leadT1ad

ইনবক্সের বাইরে-৪

রুটি, নীতি এবং এক হাজার টাকার গণতন্ত্র

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১: ৪৪
রিকশাচালক আজমল প্যাডেল মারতে মারতে হালকা ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, ‘মামা, ভোট দিতে গেলে প্যাট চলব কেমনে? গ্রাফিক: তুফায়েল আহমদ

যানজটে স্থবির পান্থপথ। সামনে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে এ যানজট, ঠিক দেখা যাচ্ছে না। রিকশায় বসে আছি। কথায় কথায় জানলাম, রিকশাচালকের নাম আজমল। শক্তপোক্ত গড়ন, বয়স চল্লিশের কোঠায়। কিশোরগঞ্জের মানুষ। গল্পে গল্পে ভোটের প্রসঙ্গ তুললাম। সামনেই তো ত্রয়োদশ নির্বাচন।

আজমলকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাড়ি যাবেন না ভোট দিতে?’

এরমধ্যেই যানজট একটু ছাড়ল। আজমল রিকশার প্যাডেল মারতে মারতে হালকা ঘাড় ফিরিয়ে বললেন, ‘মামা, ভোট দিতে গেলে প্যাট চলব কেমনে? ঢাকা থাইকা কিশোরগঞ্জ যাওয়া-আসার ভাড়া আছে না? গাড়ি ভাড়াই তো ১ হাজার ট্যাকা চইলা যাব গা!’

গণতন্ত্রের মহোৎসবে আজমলের কাছে ১ হাজার টাকার মূল্য অনেক বেশি। শোনা যায়, প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সে যখন গণতন্ত্রের চর্চা হতো, তখন নাগরিকরা তাদের কাজ ফেলে ভোট দিতে যেত বলে তাদের নাকি রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দিত। আজমলের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কেউ নেই। তাঁর কাছে ব্যালট পেপারের চেয়ে দুই কেজি চালের দাম অনেক বেশি বাস্তব। এই যে জীবন ও জীবিকার টানাপোড়েন, এটাই কি আমাদের রাজনীতির মূল স্ক্রিপ্ট নয়?

ধূসর হয়ে বিকেল নামছে। পশ্চিমাকাশের গলায় বেলাশেষের গান। আমি আবার খুঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘যদি যাওয়ার ব্যবস্থা হয়, কারে ভোট দেবেন?’

আজমল এবার একটু হাসলেন। কেমন লজ্জামিশ্রিত হাসি। বললেন, ‘আমি তো চাই জামাত ক্ষমতায় আসুক। কিন্তু জামাত যেহেতু ক্ষমতায় আইতে পারব না, তাই ভোটটা নষ্ট করতাম না। বিম্পিরেই দিতাম।’

আজমলের এই যুক্তিতে আমি অ্যান্থনি ডাউনসের ইকোনমিক থিওরি অব ডেমোক্রেসির ছায়া দেখলাম। আজমল একজন ‘র‍্যাশনাল ভোটার’। তিনি আদর্শের চেয়ে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। একেই হয়তো বলে ‘কৌশলগত ভোট’।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘জামায়াত কেন পছন্দ?’

রাস্তার দুপাশে সান্ধ্যবাতিগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। আজমল রাস্তার পাশে ফুটপাতে আঙুল উঁচিয়ে দেখালেন, ‘উই যে দেহেন, মাইয়া পুলাপান সিগ্রেট খাইতাছে। এডি আমার পছন্দ না। জামাত আইলে এগলি বন্ধ হইব। দেড় বছর ধইরা আমলীগ নাই, কোনোখানে জুয়া খেলা দেখছেন? যাত্রাপালা দেখছেন? জামাত ক্ষমতায় আইলে এগলি থাকব না।’

ফরাসি বিপ্লবের সময় দেখা গিয়েছিল, যারা বাস্তিল দুর্গ ভেঙেছিল, তারাই পরে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে গিলে খেয়েছিল একে অপরকে। রবসপিয়রের মতো নেতারা শেষ পর্যন্ত গিলোটিনেই জীবন দিয়েছিলেন। আমাদের এনসিপির তরুণরাও কি তবে ক্ষমতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ করতে গিয়ে তারা নিজেরাই সিস্টেমের অংশ হয়ে যাচ্ছে?

আজমলের ইনসাফের ধারণাটা খুব সরল। তিনি সমাজকে দেখতে চান একটি কঠোর নৈতিক শাসনের অধীনে। ইতিহাসে যখনই কোনো সমাজ চরম বিশৃঙ্খলা আর দুর্নীতির মধ্য দিয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষ এভাবেই একজন ‘পিউরিটান’ বা কঠোর নৈতিক শাসকের স্বপ্ন দেখে। সপ্তদশ শতকের ইংল্যান্ডে অলিভার ক্রমওয়েল যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তিনিও আজমলের মতো মানুষদের সমর্থন পেয়েছিলেন। কারণ মানুষ তখন রাজতন্ত্রের বিলাসিতা আর নৈতিক স্খলনে অতিষ্ঠ ছিল। আজমলের কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল ‘দিল্লি না ঢাকা’ বলে মিছিলে চিৎকার করা নয়, তাঁর কাছে স্বাধীনতা মানে তাঁর চোখের সামনের ‘অনাচার’ বন্ধ হওয়া।

অথচ এই নৈতিকতার আকাঙ্ক্ষার ঠিক বিপরীত দিকেই রয়েছে অন্য এক বাস্তবতা। মহামতি প্লেটো তাঁর রিপাবলিক-এ যেটাকে বলেছেন, ‘রাষ্ট্র শাসক পেয়েছে, কিন্তু আত্মার শাসন গেছে অ্যাপেটিটিভ অংশের হাতে।’ সেই অংশ কারা? তাঁরা হচ্ছেন, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ। তাঁরা নির্বাচনের আগে বলেন, ‘আমি মানুষের সেবা করতে এসেছি।’ কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার পরই তার পা আটকে যায় টেন্ডার–বাণিজ্য, দলীয়করণ, সরকারি প্লট, গাড়ি ইত্যাদির মধুগাত্রে। ফলে, একটি রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরেও রাষ্ট্র-সমাজের কিছুই বদলায় না।

আজমলের রিকশাটা যখন পান্থপথ মোড়ে এসে থামল, তখন পাশের দোকানগুলোয় ঝলমলে আলো জ্বলে উঠেছে। একটি টিভি-ফ্রিজ-ইলেকট্রনিক পণ্যের শোরুমে দেখলাম টেলিভিশন চলছে। খবরে দেখাচ্ছে, এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম ছোড়া হয়েছে!

মনে পড়ল, মাত্রই বছর দেড়েক আগে যে তরুণেরা ইতিহাসে স্থান করে নেওয়া এক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছে, নাসীর পটওয়ারী তাঁদেরই একজন। বিপ্লবের ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর। ফরাসি বিপ্লবের সময় দেখা গিয়েছিল, যারা বাস্তিল দুর্গ ভেঙেছিল, তারাই পরে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে গিলে খেয়েছিল একে অপরকে। রবসপিয়রের মতো নেতারা শেষ পর্যন্ত গিলোটিনেই জীবন দিয়েছিলেন। আমাদের এনসিপির তরুণরাও কি তবে ক্ষমতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ করতে গিয়ে তারা নিজেরাই সিস্টেমের অংশ হয়ে যাচ্ছে?

আজমল ভাড়া নিয়ে চলে যাওয়ার সময় আবার বললেন, ‘মামা, বিম্পি ক্ষমতায় আইলে হয়তো প্যাটটা একটু ভালো চলব, কিন্তু জামাত আইলে শান্তি পাইতাম।’

আমি দাঁড়িয়ে ভাবলাম, আমাদের এই ভূখণ্ডের মানুষের চাওয়াগুলো কত বিচিত্র। কেউ রুটি চায়, কেউ নীতি চায়। আর ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষগুলো এই চাওয়াগুলোকে স্রেফ নির্বাচনী ইশতেহারের বুলেট পয়েন্ট বানিয়ে রাখে।

এসব তত্ত্বকথায় আজমলদের কিছু এসে যায় না। তাদের রাজনীতি মূলত তিনটি প্রশ্নে থামে—‘নিত্যপণ্যের দাম কেমন, আইনশৃঙ্খলা কেমন, জেতার সম্ভাবনা কেমন। তারা জামায়াত চায়, কিন্তু ভোট দেয় বিএনপিকে। এটাই হয়তো এই সময়ের সবচেয়ে সৎ কনফেশন। তবু প্রশ্ন থেকে যায়। যে দেশে ভোট দিতে যাওয়া মানে এক হাজার টাকার ক্ষতি, সেখানে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ডাক কিংবা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এর ডাক কতটা বিশ্বাস করে এই আজমলের মতো খেটে খাওয়া মানুষেরা?

শীতের কুয়াশা আরও ঘন হচ্ছে। আজমলের রিকশাটা খানিক দূরের যানজটের ভেতরে মিলিয়ে গেল।

  • মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
Ad 300x250

সম্পর্কিত