বিদেশি বন্যপ্রাণীর অনুপ্রবেশ: পরিবেশগত সংকটের ঝুঁকি কতখানি

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৪৪
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

বাংলাদেশে দেদারসে ঢুকছে অসংখ্য বিদেশি বন্যপ্রাণী। বিমানবন্দর দিয়ে কিংবা অন্য কোনো চোরাপথে ঢুকে পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির এসব প্রাণী। চোরাকারবারীদের এই অবৈধ ব্যবসা আমাদের বাস্তুতন্ত্রে একটি সম্ভাব্য বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানোর সামিল।

সম্প্রতি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও রাজধানী ঢাকায় পরিচালিত একাধিক অভিযানে বিদেশি কচ্ছপ, টিকটিকি, উভচরসহ নানা প্রজাতির অসংখ্য বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়েছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দেশের আইনের ফাঁক ফোকর গলিয়ে একশ্রেণির চোরাকারবারী বছরের পর বছর ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পোষা প্রাণী হিসেবে প্রাণীগুলোর আমদানি হলেও নানাভাবে এই প্রাণীরা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে গিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে। এটিই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় শঙ্কা।

বিশ্বের নানা অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, একবার কোনো বিদেশি প্রজাতি দেশীয় প্রকৃতিতে প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব।

গত ২৯ মে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীন থেকে আগত একজন যাত্রীর কাছ থেকে ২৩টি বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশি বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ১ প্রজাতির ড্রাগন, ৩ প্রজাতির সাপ, ২ প্রজাতির ব্যাঙ ও ২ প্রজাতির কচ্ছপ ছিল।

গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে নানা জাতের কচ্ছপসহ অন্যান্য বিদেশি বন্যপ্রাণী জব্দের ঘটনা বারবার ঘটেছে। যেমন ২০১২ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪০০-এরও বেশি তারা-কচ্ছপসহ বিপুল-সংখ্যক বন্যপ্রাণী জব্দ করা হয়। ২০১৫ সালে জুলাই মাসে জব্দ করা হয় ৫৫৭টি কালি কাইট্টা।

নতুন কোনো বিদেশি প্রাণী দেশীয় পরিবেশে অনুপ্রবেশ করলে খাদ্যজাল, শিকারি-শিকার সম্পর্ক, পুষ্টিচক্র এবং প্রজাতিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। ফলে দেশীয় প্রতিবেশের নিরবিচ্ছিন্ন সেবা, আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক ও স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ হুমকির মুখে পড়বে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকার একটি বন্যপ্রাণীর গোদামে অভিযান চালিয়ে ১,১০০-এরও বেশি জীবিত কচ্ছপ উদ্ধার হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বন্যপ্রাণী জব্দের ঘটনা। প্রশ্ন জাগে, খোদ রাজধানীর বুকে কীভাবে গড়ে উঠল বিদেশি বন্যপ্রাণীর এই বিশাল ভান্ডার? দেশের আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কারা এ সব অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে?

এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী পাচারের সাথে বিদেশি প্রজাতি অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা যেমন নির্দেশ করে, তেমনি আমাদের প্রাণ-প্রকৃতি যে ক্রমাগত হুমকির মুখে পড়ছে তারও একটি বার্তা দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো বিদেশি প্রজাতি যত বেশি সংখ্যায় এবং যত ঘন ঘন নতুন অঞ্চলে প্রবেশ করে, তার মধ্যে অন্তত কিছু প্রাণীর প্রকৃতিতে টিকে থাকা, প্রজনন করা এবং স্থায়ী একটি পপুলেশন গড়ে তোলার সম্ভাবনা তত বেশি। অর্থাৎ, শত শত প্রাণীর পুনঃপুন প্রবেশ কেবল পাচারের পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যতের পরিবেশগত ঝুঁকির একটি মাত্রাও বটে।

কেন বিদেশি প্রাণী এত বড় হুমকি

প্রাকৃতিক পরিবেশ বরাবরই সংবেদনশীল। মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপে আমাদের প্রতিবেশ-পরিবেশ তার ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছে না। আমাদের দেশের বন, নদী, হাওর, বিল ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। প্রতিটি প্রজাতি এখানে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশগত ভূমিকা পালন করে। নতুন কোনো বিদেশি প্রাণী দেশীয় পরিবেশে অনুপ্রবেশ করলে খাদ্যজাল, শিকারি-শিকার সম্পর্ক, পুষ্টিচক্র এবং প্রজাতিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। ফলে দেশীয় প্রতিবেশের নিরবিচ্ছিন্ন সেবা, আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক ও স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ হুমকির মুখে পড়বে।

জাতিসংঘের ইন্টারগভার্নমেন্টাল সায়েন্স-পলিসি প্লাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস-এর সর্বশেষ মূল্যায়নে আক্রমণাত্মক বিদেশি প্রজাতিকে বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য হ্রাসের পাঁচটি প্রধান চালিকাশক্তির একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার দেশীয় প্রজাতির বিলুপ্তি বা হ্রাসের সঙ্গে এদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে আমাদের দেশে আসা এই বিদেশি প্রজাতির বন্যপ্রাণীরা আমাদের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রজাতি বিলুপ্তির একটি বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।

যদি কেউ মনে করেন বিদেশি প্রাণীর ঝুঁকি কেবল তাত্ত্বিক, তাহলে মারাত্মক ভুল হবে। বাংলাদেশের কয়েকটি নদীর দিকে তাকালেই পাওয়া যাবে যৌক্তিক জবাব।

দক্ষিণ আমেরিকার সাকার মাউথ ক্যাটফিশ একসময় কেবল অ্যাকোয়ারিয়ামের শৌখিন মাছ ছিল। মানুষের অবহেলা ও অনিয়ন্ত্রিত অবমুক্তির মাধ্যমে এটি আজ দেশের অনেকগুলো নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের অন্তত ১৭টি নদীতে এর উপস্থিতি দেখা গেছে। আমাদের দেশীয় মাছ ও জলজ প্রাণী বিপন্ন করে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীতে আজ এই সাকার মাছেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলে সম্প্রদায় জীবিকা হারিয়ে আজ হয়তো শহরে অটোভ্যান চালাচ্ছে।

অবৈধভাবে পাচার হওয়া প্রাণীগুলো প্রায় কখনোই স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা কোয়ারেন্টিনের মধ্য দিয়ে আসে না। ফলে তারা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং পরজীবী বহন করতে পারে, যা বাংলাদেশের দেশীয় বন্যপ্রাণী, গবাদিপশু—এমনকি মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

সাকার মাছ অত্যন্ত সহনশীল, দ্রুত অভিযোজনক্ষম। স্বল্প অক্সিজেনযুক্ত পানিতেও এরা বেঁচে থাকতে পারে। এরা দেশীয় তলদেশবাসী মাছের সঙ্গে খাদ্য ও আবাসস্থলের জন্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে এবং তলদেশীয় বাস্তুতন্ত্রের গঠনে পরিবর্তন আনছে। যদিও বাংলাদেশে এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে এটি ইতিমধ্যে একটি সতর্কবার্তা দিচ্ছে যে, একটি বিদেশি প্রজাতি কীভাবে নীরবে একটি দেশজ বাস্তুতন্ত্রকে গ্রাস করতে পারে। নদীগুলো থেকে আজ এই মাছকে নিমূর্ল করা অসম্ভব বলেই মনে করি।

বিমানবন্দরে জব্দ হওয়া কিংবা ঢাকায় আটক হওয়া বিদেশি কচ্ছপ, ব্যাঙ কিংবা সাপগুলোর মধ্যে কোনটি ভবিষ্যতের ‘সাকার মাউথ ফিস’ হয়ে উঠবে, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই। কিন্তু সেই ঝুঁকিকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই।

যে বিপদটি চোখে দেখা যায় না

বিদেশি প্রাণী কেবল দেশের প্রতিবেশের জন্য প্রতিযোগী বা শিকারি নয়; তারা নতুন রোগজীবাণুর বাহকও হতে পারে।

অবৈধভাবে পাচার হওয়া প্রাণীগুলো প্রায় কখনোই স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা কোয়ারেন্টিনের মধ্য দিয়ে আসে না। ফলে তারা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং পরজীবী বহন করতে পারে, যা বাংলাদেশের দেশীয় বন্যপ্রাণী, গবাদিপশু—এমনকি মানুষের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

বর্তমান বিশ্বের ‘ওয়ান হেল্থ’ ধারণা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। তাই বন্যপ্রাণী পাচারকে শুধু বন বিভাগের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সকলকে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

বিদেশি কোনো প্রাণীকে যথাযথভাবে প্রজাতি শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কোয়ারেন্টিন, রোগ নির্ণয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের জাতীয় বায়োসিকিউরিটি পলিসির আওতায় যে উদ্যোগগুলো জরুরি, তা হলো—

  • বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে বিশেষায়িত বন্যপ্রাণী কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা;
  • উদ্ধারকৃত বিদেশি প্রাণীর জন্য জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রোটোকল;
  • আক্রমণাত্মক বিদেশি প্রজাতির জন্য র‌্যাপিড রেসপন্স ব্যবস্থা;
  • বন বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কাস্টমস ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত টিম;
  • বিদেশি পোষ্যপ্রাণীর অনলাইন-অফলাইন বাণিজ্যের কঠোর নিয়ন্ত্রণ;
  • সর্বোপরি গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ।

আমাদের সামনে এখনও সুযোগ আছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার। ফ্লোরিডায় বার্মিজ পাইথন, ক্যারিবীয় অঞ্চলে গ্রিন ইগুয়ানা কিংবা আমাদের বুড়িগঙ্গার সাকার মাউথ মাছ দেখিয়ে দিয়েছে—একটি বিদেশি প্রজাতি কীভাবে নতুন প্রতিবেশে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তার মূল্য পরিশোধ করতে হয় বহু বছর, কখনও কখনও বহু প্রজন্ম ধরে। তার ওপর বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা যদি বিজ্ঞানভিত্তিক না হয়, তবে আগামী দিনের পরিবেশগত সংকটের বীজ আমরা নিজেরাই বপন করছি।

বন্যপ্রাণী জব্দ কিংবা উদ্ধার অভিযান সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি আমাদের আইনের শাসন ও প্রয়োগের ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। অবৈধ বিদেশি বন্যপ্রাণী বাণিজ্যকে আর কেবল পাচারের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত নিরাপত্তা, কৃষি, জনস্বাস্থ্য এবং জাতীয় বায়োসিকিউরিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু—যা মোকাবেলায় বিজ্ঞান, নীতি এবং আইনকে একই সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে হবে।

  • ড. এম এ আজিজ: অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত