বুলবুল সিদ্দিকী

‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরই) চীনের এমন একটি উদ্যোগ যা চীনকে সমগ্র বিশ্বের সাথে যুক্ত রাখছে। চীনের জন্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই উদ্যোগ মূলত চীনের প্রাচীন যোগাযোগ ব্যবস্থারই একটি আধুনিক ও বিস্তৃত রূপ। বর্তমান বিশ্বে তা শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, বরং বিশ্বপরিমণ্ডলে তাঁদের একটি স্বকীয় প্রকল্প হয়ে উঠেছে যার মাধ্যমে চীন মূলত তার মিত্র দেশগুলোর সাথে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করছে।
একইসঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্কও গড়ে তুলেছে। এ নিয়ে অবশ্য বিস্তর সমালোচনা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো, এর মাধ্যমে চীন নতুন ধরনের আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। এমন একটি বাস্তবতা আমরা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রেক্ষাপটেও দেখতে পাই। যেখানে বাংলাদেশ সেই প্রকল্পের একটি অংশীজন।
এর মধ্যে এই অঞ্চলকে ঘিরে আবার আলাপ উঠল বাংলাদেশ-চীন-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর (বিসিআইএমইসি)। এই করিডর প্রতিষ্ঠায় ২০১৩ সালেই এই চারটি দেশ নীতিগতভাবে সম্মত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতির কারণে সেটি আর খুব একটা এগোতে পারেনি। যদিও এই করিডরের আলাপ শুরু হয় মূলত নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে। চীন থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেহেতু জটিল ছিল, সে কারণে সেটিকে সহজ করার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই ছিল এই করিডরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে বিষয়টি নিয়ে আবারও রাষ্ট্রীয় পরিসরে আলোচনা শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ভ্রমণের মাধ্যমে। যদিও চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা বেশ কিছু বছর ধরেই চলমান। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার বিষয় ছিলো—কী করে এই তিনটি দেশের মধ্যে আবারও কার্যকরী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। ওই গবেষণায় আমি নিজেও একজন অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করেছি।
এরই ধারাবাহিকতায় ইউনান প্রদেশের সাথে লাগোয়া মিয়ানমার ও চীনের সীমান্ত এলাকায় আমাদের একাধিকবার যেতে হয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্যে। প্রস্তাবিত এই করিডর চীনের কুনমিং থেকে শুরু করে মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে এবং আর একটি অংশ ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। যদিও এর বিশদ পরিকল্পনা এখনো করা হয়নি।
তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এই যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় অন্তরায় বলে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান এবং এই এলাকার বড় একটি অংশ তাঁদের নিয়ন্ত্রণের থাকায় করিডরের জন্য তারা একটি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার আর্মি রাখাইনের দখল নেওয়ার জন্য এই অঞ্চলে জোরালো হামলা শুরু করেছে। এ কারণে বাংলাদেশে আবারও রোহিঙ্গাদের ঢল নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
যখন আমরা দেখি যে রাষ্ট্রীয় পরিসরে—বিশেষ করে চীনের পক্ষ থেকে এই করিডর বিষয়ে ইতিবাচক প্রস্তাবনা এসেছে, তখন সেটি বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতাও অনেকগুণ বেড়ে যায় বলে মনে হয়। তবে এসব বাস্তবায়ন কাগজে কলমে সহজ বলে মনে হলেও এর পেছনে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। জটিলতা কিংবা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এর নানা ইতিবাচক দিকও আমরা চিহ্নিত করতে পারি।
প্রথমত বিবেচনা করা দরকার করিডরের অর্থনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাবনা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমূল বদলে দিতে পারে। এর সাথে এই এলাকার মানুষজনের জীবনমানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখানে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যেমন রয়েছে, তেমনই বাংলাদেশও এ প্রক্রিয়ায় লাভবান হতে পারে।
চীনের মালাক্কা প্রণালি হয়ে পণ্য আদান-প্রদানের বিপরীতে ‘বে অফ বেঙ্গল’ বা বঙ্গোপসাগর হয়ে পণ্য আদান-প্রদানের এই প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর তাঁদের জন্যে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের আর একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ যেখানে বাংলাদেশকে তার স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। কেবল ভালো সম্পর্ক রাখার জন্যেই কোনো সিদ্ধান্ত যেন বাংলাদেশ না নেয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। কেননা এর নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিবাচক হলেও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যেন এটি চীনের ওপর আমাদের অধিক নির্ভরশীল করে না ফেলে। ইতিমধ্যেই আমরা জানি, বাংলাদেশের সাথে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক। চীনের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও আমরা ঘাটতি কমাতে পারছি না। তাই বাণিজ্য ভারসাম্যের দিকেও বাংলাদেশকে নজর রাখতে হবে। এর সকল সুবিধা যেন বাংলাদেশ নিতে পারে সেদিকেও একটি প্রায়োগিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রাখতে হবে।
আমাদের ভাবা দরকার—এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশের খরচ কীভাবে মেটানো হবে, অথবা এখানে ঋণ বা বিনিয়োগের কোনো বিষয় জড়িত থাকবে কিনা; যদি থাকে, তাহলে সেগুলো কীভাবে যুক্ত থাকবে। সতর্কভাবে আমাদের এসব বিষয় নিয়ে বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্পের সুবিধাগুলো বাংলাদেশ নিতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, এটি অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমে পরিণত হতে পারে।
বিগত সময়ে আমরা হিউম্যানিটারিয়ান বা মানবিক করিডরের আলাপ শুনেছিলাম, যার উদ্দেশ্য ছিল মূলত মিয়ানমারে অবস্থিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য সরবরাহ করা। এখন যদি মিয়ানমারের ভিতর দিয়ে চীনের সাথে একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরির আলাপ চলে তাহলে সরকারকে সাহসী, কার্যকরী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—করিডর ধারণার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের একটি সমাধানের পথ খোঁজা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে যেহেতু মিয়ানমার যুক্ত থাকবে সে ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা করতে হবে কী করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধানের আলোচনাও এই প্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত রাখতে পারি। যদিও আমরা এই সফর থেকে জানতে পারি যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সাথে সংলাপের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে রাজি আছেন।
বিষয়টি নতুন নয়। কেননা চীনের মধ্যস্থতায় যে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রচেষ্টা শুরু হয় ২০২১ সালে, সেই প্রচেষ্টাকেই আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি বর্তমান নতুন বাস্তবতায়—যেখানে এ সংকটের সমাধানের কিছু দিক নির্দেশনা রয়েছে।
এর জন্য প্রয়োজন আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা—যে কর্মপরিকল্পনা আমরা বিগত নয় বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় খুব একটা দেখতে পাইনি। বরং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রোহিঙ্গা সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর সাথে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে রয়েছে তহবিলের চরম সংকট। চীনের যেহেতু এই অঞ্চলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দৃশ্যমান তাই চীনের সাথে যথাযথ দরকষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রেও সুবিধা আদায় করতে পারবে বলে মনে হয়।
তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকাও আমাদের মূল্যায়নে রাখতে হবে। এ বিষয়ে ইতিবাচক একটি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যেতে হবে। ভারতের কারণে যেহেতু এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি এবং বর্তমান সময়ে যখন বাংলাদেশ, চীন এবং মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে নতুন একটি করিডরের কথা আলোচনা হচ্ছে, সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে এই অঞ্চল ঘিরে ভারতের অন্তর্নিহিত স্বার্থের কথা। যেমন এই অঞ্চল ঘিরেই রয়েছে তাঁদের বিখ্যাত ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্প। তাই বাংলাদেশকে বেশ সতর্কতার সাথে এই বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। এ ছাড়াও ‘বে অফ বেঙ্গল’ এলাকাটি বাংলাদেশের জন্যে কৌশলগত জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু এই অঞ্চলের দেশগুলো যেমন মিয়ানমার, চীন, ভারত নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানেরও তীক্ষ্ণ নজরে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে অনুধাবন করতে হবে। কেননা এটিই হতে পারে বাংলাদেশের জন্যে এসব দেশের সাথে দর কষাকষির জন্যে একটি অন্যতম শক্তির জায়গা।
বাংলাদেশ স্বার্থকে সামনে এগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই সরকার ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলতে পেরেছে তাঁদের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের মাধ্যমে। এখন শুধু প্রয়োজন সাহস ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
যদিও এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত নানাভাবে আশ্বস্ত করেছেন যে এখানে কোনো ভূ-রাজনৈতিক বিষয় যুক্ত নয়, বরং এই প্রস্তাবনাটি পুরোপুরিই অর্থনৈতিক বিষয়কে মাথায় রেখে পরিকল্পিত। অপরদিকে সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, ভারত নিবিড়ভাবে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের অগ্রগতির দিকে নজর রাখছে। ফলে বাংলাদেশকে তার স্বার্থকে মাথায় রেখে এই বহুমুখী কূটনৈতিক জটিলতাকে মোকাবিলা করতে হবে। এখনই আমাদের জন্যে চূড়ান্ত সময় যখন আমাদের বিগত সময়ের নতজানু দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আর সেই দর-কষাকষির জায়গাটি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্যে রয়েছে বলেই মনে হয়।
তাই বাংলাদেশ কী করে এসব জটিলতা এড়াতে পারে সেটাই হবে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতার অন্যতম সাফল্য। যদিও আমরা জানি এই নতুন প্রস্তাব এখনো আলোচনার টেবিলেই রয়েছে। বাস্তব অর্থে এটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা সেটি নির্ভর করবে বাংলাদেশ এবং আঞ্চলিক দেশগুলো নানাবিধ ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও টানাপোড়েনের মীমাংসা কী করে তার ওপর।

‘বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরই) চীনের এমন একটি উদ্যোগ যা চীনকে সমগ্র বিশ্বের সাথে যুক্ত রাখছে। চীনের জন্যে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। এই উদ্যোগ মূলত চীনের প্রাচীন যোগাযোগ ব্যবস্থারই একটি আধুনিক ও বিস্তৃত রূপ। বর্তমান বিশ্বে তা শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, বরং বিশ্বপরিমণ্ডলে তাঁদের একটি স্বকীয় প্রকল্প হয়ে উঠেছে যার মাধ্যমে চীন মূলত তার মিত্র দেশগুলোর সাথে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করছে।
একইসঙ্গে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সম্পর্কও গড়ে তুলেছে। এ নিয়ে অবশ্য বিস্তর সমালোচনা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো, এর মাধ্যমে চীন নতুন ধরনের আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। এমন একটি বাস্তবতা আমরা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রেক্ষাপটেও দেখতে পাই। যেখানে বাংলাদেশ সেই প্রকল্পের একটি অংশীজন।
এর মধ্যে এই অঞ্চলকে ঘিরে আবার আলাপ উঠল বাংলাদেশ-চীন-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর (বিসিআইএমইসি)। এই করিডর প্রতিষ্ঠায় ২০১৩ সালেই এই চারটি দেশ নীতিগতভাবে সম্মত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের অবনতির কারণে সেটি আর খুব একটা এগোতে পারেনি। যদিও এই করিডরের আলাপ শুরু হয় মূলত নব্বইয়ের দশকের শেষ ভাগে। চীন থেকে বাংলাদেশ এবং ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা যেহেতু জটিল ছিল, সে কারণে সেটিকে সহজ করার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই ছিল এই করিডরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে বিষয়টি নিয়ে আবারও রাষ্ট্রীয় পরিসরে আলোচনা শুরু হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন ভ্রমণের মাধ্যমে। যদিও চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা বেশ কিছু বছর ধরেই চলমান। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার বিষয় ছিলো—কী করে এই তিনটি দেশের মধ্যে আবারও কার্যকরী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। ওই গবেষণায় আমি নিজেও একজন অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করেছি।
এরই ধারাবাহিকতায় ইউনান প্রদেশের সাথে লাগোয়া মিয়ানমার ও চীনের সীমান্ত এলাকায় আমাদের একাধিকবার যেতে হয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্যে। প্রস্তাবিত এই করিডর চীনের কুনমিং থেকে শুরু করে মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে এবং আর একটি অংশ ইয়াঙ্গুন পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। যদিও এর বিশদ পরিকল্পনা এখনো করা হয়নি।
তবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এই যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় অন্তরায় বলে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে রাখাইনে আরাকান আর্মির উত্থান এবং এই এলাকার বড় একটি অংশ তাঁদের নিয়ন্ত্রণের থাকায় করিডরের জন্য তারা একটি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমার আর্মি রাখাইনের দখল নেওয়ার জন্য এই অঞ্চলে জোরালো হামলা শুরু করেছে। এ কারণে বাংলাদেশে আবারও রোহিঙ্গাদের ঢল নামতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
যখন আমরা দেখি যে রাষ্ট্রীয় পরিসরে—বিশেষ করে চীনের পক্ষ থেকে এই করিডর বিষয়ে ইতিবাচক প্রস্তাবনা এসেছে, তখন সেটি বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতাও অনেকগুণ বেড়ে যায় বলে মনে হয়। তবে এসব বাস্তবায়ন কাগজে কলমে সহজ বলে মনে হলেও এর পেছনে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। জটিলতা কিংবা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এর নানা ইতিবাচক দিকও আমরা চিহ্নিত করতে পারি।
প্রথমত বিবেচনা করা দরকার করিডরের অর্থনৈতিক প্রভাব। বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাবনা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আমূল বদলে দিতে পারে। এর সাথে এই এলাকার মানুষজনের জীবনমানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখানে চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যেমন রয়েছে, তেমনই বাংলাদেশও এ প্রক্রিয়ায় লাভবান হতে পারে।
চীনের মালাক্কা প্রণালি হয়ে পণ্য আদান-প্রদানের বিপরীতে ‘বে অফ বেঙ্গল’ বা বঙ্গোপসাগর হয়ে পণ্য আদান-প্রদানের এই প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডর তাঁদের জন্যে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে। এখানেই রয়েছে বাংলাদেশের আর একটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ যেখানে বাংলাদেশকে তার স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। কেবল ভালো সম্পর্ক রাখার জন্যেই কোনো সিদ্ধান্ত যেন বাংলাদেশ না নেয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। কেননা এর নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ইতিবাচক হলেও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যেন এটি চীনের ওপর আমাদের অধিক নির্ভরশীল করে না ফেলে। ইতিমধ্যেই আমরা জানি, বাংলাদেশের সাথে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক। চীনের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়া সত্ত্বেও আমরা ঘাটতি কমাতে পারছি না। তাই বাণিজ্য ভারসাম্যের দিকেও বাংলাদেশকে নজর রাখতে হবে। এর সকল সুবিধা যেন বাংলাদেশ নিতে পারে সেদিকেও একটি প্রায়োগিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা রাখতে হবে।
আমাদের ভাবা দরকার—এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অংশের খরচ কীভাবে মেটানো হবে, অথবা এখানে ঋণ বা বিনিয়োগের কোনো বিষয় জড়িত থাকবে কিনা; যদি থাকে, তাহলে সেগুলো কীভাবে যুক্ত থাকবে। সতর্কভাবে আমাদের এসব বিষয় নিয়ে বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের বৃহৎ প্রকল্পের সুবিধাগুলো বাংলাদেশ নিতে পারবে না। শুধু তা-ই নয়, এটি অন্য দেশের স্বার্থ রক্ষার মাধ্যমে পরিণত হতে পারে।
বিগত সময়ে আমরা হিউম্যানিটারিয়ান বা মানবিক করিডরের আলাপ শুনেছিলাম, যার উদ্দেশ্য ছিল মূলত মিয়ানমারে অবস্থিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য সরবরাহ করা। এখন যদি মিয়ানমারের ভিতর দিয়ে চীনের সাথে একটি অর্থনৈতিক করিডর তৈরির আলাপ চলে তাহলে সরকারকে সাহসী, কার্যকরী এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—করিডর ধারণার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের একটি সমাধানের পথ খোঁজা। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে যেহেতু মিয়ানমার যুক্ত থাকবে সে ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তা করতে হবে কী করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমস্যার সমাধানের আলোচনাও এই প্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত রাখতে পারি। যদিও আমরা এই সফর থেকে জানতে পারি যে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সাথে সংলাপের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে রাজি আছেন।
বিষয়টি নতুন নয়। কেননা চীনের মধ্যস্থতায় যে ত্রিপক্ষীয় সংলাপের প্রচেষ্টা শুরু হয় ২০২১ সালে, সেই প্রচেষ্টাকেই আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি বর্তমান নতুন বাস্তবতায়—যেখানে এ সংকটের সমাধানের কিছু দিক নির্দেশনা রয়েছে।
এর জন্য প্রয়োজন আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা—যে কর্মপরিকল্পনা আমরা বিগত নয় বছরে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় খুব একটা দেখতে পাইনি। বরং বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রোহিঙ্গা সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং প্রায় দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এর সাথে ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে রয়েছে তহবিলের চরম সংকট। চীনের যেহেতু এই অঞ্চলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দৃশ্যমান তাই চীনের সাথে যথাযথ দরকষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রেও সুবিধা আদায় করতে পারবে বলে মনে হয়।
তবে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকাও আমাদের মূল্যায়নে রাখতে হবে। এ বিষয়ে ইতিবাচক একটি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যেতে হবে। ভারতের কারণে যেহেতু এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি এবং বর্তমান সময়ে যখন বাংলাদেশ, চীন এবং মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে নতুন একটি করিডরের কথা আলোচনা হচ্ছে, সে কারণে স্বাভাবিকভাবেই ভারতের সাথে বাংলাদেশের একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে কূটনৈতিক ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হবে এই অঞ্চল ঘিরে ভারতের অন্তর্নিহিত স্বার্থের কথা। যেমন এই অঞ্চল ঘিরেই রয়েছে তাঁদের বিখ্যাত ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট’ প্রকল্প। তাই বাংলাদেশকে বেশ সতর্কতার সাথে এই বিষয়টি মোকাবিলা করতে হবে। এ ছাড়াও ‘বে অফ বেঙ্গল’ এলাকাটি বাংলাদেশের জন্যে কৌশলগত জায়গা থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু এই অঞ্চলের দেশগুলো যেমন মিয়ানমার, চীন, ভারত নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানেরও তীক্ষ্ণ নজরে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে অনুধাবন করতে হবে। কেননা এটিই হতে পারে বাংলাদেশের জন্যে এসব দেশের সাথে দর কষাকষির জন্যে একটি অন্যতম শক্তির জায়গা।
বাংলাদেশ স্বার্থকে সামনে এগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এই সরকার ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলতে পেরেছে তাঁদের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের মাধ্যমে। এখন শুধু প্রয়োজন সাহস ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়া।
যদিও এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত নানাভাবে আশ্বস্ত করেছেন যে এখানে কোনো ভূ-রাজনৈতিক বিষয় যুক্ত নয়, বরং এই প্রস্তাবনাটি পুরোপুরিই অর্থনৈতিক বিষয়কে মাথায় রেখে পরিকল্পিত। অপরদিকে সংবাদ মাধ্যমে জানা যায়, ভারত নিবিড়ভাবে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের অগ্রগতির দিকে নজর রাখছে। ফলে বাংলাদেশকে তার স্বার্থকে মাথায় রেখে এই বহুমুখী কূটনৈতিক জটিলতাকে মোকাবিলা করতে হবে। এখনই আমাদের জন্যে চূড়ান্ত সময় যখন আমাদের বিগত সময়ের নতজানু দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আর সেই দর-কষাকষির জায়গাটি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্যে রয়েছে বলেই মনে হয়।
তাই বাংলাদেশ কী করে এসব জটিলতা এড়াতে পারে সেটাই হবে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতার অন্যতম সাফল্য। যদিও আমরা জানি এই নতুন প্রস্তাব এখনো আলোচনার টেবিলেই রয়েছে। বাস্তব অর্থে এটি আদৌ আলোর মুখ দেখবে কিনা সেটি নির্ভর করবে বাংলাদেশ এবং আঞ্চলিক দেশগুলো নানাবিধ ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা ও টানাপোড়েনের মীমাংসা কী করে তার ওপর।
.png)

বাংলাদেশে দেদারসে ঢুকছে অসংখ্য বিদেশি বন্যপ্রাণী। বিমানবন্দর দিয়ে কিংবা অন্য কোনো চোরাপথে ঢুকে পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির এসব প্রাণী। চোরাকারবারীদের এই অবৈধ ব্যবসা আমাদের বাস্তুতন্ত্রে একটি সম্ভাব্য বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানোর সামিল।
৩৮ মিনিট আগে
জুলাইয়ের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার আজ কেবল একটি আইনি দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। অতীতের বহু ঘটনায় প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, শিল্প ও বাণিজ্যের পাশাপাশি গৃহস্থালি পর্যায়ে গ্যাসের সংকট সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার পাশাপাশি শীতকাল ও রক্ষণাবেক্ষণকালীন সংকট মোকাবিলায় মজুত সক্ষমতা তৈরির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন আশু বিবেচনার দাবি রাখে।
৪ ঘণ্টা আগে
অর্থনীতিতে গতি আনতে হলে এই মুহূর্তে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সেবার তুলনায় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে অধিক মনোযোগী হওয়া, বিদ্যমান উদ্যোক্তার পাশাপাশি অধিক সংখ্যায় নতুন উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে যুক্ত করা, এসএমই খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার প্রদান এবং কায়েমী স্বার্থবাদী চতুর উদ্যোক্তার অন্যায্য স্বার্থের পাহারায় ব
৮ ঘণ্টা আগে