হা মীম কেফায়েত

কল্পনা করুন, আপনি স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় হাঁটছেন কিংবা কোনো যানবাহনে করে কোথাও যাচ্ছেন। এমন সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে থামালেন। তাঁর সন্দেহ, আপনার কাছে মাদক থাকতে পারে। শুরু হলো তল্লাশি। ব্যাগের প্রতিটি অংশ, পকেট, সবকিছু খুঁজে দেখা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো মাদক পাওয়া গেল না।
স্বাভাবিকভাবেই আপনি ধরে নেবেন, যেহেতু সন্দেহের পক্ষে কোনো বস্তুগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি তাই বিষয়টি এখানেই শেষ। কিন্তু বাস্তবতা এখন আর এতটা সরল নয়।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর এটি আইনে পরিণত হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উত্থাপিত এই সংশোধনীতে সাইবার স্পেস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার হওয়া অপরিহার্য নয়। বরং ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-ওয়ালেট বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সংঘটিত কর্মকাণ্ডও তদন্ত ও বিচারের আওতায় আসবে। আদালত বা নবগঠিত মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালকে এসব ডিজিটাল সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত কিংবা রাষ্ট্রের অনুকূলে ন্যস্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে ডগ স্কোয়াড গঠন এবং আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
আইন প্রণয়নের সমর্থকদের মতে, অনলাইনভিত্তিক মাদক ব্যবসা, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ও ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় প্রচলিত তদন্তব্যবস্থা আর যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত জবাবদিহি ও বিচারিক নজরদারি ছাড়া এত বিস্তৃত ক্ষমতা নাগরিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ন্যায়বিচারের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশ্নটি তাই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত কি না, সেটি নয়। মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ও জাতীয় সমস্যা, এই বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ খুবই কম। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, অপরাধ দমনের প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে কতখানি ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং সেই ক্ষমতার কার্যকর জবাবদিহি ও সীমারেখা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
মাদক নিয়ে কঠোর আইন ও কার্যকর তদন্তব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হলো, অপরাধ দমনের নামে নিরপরাধ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। তাই রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে তার ওপর কার্যকর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো নতুন আইন মূল্যায়নের সময় শুধু তার উদ্দেশ্য নয়, আইনের প্রয়োগ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার অতীত অভিজ্ঞতা কি এমন আস্থা তৈরি করে যে, এত বিস্তৃত ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা একেবারেই নেই। এই প্রশ্নের উত্তর অনুমানের ওপর নির্ভর করে না। সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকেই এর মূল্যায়ন করা যায়।
২০০৪ সালে গঠিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সময়ের সঙ্গে নানা মানবাধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি আইনের আওতায় র্যাব ও এর কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পেছনে ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগ। একই ধরনের অভিযোগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও দীর্ঘদিন তুলে এসেছে। এখানে মূল প্রশ্ন র্যাবকে ঘিরে বিতর্ক নয়; বরং রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিলে তার ওপর কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা।
এই বিল নিয়ে সংসদে আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যখন তদন্ত পরিচালনাকারী সংস্থার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে, তখন ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে আরও কঠোর স্বচ্ছতা, স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণীত হলেও পরবর্তী সময়ে এর কয়েকটি ধারা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টসের অভিযোগ যে আইনের অস্পষ্ট ও বিস্তৃত কিছু বিধান সাংবাদিক, লেখক ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে বারবার প্রয়োগ করা হয়েছে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত কেবল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই এই আইনে ১৩৮টি মামলা হয়, যেখানে ২৮০ জনকে আসামি করা হয় এবং অন্তত ৮৪ জন গ্রেপ্তার হন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কও আইনের কিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর জবাবদিহি ও স্বাধীন বিচারিক তদারকি ছাড়া ডিজিটাল তদন্তের ক্ষমতা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংশোধিত আইনে তদন্তের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ই-ওয়ালেট, মোবাইল আর্থিক সেবা কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সরাসরি মাদক উদ্ধার না হলেও ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তদন্ত ও বিচার এগোতে পারে।
কাগজে-কলমে এসব ব্যবস্থা আধুনিক তদন্তব্যবস্থার অংশ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু একটি আইনের কার্যকারিতা শুধু তার উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করা যায় না।বিচার করতে হয় বাস্তবে সেটি কীভাবে প্রয়োগ হবে এবং সেই প্রয়োগে নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে তা দিয়ে।
আজকের পৃথিবীতে একটি মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার কেবল যোগাযোগের যন্ত্র নয়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক লেনদেন, পেশাগত নথি ও পারিবারিক স্মৃতির বিশাল অংশ এখন ডিজিটাল ডিভাইসেই সংরক্ষিত থাকে। তদন্তের স্বার্থে একটি ডিভাইস জব্দ করা মানে শুধু একটি যন্ত্র জব্দ করা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই সেটি একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পেশাগত কার্যক্রমকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দেওয়ার সমান। তদন্ত শেষে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ততক্ষণে যে ক্ষতি হয়ে যায়, তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়।
ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা কেবল তথ্য উদ্ধারের ওপর নির্ভর করে না। সেই তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং আদালতে উপস্থাপনের আগ পর্যন্ত তার অখণ্ডতা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, তার ওপরও নির্ভর করে। এই প্রক্রিয়ার যেকোনো পর্যায়ে ত্রুটি বা অনিয়ম ঘটলে প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন বাস্তবতা— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বর্তমান প্রযুক্তিতে একটি ছবি, অডিও বা ভিডিওকে এমনভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব যে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য করা কঠিন। ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তি দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এসব কারসাজি শনাক্ত করা সম্ভব হলেও সেই বিশ্লেষণ শেষ পর্যন্ত মানুষের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। সেখানে দক্ষতার ঘাটতি, অবহেলা বা অসততা থাকলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি থেকে যায়। যেখানে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তকে অপরাধ প্রমাণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে, সেখানে এই ঝুঁকি নিছক তাত্ত্বিক নয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, নতুন আইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত নির্দিষ্ট মাদক-অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড এমন একটি শাস্তি, যা একবার কার্যকর হলে বিচারিক ভুল সংশোধনের আর কোনো সুযোগ থাকে না।
এই আশঙ্কা কেবল তাত্ত্বিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইনোসেন্স প্রজেক্ট ও ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের পর থেকে প্রায় ২০০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি পরবর্তীকালে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেয়েছেন, যাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় কারাগারে ছিলেন। এসব মামলার অনেকগুলোতে ভুল শনাক্তকরণ, জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তি অথবা ত্রুটিপূর্ণ ফরেনসিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
যে দেশের বিচারব্যবস্থা প্রযুক্তি ও জনবলের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত, সেখানেও যদি এমন বিচারিক ভুলের নজির পাওয়া যায়, তাহলে সীমিত ফরেনসিক সক্ষমতা ও তুলনামূলক দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির দেশে এই ঝুঁকি আরও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশেও ভুল তদন্ত, ভুল পরিচয় কিংবা ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে নিরপরাধ মানুষের হয়রানির বহু অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির পরিধি বাড়ানো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই অবস্থান যেন আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী না হয়। একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা এমন, যেখানে অপরাধী শাস্তি পায়, আবার নিরপরাধ মানুষও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে।
আইনের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধ দমন নয়, নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত করাও। তাই এমন একটি আইনি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা একদিকে মাদক দমনে কার্যকর হবে, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে যথেষ্ট জবাবদিহি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। সত্যিকারের গণতন্ত্রের পরিচয় এখানেই।
লেখক: সাংবাদিক

কল্পনা করুন, আপনি স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় হাঁটছেন কিংবা কোনো যানবাহনে করে কোথাও যাচ্ছেন। এমন সময় একজন পুলিশ কর্মকর্তা আপনাকে থামালেন। তাঁর সন্দেহ, আপনার কাছে মাদক থাকতে পারে। শুরু হলো তল্লাশি। ব্যাগের প্রতিটি অংশ, পকেট, সবকিছু খুঁজে দেখা হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো মাদক পাওয়া গেল না।
স্বাভাবিকভাবেই আপনি ধরে নেবেন, যেহেতু সন্দেহের পক্ষে কোনো বস্তুগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি তাই বিষয়টি এখানেই শেষ। কিন্তু বাস্তবতা এখন আর এতটা সরল নয়।
গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর এটি আইনে পরিণত হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ উত্থাপিত এই সংশোধনীতে সাইবার স্পেস ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের বিচারে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার হওয়া অপরিহার্য নয়। বরং ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-ওয়ালেট বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে সংঘটিত কর্মকাণ্ডও তদন্ত ও বিচারের আওতায় আসবে। আদালত বা নবগঠিত মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালকে এসব ডিজিটাল সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত কিংবা রাষ্ট্রের অনুকূলে ন্যস্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে ডগ স্কোয়াড গঠন এবং আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।
আইন প্রণয়নের সমর্থকদের মতে, অনলাইনভিত্তিক মাদক ব্যবসা, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ও ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক মোকাবিলায় প্রচলিত তদন্তব্যবস্থা আর যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত জবাবদিহি ও বিচারিক নজরদারি ছাড়া এত বিস্তৃত ক্ষমতা নাগরিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং ন্যায়বিচারের জন্য গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশ্নটি তাই মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত কি না, সেটি নয়। মাদক একটি ভয়াবহ সামাজিক ও জাতীয় সমস্যা, এই বিষয়ে দ্বিমতের সুযোগ খুবই কম। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, অপরাধ দমনের প্রয়োজনে রাষ্ট্রকে কতখানি ক্ষমতা দেওয়া হবে এবং সেই ক্ষমতার কার্যকর জবাবদিহি ও সীমারেখা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
মাদক নিয়ে কঠোর আইন ও কার্যকর তদন্তব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে আইনের শাসনের মৌলিক নীতি হলো, অপরাধ দমনের নামে নিরপরাধ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করা যাবে না। তাই রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে তার ওপর কার্যকর জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে।
সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত না করার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ফলে যেকোনো নতুন আইন মূল্যায়নের সময় শুধু তার উদ্দেশ্য নয়, আইনের প্রয়োগ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার অতীত অভিজ্ঞতা কি এমন আস্থা তৈরি করে যে, এত বিস্তৃত ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা একেবারেই নেই। এই প্রশ্নের উত্তর অনুমানের ওপর নির্ভর করে না। সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকেই এর মূল্যায়ন করা যায়।
২০০৪ সালে গঠিত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন সময়ের সঙ্গে নানা মানবাধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি আইনের আওতায় র্যাব ও এর কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পেছনে ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগ। একই ধরনের অভিযোগ হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও দীর্ঘদিন তুলে এসেছে। এখানে মূল প্রশ্ন র্যাবকে ঘিরে বিতর্ক নয়; বরং রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিলে তার ওপর কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা।
এই বিল নিয়ে সংসদে আলোচনার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যখন তদন্ত পরিচালনাকারী সংস্থার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধেই এ ধরনের অভিযোগ ওঠে, তখন ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে আরও কঠোর স্বচ্ছতা, স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
একই ধরনের অভিজ্ঞতা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আইনটি প্রণীত হলেও পরবর্তী সময়ে এর কয়েকটি ধারা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টসের অভিযোগ যে আইনের অস্পষ্ট ও বিস্তৃত কিছু বিধান সাংবাদিক, লেখক ও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে বারবার প্রয়োগ করা হয়েছে। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২২ সালের আগস্ট পর্যন্ত কেবল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই এই আইনে ১৩৮টি মামলা হয়, যেখানে ২৮০ জনকে আসামি করা হয় এবং অন্তত ৮৪ জন গ্রেপ্তার হন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কও আইনের কিছু ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, কার্যকর জবাবদিহি ও স্বাধীন বিচারিক তদারকি ছাড়া ডিজিটাল তদন্তের ক্ষমতা অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সংশোধিত আইনে তদন্তের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ই-ওয়ালেট, মোবাইল আর্থিক সেবা কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সরাসরি মাদক উদ্ধার না হলেও ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে তদন্ত ও বিচার এগোতে পারে।
কাগজে-কলমে এসব ব্যবস্থা আধুনিক তদন্তব্যবস্থার অংশ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু একটি আইনের কার্যকারিতা শুধু তার উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করা যায় না।বিচার করতে হয় বাস্তবে সেটি কীভাবে প্রয়োগ হবে এবং সেই প্রয়োগে নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে তা দিয়ে।
আজকের পৃথিবীতে একটি মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার কেবল যোগাযোগের যন্ত্র নয়। একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক লেনদেন, পেশাগত নথি ও পারিবারিক স্মৃতির বিশাল অংশ এখন ডিজিটাল ডিভাইসেই সংরক্ষিত থাকে। তদন্তের স্বার্থে একটি ডিভাইস জব্দ করা মানে শুধু একটি যন্ত্র জব্দ করা নয়, অনেক ক্ষেত্রেই সেটি একজন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও পেশাগত কার্যক্রমকে সাময়িকভাবে স্থবির করে দেওয়ার সমান। তদন্ত শেষে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ততক্ষণে যে ক্ষতি হয়ে যায়, তার পূর্ণ ক্ষতিপূরণ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব নয়।
ডিজিটাল প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা কেবল তথ্য উদ্ধারের ওপর নির্ভর করে না। সেই তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং আদালতে উপস্থাপনের আগ পর্যন্ত তার অখণ্ডতা কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে, তার ওপরও নির্ভর করে। এই প্রক্রিয়ার যেকোনো পর্যায়ে ত্রুটি বা অনিয়ম ঘটলে প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নতুন বাস্তবতা— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বর্তমান প্রযুক্তিতে একটি ছবি, অডিও বা ভিডিওকে এমনভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব যে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য করা কঠিন। ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তি দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে এসব কারসাজি শনাক্ত করা সম্ভব হলেও সেই বিশ্লেষণ শেষ পর্যন্ত মানুষের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়। সেখানে দক্ষতার ঘাটতি, অবহেলা বা অসততা থাকলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি থেকে যায়। যেখানে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তকে অপরাধ প্রমাণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে, সেখানে এই ঝুঁকি নিছক তাত্ত্বিক নয়।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, নতুন আইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত নির্দিষ্ট মাদক-অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড এমন একটি শাস্তি, যা একবার কার্যকর হলে বিচারিক ভুল সংশোধনের আর কোনো সুযোগ থাকে না।
এই আশঙ্কা কেবল তাত্ত্বিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইনোসেন্স প্রজেক্ট ও ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালের পর থেকে প্রায় ২০০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি পরবর্তীকালে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেয়েছেন, যাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় কারাগারে ছিলেন। এসব মামলার অনেকগুলোতে ভুল শনাক্তকরণ, জোরপূর্বক আদায় করা স্বীকারোক্তি অথবা ত্রুটিপূর্ণ ফরেনসিক বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
যে দেশের বিচারব্যবস্থা প্রযুক্তি ও জনবলের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত, সেখানেও যদি এমন বিচারিক ভুলের নজির পাওয়া যায়, তাহলে সীমিত ফরেনসিক সক্ষমতা ও তুলনামূলক দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির দেশে এই ঝুঁকি আরও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশেও ভুল তদন্ত, ভুল পরিচয় কিংবা ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে নিরপরাধ মানুষের হয়রানির বহু অভিযোগ রয়েছে। এই বাস্তবতায় মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির পরিধি বাড়ানো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান অবশ্যই প্রয়োজন। তবে সেই অবস্থান যেন আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী না হয়। একটি কার্যকর বিচারব্যবস্থা এমন, যেখানে অপরাধী শাস্তি পায়, আবার নিরপরাধ মানুষও সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে।
আইনের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধ দমন নয়, নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থা নিশ্চিত করাও। তাই এমন একটি আইনি কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা একদিকে মাদক দমনে কার্যকর হবে, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে যথেষ্ট জবাবদিহি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। সত্যিকারের গণতন্ত্রের পরিচয় এখানেই।
লেখক: সাংবাদিক
.png)

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক নিঃসঙ্গ শেরপা তাজউদ্দীন আহমদ। যাঁর প্রজ্ঞা, পারদর্শিতা, দরকষাকষির ক্ষমতা, তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা এবং কুশলী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীনতার পথে পরিচালিত করেছিল।
১৭ মিনিট আগে
জাতীয় নির্বাচনের পর একটি নতুন সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচন সব সময়ই একটি বড় রাজনৈতিক ঘটনা। এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদলের প্রতিফলন নয়, বরং নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক চর্চা ও সদিচ্ছার একটি অগ্নিপরীক্ষা।
১ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী একজন মেজর পদবির সেনা অফিসারকে গ্রেপ্তার করে তাঁর বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ওই মেজরের বিরুদ্ধে ১৯৮১ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে সংঘটিত সেনা বিদ্রোহে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে; যে ঘটনায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমা
১৫ ঘণ্টা আগে
দেশে গ্যাস পরিস্থিতি কতটা খারাপ, সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। এ খাতে আমরা ক্রমে আরও আমদানিনির্ভর হচ্ছি। বাড়ছে এলএনজি-নির্ভরতা। ইরান যুদ্ধে জ্বালানি খাত অস্থির হওয়ায় এলএনজির দামও অনেক বেড়ে যায়। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ব্যয় বাড়ার এটা অন্যতম কারণ।
১৫ ঘণ্টা আগে