leadT1ad

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক দূরদর্শী সংগঠক আরাফাত রহমান কোকো

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১৭: ৪৯
বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক আরাফাত রহমান কোকো ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে খুব বেশি না থাকলেও তাঁদের দূরদর্শিতা ও কর্মপ্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলেছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ সন্তান আরাফাত রহমান কোকো ঠিক তেমনই একজন, যিনি ক্রীড়াঙ্গনে প্রবেশ করেছিলেন ক্ষমতার জোরে নয়, বরং একটি সুসংগঠিত কাঠামোর স্বপ্ন নিয়ে। নিজেকে জাহির না করে বরং নীরবে কাজ করার একজন সুদক্ষ সংগঠক ছিলেন তিনি।

কোকোর জীবনটা ছিলো বড়ই বৈচিত্র্যময়। ১৯৬৯ সালে জন্ম তাঁর। জন্মের পরপরই তাঁর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে জিয়াউর রহমান যখন স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, তখন কোকো ছিল একেবারেই অবুঝ শিশু। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর মা বেগম খালেদা জিয়া ও বড়ভাই তারেক রহমানসহ কোকোকে বন্দি করে পাকিস্তানি বাহিনী। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি রাখা হয় ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে মাত্র দুই বছর চার মাস বয়সে কোকো প্রথমবারের মতো মুক্তির স্বাদ পান। তারপর বিভিন্ন পরিক্রমায় হয়ে ওঠেন ক্রীড়াঙ্গনের একজন বিপ্লবী। সাধারণত এমন একটি পরিবারে জন্ম নিয়ে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সংবাদের শিরোনাম হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে তিনি তা চাননি। বেছে নিয়েছেন স্বাভাবিক ক্রীড়াপ্রেমী জীবন। নিজেকে আড়ালে রেখে কাজ করেছেন ক্রীড়াঙ্গন উন্নয়নে।

শিশুকাল থেকেই তাঁর জীবনে একের পর এক নাটকীয় ও বেদনাবিধুর ঘটনা ঘটতে থাকে। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের সিপাহী বিপ্লবের সময় যখন জিয়াউর রহমান বন্দি হন তখন কোকো ছিল মাত্র ছয় বছরের শিশু। মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৮১ সালে পিতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হারানোর মধ্য দিয়ে জীবনে নেমে আসে এক দুর্বিষহ অবস্থা। অতি সাধারণ ঘরের সন্তানের মতো বড় হতে হয়েছে তাঁকে। ক্ষমতার কেন্দ্রের একেবারে কাছেই জন্ম নেওয়া একজন মানুষ হয়েও কোকো রাজনীতির প্রচলিত পথে হাঁটেননি। আরাম-আয়েশের জীবন তাঁর কাছে আকর্ষণীয় ছিল না। তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাষ্ট্র সংস্কারের নীরব এক ক্ষেত্র--বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন। নিভৃতচারী এই মানুষটি ক্রীড়া প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন একজন দক্ষ ক্রীড়াশিল্পীর মতো। চুপচাপ পরিকল্পিতভাবে ও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে দেখতে চেয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়।

বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক আরাফাত রহমান কোকো ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ, সংযত ও অন্তর্মুখী স্বভাবের একজন মানুষ। ক্রীড়াঙ্গনে তাঁর অবদান ঐতিহাসিক হলেও তিনি বরাবরই ছিলেন প্রচারবিমুখ। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার প্রবণতা তাঁর মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। বরং দায়িত্বকে নীরবে ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করাকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে দায়িত্ব পালনকালে কোকো ক্রিকেটকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার বিষয়ে সচেষ্ট ছিলেন। এ সময় বিরোধী দলীয় নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে তিনি একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনে বিরল। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবকাঠামোগত ও সামগ্রিক উন্নয়ন শুরু হয়।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকেই সরাসরি ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা ছাড়াই প্রশাসনে এসেছেন। সেখানে কোকোর অবস্থান ছিল আলাদা। তিনি নিজে ডিওএইচএস ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে ক্রিকেট খেলেছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কোকো চাইলে সহজেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হতে পারতেন। কিন্তু তিনি সে পথে যাননি। বরং বোর্ডের অধীনে ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ভিত্তি শক্ত করার কাজটিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। শুরু করেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের কাঠামোগত সংস্কার। তাঁর হাত ধরেই হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার তৈরির একটি কার্যকর পাইপলাইন গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে যাঁরা পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে সফল হয়েছেন, তাঁদের প্রায় সবাই এই হাই পারফরম্যান্স ইউনিটের মধ্য দিয়েই প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছেন। খেলোয়াড় তৈরির এই ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল ডেভেলপমেন্ট কমিটির কাজ, যার মূল কারিগর ছিলেন আরাফাত রহমান কোকো।

আরাফাত রহমান কোকোর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, তিনি তাঁর কাজের পূর্ণ ফলাফল দেখে যেতে পারেননি। এমনকি কোকোর নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতিটুকু মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁকে বন্দি করা হয়। ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান তিনি। এরপর আর দেশে ফেরা হয়ে উঠেনি তাঁর। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বিদেশের মাটিতেই পার করতে হলো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত

প্রকাশ্যে না এসেই অনেকটা নিভৃতে নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে ক্রীড়াক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছেন কোকো। সাধারণ একজন খেলোয়াড় ও সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভালো খেলোয়াড় তৈরি হওয়ার আগে দরকার একটি স্বাস্থ্যকর প্রশাসনিক পরিবেশ। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই তিনি ক্রীড়াঙ্গনকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। শুধু কেন্দ্রীয় অবকাঠামো গড়েই তিনি থেমে থাকেননি; দেশের ক্রিকেটকে বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রেও কোকো রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ক্রিকেটকে মিরপুর ও চট্টগ্রামের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে তিনি সিলেট, খুলনা, বগুড়া ও রাজশাহীতে আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে রাজধানীকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে ক্রিকেটকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন তিনি, যার সুফল বর্তমান প্রজন্ম ভোগ করছে।

কোকোর চিন্তার বড় একটি জায়গা ছিল অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা। ক্রিকেট মাঠ মানেই যে শুধু উইকেট আর গ্যালারি নয়, তা তিনিই প্রথম ভাবতে শিখিয়েছিলেন। ক্রিকেটকে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তিনি গড়ে তুলতে মনোনিবেশ করেন, যেখানে খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা ও দর্শক সবাই অংশ নিবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি মাঠ সংস্কার, অনুশীলন সুবিধা এবং খেলোয়াড়দের মৌলিক চাহিদা নিয়ে নীরবে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দীর্ঘমেয়াদি।

তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা বা সংবাদ শিরোনাম কোকোর লক্ষ্য ছিল না। তাঁর দূরদর্শী সাংগঠনিক দক্ষতা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ বাংলাদেশের ক্রিকেটকে বিশ্ব-ক্রিকেটে একটি সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছুতে সহায়তা করেছে। একসময় প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা মিরপুরের শেরে বাংলা স্টেডিয়ামকে তিনি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ভেন্যুতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেন। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় এটি বিশ্বের প্রথম সারির ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলোর একটি হিসেবে আজ স্বীকৃত।

আরাফাত রহমান কোকোর ব্যক্তিত্বের একটি বিস্ময়কর ও গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর সংযম। তাঁকে দেখে বোঝার কোনো উপায়ই ছিল না যে তিনি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দম্পতির সন্তান। রাজনীতির বাইরে থেকে ইংল্যান্ড, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় করেছেন পড়াশোনা। অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করার সময় তাঁকে চরম আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে পড়াশোনা থেমে যাওয়ার উপক্রম হয়। জীবন চালাতে কোকো কাজ নেন পিজ্জা হাটে ডেলিভারি বয় হিসেবে। ডেলিভারির জন্য ব্যবহৃত গাড়িটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বন্ধুর গাড়ি ধার করে কাজ চালিয়েছেন। গাড়ি মেরামতের মতো টাকাটুকুও হাতে ছিল না তাঁর। মা দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেও কোকোর জীবন ছিল অনাড়ম্বর।

একটা সাধারণ প্রবণতা হলো, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ‘বিপ্লব’ শব্দটি শুনলেই আমরা বড় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তনের কথা ভাবি। বিশেষত বিশ্বকাপ বা বড় কোনো টুর্নামেন্ট জয় করে নতুন ট্রফি বা দলীয় খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু কোকোর বিপ্লব ছিল ভিন্ন ধরনের। এটি ছিল প্রশাসনিক মানসিকতার পরিবর্তনের প্রয়াস। তিনি বুঝতেন, ক্রীড়াঙ্গনের স্থায়ী উন্নয়ন আসে কাঠামোগত সংস্কার থেকে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সাফল্য থেকে নয়। খেলাধুলাকে তিনি দেখতেন একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে। তরুণদের জন্য এটি হতে পারে শৃঙ্খলা শেখার জায়গা, দলগত চেতনা গড়ে তোলার মাধ্যম। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি ক্রীড়াঙ্গনকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পেশাদার করার পক্ষে ছিলেন। যদিও তাঁর অনেক উদ্যোগ আলোচনার বাইরে থেকে গেছে, তবুও যাঁরা কাছ থেকে কাজ দেখেছেন, তাঁরা জানেন, তিনি ছিলেন পরিকল্পনাপ্রবণ ও বাস্তববাদী।

আরাফাত রহমান কোকোর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, তিনি তাঁর কাজের পূর্ণ ফলাফল দেখে যেতে পারেননি। এমনকি কোকোর নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতিটুকু মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাঁকে বন্দি করা হয়। ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান তিনি। এরপর আর দেশে ফেরা হয়ে উঠেনি তাঁর। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বিদেশের মাটিতেই পার করতে হলো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সে আরাফাত রহমান কোকোর জীবনাবসান ঘটে। স্বল্পায়ু এই জীবনে তিনি রেখে গেছেন নীরব দায়িত্ববোধ ও আড়ালে থেকে কাজ করার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

আজ আমরা ক্রীড়াঙ্গনের নানা সংকট নিয়ে কথা বলছি। আসলে বলছি না, বরং বলতে বাধ্য হচ্ছি। বিভিন্ন অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতা আজ স্পষ্ট। পাশাপাশি দুর্বল প্রশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব, পরিকল্পনার অভাব ইত্যাদি তো আছেই। এই দুরাবস্থা দেখে বর্তমান ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে বারবার ভেসে ওঠে কোকোর নাম। তিনি দেখিয়েছিলেন কিভাবে ক্ষমতার উচ্চকণ্ঠ ব্যবহার না করেও ক্রীড়াঙ্গনে পরিবর্তনের চেষ্টা করা যায়। নীরবতাও যে কখনো কখনো সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হতে পারে, তাঁর জীবন তারই প্রমাণ। তাঁর প্রয়াণে পরিবারের পাশাপাশি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা হয়তো তাঁর নাম খুব বেশি উচ্চারণ করি না, কিন্তু তাঁর ভাবনার প্রয়োজন এখনও আছে। সেই প্রয়োজন হয়তো বর্তমান সময়ে আরও বেশি করেই উপলব্ধ হচ্ছে।

  • ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত