লেখা:

ইরানে মার্কিন হামলার বয়স ছয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ জোর গলায় এই সামরিক অভিযানকে ‘নিখুঁত ও অপ্রতিরোধ্য’ দাবি করে আসছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ‘আসন্ন পারমাণবিক হুমকি’ চিরতরে মুছে ফেলা। একই সঙ্গে ইরানি জনগণকে উসকে দিয়ে তাদের সরকারের পতন ঘটানো। কিন্তু বাস্তবতা এখন সেই ঘোষণার ঠিক উল্টো।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের পাল্টা হামলার আতঙ্কে কাঁপছে। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। সামরিক শক্তিতে দুর্বল হওয়া বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের কোনো লক্ষণই ইরানে দেখা যাচ্ছে না। অতীতের মতোই অহংকার আর অজ্ঞতার চরম মাশুল গুনছে আমেরিকা। বিশেষ করে ইরানি শাসনব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে এই ভুলগুলো আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে একধরনের মানসিক জড়তা কাজ করে। মানুষ সাধারণত ভাবে, লড়াই দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। আর সেই যুদ্ধে যদি আমেরিকা জড়ায়, তবে এই মানসিক জড়তা আরও দীর্ঘ হয়। কারণ আমেরিকার মতো পরাশক্তি দ্রুত তার লক্ষ্য অর্জন করবে এবং ইরানের মতো ‘দুর্বল’ শক্তি সহজেই আত্মসমর্পণ করবে—এই চিন্তাই মানুষ করে। মিত্ররা যে আমেরিকার পেছনে না দাঁড়াতেও পারে, এই চিন্তা কারো মাথায় তখন আসে না। সামরিক অভিযানের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চল বা মানুষের মধ্যে আটকে থাকবে না—এই সত্য মানতেও তাদের কষ্ট হয়।
শুরুতে যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তার একটিও ফলেনি। সংঘাতের আঁচ গিয়ে লেগেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা’ দেখা দিতে পারে বলে এখনই পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় এবং উপসাগরীয় মিত্রদের এই হামলায় বা হরমুজ প্রণালি খোলার চেষ্টায় যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানি সরকার এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। উল্টো তারা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও সেনাদের ব্যাপক ক্ষতি করে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণেই হিসেবে ভুল হয়েছে। যখন ইরানে হামলা শুরু হয়, তখন আমেরিকার সমর্থকরা এক অদ্ভুত উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল। তারা ভেবেছিল আমেরিকা আবার বিশ্বকে নিজের মতো করে সাজাচ্ছে।
‘নিউইয়র্ক পোস্ট’-এর সম্পাদকীয় পর্ষদ এই যুদ্ধকে ‘প্রজন্মের সেরা পদক্ষেপ’ বলেছিল। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ঘোষণা দিয়েছিল, সব যুদ্ধের মতোই এতে ঝুঁকি আছে। কিন্তু এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও ভালো কিছুর জন্য পুনর্গঠন করতে পারে এবং বিশ্বকে আরও নিরাপদ করতে পারে। যারা এই অতিরিক্ত আশাবাদের সমালোচনা করেছিলেন, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ব্রেট স্টিফেনস বলেছিলেন, ‘যারা এই যুদ্ধের বিপক্ষে, তাদের এই ভীতু মনোভাব ও হতাশা দেখে আমি হতবাক। যুদ্ধের মাত্র দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। মাসের শেষেই এই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে।’
এখন মানসিক সেই জড়তা কেটে গেছে। সবাই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এখন আলোচনা চলছে চোরাবালি নিয়ে। কীভাবে ট্রাম্প এই যুদ্ধ থেকে মুখ রক্ষা করে বেরিয়ে আসতে পারেন, তা নিয়ে কথা হচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের নিজস্ব জটিল সমীকরণ আছে। তাদের সহজে ছকে ফেলা যাবে না। শুধু সামরিক হামলা চালিয়ে তাদের দুর্বল করে দিলেই জনগণ সরকারের পতন ঘটাবে—এমন ভাবনার কোনো ভিত্তি নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ভুল ছিল ইরানের অসম যুদ্ধ বা ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ চালানোর ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা। উপসাগরীয় অঞ্চলকে অচল ও অস্থিতিশীল করতে ইরানের হাতে বিপুল সামরিক শক্তির প্রয়োজন নেই। তারা এমনভাবে হামলা চালাচ্ছে না যা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনে বা অনেক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। কিন্তু তারা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির করে দিতে পারে, জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। আর এর মাধ্যমে তারা আমেরিকার মিত্রদের এবং পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সস্তা ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের একটানা হামলা চালিয়ে তারা ঠিক সেই লক্ষ্যই অর্জন করেছে।
দ্বিতীয় ভুল ছিল এক অদ্ভুত প্রত্যাশা। আমেরিকা ভেবেছিল ইরান তাদের সবচেয়ে দামি অস্ত্র ব্যবহার করবে না; অর্থাৎ তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না। অথচ গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ই প্রণালি বন্ধের বিষয় আলোচনায় এসেছিল। কাতারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম, তাদের মূল উদ্বেগ কাতারের দিকে আসা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ভুল ছিল ইরানে জনগণের গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন। নানা কারণেই এই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো, যখন মাথার ওপর বোমা পড়ছে তখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা চরম বোকামি। এছাড়া কয়েক মাস আগেই সরকার বিক্ষোভকারীদের গুলি করে মেরেছে, তাই মানুষের মনে ভয় আছে। বাইরের একটি দেশ যখন ইরানি নাগরিকদের মারছে এবং বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করছে, তখন জনমত স্বাভাবিকভাবেই বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এই সব ভুলের মূলে রয়েছে আমেরিকার স্বভাবসুলভ একগুঁয়েমি ও অজ্ঞতা। ইরানি সরকার সমালোচনা কুড়ালেও তাদের যন্ত্রণা সহ্য করার এক বিশাল ক্ষমতা আছে। একটি পরাশক্তির বিরুদ্ধে সামরিক জয়ের কোনো সুস্পষ্ট চিত্র না থাকলেও তারা দিনের পর দিন সংঘাত চালিয়ে যেতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন এই সহজ মনোভাব বুঝতে পারেনি বা পারলেও আমলে নেয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি মূলত আমেরিকান ক্ষমতার পেছনে হাঁটার ইতিহাস। গত চার দশকে আরব দেশগুলো আমেরিকার বশবর্তী হয়েই থেকেছে। তারা আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে এবং বিনিময়ে অর্থনৈতিক সহায়তা, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার ছাতা পেয়েছে। ঠিক এ কারণেই ইরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সহজ লক্ষ্যবস্তু মনে করে। কারণ তারা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোকে জায়গা দিয়েছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা হয়তো সরাসরি আক্রমণ করছে না, কিন্তু তারা পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধের অংশীদার।
আমেরিকা একধরনের ঘোরের মধ্যে ছিল। তারা ভেবেছিল সব রাস্তাই শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণের দিকে যায়। ইরান হয় আমেরিকার ক্ষমতার সুবিধা নেবে, নয়তো তাদের আধিপত্যের কাছে মাথা নত করবে। কিন্তু যে দেশগুলোর হিসাব কেবল লাভ-ক্ষতির ওপর নির্ভর করে না, তাদের ক্ষেত্রে এই যুক্তি খাটে না। বিশেষ করে যে দেশ বছরের পর বছর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকে টিকে থাকার নতুন কৌশল শিখেছে, তাদের কাছে ক্ষমতা মানে আধিপত্য নয়; তাদের কাছে ক্ষমতা মানে খেলায় টিকে থাকা। হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে হুথিদের মতো ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো প্রমাণ করে, ইরান নিজের সীমানার বাইরেও কতটা প্রভাব ধরে রাখতে পারে। তারা নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে এবং আরও একঘরে হওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাচ্ছে।
ট্রাম্প এমন এক শত্রুর মুখোমুখি হয়েছেন, যাকে তিনি বোঝেন না। এর কারণ শুধু তাঁর অজ্ঞতা নয়। ইরান সত্যিকার্থেই এক বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্র। তারা দশকের পর দশক ধরে দেশের ভেতরে এবং অঞ্চলে এক নতুন কাঠামো গড়ে তুলেছে। তাদের আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি এমনভাবে তৈরি যে আমেরিকান আধিপত্যের মুখে নিজেদের শর্তে টিকে থাকাই তাদের কাছে সাফল্য।
এই যুদ্ধ ধারণার চেয়ে কয়েক সপ্তাহ বেশি দীর্ঘ হচ্ছে এবং সহসা শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট

ইরানে মার্কিন হামলার বয়স ছয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন বেশ জোর গলায় এই সামরিক অভিযানকে ‘নিখুঁত ও অপ্রতিরোধ্য’ দাবি করে আসছিল। উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ‘আসন্ন পারমাণবিক হুমকি’ চিরতরে মুছে ফেলা। একই সঙ্গে ইরানি জনগণকে উসকে দিয়ে তাদের সরকারের পতন ঘটানো। কিন্তু বাস্তবতা এখন সেই ঘোষণার ঠিক উল্টো।
উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইরানের পাল্টা হামলার আতঙ্কে কাঁপছে। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। সামরিক শক্তিতে দুর্বল হওয়া বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পতনের কোনো লক্ষণই ইরানে দেখা যাচ্ছে না। অতীতের মতোই অহংকার আর অজ্ঞতার চরম মাশুল গুনছে আমেরিকা। বিশেষ করে ইরানি শাসনব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে এই ভুলগুলো আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
যুদ্ধের শুরুতে একধরনের মানসিক জড়তা কাজ করে। মানুষ সাধারণত ভাবে, লড়াই দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। আর সেই যুদ্ধে যদি আমেরিকা জড়ায়, তবে এই মানসিক জড়তা আরও দীর্ঘ হয়। কারণ আমেরিকার মতো পরাশক্তি দ্রুত তার লক্ষ্য অর্জন করবে এবং ইরানের মতো ‘দুর্বল’ শক্তি সহজেই আত্মসমর্পণ করবে—এই চিন্তাই মানুষ করে। মিত্ররা যে আমেরিকার পেছনে না দাঁড়াতেও পারে, এই চিন্তা কারো মাথায় তখন আসে না। সামরিক অভিযানের প্রভাব শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চল বা মানুষের মধ্যে আটকে থাকবে না—এই সত্য মানতেও তাদের কষ্ট হয়।
শুরুতে যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তার একটিও ফলেনি। সংঘাতের আঁচ গিয়ে লেগেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে ‘বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা’ দেখা দিতে পারে বলে এখনই পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় এবং উপসাগরীয় মিত্রদের এই হামলায় বা হরমুজ প্রণালি খোলার চেষ্টায় যুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানি সরকার এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। উল্টো তারা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও সেনাদের ব্যাপক ক্ষতি করে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণেই হিসেবে ভুল হয়েছে। যখন ইরানে হামলা শুরু হয়, তখন আমেরিকার সমর্থকরা এক অদ্ভুত উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল। তারা ভেবেছিল আমেরিকা আবার বিশ্বকে নিজের মতো করে সাজাচ্ছে।
‘নিউইয়র্ক পোস্ট’-এর সম্পাদকীয় পর্ষদ এই যুদ্ধকে ‘প্রজন্মের সেরা পদক্ষেপ’ বলেছিল। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ ঘোষণা দিয়েছিল, সব যুদ্ধের মতোই এতে ঝুঁকি আছে। কিন্তু এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যকে আরও ভালো কিছুর জন্য পুনর্গঠন করতে পারে এবং বিশ্বকে আরও নিরাপদ করতে পারে। যারা এই অতিরিক্ত আশাবাদের সমালোচনা করেছিলেন, তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট ব্রেট স্টিফেনস বলেছিলেন, ‘যারা এই যুদ্ধের বিপক্ষে, তাদের এই ভীতু মনোভাব ও হতাশা দেখে আমি হতবাক। যুদ্ধের মাত্র দুই সপ্তাহ পার হয়েছে। মাসের শেষেই এই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে।’
এখন মানসিক সেই জড়তা কেটে গেছে। সবাই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এখন আলোচনা চলছে চোরাবালি নিয়ে। কীভাবে ট্রাম্প এই যুদ্ধ থেকে মুখ রক্ষা করে বেরিয়ে আসতে পারেন, তা নিয়ে কথা হচ্ছে। পরিস্থিতি দেখে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের নিজস্ব জটিল সমীকরণ আছে। তাদের সহজে ছকে ফেলা যাবে না। শুধু সামরিক হামলা চালিয়ে তাদের দুর্বল করে দিলেই জনগণ সরকারের পতন ঘটাবে—এমন ভাবনার কোনো ভিত্তি নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ভুল ছিল ইরানের অসম যুদ্ধ বা ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ চালানোর ক্ষমতাকে খাটো করে দেখা। উপসাগরীয় অঞ্চলকে অচল ও অস্থিতিশীল করতে ইরানের হাতে বিপুল সামরিক শক্তির প্রয়োজন নেই। তারা এমনভাবে হামলা চালাচ্ছে না যা ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনে বা অনেক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। কিন্তু তারা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির করে দিতে পারে, জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে এবং অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। আর এর মাধ্যমে তারা আমেরিকার মিত্রদের এবং পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। সস্তা ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের একটানা হামলা চালিয়ে তারা ঠিক সেই লক্ষ্যই অর্জন করেছে।
দ্বিতীয় ভুল ছিল এক অদ্ভুত প্রত্যাশা। আমেরিকা ভেবেছিল ইরান তাদের সবচেয়ে দামি অস্ত্র ব্যবহার করবে না; অর্থাৎ তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না। অথচ গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ই প্রণালি বন্ধের বিষয় আলোচনায় এসেছিল। কাতারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছিলাম, তাদের মূল উদ্বেগ কাতারের দিকে আসা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নয়, বরং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় ভুল ছিল ইরানে জনগণের গণঅভ্যুত্থানের স্বপ্ন। নানা কারণেই এই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে বড় কারণ হলো, যখন মাথার ওপর বোমা পড়ছে তখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করা চরম বোকামি। এছাড়া কয়েক মাস আগেই সরকার বিক্ষোভকারীদের গুলি করে মেরেছে, তাই মানুষের মনে ভয় আছে। বাইরের একটি দেশ যখন ইরানি নাগরিকদের মারছে এবং বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস করছে, তখন জনমত স্বাভাবিকভাবেই বিভক্ত হয়ে পড়ে।
এই সব ভুলের মূলে রয়েছে আমেরিকার স্বভাবসুলভ একগুঁয়েমি ও অজ্ঞতা। ইরানি সরকার সমালোচনা কুড়ালেও তাদের যন্ত্রণা সহ্য করার এক বিশাল ক্ষমতা আছে। একটি পরাশক্তির বিরুদ্ধে সামরিক জয়ের কোনো সুস্পষ্ট চিত্র না থাকলেও তারা দিনের পর দিন সংঘাত চালিয়ে যেতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন এই সহজ মনোভাব বুঝতে পারেনি বা পারলেও আমলে নেয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি মূলত আমেরিকান ক্ষমতার পেছনে হাঁটার ইতিহাস। গত চার দশকে আরব দেশগুলো আমেরিকার বশবর্তী হয়েই থেকেছে। তারা আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে এবং বিনিময়ে অর্থনৈতিক সহায়তা, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার ছাতা পেয়েছে। ঠিক এ কারণেই ইরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের সহজ লক্ষ্যবস্তু মনে করে। কারণ তারা আমেরিকার সামরিক ঘাঁটিগুলোকে জায়গা দিয়েছে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা হয়তো সরাসরি আক্রমণ করছে না, কিন্তু তারা পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধের অংশীদার।
আমেরিকা একধরনের ঘোরের মধ্যে ছিল। তারা ভেবেছিল সব রাস্তাই শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণের দিকে যায়। ইরান হয় আমেরিকার ক্ষমতার সুবিধা নেবে, নয়তো তাদের আধিপত্যের কাছে মাথা নত করবে। কিন্তু যে দেশগুলোর হিসাব কেবল লাভ-ক্ষতির ওপর নির্ভর করে না, তাদের ক্ষেত্রে এই যুক্তি খাটে না। বিশেষ করে যে দেশ বছরের পর বছর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থেকে টিকে থাকার নতুন কৌশল শিখেছে, তাদের কাছে ক্ষমতা মানে আধিপত্য নয়; তাদের কাছে ক্ষমতা মানে খেলায় টিকে থাকা। হিজবুল্লাহ থেকে শুরু করে হুথিদের মতো ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো প্রমাণ করে, ইরান নিজের সীমানার বাইরেও কতটা প্রভাব ধরে রাখতে পারে। তারা নিজেদের স্বার্থ আদায় করে নিচ্ছে এবং আরও একঘরে হওয়া থেকে নিজেদের বাঁচাচ্ছে।
ট্রাম্প এমন এক শত্রুর মুখোমুখি হয়েছেন, যাকে তিনি বোঝেন না। এর কারণ শুধু তাঁর অজ্ঞতা নয়। ইরান সত্যিকার্থেই এক বৈচিত্র্যময় রাষ্ট্র। তারা দশকের পর দশক ধরে দেশের ভেতরে এবং অঞ্চলে এক নতুন কাঠামো গড়ে তুলেছে। তাদের আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি এমনভাবে তৈরি যে আমেরিকান আধিপত্যের মুখে নিজেদের শর্তে টিকে থাকাই তাদের কাছে সাফল্য।
এই যুদ্ধ ধারণার চেয়ে কয়েক সপ্তাহ বেশি দীর্ঘ হচ্ছে এবং সহসা শেষ হবে বলে মনে হচ্ছে না।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট

কোনো অঞ্চলে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি রোগের প্রাদুর্ভাব উচ্চহারে ছড়িয়ে পড়লে এক সময় তা মহামারিতে পরিণত হয়। মহামারির ইতিহাস বলে, রোগটি শ্রেণি নির্বিশেষে একটি ভৌগোলিক অঞ্চলকে রীতিমতো দিশাহারা ও পাগলপ্রায় বানিয়ে ফেলে।
৭ ঘণ্টা আগে
আজ ২২ মে, আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস। পৃথিবীর কোটি কোটি প্রজাতির উদ্ভিদ, প্রাণী আর অণুজীবের যে মেলবন্ধন এই পৃথিবীকে সচল রেখেছে, তাকে উদযাপনের এবং তা রক্ষায় আত্মদর্শনের দিন আজ। এবারের দিবসে জাতিসংঘের ঘোষিত প্রতিপাদ্য হলো—‘বৈশ্বিক প্রভাব সৃষ্টিতে স্থানীয় স্তরে পদক্ষেপ’।
১৫ ঘণ্টা আগে
একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে এখন শুধু নির্বাচিত সরকার বা আমলাতন্ত্রই যথেষ্ট নয়। এর জন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, গভীর নীতি-বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনায় দক্ষ একটি সংগঠিত ‘রাষ্ট্রীয় মস্তিষ্ক’। এই মস্তিষ্কের একটি দৃশ্যমান অংশ হলো উন্মুক্ত ও গবেষণাধর্মী রাষ্ট্রীয় থিংক ট্যাঙ্ক।
১ দিন আগে
প্রচারণা মতে, গত ১০ মে ছিল বিশ্ব মা দিবস। আর এ দিবসকে ঘিরে বাংলাদেশের গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, এমনকি বাস্তব নাগরিক দেখাসাক্ষাতেও নানামাত্রিক আবেগের প্রকাশ যথেষ্টই দেখা গেছে। তা দেখা যাবেই-বা না কেন!
২ দিন আগে