আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত আসলে নেয় কে?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম তিনটি অধিবেশনে মোট ১১১টি বিল পাস হয়েছে। সংসদে যেসব সরকারি বিল উত্থাপিত হয়েছে তার অধিকাংশই সংশোধনী ব্যতিরেখে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। তিনটি অধিবেশনের মধ্যে তৃতীয় অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বন্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই অবশিষ্ট ৩৫টি স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে। নয় কার্যদিবসের এই সংক্ষিপ্ত অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল উত্থাপিত হয়েছে এবং ছয়টিই পাস হয়েছে।
সংসদে উত্থাপিত বিলগুলো বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হলেও একটি বিল ছাড়া অন্য বিলগুলোর ক্ষেত্রে কমিটিকে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মাত্র দুই দিন সময় দেওয়া হয়। ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’-এর ক্ষেত্রে সময় ছিল চার দিন। প্রতিটি বিলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ সংশ্লিষ্ট কমিটির একটি বৈঠকেই সম্পন্ন হয়েছে।
তুলনামূলকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই বিলগুলো সংসদে উত্থাপিত ও গৃহীত হয়েছে। বিলের এজেন্ডা নির্ধারণ, সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো, কমিটির পর্যালোচনা, সংসদে বিতর্ক এবং শেষ পর্যন্ত ভোট—আইন প্রণয়নের প্রতিটি পর্যায়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্ন নিহিত। আর তা হলো, সংসদে আইন পাস হয়, কিন্তু আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত আসলে নেয় কে?
আইন প্রণয়ন: আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক। বিল উত্থাপন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা, সংশোধনী, ভোট এবং রাষ্ট্রপতির সম্মতির মধ্য দিয়ে একটি প্রস্তাবিত বিল আইনে পরিণত হয়। এই প্রক্রিয়া দেখে মনে হতে পারে, সংসদই আইন প্রণয়নের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান।
কিন্তু সংসদীয় রাজনীতির বাস্তবতা আরও জটিল। একটি বিল সংসদের কক্ষে ভোটে যাওয়ার অনেক আগেই তার রাজনৈতিক ভাগ্য অনেকাংশে নির্ধারিত হয়ে যায়। কোন বিষয়টি আইন করার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে বিবেচিত হবে, কোন বিল সংসদের কার্যসূচিতে আসবে, বিলের মূল কাঠামো কী হবে এবং কখন সেটি সংসদে উত্থাপিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সংসদের বাইরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকেও দেখতে হয়।
অর্থাৎ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে শুধু “কীভাবে বিল আইন হয়?”—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- “কোন বিল সংসদের এজেন্ডায় আসে, কে তার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে এবং শেষ পর্যন্ত তার পাস হওয়ার রাজনৈতিক নিশ্চয়তা কে তৈরি করে?”
আইন প্রণয়নের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সংসদের বৈঠকের এজেন্ডা বা দিনের কার্যসূচী নির্ধারণ। অর্থাৎ কোন সমস্যা, নীতি বা সরকারি উদ্যোগকে আইন প্রণয়নের বিষয় হিসেবে সংসদের সামনে আনা হবে। বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় এই পর্যায়ে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। সরকার তার নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে। মন্ত্রিসভায় কোনো বিল অনুমোদিত হওয়ার পর সেটি সংসদে উত্থাপনের পথও মূলত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সংসদে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
ফলে যে রাজনৈতিক পক্ষ আইন প্রণয়নের এজেন্ডা নির্ধারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাবান, সেই একই পক্ষ যদি সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে, তাহলে বিলের চূড়ান্ত অনুমোদনও তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে যায়। এই কারণে বাংলাদেশের মতো সংসদীয় ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকার শুধু একটি অংশগ্রহণকারী নয়; বরং এজেন্ডা নির্ধারণের প্রধান রাজনৈতিক অভিনেতা। তবে এখানেই সংসদের ভূমিকা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়।
সংসদীয় কমিটি কি কেবলই আনুষ্ঠানিক ধাপ?
সংসদীয় কমিটিকে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও পর্যালোচনা স্তর হিসেবে দেখা হয়। সংসদে বিল উত্থাপনের পর কমিটি তার বিভিন্ন বিধান পরীক্ষা করতে পারে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মতামত বিবেচনা করতে পারে, প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুপারিশ করতে পারে এবং সংসদের কাছে প্রতিবেদন দিতে পারে। অর্থাৎ কমিটি কার্যকর হলে সংসদের আইন প্রণয়ন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া থাকে না; বরং বিলের বিষয়বস্তু নিয়ে তুলনামূলকভাবে বিস্তারিত পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে যে কমিটিকে পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না। একটি জটিল বিল পরীক্ষা করার জন্য যদি সংশ্লিষ্ট কমিটিকে মাত্র দুই দিন সময় দেওয়া হয় এবং একটি মাত্র বৈঠকেই যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করতে হয়, তাহলে কমিটির প্রকৃত পর্যালোচনামূলক ভূমিকা কতটা কার্যকর হতে পারে—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।
কমিটি যদি বিলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আইনগত প্রভাব গভীরভাবে পরীক্ষা করার পর্যাপ্ত সময় না পায়, তাহলে সেটি আইন প্রণয়নের একটি কার্যকর পরীক্ষাকারী মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে অনেকাংশে একটি আনুষ্ঠানিক ধাপে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। তদুপরি সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকায় সংসদীয় কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েনের মধ্যেই সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে অবশিষ্ট ৩৫টি স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটি গঠন, কমিটির সভাপতিত্ব এবং আইন পর্যালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকলেও আইন প্রণয়নের কার্যক্রম থেমে থাকেনি। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সংসদের বৈঠক থেকে বিরোধী দলের ওয়াক আউটের ঘটনা নতুন নয়, অতীতে প্রায়শই ওয়াক আউটের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৫ কার্যদিবসে তিনবার, দ্বিতীয় অধিবেশনে ২৭ কার্যদিবসে একবার এবং তৃতীয় অধিবেশনে ৯ কার্যদিবসেই চারবার ওয়াকআউট করে তারা।
কিন্তু সংসদীয় কমিটির বৈঠক থেকে বিরোধী দলের সদস্যদের ওয়াকআউটের ঘটনা সংসদীয় চর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য যথাক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ৩০ আগস্ট কমিটির বৈঠকে বিল দুটির আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।
ফলে যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে বিল দুটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে মতামত, সংশোধনী বা আপত্তি উত্থাপনের সুযোগ ছিল, বিরোধী দলের সদস্যরা সেই আলোচনায় অংশ নেননি। ফলে সংসদীয় প্রক্রিয়ার ভেতরে থেকে বিরোধী দলের বিলের বিষয়বস্তু প্রভাবিত করার কৌশল এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদ-এই দুটির মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে।
সংসদে উত্থাপিত বিলগুলো বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তৃতীয় অধিবেশনের ছয়টি বিলের ক্ষেত্রে কমিটিগুলোকে একটি বিল ছাড়া অন্য বিলগুলোর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মাত্র দুই দিন সময় দেওয়া হয়; ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিলের ক্ষেত্রে সময় ছিল চার দিন। প্রতিটি বিলের পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজও সংশ্লিষ্ট কমিটির একটি বৈঠকেই সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করেছে; চারটি বাতিল এবং ১৬টি অধ্যাদেশকে আরও শক্তিশালী করে বিল আকারে আনার সুপারিশও করা হয়েছে।
ফলে সংসদীয় কমিটিকে নিছক আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি কমিটির অস্তিত্ব থাকলেই কার্যকর তদারকি নিশ্চিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। সুতরাং সংসদীয় কমিটি থাকা এবং কমিটিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা, দুটি এক বিষয় নয়।
বিরোধী দলের ভূমিকা কী?
সংসদে একটি বিলের চূড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ। দলীয় মনোনয়নে নির্বাচিত কোনো সংসদ-সদস্য নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তাঁর সংসদ-সদস্য পদ শূন্য হওয়ার সাংবিধানিক বিধান রয়েছে। এর ফলে সংসদে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনৈতিক শক্তি আরও সুসংহত হয়। এটি সংসদীয় সরকারব্যবস্থার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সংসদীয় ব্যবস্থায় আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ সম্পূর্ণ পৃথক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সরকার সংসদ থেকে গঠিত হয় এবং সরকারের স্থায়িত্ব সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে। ফলে সরকার যখন সংসদে শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধারণ করে, তখন সরকারি বিলের পাস হওয়ার সম্ভাবনাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি থাকে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা প্রয়োজন: সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে বিল পাস হওয়া সাংবিধানিকভাবে বৈধ; কিন্তু একটি আইন কতটা পর্যালোচিত, বিতর্কিত ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাস হলো—সেটি ভিন্ন প্রশ্ন।
তাহলে বিরোধী দলের ভূমিকা কী? যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিরোধী দলের পক্ষে কোনো সরকারি বিল ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়, তাহলে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা কি অর্থহীন? একেবারেই নয়।
বিরোধী দল প্রশ্ন তুলতে পারে, বিলের সমালোচনা করতে পারে, সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারে, কমিটিতে বিকল্প মত তুলে ধরতে পারে এবং সংসদীয় বিতর্কের মাধ্যমে সরকারের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সংসদ বিরোধী দলের জন্য রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের একটি সাংবিধানিক মঞ্চ। একজন বিরোধী সংসদ-সদস্য অনেক সময় জানেন যে তাঁর প্রস্তাবিত সংশোধনী সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে গৃহীত হবে না। তারপরও তিনি সংশোধনী আনেন। তিনি জানেন, তাঁর আপত্তির কারণে সরকার হয়তো বিল প্রত্যাহার করবে না। তারপরও তিনি আপত্তি করেন।
এর কারণ সংসদীয় রাজনীতিতে ভোটে জেতা একমাত্র রাজনৈতিক সাফল্য নয়; রাজনৈতিক অবস্থান প্রতিষ্ঠা করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। সংসদীয় বক্তব্যের মাধ্যমে একজন সংসদ-সদস্য ভোটারদের কাছে জানাতে পারেন—তিনি কোন নীতির পক্ষে, কোন নীতির বিপক্ষে এবং সরকারের কোন সিদ্ধান্তকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন।
ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬-এর বিতর্কটি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। এই আইনটির গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যদিও নাগরিক সমজ ও আইন বিশেষজ্ঞদের আপত্তি পরিলক্ষিত হয়না, দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগস্বত্ব নিজের কাছে রেখে সন্তান, নাতি-নাতনি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ রাখার বিধান নিয়ে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্যের একটি অংশ ছিল—বিলটি শরিয়াহ ও মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়নি এবং বিলটি দ্রুততার সঙ্গে পাস করা হয়েছে।
এখানে বিরোধী দলের আপত্তিকে পদ্ধতিগত ও রাজনৈতিক প্রশ্নের আলোকে দেখা যায়। প্রথমত, আইনটি পর্যাপ্ত পর্যালোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামত ও আলোচনা ছাড়া দ্রুত পাস করা হয়েছে কি না। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দল এই ইস্যুর মাধ্যমে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে এবং নিজেদের নির্দিষ্ট মূল্যবোধ ও আইনগত অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে ভোটারদের সামনে উপস্থাপন করতে চাইছে কি না। দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। সংসদীয় রাজনীতিতে একটি আপত্তি একই সঙ্গে বিল যাচাই-বাছাই করার পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক বার্তা এই দুই ভূমিকা পালন করতে পারে।
সংসদে সিদ্ধান্ত নেয় কে?
বাংলাদেশের সংসদীয় চর্চায় আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি আসে এখানে—সংসদ কি শুধু আইন পাস করবে, নাকি সরকারের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকেও জবাবদিহির মধ্যে রাখবে? সংসদীয় জবাবদিহিতা শুধু সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রশ্নোত্তর, বিতর্ক, সংশোধনী, সংসদীয় কমিটি, বিশেষজ্ঞ মতামত, সরকারি ব্যয়ের পর্যালোচনা এবং বিরোধী দলের বিকল্প মত প্রকাশ এসবের সমন্বয়েই কার্যকর জবাবদিহি তৈরি হয়। একারণে একটি অধিবেশনে কতটি বিল পাস হয়েছে—এটি সংসদের কার্যকারিতা পরিমাপের একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—বিলটি কেন আনা হলো? কে এর এজেন্ডা নির্ধারণ করল? সংসদীয় কমিটি কতটা সময় নিয়ে তা পরীক্ষা করল? বিরোধী দলের মতামত কতটা বিবেচিত হলো? সংশোধনী প্রস্তাবের কী হলো? এবং জনগণের সামনে সরকার তার সিদ্ধান্তের কতটা ব্যাখ্যা দিতে পারল?
বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। সরকার সংসদের এজেন্ডা নির্ধারণে সবচেয়ে শক্তিশালী; সংখ্যাগরিষ্ঠ দল চূড়ান্ত ভোটে সবচেয়ে শক্তিশালী; সংসদীয় কমিটি আইনকে পরীক্ষা ও পরিমার্জনের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র; আর বিরোধী দল আইনটির ফলাফল পরিবর্তনের পাশাপাশি এর রাজনৈতিক অর্থ ও জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। অতএব, সংসদে আইন পাসের ক্ষমতা এবং সংসদে আইন প্রণয়নের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া—দুটি একই বিষয় নয়।
বর্তমান সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সংবিধান সংশোধনীসহ যে কোনো বিল পাস করতে পারে। কিন্তু একটি আইনকে গভীরভাবে পর্যালোচিত, যুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন কার্যকর সংসদীয় কমিটি, পর্যাপ্ত সময়, অর্থবহ বিতর্ক, বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সরকারের রাজনৈতিক জবাবদিহি।
- ড. কে এম মহিউদ্দিন: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
.png)






