হাঙর সংরক্ষণে আমরা কতটা সচেতন

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৪২
হাঙর। ছবি: সংগৃহীত

হাঙর শব্দটি শব্দটি শুনলেই আমরা অনেকে ভীত হয়ে পড়ি। এই ভীতির কারণ অবশ্য রয়েছে। হাঙর নিয়ে ভৌতিক সিনেমা তো কম দেখা হয়নি। বিশ্বে ১৮০ টির মতো চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে হাঙর নিয়ে। এর মধ্যে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘জস’ মনে হয় দেখেনি এমন কেউ নেই।

১৯৭৫ সালে নির্মিত জস চলচ্চিত্রটি সারা বিশ্বেই বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া দ্য শ্যালোজ, দ্য মেগ এরকম অনেক চলচ্চিত্রই নির্মিত হয়েছে হাঙর নিয়ে। এগুলো তো বিদেশি চলচ্চিত্র। প্রেক্ষাপট দেশের বাইরের। কিন্তু একবার ভাবুন বাংলাদেশের হাঙর নিয়ে। অনেকেই ভ্রু কুচকাবেন। বাংলাদেশে আবার হাঙর আছে? একটি তথ্য জেনে অবাক হবেন, বাংলাদেশ বিশ্বের ১২তম হাঙরের পাখনা রপ্তানিকারক দেশ। ২০২৩ সালে ওয়াইল্ড লাইফ কনসারভেশন সোসাইটির তথ্য মতে, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২ হাজার ২৯৬ টন হাঙরের পাখনা ও মাংস শুকিয়ে রপ্তানি করা হয়েছে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও হাঙর ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায়। ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় ১৫০ কেজি ওজনের একটি হাঙর ধরা পড়েছিল জেলেদের জালে। এটি লম্বায় ছিল ৭ ফিট। সুন্দরবনে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২২ জন জেলেকে আটক করা হয়েছিল, যাদের কাছ থেকে ৪০০ কেজি ওজনের রে মাছ পাওয়া গিয়েছিল।

এই ভয় ধরানো হাঙর মাছটি কিন্তু শক্ত হাড় দিয়ে তৈরি নয়। এটি তরুণাস্থি বা নরম হাড় দিয়ে তৈরি। এদের ৫ থেকে ৭ জোড়া ফুলকা ছিদ্র থাকে। এদের ত্বকে বিশেষ ধরনের আঁশ থাকে যা দেখতে দাঁতের মতো। আরেকটি মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের যেমন দুই পাটি দাঁত থাকে, হাঙরের কিন্তু তেমন নয়। এদের দাঁত কয়েকপাটি করে সাজানো। আর এদের দাঁতও সহজে ক্ষয়ে যায় না।

অনেকেই মনে করেন হাঙরের বোধহয় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে। কেননা এরা অনেক দূর থেকেই রক্তের গন্ধ ও পানির নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে। পৃথিবীতে ৫০০ টিরও বেশি হাঙর প্রজাতি রয়েছে। এরা এতটাই বৈচিত্র্যময় যে কিছু হাঙর আছে হাতের তালুর সমান, আবার কিছু হাঙর আছে প্রায় ১২ মিটার লম্বা। এদেরকে তিমি হাঙর বলে।

বাংলাদেশেও বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ হাঙরের বসবাস রয়েছে। একটি তথ্য মতে, এখানে ২২ পরিবারের ৪৬ প্রজাতির হাঙর শনাক্ত করা হয়েছে। এই প্রজাতিটি বিপদসংকুল হওয়ার পরও অবৈধভাবে পাচার চলছেই। সিঙ্গাপুর, হংকং, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও চীনের মতো দেশগুলোতে হাঙর পাচার হয়। হাঙরের মাংস, চামড়া ও পাখনার বাণিজ্যিক চাহিদা অনেক। মূলত এই কারণেই এই সামুদ্রিক প্রজাতিটি হারিয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, গত ১২ বছরে হাঙরের সংখ্যা অনেক কমেছে।

সম্প্রতি ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশ, বন অধিদপ্তর ও মৎস্য অধিদপ্তর ‘সাগরের অভিভাবক’ শিরোনামে তিনদিনব্যাপী একটি শিক্ষামূলক প্রদর্শনীর আয়োজন করে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে। সেখানেই বলা হয়, হাঙর ও শাপলা পাতা মাছের দুই-তৃতীয়াংশ এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের মতে অতিরিক্ত আহরণ, অবৈধ বাণিজ্য, ও ধীর প্রজনন হারের কারণে এসব প্রজাতির সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০২১) মতে ৫২ প্রজাতির হাঙর ও রে মাছ বিপন্ন হিসেবে তালিকা করা হয়েছে। এই আইনের ৩৯ ধারায় বলা হয়েছে, এই ৫২ প্রজাতির প্রাণী কেউ সংগ্রহ ও বিক্রয় করলে ১ বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা অথবা উভয় সাজার বিধান রয়েছে। পুনরায় একই অপরাধ করলে আরও বেশি সাজা ভোগ করতে হবে।

ব্রাজিলিয়ান জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সাইন্সেস এ প্রকাশিত বিক্রম জিৎ রায়ের লেখা বাংলাদেশে হাঙর ও রে মাছের অবস্থা নিয়ে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক নিবন্ধনের তথ্য মতে, বাংলাদেশে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর এলাকায় ২০০৬ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত করা জরিপ অনুযায়ী ৩টি পরিবারের ১১ প্রজাতির হাঙর পাওয়া যায়। ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশের তথ্য মতে, দেশে ১০ পরিবারের হাঙর ও ১২ পরিবারের রে (শাপলা পাতা) মাছ আছে।

২০১৮ সালের একটি গবেষণা মতে, নোয়াখালি, ভোলা, পটুয়াখালী, খুলনা ও বাগেরহাটে এক ধরনের জাল ব্যবহার করে জেলেরা শাপলাপাতা মাছ ধরে। এই মাছটি মূলত গরীবদের খাবার। কারণ এটি কম দামে বেচা হয়। আর এর চামড়া শুকিয়ে চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মিয়ানমারে রপ্তানি করা হয়। তবে হাঙর বাংলাদেশে খাবার হিসেবে জনপ্রিয় নয়। হাঙরের পাখনা রপ্তানি করা হয়। এছাড়া হাঙরের মাংস, হাড় মিয়ানমারের সীমান্ত ব্যবহার করে চোরাচালানও করা হয় বলে একটি তথ্যে উঠে এসেছে।

৪ মাস আগে পরিবেশ ও প্রকৃতিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মঙ্গাবেতে প্রকাশিত একটি সংবাদ মতে, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হঠাৎ করেই অবৈধভাবে হাঙর ও রে মাছ ধরা বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানকার তথ্য অনুযায়ী হাঙর ও রে মাছের বিভিন্ন অংশ পূর্ব ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি করা হচ্ছে। সংরক্ষণবিদদের মতে, দুর্বল আইনি ব্যবস্থা এবং জেলেদের মধ্যে সচেতনতার অভাব থাকার কারণে এই ধরনের অবৈধ কাজ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবেই পৃথিবীতে প্রতি বছর ১০০ মিলিয়ন হাঙর হত্যা করা হয়।

আমরা শুধু বলি, হাঙর ও রে মাছ সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু কেন এর টিকে থাকা জরুরি এটা আমরা জানি না। আমাদের মনে হয় সিনেমায় দেখা হাঙরের মতো একটা ভয়ংকর মাছের বাঁচিয়ে রাখার দরকার কি? কিন্তু একটু খেয়াল করলে এই বিষয়টা পরিস্কার হবে। হাঙর মাছের সাঁতার কাটার অবস্থান দেখলে বোঝা যাবে যে এরা সমুদ্রের উপরিতলে ঘুরে বেড়ায়। অর্থাৎ সমুদ্রের উপরিস্তরের খাদক। ফলে যে সমস্ত মাছ দুর্বল, অসুস্থ ও বয়োবৃদ্ধ সে সমস্ত মাছকে এরা শিকার করে। ফলে অন্য প্রজাতির টিকে রাখার ক্ষেত্রে এরা সহায়তা করছে।

আবার যদি এভাবে ভাবেন, এরা অসুস্থ মাছদের যেমন খাচ্ছে, তেমনি মৃত ও পচনশীল জলজ প্রাণীদেরও খাচ্ছে। এতে করে সমুদ্রের পরিবেশ পরিষ্কার থাকছে। রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারছে না। হাঙর যেমন সমুদ্রের উপরিস্তরে ঘুরে বেড়ায়, রে মাছ আবার ঘুরে বেড়ায় সমুদ্রের মধ্যমস্তরে। তার মানে সম্রুদরে মধ্যমস্তরের বাস্তুসংস্থান ঠিক রাখতে অর্থাৎ কোন প্রজাতির অতিরিক্ত বংশবিস্তার রোধে সহায়তা করছে। রে মাছ আবার আরেকটি কাজ করে যেটি সমুদ্রের প্রাণীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরা সমুদ্রের তলদেশে বালু-কাদা ওলট-পালট করে। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশে অক্সিজেন চলাচল ও পুষ্টি উপাদান পুনর্ব্যবহারে এরা সাহায্য করছে। এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র সংরক্ষণে এদের ভূমিকা অপরিসীম।

তাই এদের সংরক্ষণে আমাদের সচেতনা বৃদ্ধি জরুরি। প্রথমত প্রয়োজন জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। সমুদ্রতীরবর্তী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এর গুরুত্ব প্রচার করা। আগামী ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক হাঙর সচেতনতা দিবস। এই আন্তর্জাতিক দিবসকে ঘিরে আসুন হাঙরের সংরক্ষণ ও গুরুত্ব প্রচারে সামিল হই। আমরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের হাঙরের পরিচিতি তুলে ধরতে পারি। তথ্যচিত্র দেখাতে পারি। হোটেল বা রেস্তোরাতে হাঙর ও রে মাছ দিয়ে তৈরি খাবার বিক্রি করতে না করতে পারি। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

হাঙরের বংশবৃদ্ধির গতি অতি ধীর। এদের কিছু প্রজাতি ২ বছরে একবার জন্মদান করে। কিন্তু এভাবে হাঙরের হত্যা হয়তো এই প্রজাতিটিকেই বিলুপ্ত করে দেবে। অনেকে দেশে হাঙর অভয়ারণ্য তৈরি করেছে। ২০০৯ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র পালাউ প্রথম হাঙর অভয়ারণ্য ঘোষণা করে। এরপর মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ, বাহামা, ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়াতেও হাঙর অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত কোনো হাঙর অভয়ারণ্য নেই। এই ধরনের উদ্যোগের কথা ভাবতে পারে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এখন থেকেই হাঙর সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

লেখক: পরিবেশবিষয়ক লেখক

Ad 300x250

সম্পর্কিত