সুমন সুবহান

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গত ২৪ ঘণ্টায় এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা গেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান তিন মাসের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন যখন নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বৃদ্ধির জেরে সেই শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়।
এই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তপ্ত ফোনালাপের ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন প্রশাসনকে না জানিয়ে বৈরুতে হামলা জোরদার করার ইসরায়েলি জেদের কারণে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে নেতানিয়াহুকে সরাসরি ‘পাগল’ ও ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের চাপ ও হোয়াইট হাউসের কড়া হুঁশিয়ারির মুখে শেষ পর্যন্ত বৈরুতে বড় ধরনের হামলা স্থগিত করতে বাধ্য হয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এই মার্কিন হস্তক্ষেপে লেবানন ফ্রন্টে একটি আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে, যেখানে বৈরুতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ বন্ধ এবং বিনিময়ে উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা স্থগিতের কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলের এই পিছু হটার ফলেই লেবাননে নির্বিচার হামলার প্রতিবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংলাপ বয়কট করা ইরান পুনরায় শান্তি আলোচনায় ফিরে আসার ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্যে থাকা ইসরায়েলি মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উন্মোচন করেছেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ও কলামিস্ট জোনাথন কুক। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে কুক দেখিয়েছেন, ইরানকে নিয়ে ইসরায়েলের বিগত ৩০ বছরের ‘জুজুর ভয়’ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিজের একক প্রভাব ও আঞ্চলিক পারমাণবিক আধিপত্য ধরে রাখার একটি বানোয়াট কল্পকাহিনি।
নেতানিয়াহুর আসল পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত ‘দুঃসাহসিক’ ও অবাস্তব। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর এক সময় পশ্চিমাদের চোখে ভিলেন রূপে চিত্রিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে তেহরানের ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খামেনি হত্যার অংশটুকু সফল হলেও আহমাদিনেজাদ নিজেই ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান, যার ফলে নেতানিয়াহুর পুরো রেজিম চেঞ্জের মাস্টারপ্ল্যান ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
জোনাথন কুকের এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে, ইরান কোনো উন্মাদ বা গণহত্যাকারী রাষ্ট্র নয়, বরং তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী নীতিই মধ্যপ্রাচ্যের আসল সংকট। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের পুনরায় সংলাপে ফিরে আসা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একক ছড়ি ঘোরানোর দিন এখন ফুরিয়ে আসছে। মূলত ওয়াশিংটন নিজের বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থেই এখন ইসরায়েলের বেপরোয়া সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের ক্ষোভ: ‘সবাই এখন আপনাকে ঘৃণা করে’
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্রমতে, গত ১ জুন সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক উত্তপ্ত ফোনালাপের ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কথোপকথন চলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি ‘পাগল’ এবং ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে আখ্যা দিতেও দ্বিধা করেননি।
অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নেতানিয়াহুকে দেওয়া নিজের নানামুখী অন্ধ সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প ফোনে তাঁর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফোনালাপ ফাঁসের বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, দুই নেতার মধ্যকার এই ফোনালাপকে কর্মকর্তারা ‘উত্তপ্ত ও তিক্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, ফোনালাপে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া সুরে নেতানিয়াহুকে বলেন, ‘আপনি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন। আমি যদি না থাকতাম তবে আপনি এতদিনে কারাগারে থাকতেন। আমি আপনার পিঠ বাঁচাচ্ছি, আর আপনি এই কাণ্ড করছেন! এখন সবাই আপনাকে ঘৃণা করে, আর এই যুদ্ধের কারণে সবাই ইসরায়েলকেও ঘৃণা করছে।’
ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হিজবুল্লাহর মাত্র একজন কমান্ডারকে টার্গেট করার অজুহাতে পুরো একটি বহুতল ভবন ধূলিসাৎ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর এমন নির্বিচার বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং আগ্রাসন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে বলে ট্রাম্প সতর্ক করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ হওয়ার মূল কারণ ছিল, ইসরায়েলের এই বেপরোয়া হামলা তেহরানের সঙ্গে চলমান ওয়াশিংটনের অত্যন্ত সংবেদনশীল শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দিচ্ছিল। শেষে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন যে, আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ইসরায়েলকে অবশ্যই বৈরুতে বোমাবর্ষণ বন্ধ করে অতি দ্রুত আক্রমণাত্মক সামরিক তৎপরতা গুটিয়ে নিতে হবে।
লেবাননে আংশিক যুদ্ধবিরতির রূপরেখা
নেতানিয়াহুর সঙ্গে উত্তপ্ত ফোনালাপের পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া একটি পোস্টে জানান, দীর্ঘ সংঘাতের পর অবশেষে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ পরস্পরের ওপর হামলা কমাতে সম্মত হয়েছে।
ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণাটি ছিল মূলত লেবাননে চলমান তীব্র উত্তেজনা সীমিত মাত্রায় হলেও প্রশমনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ওয়াশিংটনে অবস্থিত লেবানন দূতাবাসের পক্ষ থেকেও এই আংশিক যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে দূতাবাস স্পষ্ট করেছে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে দেশটিতে চলমান দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের হয়তো পুরোপুরি অবসান ঘটবে না। তা সত্ত্বেও এই উদ্যোগকে বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষায় একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহ এখন ইসরায়েলের ওপর আর কোনো নতুন হামলা না চালানোর স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমেরিকার ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্ট এর আগে কখনো সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে এভাবে কথা বলেননি। সন্ত্রাসী তালিকায় থাকা হিজবুল্লাহর সঙ্গে ট্রাম্পের এই পরোক্ষ যোগাযোগকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় গত ৪৮ ঘণ্টায় লেবানন ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের মাধ্যমে একটি নতুন পথনকশা তৈরি হয়েছে। এই রোডম্যাপ বা পথনকশার মূল উদ্দেশ্য হলো বৈরুত ও এর আশপাশের অঞ্চলে চলমান ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের সাময়িক অবসান ঘটানো।
চুক্তির প্রধান শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি বা দাহিয়েহ এলাকায় সমস্ত বড় ধরনের বিমান ও স্থল হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, বৈরুতের দিকে অগ্রসর হতে যাওয়া ইসরায়েলি অগ্রবর্তী সেনা ও আক্রমণাত্মক তৎপরতা ইতিমধ্যে গুটিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন নেতানিয়াহু। এমনকি হামলার প্রস্তুতিতে থাকা ইসরায়েলি বাহিনীকে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থানে সফলভাবে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, এই চুক্তির পারস্পরিক শর্ত হিসেবে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও উত্তর ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে তাদের রকেট ও ড্রোন হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখবে। মূলত এই দ্বিমুখী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। তবে এই আংশিক যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো অনেক বড় ধরনের সংশয় ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির এই ইতিবাচক ঘোষণার পরপরই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে একটি ভিন্নধর্মী ও কঠোর বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে তাদের আগের সামরিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, লেবানন থেকে যদি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রকেট হামলা সামান্যতম অব্যাহত থাকে, তবে ইসরায়েলও বৈরুতে পাল্টা বোমাবর্ষণ করবে। একই সঙ্গে তেল আবিব স্পষ্ট করেছে যে, দক্ষিণ লেবাননের মাটিতে তাদের সামরিক বাহিনীর স্থল অভিযান পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী চলমান থাকবে।
বর্তমানে ইসরায়েলি স্থলবাহিনী লেবাননের ভেতরের জাহারানি নদীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে গভীরে ইসরায়েলের অনুপ্রবেশ। ইসরায়েলের এমন অনড় ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে আংশিক এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব নিয়ে এখন চারদিকে তীব্র ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। হিজবুল্লাহ নেতা হাসান ফাদলাল্লাহও জানিয়েছেন যে, পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কেবল তখনই সম্ভব যদি ইসরায়েল তাদের সমস্ত সেনা লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ওয়াশিংটনে বুধবারের আসন্ন বৈঠককে সামনে রেখে এই আংশিক চুক্তি কতটুকু কার্যকর থাকবে, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সিদ্ধান্ত পাল্টে সংলাপে ফিরল ইরান
লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলার তীব্র প্রতিবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান সংলাপ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল তেহরান। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছিল, যেকোনো শান্তি বা যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে লেবাননকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং সেখানে ইসরায়েলি আগ্রাসন থামাতে হবে। এই দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান এবং কূটনৈতিক আলোচনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ সে সময় জানিয়েছিল, দাবি আদায় না হলে ইরান ও এ অঞ্চলে তাদের মিত্র প্রতিরোধ যোদ্ধারা এক চরম অর্থনৈতিক যুদ্ধের এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও বাণিজ্য সরবরাহ বিপর্যস্ত করতে তারা হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। শুধু হরমুজই নয়, লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও তাদের অচল করার পরিকল্পনা ছিল।
লেবানন ফ্রন্টে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনের কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নাজুক যুদ্ধবিরতিটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বৈরুতে ইসরায়েলের বড় হামলা থেকে পিছিয়ে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়।
ট্রাম্প সিএনবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান এই আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে গেলেও তাঁর মোটেও কিছু আসে যায় না। ওয়াশিংটনের এমন অনমনীয় ও পরোয়াহীন বার্তার পর তেহরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কৌশলগত অবস্থান এবং পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিয়ে পুনরায় মূল্যায়ন শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত করেন যে, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ব্যাক-চ্যানেল বা পরোক্ষ আলোচনা আসলে বন্ধ হয়নি, বরং তা ‘দ্রুতগতিতে’ এগিয়ে চলছে।
ট্রাম্পের এই দাবির সপক্ষে ভিন্ন বার্তা দিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা আবার সঠিক পথে ফিরেছে বলে বিভিন্ন আঞ্চলিক সূত্রও সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিশ্চিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, একটি ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অর্থ হলো সব ফ্রন্টেই লঙ্ঘন। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, যদি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের সুনির্দিষ্ট মার্কিন গ্যারান্টি পাওয়া যায়, তবে তারা স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত। ফলে ওয়াশিংটনের কঠোর মনোভাব ও কূটনৈতিক চাপের মুখে ইরান শেষ পর্যন্ত তাদের আগের অবস্থান বদলে পুনরায় শান্তি সংলাপে ফিরে এসেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই আন্তরিকভাবে সংঘাত এড়াতে আগ্রহী। ট্রাম্পের অনমনীয় মনোভাব ও সরাসরি কূটনৈতিক চাপ এবং বিপরীতে ইরানের কৌশলগত নমনীয়তা প্রমাণ করে, বড় কোনো আঞ্চলিক মহাবিপর্যয় এড়াতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বই পর্দার আড়ালে সমঝোতার পথ খুঁজছেন।
ইসরায়েলের একরোখা সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অবাস্তব রাজনৈতিক ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ভেঙে পড়ার পর, হোয়াইট হাউস এখন নিজের বৈশ্বিক স্বার্থেই মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে বদ্ধপরিকর। যদিও দক্ষিণ লেবাননে নেতানিয়াহুর স্থল অভিযানের কারণে আংশিক যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো কিছুটা ধোঁয়াশা এবং সংশয় রয়ে গেছে, তবুও বৈরুতে হামলা স্থগিত হওয়া এবং ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতি সচল থাকা একটি ইতিবাচক বার্তা। ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি এবং ওয়াশিংটনের সংলাপে ইরানের পুনরায় ফিরে আসার এই নতুন সমীকরণ আগামী দিনে সব ফ্রন্টে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের এই যৌথ যুদ্ধবিরোধী অবস্থান যদি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে দীর্ঘ তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি যুগান্তকারী এবং টেকসই রাজনৈতিক সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গত ২৪ ঘণ্টায় এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা গেছে। ইরানের সঙ্গে চলমান তিন মাসের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন যখন নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, ঠিক তখনই লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বৃদ্ধির জেরে সেই শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়।
এই চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক নজিরবিহীন উত্তপ্ত ফোনালাপের ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন প্রশাসনকে না জানিয়ে বৈরুতে হামলা জোরদার করার ইসরায়েলি জেদের কারণে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে নেতানিয়াহুকে সরাসরি ‘পাগল’ ও ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের চাপ ও হোয়াইট হাউসের কড়া হুঁশিয়ারির মুখে শেষ পর্যন্ত বৈরুতে বড় ধরনের হামলা স্থগিত করতে বাধ্য হয় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এই মার্কিন হস্তক্ষেপে লেবানন ফ্রন্টে একটি আংশিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে, যেখানে বৈরুতে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ বন্ধ এবং বিনিময়ে উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর রকেট হামলা স্থগিতের কথা বলা হয়েছে। ইসরায়েলের এই পিছু হটার ফলেই লেবাননে নির্বিচার হামলার প্রতিবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংলাপ বয়কট করা ইরান পুনরায় শান্তি আলোচনায় ফিরে আসার ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের নেপথ্যে থাকা ইসরায়েলি মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উন্মোচন করেছেন প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ও কলামিস্ট জোনাথন কুক। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে কুক দেখিয়েছেন, ইরানকে নিয়ে ইসরায়েলের বিগত ৩০ বছরের ‘জুজুর ভয়’ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিজের একক প্রভাব ও আঞ্চলিক পারমাণবিক আধিপত্য ধরে রাখার একটি বানোয়াট কল্পকাহিনি।
নেতানিয়াহুর আসল পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত ‘দুঃসাহসিক’ ও অবাস্তব। তিনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর এক সময় পশ্চিমাদের চোখে ভিলেন রূপে চিত্রিত সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে তেহরানের ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খামেনি হত্যার অংশটুকু সফল হলেও আহমাদিনেজাদ নিজেই ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়ে আত্মগোপনে চলে যান, যার ফলে নেতানিয়াহুর পুরো রেজিম চেঞ্জের মাস্টারপ্ল্যান ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
জোনাথন কুকের এই বিশ্লেষণ প্রমাণ করে, ইরান কোনো উন্মাদ বা গণহত্যাকারী রাষ্ট্র নয়, বরং তেল আবিবের যুদ্ধংদেহী নীতিই মধ্যপ্রাচ্যের আসল সংকট। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইরানের পুনরায় সংলাপে ফিরে আসা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একক ছড়ি ঘোরানোর দিন এখন ফুরিয়ে আসছে। মূলত ওয়াশিংটন নিজের বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার্থেই এখন ইসরায়েলের বেপরোয়া সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের ক্ষোভ: ‘সবাই এখন আপনাকে ঘৃণা করে’
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্রমতে, গত ১ জুন সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে এক উত্তপ্ত ফোনালাপের ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কথোপকথন চলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি ‘পাগল’ এবং ‘অকৃতজ্ঞ’ বলে আখ্যা দিতেও দ্বিধা করেননি।
অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নেতানিয়াহুকে দেওয়া নিজের নানামুখী অন্ধ সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প ফোনে তাঁর তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফোনালাপ ফাঁসের বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, দুই নেতার মধ্যকার এই ফোনালাপকে কর্মকর্তারা ‘উত্তপ্ত ও তিক্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন।
গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, ফোনালাপে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া সুরে নেতানিয়াহুকে বলেন, ‘আপনি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন। আমি যদি না থাকতাম তবে আপনি এতদিনে কারাগারে থাকতেন। আমি আপনার পিঠ বাঁচাচ্ছি, আর আপনি এই কাণ্ড করছেন! এখন সবাই আপনাকে ঘৃণা করে, আর এই যুদ্ধের কারণে সবাই ইসরায়েলকেও ঘৃণা করছে।’
ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হিজবুল্লাহর মাত্র একজন কমান্ডারকে টার্গেট করার অজুহাতে পুরো একটি বহুতল ভবন ধূলিসাৎ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর এমন নির্বিচার বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং আগ্রাসন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে বলে ট্রাম্প সতর্ক করেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষুব্ধ হওয়ার মূল কারণ ছিল, ইসরায়েলের এই বেপরোয়া হামলা তেহরানের সঙ্গে চলমান ওয়াশিংটনের অত্যন্ত সংবেদনশীল শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দিচ্ছিল। শেষে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন যে, আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে ইসরায়েলকে অবশ্যই বৈরুতে বোমাবর্ষণ বন্ধ করে অতি দ্রুত আক্রমণাত্মক সামরিক তৎপরতা গুটিয়ে নিতে হবে।
লেবাননে আংশিক যুদ্ধবিরতির রূপরেখা
নেতানিয়াহুর সঙ্গে উত্তপ্ত ফোনালাপের পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া একটি পোস্টে জানান, দীর্ঘ সংঘাতের পর অবশেষে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ পরস্পরের ওপর হামলা কমাতে সম্মত হয়েছে।
ট্রাম্পের এই আকস্মিক ঘোষণাটি ছিল মূলত লেবাননে চলমান তীব্র উত্তেজনা সীমিত মাত্রায় হলেও প্রশমনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ওয়াশিংটনে অবস্থিত লেবানন দূতাবাসের পক্ষ থেকেও এই আংশিক যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে দূতাবাস স্পষ্ট করেছে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে দেশটিতে চলমান দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের হয়তো পুরোপুরি অবসান ঘটবে না। তা সত্ত্বেও এই উদ্যোগকে বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষায় একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহ এখন ইসরায়েলের ওপর আর কোনো নতুন হামলা না চালানোর স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমেরিকার ইতিহাসে কোনো প্রেসিডেন্ট এর আগে কখনো সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে এভাবে কথা বলেননি। সন্ত্রাসী তালিকায় থাকা হিজবুল্লাহর সঙ্গে ট্রাম্পের এই পরোক্ষ যোগাযোগকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতায় গত ৪৮ ঘণ্টায় লেবানন ও ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের মাধ্যমে একটি নতুন পথনকশা তৈরি হয়েছে। এই রোডম্যাপ বা পথনকশার মূল উদ্দেশ্য হলো বৈরুত ও এর আশপাশের অঞ্চলে চলমান ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের সাময়িক অবসান ঘটানো।
চুক্তির প্রধান শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলি বা দাহিয়েহ এলাকায় সমস্ত বড় ধরনের বিমান ও স্থল হামলা চালানো থেকে বিরত থাকবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, বৈরুতের দিকে অগ্রসর হতে যাওয়া ইসরায়েলি অগ্রবর্তী সেনা ও আক্রমণাত্মক তৎপরতা ইতিমধ্যে গুটিয়ে নিতে সম্মত হয়েছেন নেতানিয়াহু। এমনকি হামলার প্রস্তুতিতে থাকা ইসরায়েলি বাহিনীকে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থানে সফলভাবে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, এই চুক্তির পারস্পরিক শর্ত হিসেবে ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও উত্তর ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে তাদের রকেট ও ড্রোন হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখবে। মূলত এই দ্বিমুখী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে একটি টেকসই শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছে। তবে এই আংশিক যুদ্ধবিরতি কতদিন টিকবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এখনো অনেক বড় ধরনের সংশয় ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির এই ইতিবাচক ঘোষণার পরপরই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর থেকে একটি ভিন্নধর্মী ও কঠোর বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, লেবানন পরিস্থিতি নিয়ে তাদের আগের সামরিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, লেবানন থেকে যদি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর রকেট হামলা সামান্যতম অব্যাহত থাকে, তবে ইসরায়েলও বৈরুতে পাল্টা বোমাবর্ষণ করবে। একই সঙ্গে তেল আবিব স্পষ্ট করেছে যে, দক্ষিণ লেবাননের মাটিতে তাদের সামরিক বাহিনীর স্থল অভিযান পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী চলমান থাকবে।
বর্তমানে ইসরায়েলি স্থলবাহিনী লেবাননের ভেতরের জাহারানি নদীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে গভীরে ইসরায়েলের অনুপ্রবেশ। ইসরায়েলের এমন অনড় ও আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে আংশিক এই যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব নিয়ে এখন চারদিকে তীব্র ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। হিজবুল্লাহ নেতা হাসান ফাদলাল্লাহও জানিয়েছেন যে, পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কেবল তখনই সম্ভব যদি ইসরায়েল তাদের সমস্ত সেনা লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে ওয়াশিংটনে বুধবারের আসন্ন বৈঠককে সামনে রেখে এই আংশিক চুক্তি কতটুকু কার্যকর থাকবে, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
সিদ্ধান্ত পাল্টে সংলাপে ফিরল ইরান
লেবাননে ইসরায়েলের নির্বিচার ও নৃশংস হামলার তীব্র প্রতিবাদে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান সংলাপ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল তেহরান। ইরান স্পষ্ট জানিয়েছিল, যেকোনো শান্তি বা যুদ্ধবিরতির চুক্তিতে লেবাননকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং সেখানে ইসরায়েলি আগ্রাসন থামাতে হবে। এই দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান এবং কূটনৈতিক আলোচনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ সে সময় জানিয়েছিল, দাবি আদায় না হলে ইরান ও এ অঞ্চলে তাদের মিত্র প্রতিরোধ যোদ্ধারা এক চরম অর্থনৈতিক যুদ্ধের এজেন্ডা হাতে নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও বাণিজ্য সরবরাহ বিপর্যস্ত করতে তারা হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। শুধু হরমুজই নয়, লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিও তাদের অচল করার পরিকল্পনা ছিল।
লেবানন ফ্রন্টে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসনের কারণে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার নাজুক যুদ্ধবিরতিটি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বৈরুতে ইসরায়েলের বড় হামলা থেকে পিছিয়ে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়।
ট্রাম্প সিএনবিসি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান এই আলোচনা পুরোপুরি ভেঙে গেলেও তাঁর মোটেও কিছু আসে যায় না। ওয়াশিংটনের এমন অনমনীয় ও পরোয়াহীন বার্তার পর তেহরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কৌশলগত অবস্থান এবং পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিয়ে পুনরায় মূল্যায়ন শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত করেন যে, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ব্যাক-চ্যানেল বা পরোক্ষ আলোচনা আসলে বন্ধ হয়নি, বরং তা ‘দ্রুতগতিতে’ এগিয়ে চলছে।
ট্রাম্পের এই দাবির সপক্ষে ভিন্ন বার্তা দিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা আবার সঠিক পথে ফিরেছে বলে বিভিন্ন আঞ্চলিক সূত্রও সংবাদমাধ্যমগুলোকে নিশ্চিত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তাঁর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, একটি ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অর্থ হলো সব ফ্রন্টেই লঙ্ঘন। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, যদি লেবাননসহ সব ফ্রন্টে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধের সুনির্দিষ্ট মার্কিন গ্যারান্টি পাওয়া যায়, তবে তারা স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত। ফলে ওয়াশিংটনের কঠোর মনোভাব ও কূটনৈতিক চাপের মুখে ইরান শেষ পর্যন্ত তাদের আগের অবস্থান বদলে পুনরায় শান্তি সংলাপে ফিরে এসেছে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষই আন্তরিকভাবে সংঘাত এড়াতে আগ্রহী। ট্রাম্পের অনমনীয় মনোভাব ও সরাসরি কূটনৈতিক চাপ এবং বিপরীতে ইরানের কৌশলগত নমনীয়তা প্রমাণ করে, বড় কোনো আঞ্চলিক মহাবিপর্যয় এড়াতে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বই পর্দার আড়ালে সমঝোতার পথ খুঁজছেন।
ইসরায়েলের একরোখা সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অবাস্তব রাজনৈতিক ‘মাস্টারপ্ল্যান’ ভেঙে পড়ার পর, হোয়াইট হাউস এখন নিজের বৈশ্বিক স্বার্থেই মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে বদ্ধপরিকর। যদিও দক্ষিণ লেবাননে নেতানিয়াহুর স্থল অভিযানের কারণে আংশিক যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে এখনো কিছুটা ধোঁয়াশা এবং সংশয় রয়ে গেছে, তবুও বৈরুতে হামলা স্থগিত হওয়া এবং ব্যাক-চ্যানেল কূটনীতি সচল থাকা একটি ইতিবাচক বার্তা। ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারি এবং ওয়াশিংটনের সংলাপে ইরানের পুনরায় ফিরে আসার এই নতুন সমীকরণ আগামী দিনে সব ফ্রন্টে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথ প্রশস্ত করতে পারে।
তেহরান ও ওয়াশিংটনের এই যৌথ যুদ্ধবিরোধী অবস্থান যদি শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে দীর্ঘ তিন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি যুগান্তকারী এবং টেকসই রাজনৈতিক সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সম্প্রতি ঢাকাসহ সারা দেশে একটি বাক্য অদ্ভুতভাবে ভাইরাল হয়েছে, “রাগ করলা?” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ এটি নিয়ে হাস্যরস করছে, ভিডিও বানাচ্ছে, টেলিভিশন চ্যানেলেও সেটিকে আলোচনার উপকরণে পরিণত করা হয়েছে। আমরা কি অজান্তেই এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করছি, বা তৈরিতে সহায়তা করছি যেখানে...
২ ঘণ্টা আগে
‘এবার ৭ গাড়ি পুলিশ পাঠিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমার প্রদর্শনী বন্ধ।’ এ রকম একটি সংবাদ আসে রোববার মধ্যরাতে। খবরে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলায় পুলিশ ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমোর প্রদর্শনী বন্ধ করে দিয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
ঈদ ব্যবস্থাপনায় সরকার বিশেষ তৎপর ছিল বলেই মনে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ১০টি বিশেষ নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের ফলে জনমনে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছিল। তবে সামগ্রিক চিত্র বলছে, কিছু মৌলিক সংকটের জায়গা এখনো বিদ্যমান।
৬ ঘণ্টা আগে
ঈদের সময় পত্রিকা পাঁচ-ছয় দিন বন্ধ থাকায় কি পাঠকের সঙ্গে সম্পর্ক সত্যিই আলগা হয়ে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। পত্রিকা ছয় দিন বন্ধ, পাঠক কি ইতিমধ্যে আরো বেশি ‘ডিজিটাল এলাকা’য় চলে গেছে? এই বিরতি কি কেবল সাময়িক ছুটি, নাকি দীর্ঘমেয়াদে পাঠকের অভ্যাস, আগ্রহ ও আনুগত্যে স্থায়ী পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
৮ ঘণ্টা আগে