বলা যায় প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য গ্রামে ফিরে যাওয়াটা আমাদের সমাজে এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, দেশের বড় শহরগুলোয়ও যারা কাজের তাগিদে বসবাস করেন, ঈদ এলেই তারা রওনা হন গ্রামের বাড়ির পথে। মূলত উদ্দেশ্য থাকে প্রিয়জন, নিকটাত্মীয় এবং গ্রামের মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা। এই সময়ে শুধু দূরে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই নয়, দেখা-সাক্ষাৎ হয় শৈশবের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও। ঈদ ঘিরে স্কুল-কলেজভিত্তিক রিইউনিয়নের আয়োজনও এখন চোখে পড়ার মতো। বলা বাহুল্য, ঈদকেই কেন্দ্র করে বহু বছর পর হলেও মানুষ একত্র হয়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন নবায়ন হয়, সম্পর্কগুলো নতুন করে উষ্ণতা পায়– এটা ঈদের অন্যতম সৌন্দর্য। এসব বিবেচনায় গ্রামে ফেরার এই প্রবণতাকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হয়।
দেশের জনসংখ্যা এখন ২০ কোটির কাছাকাছি। এর মধ্যে দুই থেকে তিন কোটির মতো মানুষ বাস করেন রাজধানীতে। ঈদ উপলক্ষে এদের একটি বড় অংশ একসঙ্গে ফিরে যান গ্রামে। প্রশ্ন হলো, তিন-চারদিনের মধ্যে যত মানুষ গ্রামে যান, যানবাহনের সংখ্যা কি সেই তুলনায় যথেষ্ট? বাস্তবতা হলো, একেবারেই নয়। ফলে ঈদের আগে-পরে সড়কপথ, নৌপথ ও রেলপথে সৃষ্টি হয় যাত্রীর প্রচণ্ড চাপ। আর এ ধারা বিদ্যমান থাকে টানা কয়েক দিন। যানবাহনে যাত্রীর বাড়তি চাপ থেকেই তৈরি হয় ঝুঁকি। বস্তুত এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করেই মানুষ ছুটতে থাকেন গ্রামের দিকে। এ পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিবারই দেখা যায়, টিকিট না পাওয়া যাত্রীরাও যানবাহনে ওঠার চেষ্টা করে ঝুঁকি নিয়ে। কেউ লঞ্চে ওঠেন অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে; বাস কিংবা ট্রেনের ছাদে চড়ে গ্রামে ফেরার উদাহরণও দৃষ্টিগোচর হয় অহরহ। দুঃখজনক হলো, বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে এটাকে আবার মহিমান্বিত করা হয় ‘শেকড়ের টান’ হিসেবে।
এই ‘শেকড়ের টানে’ ফেরা যে শুধু নগর কিংবা শহরবাসীর পক্ষ থেকেই হয়, তা নয়। দেখা যায়, অনেক সময় তাদের প্রতি এক ধরনের চাপ থাকে গ্রামে বসবাসরত স্বজনদের থেকেও। গত বছরই এক সহকর্মীর কাছে শুনেছি, টানা এগার দিনের ছুটিতে বাড়ি যেতে না পারায় আত্মহত্যায় উদ্যত হয়েছিলেন গ্রামে থাকা তার স্ত্রী। পরে পরোক্ষভাবে জেনেছি, স্বামী ঈদে বাড়ি না ফেরায় আশপাশের মানুষদের থেকে তাকেও এমন কটু কথা শুনতে হয়েছিল, যে কারণে মৃত্যুই তার কাছে মনে হয়েছিল মর্যাদাকর! আমাদের সমাজে এমন উদাহরণ যে তৈরি হচ্ছে, ঈদ ঘিরে ‘শেকড়ের টানে’ গ্রামে ফেরাকে মহিমান্বিত করাও কি এর অন্যতম কারণ নয়?
এবারের ঈদে সদরঘাটে একটি মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা দেখেছি আমরা। সড়ক দুর্ঘটনাও ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, অনেক যাত্রী ঝুঁকি নিয়ে উঠছেন ট্রেনের ছাদে। প্রত্যেক ঈদে দেখতে দেখতে এমন দৃশ্য এখন অনেকটাই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক। তবে এটা মনে রাখা দরকার, এসব দৃশ্য কোনোভাবেই ইতিবাচক প্রবণতার পরিচয় দেয় না। কারণ প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের আনন্দ কখনোই জীবনের মূল্যের চেয়ে বেশি হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ সত্যটি ভুলে যাই।
বহুল প্রচলিত কথাটি মনে রাখা দরকার—একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, যিনি ঢাকা বা জেলা শহরে থেকে উপার্জন করেন, অনেক ক্ষেত্রে তার আয়ের ওপরই নির্ভরশীল থাকে পুরো পরিবার। তিনি যদি দুর্ঘটনায় আহত হন বা প্রাণ হারান, তাহলে সেই পরিবার পড়ে যায় দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তিতে। উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে পরিবারের ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ে অনিশ্চিত। আর যদি তিনি মারাত্মক আহত হয়ে বেঁচে থাকেনও, তার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে এও দেখা যায়, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির কাজের সক্ষমতা আগের মতো থাকে না। ফলে পুরো পরিবার নিমজ্জিত হয় এক গভীর সংকটে, যার সমাধান সম্ভব হয় না সহজে।
অতিরিক্ত হিসেবে যানবাহনে ওঠা যাত্রী শুধু নিজেকে নয়, ঝুঁকিতে ফেলেন অন্যদেরও। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য সংশ্লিষ্ট পরিবহনকে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮তে রাখা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে যিনি পরিবহনে উঠছেন, তার কোনো শাস্তির বিধান জানা নেই।
এসব বাস্তবতায় আমাদের একটি সত্য উপলব্ধি করতে হবে, ঈদের আনন্দ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু জীবনের মূল্য তার চেয়েও অনেক বেশি। ঈদে আমরা গ্রামে ফিরব। মিলিত হব প্রিয়জনদের সঙ্গে। কিন্তু সেই যাত্রায় যেন আমরা নিজের জীবনকে না ফেলি ঝুঁকির মধ্যে। এটা ঠিক, প্রতিটি প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। কার মৃত্যু কখন, কোথায়, কীভাবে হবে—কেউ জানে না। এও মনে রাখতে হবে, জীবন সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বড় আমানত। এই আমানত রক্ষার দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। ঈদের আনন্দের আবেগে যেন আমরা এই দায়িত্ব ভুলে না যাই। আমরা নিজেরা যদি সচেতন হই, তাহলে ঈদ মৌসুমে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে।
ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধে সরকারি প্রচারণা লক্ষণীয়। তবুও মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা থেকে প্রশ্ন ওঠে—কীভাবে তাদের নিবৃত্ত করা যাবে এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে? এজন্য নীতিনির্ধারকরা নিচের সুপারিশগুলো রাখতে পারেন বিবেচনায়।
প্রথমত, দুর্ঘটনার ভয়াবহতা স্পষ্টভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে ব্যাপক প্রচারের উদ্যোগ নিতে হবে। কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটে, কেন ঘটে এবং এর ফলে সংশ্লিষ্টদের পরিবারগুলো কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এসবের বাস্তব চিত্র, প্রতিবেদন ও ক্ষেত্রবিশেষে ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার প্রচার করা যেতে পারে। সংবাদমাধ্যম এ ক্ষেত্রে রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সচেতনতা শুধু আনুষ্ঠানিক বার্তায় সীমাবদ্ধ না রেখে আবেগ ও বাস্তবতার সংমিশ্রণে তুলে ধরতে হবে, যাতে মানুষ বিষয়টি উপলব্ধি করে হৃদয় দিয়ে।
দ্বিতীয়ত, ঈদের ছুটি যত দীর্ঘ হোক, সেটা যাত্রার সিদ্ধান্তকে খুব বেশি প্রভাবিত করে বলে মনে হয় না। আমাদের যেহেতু যানবাহন ও অবকাঠামোতগত সংকট রয়েছে, এজন্য এ উৎসব ঘিরে ছুটি অনুমোদনের বিষয়টি প্রয়োজনভিত্তিক করা যেতে পারে। কর্মক্ষেত্রগুলোয় পরিকল্পিত ছুটি ব্যবস্থাপনা এক্ষেত্রে হতে পারে বিশেষভাবে সহায়ক। তবে বিশেষ প্রয়োজনে উৎসব ঘিরে কারও মানবিক আবেদন যেন উপেক্ষিত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, যাদের কর্মক্ষেত্রে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা নেই, তারা চাইলে গ্রামে যেতে পারেন আগেভাগে; যে সময়ে সড়ক ও যানবাহনে চাপ তুলনামূলক কম থাকে। এতে রমজানের শেষ সপ্তাহে চাপ কিছুটা হলেও কমানো যেতে পারে। গ্রামে যেতে ইচ্ছুকরা যাতে বাধ্য হয়েই আগে যান, এ ব্যাপারে নীতি প্রণয়ন করা যায় কিনা, সেটিও ভেবে দেখা যেতে পারে।
চতুর্থত, মানুষ যাতে এ সময় ব্যাপকভাবে গ্রামে না গিয়ে নগরীতে কিংবা তাদের কর্মস্থলে থেকে যায়, এ ব্যাপারে উৎসাহ জোগানোর জন্য কিছু প্রণোদনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যেমন ঈদের সময় রাজধানীতে যারা অবস্থান করবেন তাদের জন্য বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া যায় কিনা, তা ভেবে দেখা যায়। আরেকটি বিষয়, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজধানী ছেড়ে যাওয়ায় নগরী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। এতে বাসাবাড়ি ও অফিস-আদালতে চুরির ঝুঁকি বেড়ে যায়। চোরচক্র এ সময় হয়ে ওঠে সক্রিয়। ঘরবাড়ির নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব সবার আগে সংশ্লিষ্ট মালিকের। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে কোনো মহল্লা বা এলাকা ফাঁকা থাকলে অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে স্বভাবতই। তাই রাজধানীতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জনউপস্থিতি বজায় রাখার বিষয়টি নিরাপত্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এ যুক্তিতেও প্রণোদনা জোগানোর বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে।
পঞ্চমত, স্কুল-কলেজগুলো সাধারণত রোজার শুরুতেই ছুটি হয়ে যায়। ফলে অনেকেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগে যাওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু সামাজিকভাবে এমন একটি মনোভাব তৈরি হয়েছে, গ্রামে ফিরতে হবে ঈদের ঠিক আগে। এই মানসিকতারও পরিবর্তন জরুরি। মনে রাখা দরকার, ঈদের ছুটি যেসব কারণে বাড়ানো হয়, তার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করা। কিন্তু মানুষ যদি শেষ সময়ে যাত্রার মানসিকতা ত্যাগ না করে, তাহলে কোনো সরকারি উদ্যোগই কাজে আসবে না। এও ঠিক, কিছু মানুষকে শেষ সময়ে যাত্রা করতে হয় অনেকটা বাধ্য হয়ে। ইচ্ছা থাকলেও এ সময় ছাড়া তাদের যাওয়ার সুযোগ নেই। বস্তুত ঝুঁকি নিয়ে যাত্রার প্রবণতা বেশি দেখা যায় তাদের মধ্যেই। সংশ্লিষ্টরা যাতে চাইলেও ঝুঁকি নিতে না পারে, কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সেটি নিশ্চিত করা দরকার।
অতিরিক্ত হিসেবে যানবাহনে ওঠা যাত্রী শুধু নিজেকে নয়, ঝুঁকিতে ফেলেন অন্যদেরও। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য সংশ্লিষ্ট পরিবহনকে জরিমানা ও কারাদণ্ডের বিধান সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮তে রাখা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী হিসেবে যিনি পরিবহনে উঠছেন, তার কোনো শাস্তির বিধান জানা নেই। পরিস্থিতি বলছে, যদি থেকে না থাকে, সে বিষয়টিও রাখা দরকার বিবেচনায়।
সার্বিকভাবে আমাদের মনে রাখা দরকার, ঈদের আনন্দ যেন কোনোভাবে বিলীন না হয় দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি কিংবা জীবনের বিনিময়ে। এক ঈদে গ্রামে যেতে না পারলে অন্যবার যাওয়ার সুযোগ হয়তো আসবে। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করতে গিয়ে বড় দুর্ঘটনা কিংবা মৃত্যুকেই যদি আলিঙ্গন করতে হয়, তাহলে যাদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য এ যাত্রা, তাদের আনন্দও হারিয়ে যেতে পারে চিরতরে।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা