আবু তাহের খান

কীটনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্স এলএলসির অর্থায়নে মশা মারা শিখতে যুক্তরাষ্ট্র যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কোরপোরেশনের (চসিক) মেয়র ও অন্যরা। ২ জুনের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, উল্লিখিত প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দেননি। চসিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে একই সংবাদে জানা যায়, তারা পৌনে ৪ কোটি টাকার বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) নামের মশার ওষুধ কিনতে যাচ্ছে, যার উৎপাদক উপরোল্লিখিত প্রতিষ্ঠান।
এ রকম একটি সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই তা দেশব্যাপী আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আলোচনার উত্তাপের পারদ থার্মোমিটারের উপরাংশে থাকা অবস্থাতেই প্রকাশিত অপর এক খবর জানাচ্ছে, সড়কবাতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য এ জাতীয় বাতির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিবিএল) অর্থায়নে ফ্রান্স যেতে চাচ্ছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। ধারণা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর অসম্মতির কারণে চসিক মেয়রের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ যেহেতু আটকে গেছে, তাই রাসিক ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটবে।
সে যা-ই হোক, প্রায় একই ধরনের উল্লিখিত দুটি সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় এ নিয়ে হয়তো আলোচনা একটু বেশিই হচ্ছে। ঠিকাদারের অর্থে এ ধরনের বিদেশ ভ্রমণ তো হরহামেশাই হচ্ছে এবং এরই মধ্যে তা বাংলাদেশের দপ্তর সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক আমলা এবং এ ‘অনিয়ম’ জায়েজ করার জন্য যুক্ত করা স্বল্পসংখ্যক রাজনীতিক প্রায় নিয়মিতভাবেই ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর অর্থে বিদেশ ভ্রমণ করছেন। এর মধ্যে খিচুড়ি রান্না, মোবাইল টয়লেট ব্যবহার, লিফট চালানো, মাছ ধরা, পুকুর খনন, ইংরেজি কথোপকথন, সিইটিপির ব্যবহার ইত্যাদি শেখার মতো কাজে বিদেশ সফরের কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও অধিকাংশই অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে। আর অপ্রকাশিত ঘটনার সংখ্যা এতোই বিশাল যে প্রথম শ্রবণে তা অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে। তবে এ-জাতীয় ঘটনার গত ৫৫ বছরের তথ্য যদি একসঙ্গে করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, এ-সংক্রান্ত দুর্নীতি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ভ্রমণব্যয় নির্বাহে ঠিকাদার কেন বারবার সম্মত হন এবং এটা তার ব্যবসায়িক স্বার্থে কোনোরূপ হানি ঘটায় কিনা? জবাবে প্রথমেই বলা দরকার, স্থানীয় বা বিদেশি কোনো ঠিকাদার কখনো পকেটের পয়সা খরচ করে কাউকে বিদেশ পাঠাবেন, এমনটি ভাবা অবান্তর। কারণ, ঠিকাদারি তাদের কোনো দাতব্য উদ্যোগ নয়; এটি মুনাফাভিত্তিক পেশা। সুতরাং মুনাফাই এ ক্ষেত্রে তাদের মূল বিবেচ্য। তাহলে যে দুটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম নগরপালের দলকে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাজশাহী নগরপালের দলকে ফ্রান্স পাঠাতে চাচ্ছে, তার কারণ কী? কিংবা গত ৫৫ বছরে এরূপ শত শত ঠিকাদার যে দেশের হাজার হাজার আমলা ও রাজনীতিকের জন্য বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছেন, তার রহস্য কি? রহস্য আর কিছুই না– উভয় পক্ষের সমঝোতাভিত্তিক সম্মিলিত দুর্নীতি।
তাহলে দেখা যাক, এ ধরনের দুর্নীতি কীভাবে ঘটে। তবে স্বল্প পরিসরে এর সবকিছু হয়তো তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে এ নিবন্ধ থেকে মোদ্দা বিষয়গুলো আঁচ করা সম্ভব হবে বলে মনে করি, যার কিছু আবার অনেকে আগে থেকেই জানেন।
উল্লিখিত বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টে সংশ্লিষ্ট আমলা ও রাজনীতিকদেরই মূল উপকারভোগী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ঠিকাদাররাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুফল ভোগ করে থাকেন। এ জাতীয় ভ্রমণের পেছনে কিছু অর্থ ব্যয় করে এর বিপরীতে তারা সরবরাহকৃত পণ্য বা সেবার দাম বহুলাংশে বাড়িয়ে নিজেদের মুনাফা বাড়িয়ে নেন, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকে। আর ঠিকাদারদের চাপিয়ে দেওয়া মূল্যের কারণে জনগণকে উক্ত পণ্য বা সেবা যৌক্তিক দামের চেয়ে বেশি দিয়ে ক্রয় করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ঠিকাদারকে বর্ধিত মূল্য পরিশোধের কারণে রাষ্ট্রের যে আর্থিক ক্ষতি হয়, সেটি জনগণকেই আবার বাড়তি কর পরিশোধের মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের হাতে ভিন্ন কৌশলও রয়েছে, যা মূল পণ্যের দাম না বাড়িয়েও তাদের লাভবান করে। সে ক্ষেত্রে দাম হয়তো তারা ঠিকই রাখলেন, কিন্তু অন্যান্য শর্ত নিয়ে গেলেন নিজেদের পক্ষে। যেসবের মধ্যে রয়েছে বিলম্বে পণ্য সরবরাহ, পণ্যের মডেল ও উৎপাদন তারিখ পশ্চাৎবর্তী হওয়া, অগ্রিম মূল্য পরিশোধের অংক বাড়িয়ে নেওয়া ইত্যাদি। এর বাইরেও রয়েছে সমঝোতাভিত্তিক কারসাজি। সরবরাহকারী হয়তো নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে দিলেন, যে ক্ষেত্রে ঠিকাদারের পয়সায় বিদেশ ঘুরে আসারা ‘মানসম্মত’ বলে মতামত দিতে বাধ্য হন।
আর এভাবেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের সামান্য কয়েকদিনের বিদেশ সফরে দেশ ও জনগণকে বহন করতে হয় বিপুল আর্থিক ক্ষতি। পরে তা মেটানোর জন্য বহন করতে হয় বিরাট করদণ্ডের বোঝা, যা সত্যি অমানবিক।
সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের মেয়রকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি না দিয়ে নিঃসন্দেহে ভালো কাজ করেছেন এবং তা দেখে অন্যেরা খানিকটা হলেও সতর্ক হবেন। কিন্তু এমন অনাচার স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে কি? মনে তো হয় না। কারণ আমলাতান্ত্রিক বুদ্ধি ও কৌশলের কাছে রাজনীতিকদের পক্ষে পেরে ওঠা সত্যি কঠিন। এ ধরনের দুর্নীতিযুক্ত বিদেশ ভ্রমণের খবর মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে বলা হয়, ‘এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হচ্ছে না’। রাজনীতিকসহ সবাই তখন নিঃশব্দে তা মেনে নেন। অথচ এ ধরনের বক্তব্য পুরোপুরি শঠতাপূর্ণ। এতে সরাসরি রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় না হলেও এ ধরনের সমঝোতা কৌশলে পণ্য বা সেবার মূল্য যে বেশি হাঁকানো হচ্ছে কিংবা নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে রাষ্ট্রকে যে ঠকানো হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কী?
প্রসঙ্গত বলি, ঠিকাদারের পয়সায় বিদেশ ভ্রমণের মতোই অনুরূপ দুর্নীতি হচ্ছে দাতাদের পয়সায় বিদেশ ভ্রমণ। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট এমন একটি প্রকল্পও সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার আওতায় বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এই ভ্রমণগুলোর প্রতিটিই কি জরুরি? মোটেও না। অথচ প্রশ্ন করলে জবাব মিলবে, এসব বিদেশ ভ্রমণ বাংলাদেশ সরকারের অর্থে হচ্ছে না। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা হয়, দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আয়োজিত এসব ভ্রমণের অর্থ কে ফেরত দেবে, বাংলাদেশ ও তার জনগণ নয় কি? তাহলে এসব বিদেশ ভ্রমণ বাংলাদেশের অর্থে হচ্ছে না, এ বক্তব্য কি সঠিক?
আরও বলা প্রয়োজন, দরপত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রাক-বৈদেশিক ভ্রমণ সরাসরি ভূমিকা রেখে থাকে, যা একইসঙ্গে প্রত্যক্ষ দুর্নীতিও। ওই যে মশার ওষুধ কিংবা সড়কবাতি কেনার আগেই ঠিকাদাররা সংশ্লিষ্টদের যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, তা দরপত্র বাছাইতে টিকে যাওয়ার জন্য নয় কি? দেশে তো ক্ষণে ক্ষণে কত তদন্তই হয়, যার কিছু উদ্দেশ্যপূর্ণও। আবার অনেক তদন্ত শুরু হয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে থেমেও যায়। এ অবস্থায় বিনীতভাবে একটি প্রস্তাব করতে চাই—গত ৫৫ বছরে ঠিকাদার ও দাতাদের অর্থে মোট কয়টি বিদেশ ভ্রমণ হয়েছে, তার তদন্ত নয়—শুধু একটি তালিকা করা হোক, যা দেখে জনগণ বুঝতে পারবে তাদের কল্যাণের নামে এ দেশের আমলা ও রাজনীতিকরা এ পর্যন্ত কী পরিমাণ অর্থ অপচয় বা প্রকৃত অর্থে আত্মসাৎ করেছেন?
শেষ প্রশ্ন, ঠিকাদার বা দাতাদের অর্থে অপ্রয়োজনীয় এসব বিদেশ ভ্রমণ কি সহসা বন্ধ হবে? প্রধানমন্ত্রী যখন একটি ভ্রমণ অন্তত বন্ধ করেছেন, তাহলে সাহস করে বাকিগুলো বন্ধ করতে বাধা কোথায়? এ ক্ষেত্রে আমরা সাহসী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলাম।
আবু তাহের খান: আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক

কীটনাশক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্স এলএলসির অর্থায়নে মশা মারা শিখতে যুক্তরাষ্ট্র যেতে চেয়েছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কোরপোরেশনের (চসিক) মেয়র ও অন্যরা। ২ জুনের দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, উল্লিখিত প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দেননি। চসিক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে একই সংবাদে জানা যায়, তারা পৌনে ৪ কোটি টাকার বাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) নামের মশার ওষুধ কিনতে যাচ্ছে, যার উৎপাদক উপরোল্লিখিত প্রতিষ্ঠান।
এ রকম একটি সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই তা দেশব্যাপী আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। আলোচনার উত্তাপের পারদ থার্মোমিটারের উপরাংশে থাকা অবস্থাতেই প্রকাশিত অপর এক খবর জানাচ্ছে, সড়কবাতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য এ জাতীয় বাতির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিগনিফাই বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিবিএল) অর্থায়নে ফ্রান্স যেতে চাচ্ছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। ধারণা করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর অসম্মতির কারণে চসিক মেয়রের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ যেহেতু আটকে গেছে, তাই রাসিক ক্ষেত্রেও হয়তো একই ঘটনা ঘটবে।
সে যা-ই হোক, প্রায় একই ধরনের উল্লিখিত দুটি সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় এ নিয়ে হয়তো আলোচনা একটু বেশিই হচ্ছে। ঠিকাদারের অর্থে এ ধরনের বিদেশ ভ্রমণ তো হরহামেশাই হচ্ছে এবং এরই মধ্যে তা বাংলাদেশের দপ্তর সংস্কৃতির স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠেছে। প্রতিবছরই বিপুলসংখ্যক আমলা এবং এ ‘অনিয়ম’ জায়েজ করার জন্য যুক্ত করা স্বল্পসংখ্যক রাজনীতিক প্রায় নিয়মিতভাবেই ঠিকাদার বা সরবরাহকারীর অর্থে বিদেশ ভ্রমণ করছেন। এর মধ্যে খিচুড়ি রান্না, মোবাইল টয়লেট ব্যবহার, লিফট চালানো, মাছ ধরা, পুকুর খনন, ইংরেজি কথোপকথন, সিইটিপির ব্যবহার ইত্যাদি শেখার মতো কাজে বিদেশ সফরের কিছু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও অধিকাংশই অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে। আর অপ্রকাশিত ঘটনার সংখ্যা এতোই বিশাল যে প্রথম শ্রবণে তা অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে। তবে এ-জাতীয় ঘটনার গত ৫৫ বছরের তথ্য যদি একসঙ্গে করা যায়, তাহলে দেখা যাবে, এ-সংক্রান্ত দুর্নীতি বাংলাদেশের বহুল আলোচিত দুর্নীতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের ভ্রমণব্যয় নির্বাহে ঠিকাদার কেন বারবার সম্মত হন এবং এটা তার ব্যবসায়িক স্বার্থে কোনোরূপ হানি ঘটায় কিনা? জবাবে প্রথমেই বলা দরকার, স্থানীয় বা বিদেশি কোনো ঠিকাদার কখনো পকেটের পয়সা খরচ করে কাউকে বিদেশ পাঠাবেন, এমনটি ভাবা অবান্তর। কারণ, ঠিকাদারি তাদের কোনো দাতব্য উদ্যোগ নয়; এটি মুনাফাভিত্তিক পেশা। সুতরাং মুনাফাই এ ক্ষেত্রে তাদের মূল বিবেচ্য। তাহলে যে দুটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম নগরপালের দলকে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাজশাহী নগরপালের দলকে ফ্রান্স পাঠাতে চাচ্ছে, তার কারণ কী? কিংবা গত ৫৫ বছরে এরূপ শত শত ঠিকাদার যে দেশের হাজার হাজার আমলা ও রাজনীতিকের জন্য বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছেন, তার রহস্য কি? রহস্য আর কিছুই না– উভয় পক্ষের সমঝোতাভিত্তিক সম্মিলিত দুর্নীতি।
তাহলে দেখা যাক, এ ধরনের দুর্নীতি কীভাবে ঘটে। তবে স্বল্প পরিসরে এর সবকিছু হয়তো তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবে এ নিবন্ধ থেকে মোদ্দা বিষয়গুলো আঁচ করা সম্ভব হবে বলে মনে করি, যার কিছু আবার অনেকে আগে থেকেই জানেন।
উল্লিখিত বিদেশ ভ্রমণসংক্রান্ত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টে সংশ্লিষ্ট আমলা ও রাজনীতিকদেরই মূল উপকারভোগী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে ঠিকাদাররাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুফল ভোগ করে থাকেন। এ জাতীয় ভ্রমণের পেছনে কিছু অর্থ ব্যয় করে এর বিপরীতে তারা সরবরাহকৃত পণ্য বা সেবার দাম বহুলাংশে বাড়িয়ে নিজেদের মুনাফা বাড়িয়ে নেন, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকে। আর ঠিকাদারদের চাপিয়ে দেওয়া মূল্যের কারণে জনগণকে উক্ত পণ্য বা সেবা যৌক্তিক দামের চেয়ে বেশি দিয়ে ক্রয় করতে হয়। দ্বিতীয়ত, ঠিকাদারকে বর্ধিত মূল্য পরিশোধের কারণে রাষ্ট্রের যে আর্থিক ক্ষতি হয়, সেটি জনগণকেই আবার বাড়তি কর পরিশোধের মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
এ ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের হাতে ভিন্ন কৌশলও রয়েছে, যা মূল পণ্যের দাম না বাড়িয়েও তাদের লাভবান করে। সে ক্ষেত্রে দাম হয়তো তারা ঠিকই রাখলেন, কিন্তু অন্যান্য শর্ত নিয়ে গেলেন নিজেদের পক্ষে। যেসবের মধ্যে রয়েছে বিলম্বে পণ্য সরবরাহ, পণ্যের মডেল ও উৎপাদন তারিখ পশ্চাৎবর্তী হওয়া, অগ্রিম মূল্য পরিশোধের অংক বাড়িয়ে নেওয়া ইত্যাদি। এর বাইরেও রয়েছে সমঝোতাভিত্তিক কারসাজি। সরবরাহকারী হয়তো নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে দিলেন, যে ক্ষেত্রে ঠিকাদারের পয়সায় বিদেশ ঘুরে আসারা ‘মানসম্মত’ বলে মতামত দিতে বাধ্য হন।
আর এভাবেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের সামান্য কয়েকদিনের বিদেশ সফরে দেশ ও জনগণকে বহন করতে হয় বিপুল আর্থিক ক্ষতি। পরে তা মেটানোর জন্য বহন করতে হয় বিরাট করদণ্ডের বোঝা, যা সত্যি অমানবিক।
সে ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের মেয়রকে বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি না দিয়ে নিঃসন্দেহে ভালো কাজ করেছেন এবং তা দেখে অন্যেরা খানিকটা হলেও সতর্ক হবেন। কিন্তু এমন অনাচার স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে কি? মনে তো হয় না। কারণ আমলাতান্ত্রিক বুদ্ধি ও কৌশলের কাছে রাজনীতিকদের পক্ষে পেরে ওঠা সত্যি কঠিন। এ ধরনের দুর্নীতিযুক্ত বিদেশ ভ্রমণের খবর মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে বলা হয়, ‘এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় হচ্ছে না’। রাজনীতিকসহ সবাই তখন নিঃশব্দে তা মেনে নেন। অথচ এ ধরনের বক্তব্য পুরোপুরি শঠতাপূর্ণ। এতে সরাসরি রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় না হলেও এ ধরনের সমঝোতা কৌশলে পণ্য বা সেবার মূল্য যে বেশি হাঁকানো হচ্ছে কিংবা নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে রাষ্ট্রকে যে ঠকানো হচ্ছে, তার ব্যাখ্যা কী?
প্রসঙ্গত বলি, ঠিকাদারের পয়সায় বিদেশ ভ্রমণের মতোই অনুরূপ দুর্নীতি হচ্ছে দাতাদের পয়সায় বিদেশ ভ্রমণ। বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট এমন একটি প্রকল্পও সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার আওতায় বিদেশ ভ্রমণের ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এই ভ্রমণগুলোর প্রতিটিই কি জরুরি? মোটেও না। অথচ প্রশ্ন করলে জবাব মিলবে, এসব বিদেশ ভ্রমণ বাংলাদেশ সরকারের অর্থে হচ্ছে না। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করা হয়, দাতাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আয়োজিত এসব ভ্রমণের অর্থ কে ফেরত দেবে, বাংলাদেশ ও তার জনগণ নয় কি? তাহলে এসব বিদেশ ভ্রমণ বাংলাদেশের অর্থে হচ্ছে না, এ বক্তব্য কি সঠিক?
আরও বলা প্রয়োজন, দরপত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রাক-বৈদেশিক ভ্রমণ সরাসরি ভূমিকা রেখে থাকে, যা একইসঙ্গে প্রত্যক্ষ দুর্নীতিও। ওই যে মশার ওষুধ কিংবা সড়কবাতি কেনার আগেই ঠিকাদাররা সংশ্লিষ্টদের যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে নিয়ে যেতে চাচ্ছেন, তা দরপত্র বাছাইতে টিকে যাওয়ার জন্য নয় কি? দেশে তো ক্ষণে ক্ষণে কত তদন্তই হয়, যার কিছু উদ্দেশ্যপূর্ণও। আবার অনেক তদন্ত শুরু হয়ে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে থেমেও যায়। এ অবস্থায় বিনীতভাবে একটি প্রস্তাব করতে চাই—গত ৫৫ বছরে ঠিকাদার ও দাতাদের অর্থে মোট কয়টি বিদেশ ভ্রমণ হয়েছে, তার তদন্ত নয়—শুধু একটি তালিকা করা হোক, যা দেখে জনগণ বুঝতে পারবে তাদের কল্যাণের নামে এ দেশের আমলা ও রাজনীতিকরা এ পর্যন্ত কী পরিমাণ অর্থ অপচয় বা প্রকৃত অর্থে আত্মসাৎ করেছেন?
শেষ প্রশ্ন, ঠিকাদার বা দাতাদের অর্থে অপ্রয়োজনীয় এসব বিদেশ ভ্রমণ কি সহসা বন্ধ হবে? প্রধানমন্ত্রী যখন একটি ভ্রমণ অন্তত বন্ধ করেছেন, তাহলে সাহস করে বাকিগুলো বন্ধ করতে বাধা কোথায়? এ ক্ষেত্রে আমরা সাহসী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকলাম।
আবু তাহের খান: আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষক

আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে সীমান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হয়। সীমানার মধ্য দিয়ে দুটি রাষ্ট্রের সীমানাই কেবল নির্ধারিত হয় না, বরং রাষ্ট্রের নাগরিকদের অবাধ চলাচলের সীমারেখা ও নিয়ন্ত্রণের যৌক্তিকতাও নির্ধারিত হয়।
১৪ মিনিট আগে
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি এবার থিম নির্ধারণ করেছে– ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলেছে, গত ১১ বছর ছিল ইতিহাসে উষ্ণতম।
৩ ঘণ্টা আগে
আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বমঞ্চে এবারের সতর্কবার্তা হলো— ‘#NowForClimate’ বা ‘জলবায়ু নিয়ে ভাবার এখনই সময়’। এটি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং বর্তমানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিপজ্জনক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপে
৫ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের পরিবেশ আজ এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এদেশের বিপুল বৈচিত্রময় বনভূমি আজ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি সম্প্রসারণ, নগরায়ন ও সম্পদের আগ্রাসী আহরণের সম্মিলিত চাপে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছে। বনভূমি এখন দেশের মোট ভূখণ্ডের এগারো শতাংশেরও কম, যা অবক্ষয়ের মাত্রা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
৫ ঘণ্টা আগে