নাজিয়া আফরিন

১৪ বছরের এক কিশোরি। সহায়হীন, আশ্রয়হীন, অভিভাবকহীন। রাষ্ট্রই তার অভিভাবক। ফরিদপুরের সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) থাকা ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া এই শিশু গত জানুয়ারি থেকে একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর এই ঘটনা সামনে এসেছে তখনই, যখন সে সাতাশ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছেছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিশু পরিবারের পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। মামলা দায়ের হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে একমাত্র আসামিও। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্র কি দায় সারতে পারল?
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি ছিল। ৩০৬টি মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যেখানে মামলা হয় মাত্র ২০টি ঘটনায়।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১,৮৯০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮৩ জন নিহত এবং ৫৮০ জন ধর্ষণের শিকার। সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দলিল। বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে আইনজীবীরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন—তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, মেডিকেল রিপোর্ট পেতে বিলম্ব, সাক্ষী হাজিরের ব্যর্থতা—তা প্রমাণ করে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে ফাঁকটা কতটা প্রাতিষ্ঠানিক, কতটা দীর্ঘস্থায়ী।
বয়স্ক নাগরিকদের অবস্থাও কাঠামোগতভাবে একই ধরনের অদৃশ্যতার শিকার, আর তার একটি নির্মম দৃষ্টান্ত মিলেছে সম্প্রতি নরসিংদীর রায়পুরায়। মেথিকান্দা রেলস্টেশনে পঁচিশ বছর ধরে বসবাসকারী বাক্প্রতিবন্ধী ও পরিচয়হীন বৃদ্ধা ববি বেগম, স্থানীয়দের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘বুবি’ নামে, স্টেশন পরিষ্কার করে ও ভিক্ষা করে যে চল্লিশ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন, তা না দিতে চাওয়ায় দুর্বৃত্তরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।
কোনো রাষ্ট্রীয় ঠিকানা, কোনো পরিবার, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান ছাড়াই একজন মানুষ আড়াই দশক ধরে একটি রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসবাস করে গেছেন, অথচ রাষ্ট্রের কোনো সমাজসেবা কাঠামো তাকে খুঁজে পায়নি। যতক্ষণ না তার মৃত্যু সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হলো ততক্ষণ তিনি ছিলেন অদৃশ্য।
ঘটনার পর প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ছুটে এসেছিল বটে, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে আর হামলাকারীরা রয়ে গেছে অধরা। দেশের প্রায় এক দশমাংশ মানুষ, অর্থাৎ এক কোটি আশি লাখেরও বেশি মানুষ এখন ষাটোর্ধ্ব, অথচ প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান বা নজরদারি কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞরা তাই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির দাবি তুলছেন কেবল সচেতনতামূলক আলোচনার বাইরে গিয়ে বাস্তব নীতি প্রণয়নের জন্য। শিশু আর প্রবীণ—রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কাঠামোর এই দুই প্রান্তেই একটি সাধারণ প্যাটার্ন দেখা যায়—যাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা কম, রাষ্ট্রের হিসাব কষার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে কম দৃশ্যমান। ফরিদপুরের কিশোরী আর বৃদ্ধা বুবি রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান হন কেবল সহিংসতার শিকার হওয়ার পরে, বাঁচার শর্ত হিসেবে নয়।
এখানেই মিশেল ফুকোর জৈবরাজনীতি ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ফুকো দেখিয়েছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র জনসংখ্যাকে ‘বাঁচানোর’ নামে যে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করে হাসপাতাল, কারাগার, অনাথালয়—সেই একই কাঠামো একইসঙ্গে অনুশাসন ও পরিত্যাগের যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে। জর্জিও আগামবেনের ‘বেয়ার লাইফ’ বা নগ্নপ্রাণ ধারণাটি আরও নির্দিষ্টভাবে এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বসবাসকারী অভিভাবকহীন শিশু আইনি অর্থে ‘অন্তর্ভুক্ত’ হলেও কার্যত এমন এক ব্যতিক্রমী পরিসরে বাস করে যেখানে তার শরীর সুরক্ষার আওতা থেকে বাদ পড়ে যায়। রাষ্ট্র তাকে অন্তর্ভুক্ত করে ঠিকই, কিন্তু বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে। যে প্রাচীর তাকে রক্ষা করার কথা, সেই প্রাচীরই তাকে দৃশ্যমানতা ও জবাবদিহি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।
জোহান গালটুংয়ের কাঠামোগত সহিংসতা তত্ত্ব এই বিশ্লেষণকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেয়। গালটুং পার্থক্য করেছিলেন প্রত্যক্ষ সহিংসতা আর কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে। পরেরটি ঘটে যখন সামাজিক কাঠামো নিজেই মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা দেয়, প্রায়শই অদৃশ্যভাবে, কোনো একক অপরাধীকে চিহ্নিত না করেই। ফরিদপুরের ঘটনায় ধর্ষণকারী একজন ব্যক্তি, কিন্তু ছয় মাস ধরে তার অপরাধ অলক্ষ্যে থাকার শর্তটি তৈরি করেছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা—তদারকিহীনতা, জবাবদিহিহীনতা, আর দুর্বল সুরক্ষা-বলয়। ব্যক্তি-অপরাধ আর কাঠামোগত অবহেলা এখানে পরস্পরকে পুষ্ট করেছে।
প্রশ্ন হলো, এই কাঠামোগত ব্যর্থতা কি কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি তার শিকড় আরও গভীরে, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বিভাজন ও নৈতিক অবক্ষয়ে প্রোথিত? রাজনৈতিক দলগুলো দায়বদ্ধ না থাকলে শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে না, কারণ শিশুসুরক্ষা নিছক আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। যখন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ক্রমশ বিভাজিত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সংস্কৃতিও ক্ষয়ে যায়। কারণ জবাবদিহি দাবি করার সামষ্টিক নৈতিক ঐকমত্যই তখন আর গড়ে উঠতে পারে না। প্রতিটি ঘটনা তখন রাজনৈতিক দোষারোপের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, কাঠামোগত সংস্কারের দাবি নয়।
জুডিথ বাটলারের ‘গ্রিভ্যাবিলিটি’ বা ‘শোকযোগ্যতার’ ধারণাটিও এখানে ভাবার মতো—কোন জীবন সমাজে শোকযোগ্য বলে গণ্য হয়, আর কোনটি নীরবে হারিয়ে যায়, তা নির্ধারণ করে ক্ষমতার বিন্যাস। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা এক বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী কিশোরীর ওপর ছয় মাস ধরে চলতে থাকা যৌন সহিংসতা কিংবা পঁচিশ বছর ধরে একটি রেলস্টেশনে নিঃসঙ্গ বেঁচে থাকা এক বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধার হত্যা—দুটোই যদি কেবল সংবাদ-চক্রের সাময়িক শিরোনাম হয়ে থেমে যায়, সহিংসতা পরবর্তী সহানুভূতির ঢেউয়েই শেষ হয়ে যায়, তবে তা প্রমাণ করে প্রান্তিক জীবনের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের মনোযোগ কতটা শর্তসাপেক্ষ ও মরণোত্তর। বেঁচে থাকা অবস্থায় নয়, কেবল ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত হওয়ার পরই যেন এই জীবনগুলো দৃশ্যমানতা পায়।
সমাধান তাই কেবল পাঁচজন কর্মচারী বরখাস্তের টোকেন পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন স্বাধীন তদারকি সংস্থা, বাধ্যতামূলক নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগ জানানোর সহজ ও নিরাপদ চ্যানেল, এবং সবচেয়ে জরুরি—রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ন্যূনতম ঐকমত্য যে শিশু ও প্রবীণের সুরক্ষা কোনো দলীয় বিতর্কের বিষয় নয়। রাষ্ট্র যখন নিজের প্রতিষ্ঠিত আশ্রয়কেন্দ্রেই নাগরিককে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি নয়, বরং সমাজের সমষ্টিগত নৈতিক দায়বদ্ধতার সংকট, যার মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হয় তাদেরই, যাদের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে ক্ষীণ।

১৪ বছরের এক কিশোরি। সহায়হীন, আশ্রয়হীন, অভিভাবকহীন। রাষ্ট্রই তার অভিভাবক। ফরিদপুরের সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) থাকা ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া এই শিশু গত জানুয়ারি থেকে একাধিকবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর এই ঘটনা সামনে এসেছে তখনই, যখন সে সাতাশ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছেছে। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিশু পরিবারের পাঁচজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। মামলা দায়ের হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে একমাত্র আসামিও। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্র কি দায় সারতে পারল?
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি ছিল। ৩০৬টি মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যেখানে মামলা হয় মাত্র ২০টি ঘটনায়।
মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ১,৮৯০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৪৮৩ জন নিহত এবং ৫৮০ জন ধর্ষণের শিকার। সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যা একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার দলিল। বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে আইনজীবীরা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন—তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, মেডিকেল রিপোর্ট পেতে বিলম্ব, সাক্ষী হাজিরের ব্যর্থতা—তা প্রমাণ করে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যে ফাঁকটা কতটা প্রাতিষ্ঠানিক, কতটা দীর্ঘস্থায়ী।
বয়স্ক নাগরিকদের অবস্থাও কাঠামোগতভাবে একই ধরনের অদৃশ্যতার শিকার, আর তার একটি নির্মম দৃষ্টান্ত মিলেছে সম্প্রতি নরসিংদীর রায়পুরায়। মেথিকান্দা রেলস্টেশনে পঁচিশ বছর ধরে বসবাসকারী বাক্প্রতিবন্ধী ও পরিচয়হীন বৃদ্ধা ববি বেগম, স্থানীয়দের কাছে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘বুবি’ নামে, স্টেশন পরিষ্কার করে ও ভিক্ষা করে যে চল্লিশ হাজার টাকা জমিয়েছিলেন, তা না দিতে চাওয়ায় দুর্বৃত্তরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করে।
কোনো রাষ্ট্রীয় ঠিকানা, কোনো পরিবার, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান ছাড়াই একজন মানুষ আড়াই দশক ধরে একটি রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসবাস করে গেছেন, অথচ রাষ্ট্রের কোনো সমাজসেবা কাঠামো তাকে খুঁজে পায়নি। যতক্ষণ না তার মৃত্যু সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হলো ততক্ষণ তিনি ছিলেন অদৃশ্য।
ঘটনার পর প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো ছুটে এসেছিল বটে, কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে আর হামলাকারীরা রয়ে গেছে অধরা। দেশের প্রায় এক দশমাংশ মানুষ, অর্থাৎ এক কোটি আশি লাখেরও বেশি মানুষ এখন ষাটোর্ধ্ব, অথচ প্রবীণ নির্যাতন প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান বা নজরদারি কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
বিশেষজ্ঞরা তাই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির দাবি তুলছেন কেবল সচেতনতামূলক আলোচনার বাইরে গিয়ে বাস্তব নীতি প্রণয়নের জন্য। শিশু আর প্রবীণ—রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা কাঠামোর এই দুই প্রান্তেই একটি সাধারণ প্যাটার্ন দেখা যায়—যাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা কম, রাষ্ট্রের হিসাব কষার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে কম দৃশ্যমান। ফরিদপুরের কিশোরী আর বৃদ্ধা বুবি রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান হন কেবল সহিংসতার শিকার হওয়ার পরে, বাঁচার শর্ত হিসেবে নয়।
এখানেই মিশেল ফুকোর জৈবরাজনীতি ধারণাটি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ফুকো দেখিয়েছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র জনসংখ্যাকে ‘বাঁচানোর’ নামে যে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করে হাসপাতাল, কারাগার, অনাথালয়—সেই একই কাঠামো একইসঙ্গে অনুশাসন ও পরিত্যাগের যন্ত্র হয়ে উঠতে পারে। জর্জিও আগামবেনের ‘বেয়ার লাইফ’ বা নগ্নপ্রাণ ধারণাটি আরও নির্দিষ্টভাবে এই ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে বসবাসকারী অভিভাবকহীন শিশু আইনি অর্থে ‘অন্তর্ভুক্ত’ হলেও কার্যত এমন এক ব্যতিক্রমী পরিসরে বাস করে যেখানে তার শরীর সুরক্ষার আওতা থেকে বাদ পড়ে যায়। রাষ্ট্র তাকে অন্তর্ভুক্ত করে ঠিকই, কিন্তু বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে। যে প্রাচীর তাকে রক্ষা করার কথা, সেই প্রাচীরই তাকে দৃশ্যমানতা ও জবাবদিহি থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।
জোহান গালটুংয়ের কাঠামোগত সহিংসতা তত্ত্ব এই বিশ্লেষণকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেয়। গালটুং পার্থক্য করেছিলেন প্রত্যক্ষ সহিংসতা আর কাঠামোগত সহিংসতার মধ্যে। পরেরটি ঘটে যখন সামাজিক কাঠামো নিজেই মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাধা দেয়, প্রায়শই অদৃশ্যভাবে, কোনো একক অপরাধীকে চিহ্নিত না করেই। ফরিদপুরের ঘটনায় ধর্ষণকারী একজন ব্যক্তি, কিন্তু ছয় মাস ধরে তার অপরাধ অলক্ষ্যে থাকার শর্তটি তৈরি করেছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা—তদারকিহীনতা, জবাবদিহিহীনতা, আর দুর্বল সুরক্ষা-বলয়। ব্যক্তি-অপরাধ আর কাঠামোগত অবহেলা এখানে পরস্পরকে পুষ্ট করেছে।
প্রশ্ন হলো, এই কাঠামোগত ব্যর্থতা কি কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা, নাকি তার শিকড় আরও গভীরে, সামাজিক-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বিভাজন ও নৈতিক অবক্ষয়ে প্রোথিত? রাজনৈতিক দলগুলো দায়বদ্ধ না থাকলে শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধ হবে না, কারণ শিশুসুরক্ষা নিছক আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি সমাজের নৈতিক অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। যখন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ক্রমশ বিভাজিত ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে, তখন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সংস্কৃতিও ক্ষয়ে যায়। কারণ জবাবদিহি দাবি করার সামষ্টিক নৈতিক ঐকমত্যই তখন আর গড়ে উঠতে পারে না। প্রতিটি ঘটনা তখন রাজনৈতিক দোষারোপের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, কাঠামোগত সংস্কারের দাবি নয়।
জুডিথ বাটলারের ‘গ্রিভ্যাবিলিটি’ বা ‘শোকযোগ্যতার’ ধারণাটিও এখানে ভাবার মতো—কোন জীবন সমাজে শোকযোগ্য বলে গণ্য হয়, আর কোনটি নীরবে হারিয়ে যায়, তা নির্ধারণ করে ক্ষমতার বিন্যাস। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে থাকা এক বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী কিশোরীর ওপর ছয় মাস ধরে চলতে থাকা যৌন সহিংসতা কিংবা পঁচিশ বছর ধরে একটি রেলস্টেশনে নিঃসঙ্গ বেঁচে থাকা এক বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধার হত্যা—দুটোই যদি কেবল সংবাদ-চক্রের সাময়িক শিরোনাম হয়ে থেমে যায়, সহিংসতা পরবর্তী সহানুভূতির ঢেউয়েই শেষ হয়ে যায়, তবে তা প্রমাণ করে প্রান্তিক জীবনের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের মনোযোগ কতটা শর্তসাপেক্ষ ও মরণোত্তর। বেঁচে থাকা অবস্থায় নয়, কেবল ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত হওয়ার পরই যেন এই জীবনগুলো দৃশ্যমানতা পায়।
সমাধান তাই কেবল পাঁচজন কর্মচারী বরখাস্তের টোকেন পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রয়োজন স্বাধীন তদারকি সংস্থা, বাধ্যতামূলক নিয়মিত পরিদর্শন, অভিযোগ জানানোর সহজ ও নিরাপদ চ্যানেল, এবং সবচেয়ে জরুরি—রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ন্যূনতম ঐকমত্য যে শিশু ও প্রবীণের সুরক্ষা কোনো দলীয় বিতর্কের বিষয় নয়। রাষ্ট্র যখন নিজের প্রতিষ্ঠিত আশ্রয়কেন্দ্রেই নাগরিককে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তা কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটি নয়, বরং সমাজের সমষ্টিগত নৈতিক দায়বদ্ধতার সংকট, যার মূল্য সবচেয়ে বেশি দিতে হয় তাদেরই, যাদের কণ্ঠস্বর সবচেয়ে ক্ষীণ।
.png)

মানুষের তৈরি সমস্ত শৃঙ্খল, বৈষম্য এবং দাসত্ব দূর করে একটি সাম্যভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতেই পৃথিবীতে এসেছিলেন প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তিনি কখনোই কোনো বংশগত রাজতন্ত্র, সাম্রাজ্য বা ক্ষমতার মসনদ প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। প্রিয়নবীর (সা.) সুমহান আদর্শ ছিল মানুষ যেন শু
২ ঘণ্টা আগে
জশনে জুলুস বা ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন কেবল বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে ইসলামের ইতিহাস ও চর্চার দিকে তাকালে দেখা যায়—মিশর, ইয়েমেন থেকে শুরু করে আফ্রিকার নানা দেশে যুগ যুগ ধরে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগ
২ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পুনর্বণ্টনে আফরোজা খানম রিতা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এটিকে শুধু মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হিসেবে না দেখে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়।
১ দিন আগে
রোহিঙ্গা সংকট নয় বছর পেরিয়ে দশম বছরে পদার্পণ করলো। এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ এর টেকসই সমাধানে একটুও এগোতে পারেনি। বিগত পুরো সময়টা জুড়ে প্রায় ১.২ মিলিয়ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মৌলিক চাহিদার যোগানোই যেন ছিল বাংলাদেশের প্রধান কাজ। নয় বছরের ইতিহাসের দিকে তাকালে নানা রকম টানাপোড়েনও দেখা যায়।
২৫ আগস্ট ২০২৬