বাংলা কিউআর: ঘোষণার ঝলক আর বাস্তবায়নের ফাঁকফোকর

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৬: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

একটি নীতি যত সুন্দর কাগজে লেখা হোক, তার প্রকৃত পরিচয় মেলে রাস্তার ধুলোয়, ফুটপাতের হাঁকডাকে। বাংলা কিউআর নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা শুনে মনে হয়েছিল, এক লহমায় দেশের পুরো লেনদেন ব্যবস্থা আধুনিক হয়ে উঠবে। বাস্তবতা তার চেয়ে জটিল, এবং অনেকাংশে হতাশাজনক।

প্রথম প্রশ্নটি সবচেয়ে সহজ, অথচ সবচেয়ে অস্বস্তিকর। যে দেশে ইন্টারনেট সংযোগ এখনো শহর ও গ্রামের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান তৈরি করে রাখে, সেখানে একটিমাত্র ডিজিটাল মাধ্যমকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের নিজস্ব পরিসংখ্যানই বলছে, দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে। ফুটপাতের এক পুরি বিক্রেতা বা প্রত্যন্ত হাটের ধান ব্যবসায়ী, যাঁর হাতে বাটন ফোন, তাঁর জন্য বাংলা কিউআর কোনো সুযোগ নয়, বরং নতুন এক বাধা। অথচ নীতিনির্ধারকদের ঘোষণায় বারবার শোনা যায় সর্বজনীনতার বুলি, যেন কাগজে-কলমে ঘোষণা দিলেই বাস্তবে সর্বজনীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

দ্বিতীয় সমস্যাটি আরও গভীর। বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআরের একটি ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করেছিল, যাতে ব্যাংক কার্ডের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক পঞ্চাশ শতাংশ ও এমএফএসের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক আশি শতাংশের বেশি নেওয়া না যায়। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় সেই ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়ে সর্বনিম্ন হার এক শতাংশ বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তন নীরবে ঘটেছে, ঢাকঢোল পিটিয়ে নয়।

প্রশ্ন হলো, যে নীতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যয় কমানোর কথা বলে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কীভাবে উল্টো পথে হাঁটল। এই ধরনের নীরব পরিবর্তন নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যেসব ছোট ব্যবসায়ী প্রতিদিনের সামান্য মুনাফা থেকে সংসার চালান, তাঁদের জন্য এক শতাংশ বাড়তি খরচ সামান্য শোনালেও বছর শেষে তা একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্কে দাঁড়ায়।

তৃতীয় সমস্যা নিরাপত্তা প্রশ্নে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডিজিটাল লেনদেনে আশি হাজারের বেশি প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, যাতে খোয়া গেছে প্রায় একশ কোটি টাকা। এমন এক পরিস্থিতিতে, যেখানে প্রতারণা প্রতিরোধের কাঠামো এখনো দুর্বল, সেখানে একটিমাত্র সর্বজনীন কিউআর কোডকে বাধ্যতামূলক করার অর্থ কী দাঁড়ায়। প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেখলে, একক মান বা সিঙ্গেল পয়েন্ট অব ফেইলিওরের ঝুঁকি এখানে উপেক্ষা করা যায় না। যদি কোনো একটি প্রযুক্তিগত দুর্বলতা এই সর্বজনীন ব্যবস্থায় ধরা পড়ে, তার প্রভাব হবে বিচ্ছিন্ন একাধিক ব্যবস্থার তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক। অথচ সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ঘোষণার সময় তেমন গুরুত্ব পায়নি।

বাংলা কিউআরের কেন্দ্রীভূত অবকাঠামো তত্ত্বগতভাবে সব প্রতিষ্ঠানকে সমান সুযোগ দেওয়ার কথা বললেও, বাস্তবে বাজারের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রথম সুবিধা নিতে পারে, কারণ তাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও গ্রাহক সংখ্যা ইতিমধ্যে অনেক এগিয়ে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলনা করলে বাংলাদেশের প্রস্তুতির ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়। ভারতের ইউপিআই যখন চালু হয়েছিল, তার আগে বছরের পর বছর ধরে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, ব্যাংক ও অর্থপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করা হয়েছিল ধাপে ধাপে। ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ পাইলট পর্যায় পার হয়েই বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশে বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রে সেই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি পাইলট পরীক্ষা বা প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ের স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বরং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে বাধ্যতামূলক করার এই তাড়াহুড়ো নীতি বাস্তবায়নের চিরায়ত বাংলাদেশি ধরনকেই যেন আরেকবার প্রতিফলিত করে, আগে ঘোষণা, পরে প্রস্তুতি।

চীনের অভিজ্ঞতা থেকেও একটি সতর্কবার্তা পাওয়া যায়। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন আলিপে ও উইচ্যাট পের মধ্যে আন্তঃকার্যক্ষমতা বাধ্যতামূলক করেছিল, তখন সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছিলেন, এই ধরনের কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা প্রতিযোগিতা কমিয়ে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের পথ প্রশস্ত করে কি না। বাংলাদেশেও একই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। বিকাশের মতো বাজারে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান আর ছোট এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে যে অসম প্রতিযোগিতা বিদ্যমান, বাংলা কিউআরের কেন্দ্রীভূত কাঠামো সেই অসমতাকে আরও গভীর করতে পারে, যদি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ সতর্ক না থাকে।

এখানে একটি তাত্ত্বিক প্রশ্নও তোলা দরকার। অর্থনীতিবিদ ড্যানি রড্রিকের কথা এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য, প্রযুক্তিগত রূপান্তর যখন রাষ্ট্রীয় নির্দেশে চাপিয়ে দেওয়া হয়, বাজারের স্বাভাবিক গ্রহণযোগ্যতার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, তখন তার সামাজিক ব্যয় প্রায়ই দৃশ্যমান হয় অনেক পরে, যখন সংশোধনের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়।

বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং জরিমানার হুমকি দেওয়ার যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা বাজার-নেতৃত্বাধীন রূপান্তরের বদলে রাষ্ট্র-নির্দেশিত জবরদস্তির চরিত্র নিয়ে ফেলেছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শোনা যায়, তাঁরা প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পাননি, প্রশিক্ষণও পাননি পর্যাপ্ত মাত্রায়।

আরেকটি সমালোচনা প্রাসঙ্গিক জবাবদিহিতা প্রশ্নে। বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় লেনদেনের সব তথ্য কেন্দ্রীভূতভাবে সংরক্ষিত হবে ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশের অধীনে। তথ্য সুরক্ষা আইন এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর না হওয়া একটি দেশে এত বিপুল পরিমাণ আর্থিক তথ্যের কেন্দ্রীভবন কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক হওয়া উচিত ছিল। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এই প্রশ্ন তেমন জোরালোভাবে ওঠেনি, যা নিজেই একটি উদ্বেগের বিষয়। রাষ্ট্রীয় নজরদারি সক্ষমতা যেখানে ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে প্রতিটি ছোট লেনদেনের তথ্যও কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষিত হওয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবা দরকার।

চতুর্থ সমস্যা প্রতিযোগিতা ও বাজার কাঠামোর প্রশ্নে। বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবার বাজারে বিকাশের একচ্ছত্র আধিপত্য দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়। প্রতিযোগিতা কমিশনের একাধিক প্রতিবেদনে এই বাজারের অসম কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলা কিউআরের কেন্দ্রীভূত অবকাঠামো তত্ত্বগতভাবে সব প্রতিষ্ঠানকে সমান সুযোগ দেওয়ার কথা বললেও, বাস্তবে বাজারের প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রথম সুবিধা নিতে পারে, কারণ তাদের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও গ্রাহক সংখ্যা ইতিমধ্যে অনেক এগিয়ে। ছোট এমএফএস প্রতিষ্ঠান বা নতুন প্রবেশকারীদের জন্য এই সমান মাঠ কতটা প্রকৃতপক্ষে সমান থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকে যায়। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ যদি সক্রিয়ভাবে বাজারের ভারসাম্য রক্ষায় হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে সর্বজনীনতার নামে চালু হওয়া এই ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত বাজারের অসমতাকেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে ফেলতে পারে।

যে নীতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ব্যয় কমানোর কথা বলে শুরু হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত কীভাবে উল্টো পথে হাঁটল। এই ধরনের নীরব পরিবর্তন নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাবের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। যেসব ছোট ব্যবসায়ী প্রতিদিনের সামান্য মুনাফা থেকে সংসার চালান, তাঁদের জন্য এক শতাংশ বাড়তি খরচ সামান্য শোনালেও বছর শেষে তা একটি উল্লেখযোগ্য অঙ্কে দাঁড়ায়।

পঞ্চম সমস্যা প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার ঘাটতিতে। বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু ব্যাপক জনসচেতনতামূলক প্রচারণা বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে যতটা প্রয়োজন ছিল, ততটা দেখা যায়নি।

ফুটপাতের বিক্রেতা বা মফস্বলের ছোট দোকানির কাছে বাংলা কিউআর সম্পর্কে সম্যক ধারণা পৌঁছানোর আগেই বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে গেছে। ফলাফল, বহু ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে ব্যাংকের শাখায় শাখায় ঘুরছেন, প্রক্রিয়া বুঝতে সময় ব্যয় করছেন, অথচ এই সময়টুকু তাঁদের ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের উচিত ছিল প্রথমে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা, তারপর ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক করার দিকে যাওয়া। উল্টো পথে হাঁটার এই সিদ্ধান্ত নীতি প্রণয়নে দূরদর্শিতার অভাবই প্রকাশ করে।

ষষ্ঠ সমস্যা তুলনামূলক মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতা। বাংলাদেশ ব্যাংক দাবি করেছে, এক শতাংশ ফি ব্যাংক ও ব্যবসায়ীর মধ্যকার বিষয়, গ্রাহকের পকেট থেকে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায়ীরা যদি এই বাড়তি খরচ পণ্যের দামে যুক্ত করে দেন, যা অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটার কথা, তাহলে পরোক্ষভাবে সেই বোঝা গ্রাহকের কাঁধেই এসে পড়বে। এই সহজ অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্বীকার না করে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণায় গ্রাহককে আশ্বস্ত করার চেষ্টা এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। মূল্য হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া নিয়ে স্বাধীন গবেষণা প্রকাশ্যে না এলে প্রকৃত চিত্র কখনোই স্পষ্ট হবে না।

সপ্তম সমস্যা তুলনামূলক আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের বড় বিপণিবিতানে বাংলা কিউআর বাস্তবায়ন করা তুলনামূলক সহজ, কারণ সেখানে ব্যাংক শাখা, প্রযুক্তি সহায়তা ও গ্রাহক সচেতনতা সবই তুলনামূলক উন্নত। কিন্তু হাওর অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম বা উপকূলীয় এলাকার ছোট বাজারে একই সময়সীমার মধ্যে একই বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।

একক সময়সীমা নির্ধারণ করে সারা দেশে একই নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার এই কেন্দ্রীভূত নীতি প্রণয়নের ধরন বাংলাদেশের আঞ্চলিক বৈচিত্র্য ও অসম উন্নয়নের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে।

সবশেষে বলা দরকার, ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক লক্ষ্য। কিন্তু লক্ষ্যের মহিমা দিয়ে বাস্তবায়নের ত্রুটি ঢেকে রাখা যায় না। বাংলা কিউআরের প্রকৃত পরীক্ষা হবে আগামী কয়েক মাসে, যখন প্রাথমিক উচ্ছ্বাস স্তিমিত হয়ে আসবে, আর প্রশ্ন উঠবে, প্রান্তিক ব্যবসায়ী কি সত্যিই উপকৃত হয়েছেন, নাকি কেবল বাড়তি একটি বাধ্যবাধকতার বোঝা বহন করছেন। সেই প্রশ্নের সৎ উত্তর খোঁজার সাহস নীতিনির্ধারকদের দেখাতে হবে, আত্মপ্রশংসার আড়ালে সমস্যা লুকিয়ে রাখলে চলবে না।

  • এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত