যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যেভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করছে

লেখা:
লেখা:
হোসেন দাব্বাগ

প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২: ৪৮
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর শোকার্ত ইরানীদের ঢল। ছবি: রয়টার্স

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে কিছু কৌশলগত ভাষায় বোঝানো হয়। যেমন প্রতিরোধ, উত্তেজনা বৃদ্ধি, সামরিক চাপ, ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি, আর পারমাণবিক ঝুঁকি। এই শব্দগুলো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু যুদ্ধের পুরো চিত্রটা তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট নয়।

ইরান কীভাবে যুদ্ধে লড়বে এবং টিকে থাকবে, তা বুঝতে হলে শুধু সামরিক হিসাব-নিকাশ দেখলেই হবে না। আমাদের দেখতে হবে ইরানে নৈতিক ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র শক্তি, ক্ষতি এবং সর্বোপরি সহনশীলতাকে বিচার করে।

ইরান দেশটি শুধু আক্রমণের শিকার রাষ্ট্র নয়। বরং এমন একটি রাষ্ট্র, যার চিন্তা-ভাবনার মূলভিত্তি অনেকদিন ধরে শিয়া রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব গড়ে উঠেছে। শিয়া ধর্মতত্ত্ব বিশ্বাসীরা মনে করে শহীদ হওয়া, ত্যাগ ও পবিত্রতা রক্ষা করাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

‘যুদ্ধ’ ছোট একটি শব্দ। যুদ্ধ শুধু অস্ত্র দিয়ে লড়া হয় না। মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং গল্প বা ধারণাও যুদ্ধের অংশ। অনেক সময় এই অর্থ ও বিশ্বাসই একটি বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় রমজান মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার পর শোকের ছায়া নেমে আসে। কট্টরপন্থীরা রাষ্ট্র সমর্থিত শোকানুষ্ঠান পালন করে আসছে রাতের পর রাত। তখনও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বোমাবর্ষণ চালানো অব্যাহত রেখেছিল। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অনুগতদের মধ্যে, বিশেষ করে আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজ’-এর মধ্যে এমন মানুষ রয়েছে যারা একজন ঐশ্বরিক দিকনির্দেশনাপ্রাপ্ত আলেমের শাসনের জন্য শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত।

তবে এর মানে এই নয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র অপরাজেয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অর্থ আরও জটিল এবং উদ্বেগজনক। শত্রু দেশগুলো বাহ্যিক সহিংসতা দেখিয়ে ইসলামি প্রজাতান্ত্রিক দেশ ইরানের তেমন বড় ক্ষতি করতে পারে না। বরং এটি প্রতীকী ও নৈতিক ব্যাকরণকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। যার মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে কয়েক দশক ধরে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছে দেশে ও বিদেশে দমন-পীড়নকে বৈধতা দিয়েছে।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র কখনোই কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল না। শুরু থেকেই দেশটি নিজেকে একটি নৈতিক প্রকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছে। দেশটির সার্বভৌমত্বকে পবিত্র ইতিহাসের সঙ্গে একীভূত করেছে। একই সঙ্গে ইতিহাসের কেন্দ্রীয় আবেগ ও প্রতীকের উৎস শিয়া স্মৃতি। বিশেষ করে ৬৮০ সালের কারবালার যুদ্ধ। যেখানে উমাইয়া বাহিনী মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হোসেন এবং তাঁর সঙ্গীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।

শিয়া সংস্কৃতিতে ঘটনাটি অন্যায়, নিরপরাধের কষ্ট, ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ এবং মহিমান্বিত আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্বাসীদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে নিপীড়ন মানেই পরাজয় নয়। কষ্ট ভোগ করাকে সত্যের পক্ষে থাকার পরিচয় মনে করে।

এই কারণেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আত্মপরিচয়ে কেউ শহীদ হলে, তা কোনো গৌণ বিষয় মনে করা হয় না। বরং এটিকে তাদের অন্যতম কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক মূল্যবোধের অংশ মনে করা হয়। বছরের পর বছর ধরে শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ‘ন্যায়সঙ্গত ভুক্তভোগী’, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্য, অবমাননা ও বৈদেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসা পবিত্র অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করছে।

আত্মত্যাগের পবিত্রকরণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থা যেকোনো আক্রমণকে তার নিজস্ব নৈতিক জগতের ভেতরে শুষে নিতে পারে। যা বাইরে থেকে ধ্বংসলীলা বলে মনে হয়, তা ভেতর থেকে সাক্ষ্য, সহনশীলতা ও বিশ্বস্ততা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। সেখানে মৃত্যু নিজেই রাজনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে।

একটি আদর্শিক রাষ্ট্র যা নিজেকে পবিত্র প্রতিরোধের চশমা দিয়ে দেখে, তারা হয়তো কমান্ডার, অবকাঠামো এবং ভূখণ্ড হারাতে পারে, তবুও প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন করতে পারে, যা শাহাদাতের পথে পুনরায় প্রবেশ করার সুযোগ। আদর্শিক রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের এটিই অন্যতম ট্র্যাজেডি। বাইরে থেকে তাদের যত বেশি আক্রমণ করা হবে, তত তারা তাদের টিকে থাকার মিথগুলো পুনরুদ্ধার করবে।

বর্তমান যুদ্ধে ইরানের কৌশল ক্রমশ সহনশীলতা। ফলে যুদ্ধটি ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে যাচ্ছে। তারা চেষ্টা করছে শত্রুর থেকে কীভাবে বেশি সময় টিকে থাকা যায়, আঘাত সহ্য করা যায়, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করা। ইরানিরা বিশ্বাস করে, ইরানের মনোবল ভাঙার আগেই ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের রাজনৈতিক সংকল্প ভেঙে পড়বে। বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও বোমাবর্ষণের মুখে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি।

আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধের স্মৃতিও ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সহনশীলতা ও আত্মত্যাগের একটি টেকসই সংস্কৃতি দিয়ে গেছে। এর পাশাপাশি দীর্ঘায়িত বাহ্যিক চাপ মোকাবিলা করে টিকে থাকার অভিজ্ঞতাও ইরানের রয়েছে। যদিও ইরানিদের জন্য এর মানবিক মূল্য ছিল বিশাল।

অবশ্য সব সংহতিই ধর্মতাত্ত্বিক নয়। অনেক ইরানি রয়েছে যারা ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ঘৃণা করে। তারাও বিদেশি আক্রমণের কারণে সংকুচিত বোধ করতে পারে তা প্রজাতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য থেকে নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, ভয়, শোক বা সম্মিলিত শাস্তির আতঙ্ক থেকে। আর এটাই মূল বিষয়। বাহ্যিক সহিংসতা দেশের ভেতরের নৈতিক সীমারেখাগুলোকে অস্পষ্ট করে দিতে পারে। এটি জনপরিসরকে সংকুচিত করতে পারে। অবরুদ্ধ মানসিকতা আরও তীব্রতর করতে পারে। রাষ্ট্রকে দমন-পীড়নের হোতা হিসেবে নয় বরং জাতির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ করে দিতে পারে।

যখনই অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বাহ্যিক হুমকির দ্বারা স্থানান্তরিত হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রায়ই তার সুবিধা পায়। শান্তিকালীন সময়ে এর ব্যর্থতাগুলো প্রকাশ পায়—যেমন দুর্নীতি, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক পতন এবং জবরদস্তিমূলক শাসন। যুদ্ধের সময় বিশেষ করে বিদেশি ও অবৈধ আক্রমণের মুখে এটি তার পুরনো ভাবমূর্তি ফিরে পেতে পারে—কোনো অযোগ্য কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধের এক অবরুদ্ধ অভিভাবক হিসেবে।

এর মানে এই নয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ধর্মতত্ত্ব সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য। প্রতিবেদনগুলো বলছে যে, ইরানের পরবর্তী নেতৃত্ব একটি ক্ষয়িষ্ণু অনুগত গোষ্ঠী। ফলে বৈধতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন। অনেক ইরানি অনেক আগেই রাষ্ট্রের এই পবিত্র আখ্যানে বিশ্বাস হারিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব কার্যকর হওয়ার জন্য সর্বজনীন বিশ্বাসের প্রয়োজন হয় না। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বিশ্বাসী, পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান, পর্যাপ্ত আচার-অনুষ্ঠান, পর্যাপ্ত ভয় এবং পর্যাপ্ত যুদ্ধ যা কষ্টকে সংহতিতে রূপান্তর করতে পারে।

এটাই বর্তমান যুদ্ধকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যদি মনে করে যে প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করলেই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের তাৎপর্য মুছে যাবে। তবে তারা সম্ভবত যে রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়ছে, তা বুঝতে মারাত্মক ভুল করছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ না করে বরং উত্তপ্ত করছে। ইরানকে ‘বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ’ করতে বলা নিঃসন্দেহে অবমাননাকর। এটি উত্তেজনা আরও বাড়াবে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে সেই ধরনের শত্রু উপহার দেবে, যা তারা বলতে অভ্যস্ত।

ধর্মনিরপেক্ষ কৌশলগত ভাবনা আসলে সহিংসতা সক্ষমতা ধ্বংস করার মাধ্যমে দুর্বল করে দেয়। কিন্তু একটি রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক ভাবনায় সহিংসতা পবিত্র উদ্দেশ্যকে নিশ্চিত করার মাধ্যমে শক্তিশালী করতে পারে। একটি আদর্শিক রাষ্ট্র যা নিজেকে পবিত্র প্রতিরোধের চশমা দিয়ে দেখে, তারা হয়তো কমান্ডার, অবকাঠামো এবং ভূখণ্ড হারাতে পারে, তবুও প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অর্জন করতে পারে, যা শাহাদাতের পথে পুনরায় প্রবেশ করার সুযোগ। আদর্শিক রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের এটিই অন্যতম ট্র্যাজেডি। বাইরে থেকে তাদের যত বেশি আক্রমণ করা হবে, তত তারা তাদের টিকে থাকার মিথগুলো পুনরুদ্ধার করবে।

যদিও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নৃশংসতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই এবং আত্মত্যাগের ধর্মতত্ত্বকেও আকর্ষণীয় করে করে উপস্থাপন করা উচিত হবে না। এই ধর্মতত্ত্বকে প্রায়ই নিষ্ঠুরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে বিশ্বাসের ভাষায় ক্ষতিকে পবিত্র ঘোষণা করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নৈতিক সমালোচনার জন্য স্পষ্টতা প্রয়োজন। আমরা যদি বুঝতে চাই ইসলামি প্রজাতন্ত্র কীভাবে টিকে থাকে, তবে আমাদের দেখতে হবে, এর স্থিতিস্থাপকতা কেবল সামরিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং প্রতীকীও বটে। এটি আঘাতকে নৈতিক কর্তৃত্বে রূপান্তর করার ক্ষমতার মধ্যে নিহিত।

এই কারণেই ধর্মীয় মাত্রাটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি এই জন্য নয় যে এই যুদ্ধ কেবল ধর্মের জন্য, বরং এই জন্য যে ধর্মকে রাজনৈতিক অর্থে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয় যখন তারা পাল্টা আঘাত করতে পারে। সমভাবে শক্তিশালী হয় যখন তারা যথেষ্ট মানুষকে এই বিশ্বাস করাতে পারে যে আক্রমণ সহ্য করতে পারাটাই ‘বিজয়’।

তাই ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করতে পারে। এটি রাষ্ট্রের বস্তুগত ভিত্তি দুর্বল করে দিতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে সেই পবিত্র আখ্যানকে রসদ জোগাতে পারে, যার মাধ্যমে তারা বেঁচে থাকে।

  • হোসেন দাব্বাগ: লন্ডনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

(আল জাজিরা থেকে নিবন্ধটি অনুবাদ করেছেন খাদিজা আক্তার)

সম্পর্কিত