মৃত্যুঞ্জয়ী মাহেরীন

‘আমার বাচ্চারা পুড়ে মরছে, আমি কীভাবে সহ্য করি’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ১০: ০৭
মাহেরীন চৌধুরী। ছবি: উইকিপিডিয়া

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু চিরতরে নিভে যাওয়ার আগ মুহূর্তে তারা হয়ে ওঠেন অন্যের জীবনের অনন্ত আলোকবর্তিকা। মৃত্যু তাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারে না। এমনই এক নির্লোভ ও মহীয়সী নারী ছিলেন মাহেরীন চৌধুরী। পেশায় ছিলেন শিক্ষিক, কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে গেছেন—তিনি কেবল শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন এক অসীম মমতাময়ী মা।

বিভীষিকাময় সেই দুপুর
গত বছরের ২১ জুলাই। দুপুর ১টা বেজে ১৮ মিনিট। রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সবেমাত্র ছুটি হয়েছে। অন্য সাধারণ দিনের মতোই বাংলা মাধ্যমের সিনিয়র শিক্ষিকা ও কো-অর্ডিনেটর মাহেরীন চৌধুরী গেটের সামনে দাঁড়িয়ে পরম স্নেহে বাচ্চাদের তুলে দিচ্ছিলেন অভিভাবকদের হাতে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমান বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে স্কুলভবনের ওপর।

বিমানটি বিল্ডিং ভেদ করে মাটির নিচে ঢুকে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। শুরু হয় ভয়াবহ বিস্ফোরণ আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা। প্রাণহানির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৩২ জনে।

সেদিন ৪২ বছর বয়সি শিক্ষিকা মাহেরীন সম্পূর্ণ অক্ষত ছিলেন। চাইলে তিনি নিজেকে বাঁচিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে পারতেন। কিন্তু নিজের প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন আগুনের কুণ্ডলীতে, তাঁর প্রাণপ্রিয় শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে।

আতঙ্কিত শিশুদের একে একে বের করে আনতে থাকেন তিনি। আগুনের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে অন্তত ২০ জনেরও বেশি শিশু শিক্ষার্থীকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন। বাচ্চাদের সাহস জুগিয়ে তিনি বলছিলেন—‘ভয় পেয়ো না, দৌড়াও সামনের দিকে, পেছনে তাকিও না। আমি আছি তোমাদের সঙ্গে।’

শিশুদের বের করার একপর্যায়ে হঠাৎ আরেকটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনের তীব্রতা বেড়ে যায় বহুগুণ। বাচ্চাদের বাঁচাতে গিয়ে এবার নিজেই মারাত্মকভাবে ঝলসে যান মাহেরীন। উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া এক সেনাসদস্য আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম একে একে বাচ্চাগুলো বের করে দিচ্ছিলেন, কিন্তু নিজে আর বের হতে পারেননি।’

‘আমার বাচ্চারা পুড়ে মরছে, আমি কীভাবে সহ্য করি’
অগ্নিদগ্ধ মাহেরীনকে দ্রুত ভর্তি করা হয় ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে। তার শরীরের ১০০ শতাংশই পুড়ে গিয়েছিল। বেঁচে থাকার কোনো আশাই ছিল না। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বারবার বলছিলেন, ‘আমার বুক-পেট সব জ্বলে যাচ্ছে।’

লাইফ সাপোর্টে যাওয়ার আগে স্বামী মনছুর হেলালের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। মনছুর যখন তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কেন এ কাজ করতে গেলে, তোমারও তো দুটি সন্তান আছে?’
উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চারা আমার সামনে সব পুড়ে মারা যাচ্ছে, আমি এটা কীভাবে সহ্য করি!’

২১ জুলাই রাতেই যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই মানুষ গড়ার কারিগর। নীলফামারীর জলঢাকার বগুলাগাড়ি চৌধুরীপাড়ার এক সাহসী সন্তান চিরতরে ঘুমিয়ে পড়েন, রেখে যান চোখের জলে ভাসানো এক বীরত্বের উপাখ্যান।

পরিচয়ের আড়ালে থাকা এক সাদামাটা জীবন
মাহেরীন চৌধুরী কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না; তার ছিল ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিচয়। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি কখনোই সেই পরিচয়ের অহংকার করেননি। তিনি ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাতিজি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চাচাতো বোন।

আমাদের সমাজে যেখানে সামান্য রাজনৈতিক পরিচয় ভাঙিয়ে মানুষ সুবিধা খোঁজে, সেখানে মাহেরীন ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি নির্লোভ ও সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে রেখে তিনি নীরবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

জুলাই-২৪ এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনেও তিনি সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর কোনো রাজনৈতিক ফায়দা না লুটে তিনি নিঃশব্দে ফিরে গিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিক্ষকতা পেশায়।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অশ্রুসিক্ত বিদায়
মাহেরীন চৌধুরীর এই আত্মত্যাগ শুধু দেশের মানুষের হৃদয়কেই নাড়া দেয়নি, ছুঁয়ে গেছে আন্তর্জাতিক মহলকেও। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এই শিক্ষিকার ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছেন, ‘তিনি তার শিক্ষার্থীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন এবং আরও শিক্ষার্থীকে বাঁচাতে সাহসিকতার সঙ্গে ধোঁয়া ও আগুনের মধ্যে ফিরে যান। তার এই অসীম সাহস ভোলা যাবে না।’

তার এক শিক্ষার্থী আবেগঘন কণ্ঠে লিখেছে, ‘শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই শেখান না, শেখান কীভাবে মানুষ হতে হয়। মাহেরীন ম্যাম ছিলেন সেই শিক্ষকদের একজন।’

মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার

সমাজসেবায় গৌরবোজ্জ্বল কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে মাহেরীন চৌধুরীকে। গত ১৬ এপ্রিল ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন মাহেরীনের স্বামী মনসুর হেলাল।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত