বঙ্গোপসাগর থেকে একটি পরাশক্তিকে পর্যবেক্ষণ

বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব: কোন পথে বাংলাদেশ

আমেরিকার আড়াইশত বছর পূর্তি শুধু একটি মাইলফলক নয়—এটি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি কৌশলগত মুহূর্ত। পাঁচ পর্বের এই ধারাবাহিক স্ট্র্যাটেজিক নিবন্ধে America at 250: At Home and Beyond গ্রন্থে উত্থাপিত কৌশলগত শিক্ষাগুলো বিশ্লেষণ করা হবে এবং সেসব শিক্ষার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য তাৎপর্য অন্বেষণ করা হবে। এক অনিশ্চিত শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ধারাবাহিকটির বিভিন্ন পর্বে আলোচিত হবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিভাজন, পরিবর্তনশীল ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তির ভারসাম্য, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত সংকট, এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সামুদ্রিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব। পাঁচ পর্বের ধারাবাহিকটির আজ চতুর্থ পর্ব প্রকাশ করা হলো।

প্রকাশ : ২৮ জুন ২০২৬, ১৮: ৪৮
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

ইতিহাস সাধারণত বৃহৎ শক্তিগুলোর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই বেশি স্মরণে রাখে। তাদের যুদ্ধ, মতবাদ, জোট, উত্থান কিংবা পতনের কাহিনিই ইতিহাসের প্রধান আলোচ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ছোট রাষ্ট্রগুলো কীভাবে এই দৈত্যদের মাঝখানে টিকে থাকে—সে বিষয়ে ইতিহাস তুলনামূলকভাবে নীরব। তারা বলপ্রয়োগে বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে না, কিন্তু কৌশলের মাধ্যমে প্রায়ই নিজেদের টিকিয়ে রাখে। সেই অর্থে America at 250: At Home and Beyond গ্রন্থের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক শিক্ষাগুলোর একটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে নয়; বরং বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর সামনে থাকা কৌশলগত পছন্দগুলোকে নিয়েও।

বইটির কেন্দ্রীয় যুক্তি হলো, ২৫০ বছরে এসে আমেরিকা এক নতুন কৌশলগত সমন্বয়ের পর্যায়ে প্রবেশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও শক্তিশালী, কিন্তু স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন পরিবেশে আর নেই। চীন এখন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলো আরও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এখন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি অবস্থান করছে। প্রযুক্তি ক্ষমতার ধারণাকেই বদলে দিয়েছে। এর ফলে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে, যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ড ক্রমশ ছোট রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক পরিসরে এসে মিলিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। অতীতের দশকগুলোতে ছোট রাষ্ট্রগুলো অনেক সময় দূরত্বের মাধ্যমে নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা কূটনৈতিক চলাচলের পরিসর তৈরি করেছে। কিন্তু আধুনিক যুগে ভূগোল আর শুধু সুরক্ষা নয়; বরং কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্যপথ, ডিজিটাল অবকাঠামো, সামুদ্রিক সংযোগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল এখন ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সরাসরি বৃহৎ শক্তির হিসাব-নিকাশের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেছে। বঙ্গোপসাগর আর প্রান্তিক জলরাশি নয়; এটি এমন এক বৃহত্তর কৌশলগত ক্ষেত্রের অংশ, যেখানে বেইজিং, ক্যানবেরা, ইসলামাবাদ, নয়া দিল্লি, টোকিও, ওয়াশিংটন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ ক্রমশ একে অপরকে স্পর্শ করছে।

বাংলাদেশের সামনে এই বাস্তবতা একটি কঠিন প্রশ্ন তোলে—তীব্রতর পরাশক্তির প্রতিযোগিতার যুগে একটি ছোট সামুদ্রিক রাষ্ট্র কীভাবে তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে? এর উত্তর হয়তো এমন একটি নীতিতে নিহিত, যা বইটি পরোক্ষভাবে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়—“স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি ক্যান বি এক্সপ্লেইনড অ্যাজ স্ট্র্যাটেজিক ইক্যুইডিস্ট্যান্স”। অর্থাৎ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে কৌশলগত সমদূরত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।

অনেক সময় ছোট রাষ্ট্রগুলো মনে করে, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে একটিকে বেছে নিতেই হবে। অথচ সফল মধ্য ও ক্ষুদ্র শক্তির অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। অস্থির সময়ে টিকে থাকে সেই রাষ্ট্রগুলো, যারা নীতিগত পরিসর হারিয়ে না ফেলে সম্পর্কের বৈচিত্র্য বজায় রাখে।

কৌশলগত সমদূরত্ব বিচ্ছিন্নতা নয়। এর অর্থ বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করা নয়। আবার এমনও নয় যে মুখে নিরপেক্ষতার কথা বলা হবে, কিন্তু নীরবে একক কোনো বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া হবে। কৌশলগত সমদূরত্বের অর্থ হলো জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা। এটি নিষ্ক্রিয় নয়; বরং সক্রিয় এবং সচেতন নীতিগত অবস্থান।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভবত এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। অনেক সময় ছোট রাষ্ট্রগুলো মনে করে, প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর মধ্যে একটিকে বেছে নিতেই হবে। অথচ সফল মধ্য ও ক্ষুদ্র শক্তির অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। অস্থির সময়ে টিকে থাকে সেই রাষ্ট্রগুলো, যারা নীতিগত পরিসর হারিয়ে না ফেলে সম্পর্কের বৈচিত্র্য বজায় রাখে। তারা একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়, আঞ্চলিক সম্পর্ক মজবুত করে এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ করে—যাতে বৈদেশিক অংশীদারিত্ব নির্ভরশীলতা নয়, বরং কৌশলগত বিকল্পে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের এমন দৃষ্টিভঙ্গির জন্য কিছু ভিত্তি ইতোমধ্যেই তৈরি রয়েছে। আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ঐতিহ্য আছে। আমরা বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছি। আঞ্চলিক বিরোধে সংযম দেখিয়েছি। কিন্তু সামনের কৌশলগত পরিবেশ হয়তো এই ভারসাম্যকে আরও সুপরিকল্পিত রূপ দেওয়ার দাবি জানাবে।

প্রথম শিক্ষা হলো—কূটনীতিকে প্রতিক্রিয়াশীল নয়, কৌশলগত হতে হবে। ছোট রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় পররাষ্ট্রনীতি খণ্ডিত হয়ে পড়ে—তাৎক্ষণিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আগেভাগে বোঝার বদলে পরিচালিত হয়। কিন্তু আমেরিকার পুনর্মূল্যায়ন এবং চীনের সম্প্রসারণে প্রভাবিত এক বিশ্ব আরও গভীর কৌশলগত দূরদৃষ্টি দাবি করে। বাংলাদেশ আর কেবল দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর মধ্যে পররাষ্ট্রনীতিকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে না, কিংবা তৃতীয় পক্ষের প্রভাবেও পরিচালিত হতে পারে না। বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক স্রোত কীভাবে আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে বদলে দিতে পারে, তা বোঝা জরুরি। চ্যালেঞ্জ শুধু বন্ধুত্ব রক্ষা করা নয়; বরং সেই বন্ধুত্বের পরিবর্তিত যুক্তিও বোঝা।

দ্বিতীয় শিক্ষা হলো—সামুদ্রিক ভূগোলকে জাতীয় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা। বহু বছর ধরে বাংলাদেশের কৌশলগত আলোচনা ছিল অত্যধিক স্থলকেন্দ্রিক। অথচ দেশের ভবিষ্যৎ সমুদ্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আমাদের অধিকাংশ বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়। জ্বালানি নিরাপত্তা নির্ভর করে বহিরাগত সমুদ্রপথের ওপর। সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। আমাদের বন্দরগুলো আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যে শতাব্দী ক্রমশ সামুদ্রিক প্রতিযোগিতায় সংজ্ঞায়িত হচ্ছে, সেখানে একটি সামুদ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে চিন্তা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের সবচেয়ে মূল্যবান কৌশলগত সুবিধাগুলোর একটি হতে পারে। ছোট রাষ্ট্রগুলো পরাশক্তির সঙ্গে আয়তনে প্রতিযোগিতা করতে পারে না, কিন্তু অবস্থানের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিকতা অর্জন করতে পারে।

তৃতীয় শিক্ষা হলো—জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা পররাষ্ট্রনীতিকে শক্তিশালী করে। America at 250: At Home and Beyond বইটিতে আমেরিকার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা দেখায় যে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রও অভ্যন্তরীণ বিভাজনে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ছোট রাষ্ট্রগুলোর জন্য এই শিক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের বহির্মুখী অবস্থান তার অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, রাজনৈতিক স্থিরতা এবং সামাজিক সংহতি—সবই কূটনৈতিক নমনীয়তা বাড়ায়। যে রাষ্ট্র ভেতরে দুর্বল, সে প্রায়ই বাইরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

আমাদের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ঐতিহ্য আছে। আমরা বিভিন্ন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছি। আঞ্চলিক বিরোধে সংযম দেখিয়েছি। কিন্তু সামনের কৌশলগত পরিবেশ হয়তো এই ভারসাম্যকে আরও সুপরিকল্পিত রূপ দেওয়ার দাবি জানাবে।

সাম্প্রতিক ইরানের ঘটনাপ্রবাহও এই বাস্তবতা তুলে ধরে। দীর্ঘ দশকের নিষেধাজ্ঞা ও বহিরাগত চাপ সত্ত্বেও তেহরান আঞ্চলিক প্রভাবের একটি মাত্রা বজায় রাখতে পেরেছে, কারণ তার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কৌশলগত সংস্কৃতি এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিস্থাপকতা তাকে কঠিন পরিস্থিতিতেও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। যারা ভেতরে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, তারা বাইরে আরও কার্যকরভাবে দরকষাকষি করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সমদূরত্বের ভিত্তি শুরু হওয়া উচিত নিজস্ব সক্ষমতা থেকে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে:

  • শক্তিশালী বেসামরিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠান
  • টেকসই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
  • দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সংস্কৃতির বিকাশ
  • সামুদ্রিক দক্ষতা ও নৌ-কূটনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া

ছোট সামুদ্রিক রাষ্ট্রগুলোর পরিবেশে প্রভাব ফেলতে বড় নৌবহর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু তাদের এমন সক্ষম নৌবাহিনী প্রয়োজন, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় অবদান রাখতে পারে। ইন্দো-প্যাসিফিকে নৌ-উপস্থিতি এখন আর কেবল যুদ্ধের বিষয় নয়; এটি অংশীদারিত্ব, প্রতিরোধ, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং আস্থা সৃষ্টির বিষয়ও। একটি পেশাদার নৌবাহিনী শুধু সামরিক শক্তি নয়, কূটনৈতিক হাতিয়ারও হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ—সামুদ্রিক শক্তিকে কেবল প্রতিরক্ষা ব্যয় হিসেবে নয়, বরং কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।

বাংলাদেশ হয়তো যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার গতিপথ নির্ধারণ করবে না। হয়তো বৈশ্বিক শক্তির কাঠামোও গঠন করবে না। কিন্তু এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে নতুন বিশ্ব বাস্তবতা তৈরি করছে, তার ভেতর দিয়ে কতটা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে চলবে—সেটি বাংলাদেশকে নিজেই নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য America at 250 এর গভীর বার্তা সম্ভবত এখানেই।

বৃহৎ শক্তির উত্থান কিংবা পুনর্গঠন সবসময়ই মনোযোগ আকর্ষণ করে। কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তার প্রকৃত পরীক্ষা অনেক সময় অন্যত্র—ছোট রাষ্ট্রগুলো সেই পরিবর্তনের ভাষা কতটা স্পষ্টভাবে পড়তে পারে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় কতটা বিচক্ষণ হতে পারে তার মধ্যে। কারণ পরাশক্তির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সবসময় শক্তির প্রশ্ন নয়; অধিকাংশ সময় তা কৌশলের প্রশ্ন।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)
Ad 300x250

সম্পর্কিত