বিদ্যুৎ খাত
লেখা:

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ব্যয়, নীতিগত দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা এবং ভোক্তাবিরোধী সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করছে। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার বদলেছে, আইনের ভাষা বদলেছে—কিন্তু সাধারণ ভোক্তার বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি। বরং প্রতিবারের মতো সংকটের দায় আবারও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই এসে পড়ছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফার ১৮তম দফায় শিল্প, বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সকল ‘কালাকানুন’ বাতিল করা হবে এবং জনস্বার্থবিরোধী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে চলমান দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। একইসঙ্গে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে বের হয়ে নবায়নযোগ্য ও মিশ্র জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথাও বলা হয়েছিল।
এই প্রতিশ্রুতিগুলো নিঃসন্দেহে জনমনে আশার সঞ্চার করেছিল। কারণ বিগত এক যুগে বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইনের আড়ালে যে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার চাপ বহন করেছে দেশের সাধারণ মানুষ। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে এবং সেই আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বিদ্যুৎ বিলের মধ্য দিয়েই আদায় করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০১০ সালের বহুল সমালোচিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ রহিত করার উদ্যোগ নেয়। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ মনে হলেও বাস্তবে অধ্যাদেশে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়, যা মূলত পুরোনো ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই বহাল রাখে।
অধ্যাদেশের ২(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আইন রহিত হওয়ার আগে ওই আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তি বা গৃহীত ব্যবস্থা বৈধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে ২(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ওই আইনের আওতায় চলমান কার্যক্রম এমনভাবে অব্যাহত থাকবে যেন আইনটি রহিতই হয়নি।
অর্থাৎ যে আইনের মাধ্যমে দায়মুক্তি, অস্বচ্ছতা এবং বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেই কাঠামোর বাস্তব কার্যকারিতা এখনো বহাল রয়েছে। ফলে আইন বাতিল হলেও তার মূল সুবিধাভোগী কাঠামো অক্ষত রয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—দায়মুক্তির সংস্কৃতি কি সত্যিই শেষ হয়েছে, নাকি কেবল আইনের নাম ও ভাষা বদলেছে?
এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পর। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১ টাকা ৫২ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। একইসঙ্গে পাইকারি পর্যায়ে মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং সঞ্চালন মাশুলও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কিন্তু গণশুনানিতে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পোদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ভোক্তা অধিকারকর্মীরা এই যুক্তির সঙ্গে একমত হননি। তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন চুক্তি, সিস্টেম লস, অপচয় এবং নানা ধরনের অস্বচ্ছ ব্যয়ের দায় সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ফলেই বারবার মূল্যবৃদ্ধির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিইআরসি কি তার সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে? কারণ একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব শুধু ব্যয় সমন্বয় করা নয়; বরং উৎপাদক, সরবরাহকারী এবং ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে বিইআরসিই একমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য এখানে বিদ্যমান। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা বিতরণ কোম্পানিগুলো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিলে তা নিয়ে গণশুনানি হয়, কমিশন শুনানি গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু ভোক্তাদের পক্ষ থেকে মূল্য হ্রাস, ব্যয় সংকোচন বা বিকল্প নীতির প্রস্তাব এলে সেগুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে শুনানি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকর প্রক্রিয়া বাস্তবে অনুপস্থিত।
অর্থাৎ একজন ভোক্তা যদি সিস্টেম লস কমানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, অযৌক্তিক চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি অথবা উৎপাদন ব্যয় কমানোর অন্য কোনো বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেন, তাহলে সেই প্রস্তাব মূল্যবৃদ্ধির আবেদনের মতো সমান গুরুত্ব পায় না। এটি শুধু একটি প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা নয়; বরং জ্বালানি সুবিচার ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের প্রশ্ন।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের পক্ষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য কমানোর নানা প্রস্তাব ও সংস্কারের সুপারিশ দিয়ে আসছে। তারা বারবার বলেছে, বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করতে হবে, অপচয় কমাতে হবে, অযৌক্তিক চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ব্যয় হ্রাস ও কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে মূল্য সমন্বয়কেই এখনো প্রধান সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই সংকট থেকে বের হতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে বৈষম্যহীন বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, জমি অধিগ্রহণনির্ভর বৃহৎ প্রকল্পের পরিবর্তে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ, অনুৎপাদনশীল জমিতে সৌর প্রকল্প এবং বায়ুবিদ্যুতের ওপর জোর দিতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বড় করপোরেটনির্ভর না করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত মডেলের দিকে এগোতে হবে, যা কর্মসংস্থান ও জ্বালানি গণতন্ত্র উভয়কেই শক্তিশালী করবে।
সবশেষে বলতে হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে শুধু ব্যবসা বা মুনাফার খাত হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই জ্বালানি নীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে ভোক্তার স্বার্থ, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহি। অন্যথায় আইন বদলাবে, সরকার বদলাবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাখ্যাও বদলাবে; কিন্তু সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলের বোঝা ও ভোগান্তির গল্প একই থেকে যাবে।
লেখক: প্রকল্প ব্যবস্থাপক, এনার্জি ট্রানজিশন, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ ব্যয়, নীতিগত দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা এবং ভোক্তাবিরোধী সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করছে। সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক অঙ্গীকার বদলেছে, আইনের ভাষা বদলেছে—কিন্তু সাধারণ ভোক্তার বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি। বরং প্রতিবারের মতো সংকটের দায় আবারও শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই এসে পড়ছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফার ১৮তম দফায় শিল্প, বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সকল ‘কালাকানুন’ বাতিল করা হবে এবং জনস্বার্থবিরোধী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে চলমান দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। একইসঙ্গে আমদানি-নির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে বের হয়ে নবায়নযোগ্য ও মিশ্র জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথাও বলা হয়েছিল।
এই প্রতিশ্রুতিগুলো নিঃসন্দেহে জনমনে আশার সঞ্চার করেছিল। কারণ বিগত এক যুগে বিদ্যুৎ খাতে দায়মুক্তি আইনের আড়ালে যে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার চাপ বহন করেছে দেশের সাধারণ মানুষ। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে এবং সেই আর্থিক বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বিদ্যুৎ বিলের মধ্য দিয়েই আদায় করা হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০১০ সালের বহুল সমালোচিত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ রহিত করার উদ্যোগ নেয়। প্রথম দৃষ্টিতে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ মনে হলেও বাস্তবে অধ্যাদেশে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়, যা মূলত পুরোনো ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই বহাল রাখে।
অধ্যাদেশের ২(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আইন রহিত হওয়ার আগে ওই আইনের আওতায় সম্পাদিত চুক্তি বা গৃহীত ব্যবস্থা বৈধ হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে ২(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ওই আইনের আওতায় চলমান কার্যক্রম এমনভাবে অব্যাহত থাকবে যেন আইনটি রহিতই হয়নি।
অর্থাৎ যে আইনের মাধ্যমে দায়মুক্তি, অস্বচ্ছতা এবং বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেই কাঠামোর বাস্তব কার্যকারিতা এখনো বহাল রয়েছে। ফলে আইন বাতিল হলেও তার মূল সুবিধাভোগী কাঠামো অক্ষত রয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে—দায়মুক্তির সংস্কৃতি কি সত্যিই শেষ হয়েছে, নাকি কেবল আইনের নাম ও ভাষা বদলেছে?
এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পর। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য ১ টাকা ৫২ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। একইসঙ্গে পাইকারি পর্যায়ে মূল্য প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং সঞ্চালন মাশুলও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এই মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কিন্তু গণশুনানিতে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পোদ্যোক্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ভোক্তা অধিকারকর্মীরা এই যুক্তির সঙ্গে একমত হননি। তাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, পরিকল্পনাগত দুর্বলতা, উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন চুক্তি, সিস্টেম লস, অপচয় এবং নানা ধরনের অস্বচ্ছ ব্যয়ের দায় সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ফলেই বারবার মূল্যবৃদ্ধির আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিইআরসি কি তার সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে? কারণ একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্ব শুধু ব্যয় সমন্বয় করা নয়; বরং উৎপাদক, সরবরাহকারী এবং ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ন্যায্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে বিইআরসিই একমাত্র নিয়ন্ত্রক সংস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য এখানে বিদ্যমান। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা বিতরণ কোম্পানিগুলো মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব দিলে তা নিয়ে গণশুনানি হয়, কমিশন শুনানি গ্রহণ করে এবং সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু ভোক্তাদের পক্ষ থেকে মূল্য হ্রাস, ব্যয় সংকোচন বা বিকল্প নীতির প্রস্তাব এলে সেগুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়ে শুনানি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকর প্রক্রিয়া বাস্তবে অনুপস্থিত।
অর্থাৎ একজন ভোক্তা যদি সিস্টেম লস কমানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, অযৌক্তিক চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি অথবা উৎপাদন ব্যয় কমানোর অন্য কোনো বাস্তবসম্মত প্রস্তাব দেন, তাহলে সেই প্রস্তাব মূল্যবৃদ্ধির আবেদনের মতো সমান গুরুত্ব পায় না। এটি শুধু একটি প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা নয়; বরং জ্বালানি সুবিচার ও অংশগ্রহণমূলক শাসনের প্রশ্ন।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের পক্ষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য কমানোর নানা প্রস্তাব ও সংস্কারের সুপারিশ দিয়ে আসছে। তারা বারবার বলেছে, বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করতে হবে, অপচয় কমাতে হবে, অযৌক্তিক চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ব্যয় হ্রাস ও কাঠামোগত সংস্কারের পরিবর্তে মূল্য সমন্বয়কেই এখনো প্রধান সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই সংকট থেকে বের হতে হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নে বৈষম্যহীন বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, জমি অধিগ্রহণনির্ভর বৃহৎ প্রকল্পের পরিবর্তে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ, অনুৎপাদনশীল জমিতে সৌর প্রকল্প এবং বায়ুবিদ্যুতের ওপর জোর দিতে হবে। চতুর্থত, বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বড় করপোরেটনির্ভর না করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত মডেলের দিকে এগোতে হবে, যা কর্মসংস্থান ও জ্বালানি গণতন্ত্র উভয়কেই শক্তিশালী করবে।
সবশেষে বলতে হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে শুধু ব্যবসা বা মুনাফার খাত হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই জ্বালানি নীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে ভোক্তার স্বার্থ, স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহি। অন্যথায় আইন বদলাবে, সরকার বদলাবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাখ্যাও বদলাবে; কিন্তু সাধারণ মানুষের বিদ্যুৎ বিলের বোঝা ও ভোগান্তির গল্প একই থেকে যাবে।
লেখক: প্রকল্প ব্যবস্থাপক, এনার্জি ট্রানজিশন, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)

১৬ জুন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসে একটি কালো দিন। ১৯৭৫ সালের এ দিনটিতে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তৎকালীন বাকশাল সরকার চারটি পত্রিকা সরকারি ব্যবস্থাপনায় রেখে বাকি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়। এতে হাজারো সাংবাদিকসহ গণমাধ্যমকর্মী রাতারাতি বেকার হয়ে দুঃসহ জীবনে পতিত হন।
৪ ঘণ্টা আগে
নয়াদিল্লির যন্তরমন্তরে শনিবার এক অভিনব প্রতিবাদ দেখল ভারত। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র ডাকা বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা তেলাপোকার মুখোশ পরে রাস্তায় নামেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান-সহ একাধিক নেতার পদত্যাগের দাবিতে। এই দৃশ্যকে ঘিরেই সরব হয়েছে রাজনৈতিক মহল।
১৮ ঘণ্টা আগে
বেসরকারি খাতের সবচেয়ে সফল ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে আওয়ামী লীগ শাসনামলে কী ঘটেছিল, সেটা সবার জানা। অন্তর্বর্তী শাসনামলে ইসলামী ব্যাংকসহ কিছু ব্যাংক রক্ষায় উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত সরকার এলে খাতটিতে আস্থা জাগানোর পদক্ষেপ আরও জোরালো করা হবে।
২১ ঘণ্টা আগে
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, আধুনিক যুদ্ধগুলো কেবল ভূখণ্ড দখলের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে একে অপরকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার এক দীর্ঘমেয়াদি ও নির্মম খেলা। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত সম্প্রতি দেড় হাজারতম দিন অতিক্রম করেছে—যা স্থায়িত্বের দিক থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মোট সময়সীমাকেও ছাড়
১ দিন আগে