জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তাসনিম জারা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের আইনি মারপ্যাঁচ তথা এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের গ্যাঁড়াকলে পড়ে তার নির্বাচনি লড়াই থেকে ছিটকে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শনিবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র গৃহীত হয়নি। এখন তাসনিম জারার সামনে আপিলের সুযোগ রয়েছ। সেখানেও যদি তাঁর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা না হয়, তাহলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না এই তরুণ রাজনৈতিক কর্মী—যিনি জুলাই অভ্যুত্থান এবং তারপরে নানা কারণে আলোচিত ও প্রশংসিত হয়েছেন।
মনোনয়নপত্র গ্রহণ না করার পেছনে নির্বাচন কমিশনের যুক্তির সমালোচনা করেছেন তাসনিম জারাও। তাঁর দাবি, যা দরকার ছিল, তার চেয়ে বেশি স্বাক্ষর তারা জমা দিয়েছিলেন। সেখান থেকে ১০ জনের তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে গিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। ১০ জনের সত্যতা পেয়েছেন। তবে এই ১০ জনের মধ্যে ২ জনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা ঢাকা-৯ আসনের ভোটার নন। এই দুজন জানতেন, তারা ঢাকা-৯-এর ভোটার। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, তারা ঢাকা-৯-এর ভোটার নন।
প্রসঙ্গত, নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার মোট ভোটারের ১ শতাংশের নাম-স্বাক্ষর ও ভোটারের মুঠোফোন নম্বরের তালিকা মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনেই তা নিশ্চিত করতে হয়। তবে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা নেই। সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাদ পড়া ৭৩১ জনের মধ্যে ৪২৩ জনই ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। বেশির ভাগই বাদ পড়েন ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরযুক্ত সমর্থন তালিকায় গরমিলের কারণে।
ধরা যাক কোনো আসনে ভোটারের সংখ্যা ৫ লাখ। সেক্ষেত্রে স্বতন্ত্র প্রার্থী এর এক শতাংশ হিসাবে ৫ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হবে। হাজার হাজার ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে একজন প্রার্থীকে কী পরিমাণ কষ্ট করতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় এগুলো যাচাই করে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে। অর্থাৎ হাজারো স্বাক্ষরের ভেতর থেকে জনা দশেক ভোটারকে ফোন করে তার স্বাক্ষরের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করে। কিন্তু কয়েক হাজার ভোটারের মধ্যে দুই চারজনের স্বাক্ষর মিলছে না বা সংশ্লিষ্ট ভোটার কোনো কারণে সঠিক তথ্য দিচ্ছেন না, এই অজুহাতে কারো মনোনয়নপত্র বাতিলের পদ্ধতিটা কতটা গণতান্ত্রিক ও যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হলো, সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বিধানটি মূলত নির্বাচনের গুরুত্ব বজায় রাখা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে। এরকম একটি বিধানের মূল কারণ হচ্ছে দলীয় প্রার্থীর বাইরে ব্যক্তি পর্যায়ে তথা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা বা তাদের রাশ টেনে ধরা। এরকম একটি প্রক্রিয়া না থাকলে যেকেউ প্রার্থী হয়ে যেতে পারবেন এবং তখন একেকটি আসনে প্রার্থীর সংখ্যা হয়ে যাবে অনেক—যা পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থাপনাকে জটিলতার মধ্যে ফেলে দেবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে প্রার্থী হওয়ার জন্য একট ন্যূনতম শর্ত থাকা উচিত বলেও মনে করা হয়।
নির্বাচন একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল প্রক্রিয়া। যদি কোনো শর্ত না থাকত, তাহলে যে কেউ শখের বশে বা নিতান্তই পরিচিতি পাওয়ার জন্য প্রার্থী হয়ে যেতেন। ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন প্রমাণের বাধ্যবাধকতা থাকায় যারা আসলেই নির্বাচনের ব্যাপারে সিরিয়াস এবং যাদের ন্যূনতম জনসমর্থন আছে, তারাই প্রার্থী হতে পারেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের রাশ টেনে ধরার আরেকটি কারণ নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হলে ব্যালট পেপার অনেক বড় হয়ে যায়, যা ভোটারদের জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এছাড়া ব্যালট পেপার ছাপানো এবং নির্বাচনি প্রতীক বরাদ্দ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। ফলে প্রার্থীর সংখ্যা কম হলে নির্বাচনের ব্যবস্থাপনাটি সহজ হয়।
এসব কারণে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য একটি নিয়ম বা শর্ত থাকা উচিত বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই শর্ত বা প্রক্রিয়াটি কী হওয়া উচিত? এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের এই প্রক্রিয়ায় ভোটারের গোপনীয়তাও ক্ষুণ্ন হয়। কেননা, কোন প্রার্থীর পক্ষে কারা সমর্থন জানিয়ে স্বাক্ষর করলেন, এটি প্রকাশ হয়ে যায়। অনেকে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানালেও বা গোপনে তাকে ভোট দিলেও সেটি প্রকাশ্যে নাও বলতে পারেন। কিন্তু যখন ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে তাকে স্বাক্ষর করতে সেটি ভোটারের জন্য তো বটেই, প্রার্থীর জন্যও বিব্রতকর। আবার মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগ মুহূর্তে ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের জন্য যে তাড়াহুড়া তৈরি হয়, তাতে কিছু ভুলভ্রান্তিও থাকে।
এ বছর তাসনিম জারার পক্ষে স্বাক্ষর সংগ্রহের সময় ভোটারের নম্বর যাচাই নিয়ে একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। উপরন্তু তখন নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটও ঠিকমতো কাজ করছিল না। অর্থাৎ প্রযুক্তি যদি কোনো জটিলতায় আটকে যায়, এর খেসারত দিতে হয় সম্ভাব্য প্রার্থীকে। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্য এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহের বদলে অন্য কোনো পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন—যা দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ব্যক্তির স্বতন্ত্র পরিচয়ে ভোটে দাঁড়ানোর বিষয়টি সহজ করবে। দ্বিতীয়ত, জটিল পদ্ধতির মারপ্যাঁচ বা গ্যাঁড়াকলে পড়ে অনেক কষ্ট করার পরেও মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় কারো মন খারাপ হবে না। একটি সহজ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া মেনে যার খুশি ভোটে দাঁড়াক। ভোটাররা সিদ্ধান্ত নিক যে তাকে ভোট দেবে কি না।
এক্ষেত্রে জামানত বাজেয়াপ্তের একটি বিধান রয়েছে। যেমন প্রত্যেক প্রার্থীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হয়। একটি নির্বাচনি এলাকায় যত ভোট পড়ে তার শতকরা সাড়ে ১২ শতাংশ ভোট যদি কোনো প্রার্থী না পান তাহলে তার জামানতের টাকা বাজেয়াপ্ত হয়। যে কারণে দেখা যায় প্রত্যেক নির্বাচনেই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এ বছর মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় প্রত্যেক প্রার্থীকে ৫০ হাজার টাকা জামানত জমা দিতে হয়েছে। তবে সরকার বা নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে যে তারা দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংখ্যায় রাশ টানবে, সেক্ষেত্রে জামানতের পরিমাণ বাড়াতে পারে। তখন হয়তো যার জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, তিনি ভোটেই দাঁড়াবেন না। কিন্তু তারপরও কেউ যদি নিজের পরিচিতি বা দলীয় কৌশল কিংবা অন্য কোনো কারণে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, সেই সুযোগ তাঁকে দেওয়া উচিত। এজন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণের পদ্ধতিটা সহজ করা দরকার।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শর্ত সহজ করার পরামর্শ দিয়ে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের পরিবর্তে ৫০০ ভোটারের সম্মতি নেওয়ার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু কমিশন সেটি আমলে নেয়নি। সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল আলীম মনে করেন, ‘এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষরের শর্ত থাকায় অনেক ভালো লোক নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। আমরা অনলাইনে বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নিয়েছি। ঢাকা ও বিভিন্ন জেলায় গিয়ে বৈঠক করেছি। অনেকেই এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের শর্ত সহজ করতে মত দিয়েছেন। অনেকে এ শর্ত পুরোপুরি বাদ দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন।’ (আজকের পত্রিকা, ২৪ অক্টোবর ২০২৫)।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিদায় নেওয়া কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার পথ সহজ করেছিল। ২০১৬ সাল থেকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী হওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়। সেই বিধান অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে ২৫০ জন ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দিতে হতো। ২০২৪ সালের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়াতে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীকে প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন প্রেক্ষাপটে উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার ২৫০ জন ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান বাতিল করা হয়। তবে অহেতুক প্রার্থী হওয়া ঠেকাতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বিধান হয় নির্বাচনে যত ভোট পড়বে, তার ১৫ শতাংশ না পেলে প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। আগে প্রদত্ত ভোটের ১২.৫ শতাংশের কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার বিধান ছিল।
এছাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে জামানতের অংক ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ এবং ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জামানতের অংক বাড়ানো এবং আরও দুয়েকটি সহজ শর্ত দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জটিলতা কমানো যায়।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক