজের অনেক নির্দলীয় মানুষ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়ী হতেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনও ওক অসময় দলীয় প্রতীকে করা শুরু হলো। তখন নির্দলীয় ভালো মানুষদের জিতে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে গেলো। তীব্র সমালোচনার মুখে অবশ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় পদ্ধতিতে হচ্ছে। কিন্তু দলের ছাপ অদৃশ্য হয়ে রয়ে গেছে সমান দাপটে।
দলীয় প্রার্থী হলেই তিনি খারাপ আর নির্দলীয় প্রার্থী মানেই ভালো—এই সরলীকরণের সুযোগ নেই। তেমনি এটিও সত্য যে টাকাওয়ালা মাসলম্যানদের দাপটে নির্দলীয় বা দলীয় দাস নন এমন অনেক ভালো মানুষের ইচ্ছা থাকলেও তারা নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সাহস পান না। অনেক জায়গায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী, সংগঠক, ধর্মীয় নেতা আছেন। তারা সমাজে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় মানুষেরা তাদেরকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চান। তারা জনপ্রতিনিধি হলে দুর্নীতিমুক্ত থেকে গণমুখী কাজ করবেন বলে বিশ্বাস করা হয়। সেরকম প্রার্থীদেরও নির্বাচনে রাজি করানো যায় না শুধুমাত্র দলীয় প্রার্থীদের দাপটের কারণে।
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন না হওয়ায় এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র পদে বিএনপির একাধিক ব্যক্তি প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এদের মধ্যে যারা দলীয় সমর্থন পাবেন না তাদেরও অনেকে মাঠে থাকতে পারেন ।
সম্প্রতি পারিবারিক কাজে গিয়েছিলাম একটি ছোট্ট পৌর শহরে। সেখানে প্রেসক্লাবে আড্ডা দেয়ার সময় জানা গেলো আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আগ্রহী প্রার্থীর সংখ্যা অন্তত পাঁচজন। তাদের মধ্যে তিনজন বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, একজন আইনজীবী এবং একজন শহরের নামকরা ব্যবসায়ী। শেষ পর্যন্ত এদের মধ্যে কে বিএনপির সমর্থন পাবেন বা আদৌ তাদের কেউ পাবেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। কিন্তু শহরের মানুষ এ ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত যে দলীয় সমর্থন যিনিই পান না কেন, একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকবেন। মানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীকে লড়তে হবে নিজ দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধেই। এই পরিস্থিতি বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীদের সুযোগ তৈরি করে দেবে কি না বা স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির দলীয় কোন্দল ও গ্রুপিং আরও বাড়িয়ে দেবে কি না, সেই প্রশ্ন আছে। ফলে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অনেকে মনে করেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কারণ, জাতীয় নির্বাচনের পর এই নির্বাচন হবে মাঠপর্যায়ে সরকারের জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের প্রথম বড় পরীক্ষা। অন্যদিকে এটি দলের জন্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও জনসংযোগের পরীক্ষাও হবে।
গত ৯ মে রাজধানীর কেআইবি মিলনায়তনে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মতবিনিময় সভা হয়। সেখানে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করার বার্তা দেন। তিনি নেতাকর্মীদের পরামর্শ দেন ঐক্যবদ্ধ থাকার, ভালো আচরণের মাধ্যমে মানুষের মন জয় করার এবং মাঠে কাজ করে জনগণের আস্থা অর্জনের। তার মানে, প্রশাসনিক প্রভাব বা দলীয় সুবিধা দিয়ে কাউকে জিতিয়ে আনার পথে তিনি হাঁটতে চান না। এটি ভালো লক্ষণ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ের বাইরেও ব্যক্তির ইমেজ এবং আঞ্চলিকতা ও ইজম অনেক সময় বড় ভূমিকা রাখে। সেই ব্যক্তি ইমেজ এবং দলীয় সমর্থনের সমন্বয় ঘটাতে পারবেন যারা, তাদের জয়ের পাল্লাই ভারী হবে।
পরিশেষে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত বিপুল সংখ্যক প্রার্থী হেরে গেলেও তাতে সরকারের পতন হয়ে যাবে না। কিন্তু এখানে বিএনপির জন্য একটা সুযোগ আছে। তারা দলীয় বিবেচনার পাশাপাশি ব্যক্তির ইমেজ, সততা, শিক্ষা, সমাজে গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থীদের সমর্থন দিয়ে প্রভাবমুক্ত একটি নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। তাহলে একটা উদাহরণ সৃষ্টি হতে পারে। এতে বিএনপি তথা সরকারের ভাবমূর্তি বাড়বে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
.png)




-2b06a0-256x144.webp)

