Two roads diverged in a wood, and I— I took the one less traveled by, and that has made all the difference. (The Road Not Taken, Robert Frost)
হ্যাঁ আমরা সেই কম হেঁটে যাওয়া মানুষের পথে হেঁটেছিলাম। যে পথ ভয়ের, ক্ষয়ের, ত্যাগের এবং অস্তিত্বের সেই পথেই আমরা হেঁটেছি। ১৯৭১ সাল; বাঙালি হেঁটেছে অস্তিত্বের পথে। জীবনের সহজ সুখের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্বাধীনতার কণ্টকাকীর্ণ পথ বেছে নিয়েছিল অজস্র যুবা পুরুষ, নারী, শিশু এমনকি মৃত্যু পথযাত্রী বৃদ্ধও, আমাদের পূর্বসূরী তাঁরা। তাঁদের সেই আত্মদান কোনো সাধারণ ত্যাগ নয়; এক অতিমানবিক সংকল্প।
আলজেরিয়ার মরুপ্রান্তরে ফরাসি কামানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণ, ভিয়েতনামের গহিন জঙ্গলে নাপালম বোমার আগুনে পুড়ে ছাই হওয়া সেই কৃষক, কিংবা আমাদের একাত্তরের অল্প বয়সে প্রাণ হারানো কোনো তরুণ গেরিলা; তাঁরা প্রত্যেকেই পারতেন দেশ-শত্রুর সঙ্গে আপস করে কেবল শ্বাসটুক বাঁচিয়ে রাখতে। তাঁরা করেননি। তাঁরা জানতেন, দাসের মতো শত-সহস্র বছর বেঁচে থাকার চেয়ে শত্রুমুক্ত একটি দেশে, একটি মুহূর্তের জন্যও বেঁচে থাকা কতটা সুখের। যারা লড়েছে তারা সুখে বেঁচেছে। কিন্তু যারা বেঁচে গিয়েছে তাদের বাঁচাটা ক্রমশ সংকুচিত হতে হতে সুখ থেকে হয়ে উঠেছে অসুখ। মানুষে মানুষে চলছে এক অদৃশ্য লড়াই। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, রাষ্ট্র নিয়ে শেষ নেই বিতর্কের। এই পাল্লায় আছে মুক্তিযুদ্ধও।
পরাধীনতার শিকল ভেঙে বেরোনোর যে প্রচণ্ড দহন, সেই যে এক চিলতে লাল-সবুজ পতাকার জন্য অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া সময়গুলো নিয়ে চলছে তর্ক, বয়ান, পাল্টা বয়ান। লাখো মানুষের বুকের তপ্ত রক্ত আর মা-বোনেদের অস্ফূট চিৎকারে পাওয়া একটা দেশ, এক পরম পবিত্র জয়, তাকে দানে পাওয়া জ্ঞানে বিচার করার শঠতায় চলছে কথার পিঠে কথা। তর্কের বিপরীতে তর্ক।
এই তর্কের কেন্দ্র তিনটি: নেতৃত্বের একক কৃতিত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জাতীয় পরিচয়ের সংজ্ঞা। এই বিতর্কগুলো কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং বর্তমানের ক্ষমতার উৎসকে সংজ্ঞায়িত করার লড়াই। রাজনৈতিক অস্তিত্ব সজীব রাখার লড়াই।
মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা শব্দটি যতই বেখাপ্পা হোক, বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে তীব্র বিভাজন, তার মূলে রয়েছে এই মুক্তিযুদ্ধের একক দাবিদার হওয়ার প্রবল বাসনা। এই বিতর্কটি আজ আর কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বর্তমানের শাসনক্ষমতাকে জায়েজ করার এক কৌশলে পরিণত হয়েছে। এই কৌশলে সবচেয়ে চর্চিত প্রসঙ্গ স্বাধীনতার ঘোষণা। কে দিয়েছেন প্রথম?
আমরা তর্কের মাধ্যমে আসলে এমন একটি জায়গায় পৌঁছাতে চাই, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কোনো দ্বিতীয় মত থাকবে না। কিন্তু ক্ষমতার মোহ আর গোষ্ঠীস্বার্থের ভিন্নতার কারণে সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য বারবার আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
এই একটি প্রশ্নকে মান ধরে তর্কের ওপরে তর্ক জমছে দশকের পর দশক। এক পক্ষ যখন ২৫ মার্চের কালরাতে শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার অবিসংবাদিত নেতৃত্বকে ইতিহাসের একমাত্র সত্য হিসেবে তুলে ধরে, অন্য পক্ষ তখন কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের সেই সাহসী ঘোষণাকেই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে চায়।
এই দ্বিপাক্ষিক দাবি ও স্বপক্ষীয় সমর্থনের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ত্যাগ, সাংগঠনিক কর্ম, প্রবাসী সরকারের অভাবনীয় কূটনৈতিক লড়াই কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সেই দ্বিধাহীন আত্মদান।
মুক্তিযুদ্ধের একচ্ছত্র ‘কপিরাইট’ বা স্বত্বাধিকারী হতে প্রতিটি দলেই আছে আলাদা আলাদা যুদ্ধ সরঞ্জাম। দলিল, দস্তাবেজ। সাক্ষ্য, প্রমাণ। মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর জানা হয়ে গেছে, এই জনপদে নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের একমাত্র মাপকাঠি হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। ফলে ক্ষমতায় থাকাকালীন ইতিহাসকে নিজস্ব বয়ানে সাজানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে চলছে তা যুগের পর যুগ। এর ফলে পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানেও ইতিহাসের খণ্ডিত রূপ পরিবেশন করাটা আর অপরাধ তুল্য হয় না।
একজনকে মহান করতে গিয়ে অন্যজনকে ছোট করা কিংবা সম্পূর্ণ অস্বীকার করার এই সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ঐক্যকে রুগ্ন থেকে মুমূর্ষু করে তুলছে। সঙ্গে বাড়িয়ে দিচ্ছে আরও আরও আগ্রাসী বিতর্কের পথ।
এই বিতর্ক যতটা না সত্য অন্বেষণের জন্য, তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেদের ক্ষমতার মসনদকে নিষ্কণ্টক করার প্রয়াস। কোনো পক্ষই মানতে চায় না যখন ইতিহাসকে দলের ‘সম্পত্তি’ হিসেবে দেখা হয়, তখন সাধারণ মানুষের সেই যৌথ ত্যাগের মহিমাকে পুরোপুরি আত্মস্থ করতে ব্যর্থ হয় এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর দেশপ্রেমের সমার্থক থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে একে অপরকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ বা ‘দালাল’ অপবাদ দেওয়ার এক শাণিত অস্ত্র।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার পর আমাদের জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে যে বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা কেবল সংজ্ঞার লড়াই নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামোর মূল দর্শন নিয়ে এক গভীর আদর্শিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-কে রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক ও ভাষাভিত্তিক ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, যেখানে ৯ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করা হয়েছিল—ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত একক সত্তাই হবে আমাদের ঐক্যের ভিত্তি।
এই দর্শনের মূলে ছিল হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। কিন্তু ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় দর্শনে এক আমূল পরিবর্তন আনা হয় এবং ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর ধারণা প্রবর্তন করা হয়। এর তাত্ত্বিক ভিত্তি ছিল কেবল ভাষা নয়, বরং ভূখণ্ড এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের এক সংমিশ্রণ।
এই পরিবর্তনের দেখা দেয় স্পষ্ট বিভাজনরেখা: একদল মনে করেন ‘বাঙালি’ পরিচয়টি আমাদের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক শেকড়কে ধারণ করে, অন্যদল মনে করেন ‘বাংলাদেশী’ পরিচয়টি আমাদের সার্বভৌমত্ব ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যকে রক্ষা করে।
এই পরিচয়ের সংকটই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যাবতীয় বিতর্কের প্রধান জ্বালানি। কারণ, এক পক্ষ যখন মুক্তিযুদ্ধকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব হিসেবে দেখে, অন্য পক্ষ তখন একে ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও মুসলিম প্রধান জনপদের মুক্তি হিসেবে চিত্রায়িত করতে চায়।
সংবিধানের বিবর্তনে এই দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়েছে, যেখানে বর্তমানে ৬(২) অনুচ্ছেদে নাগরিকত্বের পরিচয় ‘বাংলাদেশী’ হলেও ৯ অনুচ্ছেদে জাতীয় সংহতির ভিত্তি হিসেবে ‘বাঙালি’ জাতীয়তাবাদকে রাখা হয়েছে। এই সাংবিধানিক দ্বৈততা মূলত আমাদের সমাজের সেই অমীমাংসিত সত্যকেই প্রতিফলিত করে—যেখানে আমরা আজও একমত হতে পারিনি যে আমাদের অস্তিত্বের মূল ভিত্তিটি আসলে কোনটি। ফলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রতিটি বিতর্ক শেষ পর্যন্ত এই পরিচয় সংকটের আবর্তেই ঘুরপাক খায়, যেখানে ইতিহাস চর্চার চেয়ে নিজের অস্তিত্বের সংজ্ঞা প্রতিষ্ঠার লড়াইটিই প্রবল হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের মহান আত্মত্যাগের পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ‘দায়বদ্ধতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ আমাদের জাতীয় ঐক্যের পথে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে দ্বিধাবিভক্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি করেছে বিতর্ক। একটি নবজাত রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি তখনই সুসংগত হয়, যখন তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার সুনিশ্চিত হয়; কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে এই ন্যায়বিচারের পথটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার।
১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তির যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, তা কেবল সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খুনিদেরই রক্ষা করেনি, বরং একাত্তরের চিহ্নিত ঘাতক-দালালদেরও রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনর্বাসিত করার এক নজিরবিহীন অধ্যায় তৈরি করেছিল। যে ঘাতকদের হাতে ছিল এদেশের মেধাবী বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের রক্ত, তাদের গাড়িতে যখন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়েছে, তখন তা কেবল শহীদ পরিবারগুলোকেই অপমানিত করেনি, বরং মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকেই এক চরম উপহাসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
এই দীর্ঘ বিচারহীনতার সুযোগে সমাজে একটি ‘অস্বীকারের রাজনীতি’ শিকড় গেড়ে বসে, যেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা বা বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগকে লঘু করে দেখানোর ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। ফলে চার দশক পর যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো, তখন তা কেবল আইনি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকল না; বরং দীর্ঘ বিলম্বের কারণে সৃষ্ট আদর্শিক মেরুকরণ এই বিচারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বনাম ন্যায়বিচারের এক অমীমাংসিত তর্কে রূপ নেয়।
এক পক্ষ যখন একে ‘রক্তের ঋণ শোধ’ হিসেবে গ্রহণ করেছে, অন্য পক্ষ তখন একে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রচার করে সমাজে বিভাজনকে আরও উসকে দিয়েছে। এই বিচারহীনতার গ্লানিই মূলত আমাদের ইতিহাসের সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ করে দিয়েছে এবং প্রমাণ করেছে যে, যখন রাষ্ট্র তার শত্রুদের দণ্ড দিতে দেরি করে, তখন সেই অমীমাংসিত ক্ষতটিই পরবর্তীতে অন্তহীন রাজনৈতিক বিতর্কের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
তর্কের কেন্দ্র তিনটি: নেতৃত্বের একক কৃতিত্ব, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং জাতীয় পরিচয়ের সংজ্ঞা। এই বিতর্কগুলো কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং বর্তমানের ক্ষমতার উৎসকে সংজ্ঞায়িত করার লড়াই। রাজনৈতিক অস্তিত্ব সজীব রাখার লড়াই।
এবার আসা যাক মহান মুক্তিযুদ্ধের মতো একটি পরম সংবেদনশীল ও জাতীয় অস্তিত্বের মূল ভিত্তি নিয়ে আমাদের প্রাত্যহিক এই অন্তহীন তর্কের গন্তব্য আসলে কোথায়—এ প্রশ্নের মীমাংসায়। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, তর্কের উদ্দেশ্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আদর্শিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে তিনটি ভিন্ন মোহনায় গিয়ে মিশেছে।
প্রথমত, এই তর্কের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে বিদ্বেষের জয় এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার এক অঘোষিত লড়াই। এখানে ইতিহাস চর্চা কোনো লক্ষ্য নয়, বরং ইতিহাসকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একপক্ষ যখন অন্যপক্ষকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’, ‘রাজাকার’ বা ‘পাকিস্তানের প্রেতাত্মা’ হিসেবে চিহ্নিত করতে চায়, অন্যপক্ষ তখন পাল্টা ‘ভারতীয় দালাল’ বা ‘আধিপত্যবাদের অনুসারী’ তকমা দিয়ে রাজনৈতিক ময়দান থেকে প্রতিপক্ষকে নৈতিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
এই তর্কের গন্তব্য কোনো সত্য অন্বেষণ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত ‘ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন’ বা চরিত্রহননের প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে বর্তমানের রাজনৈতিক আধিপত্যকে নিষ্কণ্টক করা হয়। যখন মুক্তিযুদ্ধকে কেবল কাউকে বর্জন করার মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়, তখন সেই ত্যাগের মহিমা সংকীর্ণ দলীয় বিদ্বেষের কাছে পরাজিত হয়।
দ্বিতীয়ত, এই তর্কের ভিড়েও একদল নিভৃতচারী মানুষ ও গবেষক রয়েছেন যাদের লক্ষ্য কেবল সত্যের অনুসন্ধান। তাঁরা চান একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর একটি নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পূজা নয় বরং প্রতিটি বীরের সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন থাকবে।
এই সত্যের অভিযাত্রীরা বিশ্বাস করেন যে, ইতিহাসের কোনো অধ্যায়কেই অস্পৃশ্য বা প্রশ্নাতীত রাখা উচিত নয়; বরং তথ্যের ব্যবচ্ছেদ ও নির্মোহ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই প্রকৃত গৌরবকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তাঁদের তর্কের গন্তব্য হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ইতিহাস যেখানে প্রবাসী সরকারের সকল সদস্যের প্রশাসনিক মেধা, রণাঙ্গনের সেক্টর কমান্ডারদের রণকৌশল এবং নাম না জানা লাখ লাখ সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের গল্পগুলো কোনো কাটছাঁট ছাড়াই সমমর্যাদায় স্থান পাবে।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যটি হলো একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচয়ের সংকট, বিচারহীনতার গ্লানি আর রাজনৈতিক মালিকানার লড়াই আমাদের সমাজকে এতটাই খণ্ডিত করেছে যে, আমরা আজও মুক্তিযুদ্ধের একটি সর্বজনীন সংজ্ঞায় একমত হতে পারিনি।
আমরা তর্কের মাধ্যমে আসলে এমন একটি জায়গায় পৌঁছাতে চাই, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে কোনো দ্বিতীয় মত থাকবে না। কিন্তু ক্ষমতার মোহ আর গোষ্ঠীস্বার্থের ভিন্নতার কারণে সেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য বারবার আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আমরা যখন বিতর্ক করি, তখন অবচেতনে হয়তো সেই অভিন্ন ভিত্তিটুকুই খুঁজি যা আমাদের সবাইকে আবার একাত্তরের মতো এক সুতায় বাঁধবে।
এটি অনস্বীকার্য যে, মুক্তিযুদ্ধ কোনো সাধারণ তর্কের বিষয় নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের মূলসূত্র। রাজনৈতিক স্বার্থ আর ক্ষুদ্র মোহের ঊর্ধ্বে গিয়ে ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে সাহসের সঙ্গে মেনে নেওয়া এবং জাতীয় বীরদের দলমতের ঊর্ধ্বে রেখে শ্রদ্ধা জানানোই হতে পারে এই দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর বিতর্কের একমাত্র সুন্দর সমাপ্তি। যেদিন আমরা ইতিহাসকে দলীয় সম্পত্তি না ভেবে জাতীয় আমানত হিসেবে গ্রহণ করতে পারব, সেদিনই হয়তো তর্কের অবসান ঘটবে এবং আমরা সেই সমৃদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারব, যে আকাঙ্ক্ষায় অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা।
- নাহিদা নাহিদ: গল্পকার ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক