শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রধান তিন এজেন্ডা নিয়ে এগোয়, তার একটি হলো সংস্কার। ধারাবাহিকভাবে বললে, বিচার অর্থাৎ ক্ষমতাচ্যুতদের অপরাধী অংশের বিচার; সংস্কার, মূলত রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার ও নির্বাচন অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচন। এর মধ্যে দ্বিতীয় এজেন্ডা সংস্কার এত গুরুত্ব পায় যে, মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ সংস্কার আলোচনা চলে—সময় বাড়িয়ে। এর আগে সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। তবে প্রথম ধাপে গঠিত ৬টি কমিশনের বাছাইকৃত সুপারিশ নিয়েই শুরু হয় সংস্কার আলোচনা। গঠিত হয় ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ । এর উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা। প্রধান উপদেষ্টা এ প্রক্রিয়ার শুরুতেই বলেছিলেন, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া সরকার সংস্কারে হাত দেবে না। অর্থাৎ সুপারিশ যত আকর্ষণীয়ই হোক, সরকার তা বাস্তবায়নে এগোবে না রাজনৈতিক দলগুলো একমত না হলে।
সংস্কার এজেন্ডার সূচনা ও ঐকমত্যের চেষ্টা
সংস্কারের কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই। তেমন কিছু সুপারিশও করেছিল সংস্কার কমিশনগুলো। দেখা যাবে, নব্বইয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের পর গঠিত ২৯টি টাস্কফোর্সও এমন কিছু সুপারিশ করেছিল। সেগুলো পরে নানা কারণে আর বাস্তবায়ন হয়নি। যেকোনো সংস্কারে দুটি পক্ষ থাকে। একটি ওই সংস্কার না হওয়ার কারণে লাভবান; অন্যটি ওই সংস্কার হলে পরে লাভবান হবে। আর সেই সংস্কারই প্রকৃতপক্ষে সংস্কার, যেটি ঘটলে সিংহভাগ মানুষ লাভবান হয়। বিদ্যমান বিধি-ব্যবস্থায় যারা লাভবান, তারা সংস্কারের বিরোধিতা করাটাই স্বাভাবিক। এদের প্রতিরোধ দেখে অনেক সময় সংস্কারের উদ্যোক্তারা পিছিয়েও আসেন। বর্তমান শাসনামলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংস্কার করতে গিয়ে সরকার যেমন বড় প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এনবিআর সংস্কারের সুপারিশ ব্যবসায়ী সম্প্রদায় থেকে তো ছিলই; উন্নয়ন সহযোগীদের দিক থেকেও এ বিষয়ে তাগাদা দেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু কাজটা করতে গিয়ে সরকারকে পড়তে হয় গোলযোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে। এ বিষয়ে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্য নেই। তবে এনবিআর সংস্কারে সরকার সংকটে পড়ার পর তাদের কারও দিক থেকে কোনো বক্তব্যও মেলেনি।
সংস্কার কমিশনের বিপুলসংখ্যক সুপারিশ থেকে সরকার কিছু ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার’কে আলাদা করেছিল। প্রথমত, এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কথা জানা যায় না। সুতরাং রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনও নেই। তাছাড়া বিধিবিধান বা আইন সংস্কার করেই এগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে, যা বর্তমান শাসনামলেই সম্ভব। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়নেও বড় অগ্রগতির খবর পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমে বরং হতাশাজনক খবরই বেশি দেওয়া হয়েছে, যা সংস্কার বিষয়ে উৎসাহী মানুষকে করেছে আশাহত। অন্তর্বর্তী সরকার যে সংস্কারে আন্তরিক– তৈরি হতে যাওয়া সে ধারণাটিও এতে মার খেয়েছে। এমন অনেক সংস্কারের সুপারিশও ছিল, যেগুলোর বাস্তবায়নে বড় প্রতিরোধের মুখে পড়ার ঝুঁকি ছিল না। তবে কিছু সুপারিশ আছে, যেগুলোর বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধির প্রশ্ন জড়িত। অন্তর্বর্তী সরকারকে অর্থ সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে, সেটা জানা কথা। এ কারণে কিছু আশু বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার আটকে থাকলে তা অবশ্য ভিন্ন বিবেচনার বিষয়।
সংবিধান সংস্কার, গণভোট ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন
সংস্কারে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে সংবিধান পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে। দেশে তো এ মুহূর্তে জাতীয় সংসদ অনুপস্থিত। গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সংসদও ভেঙে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার করতে গেলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে আর সেজন্য সংসদের উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। অবশ্য এ নিয়েও দীর্ঘদিন বিতর্ক চলেছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ‘নতুন সংবিধান’ অর্জন সম্ভব বলেও তত্ত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠে থাকা প্রধান দলগুলো এ বিষয়ে একমত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও সে পথে হাঁটেনি। তারা বরং চেষ্টা করেছেন রাষ্ট্র সংস্কারে যত বেশি সম্ভব সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোকে এক জায়গায় আনতে। এতে অগ্রগতি হয়নি, তাও বলা যাবে না। তবে সেটি অর্জনে অনেক মূল্যবান সময় ব্যয় করতে হয়েছে আর এতে করে অন্যদিকে অবনতি ঘটেছে সার্বিক পরিস্থিতির।
গণঅভ্যুত্থানের পর সব দেশেই সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সরকার এক্ষেত্রে কতটা কী করতে পারতো, তা নিয়ে অবশ্য বিতর্ক কম নেই। এর মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র সংস্কারে যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে, তা নিয়ে হতে যাচ্ছে গণভোট। রাষ্ট্র সংস্কারে এক ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরিতেই এর আয়োজন করা হয়েছে। গণভোট কখন হবে, সেটা নিয়েও বিতর্ক চলেছে কিছুদিন। শেষে সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গেই রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়ে ভোটারের মত নেওয়া হবে।
এর আগেও তিনবার গণভোট হয়েছে দেশে। এর দুটি দুই সেনাশাসকের নীতি ও কার্যক্রমকে বৈধতা দিতে। তৃতীয়টি সরকারব্যবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার বদলে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থায় আমরা গেলেও অভিজ্ঞতা সুখকর হয়নি। এতে করে রাষ্ট্রপতির বদলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে বলে সমালোচনা হচ্ছিল শুরু থেকে। সমালোচনা যে সঠিক ছিল, তা আবার আক্ষরিকভাবে প্রমাণ করে গেছেন শেখ হাসিনা।
ক্ষমতাসীন দল ও এর বাইরে থাকা তার সহচররাও এজন্য কম দায়ী নন। শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা চর্চার পরিণতিতেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যতিক্রমী রক্ষাকবচ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাও বাতিল হয়ে যায়। আজ্ঞাবহ হয়ে ওঠা বিচার বিভাগও তার ইচ্ছা পূরণে এগিয়ে আসে। একের পর এক ভুয়া নির্বাচন এবং এর মাধ্যমে আরও বেশি করে স্বৈরশাসন গেঁড়ে বসাটাই হয়ে ওঠে নিয়তি। অতঃপর গণঅভ্যুত্থানে এটি উচ্ছেদ হওয়ার পর অনিবার্যভাবেই সামনে আসে একই ধরনের শাসন ফিরে আসার প্রক্রিয়া বন্ধে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন। গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দলগুলো স্বভাবতই এতে আপত্তি জানায়নি। যারা দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণ চাইছিলেন, তারাও সে দাবি পাশে সরিয়ে রেখে যোগ দেন সংস্কার আলোচনায়। তবে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশে তাদের আপত্তি কম নয়। বিভিন্ন প্রশ্নে তাদের অর্থাৎ বিএনপির ভিন্নমত জানানোর ঘটনাই বেশি করে আলোচিত। রাষ্ট্র সংস্কারে জামায়াত, এনসিপিকে অধিক উৎসাহী আর পরস্পরের কাছাকাছিও দেখতে পেয়েছি আমরা।
সরকারকেও রাষ্ট্র সংস্কারে উদ্যোগী দেখা গেছে। প্রধান উপদেষ্টা শুরু থেকে বলেছেন, ‘মৌলিক সংস্কার’ না হলে পুরনো রাজনীতি আর শাসনব্যবস্থা ফিরে আসবে। তাই তার উদ্যোগে গঠিত ঐকমত্য কমিশন যত বেশি সম্ভব এ ধরনের সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত করতে বারবার তাদের সঙ্গে বসেছে। এর পরিণতিতেই সম্ভব হয়েছে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ উপনীত হওয়া। এতে স্থান পেয়েছে ৮৪টি সংস্কারের সুপারিশ। এর মধ্যে ৪৮টি সুপারিশ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন করতে হবে বলে সেগুলোই তোলা হচ্ছে গণভোটে। এর মধ্যে ৩০টি সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সিংহভাগ রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যকে বর্ণনা করা হচ্ছে ‘রাজনৈতিক ঐকমত্য’ বলে। তাই ৩০টি মৌলিক সংস্কার প্রশ্নে বিশেষ বিশেষ দলের ভিন্নমত এড়িয়ে গণভোটে চাওয়া হচ্ছে জনসম্মতি। অবশিষ্ট ১৮টি সুপারিশ রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বাস্তবায়ন করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মোট ৮৪টি সুপারিশের অবশিষ্টগুলোর বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার লাগবে না বলে এগুলো অন্তর্বর্তী সরকারই করে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তবে মনে হয় না, এ ক্ষেত্রে আর কোনো অগ্রগতি হবে। কেননা নির্বাচন ও গণভোট চলে এসেছে সামনে। তফসিল ঘোষণাও হয়ে গেছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) মিলে পুরোদমে চালাচ্ছে নির্বাচনের আয়োজন।
জাতীয় নির্বাচনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। ক্ষমতায় যাওয়ার প্রশ্ন সামনে রেখে জোট গঠনের প্রক্রিয়াও চলমান। এ অবস্থায় আবার রাষ্ট্র সংস্কার প্রশ্নে গণভোটের বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে মনে হয়। এ বিষয়ে যারা বেশি উৎসাহ দেখিয়েছিল, তাদের জোটবদ্ধ হতে দেখা গেলেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রচারণা চালাতে দেখা যাচ্ছে না। সরকার অবশ্য তার মতো করে প্রচারণা চালাচ্ছে। ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন আসবে, তা বর্ণনা করছে সরকার।
এ ধরনের প্রচারণা কতটা ব্যাপক জনসাধারণের মধ্যে যাচ্ছে, সে প্রশ্ন রয়েছে অবশ্য। একই দিন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট হলে ভোটারদের কাছে দ্বিতীয়টি আকর্ষণ হারাবে কিনা, সে প্রশ্নও কম নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একাধিক ব্যালটে ভোটদানের অভিজ্ঞতা কম নেই, একথা বলে অনেকে অবশ্য আশ্বস্ত থাকতে চাইছেন। তবে মনে করা হচ্ছে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের পক্ষে প্রচারণা না চালালে ভোটাররা একে গুরুত্বহীন মনে করতে পারে। রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়টি যারা আগামী সংসদের কাছে অর্পণ করতে চেয়েছিল, তারা অর্থাৎ বিএনপি ভেতরে ভেতরে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালাবে কিনা, এমন কথাবার্তাও রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। ‘না’ জয়যুক্ত হলে কী হবে, এ প্রশ্নও অনেককে তুলতে দেখা যায়। দুর্ভাগ্যবশত সেটি ঘটলে নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে দীর্ঘদিন সংস্কার আলোচনা চালানোর কী মানে, এ প্রশ্নও কিন্তু উঠবে।
বিএনপির অবস্থান, অতীত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ সংস্কারের দায়
সে ক্ষেত্রে একটি রক্ষাকবচ রয়েছে অবশ্য। সেটি হলো, ক্ষমতাপ্রত্যাশী সবচেয়ে বড় দল বিএনপির নিজেরই ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বছরখানেক আগে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের দাবির পর বিএনপি এ কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেছিল, ক্ষমতায় এলে তারা এগুলো বাস্তবায়ন করবেন। এতে দলটির মিত্র সংগঠনগুলোর দাবিও যুক্ত করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কার কমিশন গঠন এবং সংস্কারের যেসব প্রশ্ন বেশি করে সামনে এনেছে; তার সঙ্গে বিএনপির ৩১ দফার অনেক সঙ্গতি কিন্তু রয়েছে। দলটি বলছে, ৩১ দফায় রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় সব সংস্কারের অঙ্গীকারই ধারিত। এ দাবিতে সত্যতা রয়েছে বৈকি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপি নিজেই অঙ্গীকার করেছিল। ‘না’ ভোট জয়যুক্ত হলেও দলটির এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রশ্ন সামনে থাকবে। এমন কিছু ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন আনার কথা বিএনপি বলেছিল, যেসব ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার কমিশন গঠন করেনি। যেমন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন, শিক্ষা সংস্কার কমিশন।
অন্তর্বর্তী সরকার ৫টি কমিশনের সুপারিশ ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় আনেনি। এর কোনো কোনোটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় বিভাজন লক্ষ করা গেছে। যেমন, নারী সংস্কার কমিশন নিয়ে সংস্কারে অধিক উৎসাহী দলগুলো বড় জমায়েত করে তীব্র মতপার্থক্যের কথা জানিয়েছে। সরকারও এ প্রশ্নে আর যায়নি। ভবিষ্যতে যে সরকারই গঠিত হোক, তাদের কিন্তু এসব ইস্যু মোকাবিলা করতে হবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে অবশ্য তার থাকবে বিশেষ রাজনৈতিক জোর।
সংস্কার, বিশেষত রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়াস চালানো হয়েছিল এক-এগারো সরকারের আমলেও। প্রায় দু’বছর ক্ষমতায় থাকা সেই সেনাসমর্থিত সরকার জোর দিয়েছিল সাংবিধানিক সংস্কারে। দুর্নীতি দমনকেও তারা বড় এজেন্ডা করেন। রাজনৈতিক দলে গণতন্ত্রায়ন ও বংশানুক্রমিক নেতৃত্বের অবসানে জোর দেন তারা। তবে দুই নেত্রীকে ‘মাইনাস’ করার স্থূল চেষ্টায় তাদের ইতিবাচক উদ্যোগও বানচাল হয়ে যায়।
পরবর্তী হাসিনা সরকার আবার চলেছে সংস্কারের সম্পূর্ণ বিপরীতে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার উচ্ছেদ, প্রকৃত বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে রাখা আর নতুন কালাকানুন করে জনমত নিয়ন্ত্রণ এর প্রমাণ। দীর্ঘ একতরফা শাসনে তারা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ধ্বংস করে দেন। এ অবস্থায় গণঅভ্যুত্থান ছিল অনিবার্য। সেটা আবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে স্বৈরশাসনের পুনরুত্থান রোধে রাষ্ট্র সংস্কারের। এ ক্ষেত্রে পুরনো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কম সাহস দেখায়নি। সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিএনপি এ ক্ষেত্রে যতখানি এগিয়ে এসেছে, সেটাকে কম বলা যাবে না। অন্য যারা এ ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে, তাদের দায়িত্ব হলো বিরোধী দলে গিয়ে বসলেও সংস্কার প্রশ্নে আগেকার মনোভাব অটুট রাখা। সংসদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় তাদের হিস্যা নিশ্চিতের যেটুকু সুযোগ সংস্কারের সুপারিশে রয়েছে, তাতে করে বিরোধীদের ইতিবাচক ভূমিকার বিষয়ে জনপ্রত্যাশাও বাড়বে। সেটা মনে রাখতে হবে তাদের।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলামিস্ট