ভাস্কর্য, নারী ও রাজনীতি

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৭: ০১
‘জুলাই শহীদ নারী মঞ্চে’র নারী ভাস্কর্যগুলো কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

​রাজধানী ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও অংশগ্রহণকারী নারীদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই শহীদ নারী মঞ্চে’র নারী ভাস্কর্যগুলো কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কিন্তু কেন, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, জনপরিসরে নারীর স্বাধীন অবয়ব প্রকাশে এত বিরুদ্ধতা কেন? ‘চব্বিশের উত্তরা’ সংগঠনের সদস্য মনীষা মাফরুহার অভিযোগ অনুযায়ী, এর মধ্যে চারটি ভাস্কর্য সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয়েছে। এটি কি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক গাফিলতি, নাকি নারী নিয়ে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক সংকটের এক হীন প্রকাশ?

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে ভাস্কর্য নির্মাণ এবং ভাঙনের সংস্কৃতি বহু পুরোনো। এটি কেবল দেশেই নয়, বহির্বিশ্বেও এর বহু নজির রয়েছে। যদি ভাঙনের প্রসঙ্গে বলা হয়, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর লেনিন বা স্টালিনের ভাস্কর্য গুঁড়িয়ে দেওয়া কিংবা ২০০৩ সালে বাগদাদের ফেরদৌস স্কোয়ারে মার্কিন আগ্রাসনে সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্য অপসারণ কিংবা ২০০১ সালে তালেবান কর্তৃক বামিয়ানের ঐতিহাসিক বুদ্ধ মূর্তি উড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো ছিল ক্ষমতার পালাবদল বা মতাদর্শিক চরমপন্থার দৃষ্টিকটু বহিঃপ্রকাশ।

​এই ভাঙনের উন্মত্ততা বাংলাদেশে ব্যাপক রূপ নিয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তখন অসংখ্য ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ বা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন ও তাদের রাজনৈতিক প্রতীকগুলোকে ‘ফ্যাসিবাদী চিহ্ন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষুব্ধ জনতা ও আন্দোলনকারীরা এসব ভেঙে ফেলে।

কিন্তু এই ভাঙচুরের ব্যাপ্তি কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হেনেছে। উদাহরণস্বরূপ, মেহেরপুরের মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের ভাস্কর্য ও প্রতিকৃতি ভেঙে ফেলার কথা বলা যায়। মুজিবনগরের ভাস্তর্য ভেঙে ফেলার কারণে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের দলিল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও পলাশী মোড়ে ভাস্কর শামীম শিকদারের ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতাসংগ্রাম’ ভাস্কর্যটিতে ভাঙচুর করা হয়েছে। বিজয় সরণির ‘মৃত্যুঞ্জয়’ ভাস্কর্য এবং শিশু একাডেমির ‘দুরন্ত’ ভাস্কর্যটিও এই রোষানল থেকে রেহাই পায়নি।

রাজধানী ছাড়িয়ে ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে এই তাণ্ডব; যার মধ্যে চট্টগ্রামের সিআরবি মোড়ে ‘বজ্রকণ্ঠ’ ভাস্কর্যটি ক্রেন ও বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। নরসিংদীর ‘তর্জনী’, ময়মনসিংহের শশী লজের ‘ভেনাস’ মূর্তি এবং ঝিনাইদহের বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুরের শিকার হয়। মূলত রাজনৈতিক ক্ষোভ ও মতাদর্শিক বৈরিতা থেকে সংঘটিত এসব তাণ্ডবের পরে দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যগুলোর অধিকাংশই এখনো সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে জনপরিসরে ভাস্কর্য নির্মাণের বাহুল্য বা অতিমাত্রিকতা নিয়েও সমাজে একধরনের নেতিমনোভাব তৈরি হয়েছিল, যা এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

​এই ধ্বংসযজ্ঞের নেপথ্যে থাকা নান্দনিকতা বনাম রাজনৈতিক প্রতিশোধের প্রশ্নটি আজ তীব্রভাবে সামনে এসেছে। কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের জনপরিসরের শিল্পকর্ম বা পাবলিক আর্ট ধ্বংস করার ক্ষেত্রে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। একটি সভ্য রাষ্ট্রে সাংস্কৃতিক সম্পত্তি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আইন থাকলেও রাজনৈতিক পালাবদলের ধাক্কায় তা কার্যকারিতা হারায়, যা মূলত আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়। কোনো নির্দিষ্ট শাসকের পতনের অর্থ কি সমগ্র ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বা জাতীয় স্মৃতি মুছে ফেলা? ফরাসি বা রুশ বিপ্লবের পরেও ভাস্কর্য ভাঙচুর হয়েছিল। পরে সেগুলো ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণও করা হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের দেশে ভাস্কর্য ধ্বংসের এই প্রবণতা একধরনের ‘স্মৃতি উচ্ছেদ’ বা ইরেজার অব মেমরির রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছে।

​এর পাশাপাশি বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে জনপরিসরে ভাস্কর্য নির্মাণের বাহুল্য বা অতিমাত্রিকতা নিয়েও সমাজে একধরনের নেতিমনোভাব তৈরি হয়েছিল, যা এই ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বহির্বিশ্বে সাধারণত ভাস্কর্য বা পাবলিক আর্ট নির্মিত হয় নান্দনিক সৌন্দর্যবর্ধন, নাগরিক মননশীলতার বিকাশ এবং ঐতিহাসিক চেতনা বা দর্শনের প্রতীক হিসেবে। কিন্তু আমাদের দেশে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলীয় তোষণ, অতি-রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা এবং যত্রতত্র অপরিকল্পিতভাবে ভাস্কর্য ও ম্যুরাল চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

শিল্পচর্চার স্বাধীনতা ও নান্দনিক মূল্যবোধের চেয়ে যখন ভাস্কর্যকে রাজনৈতিক বন্দনা বা মতাদর্শিক আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অনীহা ও ক্ষোভ দানা বাঁধাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে বহির্বিশ্বে শিল্পের অপব্যবহার হলেও সেখানে শিল্পকে ধ্বংস করা হয় না, বরং তাকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পক্ষান্তরে আমাদের দেশে ভাস্কর্যের অতিরিক্ত রাজনৈতিক ব্যবহার এবং এর বিপরীতে সৃষ্ট জনরোষকে কাজে লাগিয়ে পুরো ভাস্কর্য সংস্কৃতিকেই প্রগতির বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

​এই ধ্বংসযজ্ঞকে যখন আমরা বর্তমান নারী উত্তরণের প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাপকাঠিতে বিশ্লেষণ করি, তখন বিষয়টি বিপজ্জনক ভূরাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপ নেয়। দিয়াবাড়ির জুলাই শহীদ নারী মঞ্চের ভাস্কর্যগুলো কোনো নির্দিষ্ট স্বৈরাচারী নেতার প্রতীক ছিল না; এগুলো ছিল ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নারীর আত্মত্যাগ ও ঐতিহাসিক অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট স্বীকৃতি। ফলে এই মঞ্চে আঘাত হানার অর্থ কেবল একটি শিল্পকর্ম ভাঙা নয়, বরং জনপরিসরে নারীর রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও ঐতিহাসিক ভূমিকার টুঁটি চেপে ধরা।

কেন প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই নারী ও তার অর্জিত অধিকার সবার আগে রক্ষণশীল দৃষ্টির শিকার হয়, তা সত্যিই ভাবনার বিষয়। ঐতিহাসিক ফরাসি বিপ্লব বা আরব বসন্তের মতো ঘটনাগুলোর পর দেখা গেছে, বিপ্লবে নারীরা সামনে থেকে অংশ নিলেও রাষ্ট্রক্ষমতার রূপান্তরের সময় তাদের জনপরিসর সংকুচিত করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারীর রক্ত ও ঘাম জড়ানো অর্থময় উপস্থিতি দিয়াবাড়ির মঞ্চে এসে এভাবে আক্রমণের মুখে পড়ার ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে, এটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার আক্রমণ ছাড়া আর কিছু নয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মারপ্যাঁচে বাংলাদেশ যখন একটি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখন এ ধরনের ঘটনা বহির্বিশ্বে অত্যন্ত নেতিবাচক কূটনৈতিক বার্তা পাঠায়। বিদেশি কূটনৈতিক মহল, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং দাতা দেশগুলো সবসময় নারী অধিকার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের ওপর বিশেষ নজর রাখে। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক স্তরে নারী ভাস্কর্য ঢেকে রাখা বা অপসারণের মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা দেশের সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে ধ্বংস করে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মৌলবাদী ও রক্ষণশীল শক্তির উত্থানের আশঙ্কা জোরালো করে তোলে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বহুজাতিক সহায়তা এবং বৈশ্বিক ভাবমূর্তির নিরিখে এই আত্মঘাতী প্রবণতা দেশকে দীর্ঘমেয়াদে চরম খেসারত দিতে বাধ্য করবে।

​গত দুই বছরে ভাস্কর্য ভাঙার উৎসব সংস্কৃতিমনস্ক সমাজে বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সংস্কৃতির এই গভীর সংকটের মুহূর্তে বুদ্ধিজীবী সমাজ, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর দৃশ্যমান শৈথিল্য প্রকারান্তরে উগ্র ও অসহিষ্ণু শক্তিগুলোকে আরও উৎসাহিত করেছে। ভাস্কর্যের এই রাজনীতির কোনো ইতিবাচক সমাপ্তি নেই, বরং এর শেষ কেবল মেধা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির চূড়ান্ত দেউলিয়াত্বেই হতে পারে। তাই সব ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্ব্যর্থহীন অবস্থান স্পষ্ট করে বলতে হয়—ভাস্কর্য ভাঙার অসভ্য সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের বিকল্প নেই।

  • নাহিদা নাহিদ: গল্পকার, গবেষক ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত