সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোতে নায়কের হাতে ‘বিশাল বন্দুক’ থাকা যেন এক নতুন ট্রেন্ড। ‘অ্যানিমেল’ থেকে শুরু করে দেশীয় ‘তুফান’ বা ‘মালিক’—সবখানেই পুরুষত্বকে সংজ্ঞায়িত করা হচ্ছে অস্ত্রের মাধ্যমে। কিন্তু পর্দার এই বন্দুক কি নিছকই প্রপস, নাকি পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য ও সহিংসতার এক ভয়ংকর বার্তা? নাজিয়া আফরিনের লেখাটিতে চলচ্চিত্র তত্ত্ব ও সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে এই মহিমান্বিত সহিংসতা সমাজমানসে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নাজিয়া আফরিন

ঈদে মুক্তি পাওয়া নতুন সিনেমা, হলভর্তি দর্শক, পর্দায় হিরো—এলোমেলো চুল, মুখভর্তি গোঁফ-দাড়ি এবং হাতে সেই বন্দুক। চিনতে পেরেছেন তো, কোন বন্দুকের কথা বলছি! যেটা ‘অ্যানিমেল’-এ রণবীর কাপুরের হাত থেকে এবার সরাসরি ‘মালিক’-এর আরিফিন শুভর হাতে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে! এর আগে ‘তুফান’-এ ছিল, ‘তাণ্ডব’-এ ছিল, গেল ঈদে ‘রাক্ষস’-এও ছিল। সিনেমা পাল্টায়, নায়ক পাল্টায়, কিন্তু বন্দুক সেই একই। এই বন্দুক এখন আর নেহাতই প্রপস নেই, এটা একটা ব্র্যান্ড। কিন্তু এই ব্র্যান্ড দর্শককে কি বার্তা দিচ্ছে?
২০২৩ সালে সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা পরিচালিত ‘অ্যানিমেল’ সিনেমাটি মুক্তি পায় এবং বক্স অফিসে ঝড় তোলে। সেই সঙ্গে সোশাল মিডিয়ায় আলোচনারও ঝড় ওঠে - সিনেমাটি কি স্পষ্টভাবেই নারীবিদ্বেষী? রণবীরের চরিত্র কি পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার গৌরবগাঁথা? পরিচালক জবাব দেন, এটা একটা ‘চরিত্র বিশ্লেষণ’, নৈতিকতার পাঠ দেওয়া তাঁর কাজ নয়। কিন্তু সিনেমা কখনোই নিরীহ ও নিরপেক্ষ হয় না।
চলচ্চিত্র তত্ত্বে একটি মৌলিক ধারণা হলো উপস্থাপনা। স্টুয়ার্ট হলের বিশ্লেষণে উপস্থাপন মানে শুধু ‘কী দেখানো হচ্ছে’ নয়, বরং ‘দেখানোর মাধ্যমে কোন অর্থ তৈরি হচ্ছে।’ হল তাঁর ‘রিপ্রেজেন্টেশন: কালচারাল রিপ্রেজেন্টেশনস অ্যান্ড সিগ্নিফায়িং প্র্যাক্টিসেস’ (১৯৯৭) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে মিডিয়া সংস্কৃতি কিছু ইমেজের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে একটি ডিসকোর্স তৈরি করে - যা ধীরে ধীরে ‘সত্যি’ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, ‘মালিক’ বা ‘তুফান’-এর মতো সিনেমায় নায়ক যখন বারবার একইভাবে উপস্থাপিত হন, তখন এই ইমেজটি সমাজে একটি ডিসকোর্স তৈরি করে যে পুরুষত্ব মানেই হাতে বড় বন্দুক।
পর্দায় একজন পুরুষ যত বেশি ধ্বংস করে, দর্শক তাকে তত বেশি “শক্তিশালী” হিসেবে পড়তে শেখে। এই পাঠই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
সমাজবিজ্ঞানী আর ডব্লিউ কনেল তাঁর ‘ম্যাসকুলিনিটিজ’ (১৯৯৫) গ্রন্থে হেজিমোনিক ম্যাসকুলিনিটি বা আধিপত্যশীল পুরুষত্বের ধারণা দিয়েছিলেন। কনেলের মতে, প্রতিটি সমাজেই পুরুষত্বের একটি ‘আদর্শ মডেল’ থাকে যেটি অন্য সব ধরনের পুরুষত্ব, যেমন: নরম, সংবেদনশীল, যত্নশীল - হাস্যকর বা হীন হিসেবে দেখায়। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমায় পুরুষত্বের যে নতুন মডেল তৈরি হয়েছে সেখানে - নায়ক কাঁদে না, নায়ক আলোচনা করে না, নায়ক গুলি করে আর দর্শক হাততালি দেয়।
এই হাততালির ভেতরে একটা নীরব সম্মতি লুকিয়ে থাকে। আমরা সম্মতি দিচ্ছি যে এটাই শক্তি, এটাই আদর্শ। ফ্রয়েডিয়ান মনোবিশ্লেষণে অস্ত্রকে দীর্ঘকাল ধরেই ফ্যালিক প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ বন্দুক কেবল হত্যার যন্ত্র নয়, এটি পুরুষালি কর্তৃত্বের চাক্ষুষ ঘোষণা। চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক লরা মালভি তাঁর প্রবন্ধ ‘ভিজ্যুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ (১৯৭৫)-এ বলেছিলেন, মূলধারার সিনেমা এমন একটি “মেল গেজ” বা পুরুষালি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্মিত যেখানে পর্দার সব কিছু পুরুষের আনন্দ ও ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ‘মালিক’, ‘রাক্ষস’ বা ‘তাণ্ডব’-এ পুরুষের তার বন্দুকই সবকিছুর কেন্দ্রে।
এবার সরাসরি প্রশ্নটা করেই ফেলি - এই সিনেমাগুলো কি বাস্তব সহিংসতাকে উস্কে দেয়?
২০১৯ সালে আমেরিকান জার্নাল পিএলওএস ওয়ানে এ প্রকাশিত ব্র্যাড বুশম্যান এবং তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে হলিউডের শীর্ষ ব্যবসাসফল ছবিগুলোতে বন্দুক সহিংসতার দৃশ্য প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। আর এই অস্ত্রের প্রতিটি উপস্থাপনা ছিল গ্ল্যামারাস, পরিণতিশূন্য এবং আকাঙ্ক্ষিত। গবেষকরা বলছেন, এই ধরনের উপস্থাপনা দর্শকের মনে, বিশেষত কিশোরদের মনে, অস্ত্রকে স্বাভাবিক এবং কাম্য করে তোলে। বাংলাদেশে এই গবেষণার সরাসরি প্রয়োগ না থাকলেও, সামাজিক বাস্তবতা বলছে - যে দেশে পারিবারিক সহিংসতার হার উদ্বেগজনক, যেখানে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মামলা প্রতিবছর বাড়ছে, সেখানে সিনেমার পর্দায় প্রদর্শিত এই “শক্তিমান পুরুষ”দের প্রভাব একেবারে শূন্যের কোঠায় নয়।
বেল হুকস তাঁর ‘দ্য উইল টু চেঞ্জ: মেন, ম্যাসকুলিনিটি, অ্যান্ড লাভ’ (২০০৪)-এ লিখেছেন - পুরুষরা আবেগ দেখালে দুর্বল হয়ে পড়বে, এই মিথটা পপুলার কালচার তৈরি করে এবং টিকিয়ে রাখে। এই মিথের শিকার পুরুষ নিজেও, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন যাঁরা তার আশেপাশে থাকেন।
এখানেই উপস্থাপনার মাধ্যমে ডিসকোর্স নির্মাণের ভূমিকাটা স্পষ্ট হয়। মিশেল ফুকো ডিসকোর্স বলতে বুঝিয়েছিলেন এমন একটি কাঠামো যা নির্ধারণ করে কোন কথা বলা যাবে, কোনটা বলা যাবে না, কোনটা ‘সত্যি’ আর কোনটা ‘অস্বাভাবিক’। সিনেমা যখন বারবার একই ধরনের পুরুষকে নায়ক করে, তখন এমন একটি ডিসকোর্স তৈরি করে, যা বলে, সংবেদনশীল পুরুষ নায়ক নয়, যে পুরুষ আলোচনা করে সে দুর্বল, ভালোবাসায় বিশ্বাসী পুরুষ বোকা। এই ডিসকোর্সে বড় হওয়া একটি প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে সেই ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করে। যে ছেলেটি “মালিক” দেখে হল থেকে বের হচ্ছে, সে শুধু একটা সিনেমা দেখে বের হচ্ছে না - সে একটা শিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে। শিক্ষাটা হলো: রাগই পৌরুষ, অস্ত্রই উত্তর।
বাংলাদেশি সিনেমার এই প্রবণতাকে বলিউডের অন্ধ অনুকরণ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এই অনুকরণের পেছনে একটা সচেতন বাণিজ্যিক যুক্তি আছে। প্রযোজকরা জানেন কী বিকোয়। জ্যাকসন কাটজ তাঁর তথ্যচিত্র “টাফ গাইস টু” (২০১৩)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে বিনোদন শিল্প পুরুষালি সহিংসতাকে একটি পণ্য হিসেবে বিক্রি করে এবং সেই বিক্রির চাপেই নির্মাতারা আরো বেশি সহিংসতা পরিবেশন করতে বাধ্য হন। এটি একটি চক্র - দর্শক চান, নির্মাতা বানান, আরো বেশি দর্শক অভ্যস্ত হন, আরো বেশি চান। কিন্তু এই চক্রে কেউ প্রশ্ন করেন না: দর্শক আসলে কি এটাই চাইছেন, নাকি তাঁদের এটাই চাইতে শেখানো হয়েছে?
নারীচরিত্রের কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। “অ্যানিমেল” থেকে শুরু করে এই ঘরানার বাংলাদেশি ছবিগুলোতে নারী মূলত তিনটি ভূমিকায় আসেন - উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা ভিকটিম, নায়কের পুরুষত্বের যোগ্যতার ‘পুরস্কার’, অথবা নিয়ন্ত্রণে রাখার বস্তু। এই তিনটি ভূমিকাই নারীকে একজন মানুষ না করে একটি উপকরণ করে তোলে। মালভির ভাষায়, নারী এখানে “টু-বি-লুকড-অ্যাট” - দেখার বস্তু, ক্রিয়াশীল সত্তা নয়। এই উপস্থাপনা যে ডিসকোর্স তৈরি করে তা বলে: নারীর নিরাপত্তা তার নিজের হাতে নয়, পুরুষের বন্দুকের নলের ডগায়।
তাহলে কি সিনেমায় সহিংসতা দেখানো যাবে না? অবশ্যই তেমনটা নয়। সমস্যা সহিংসতা দেখানোয় নয়, সহিংসতাকে মহিমান্বিত করায়। ‘গডফাদার’-এ সহিংসতা আছে, কিন্তু তার পরিণাম আছে। ‘মালিক’ বা ‘তান্ডব’-এর নায়ক যখন গুলি করেন, তখন কোনো পরিণাম নেই - শুধু আছে দর্শকের আমোদিত হর্ষধ্বনি। এই পরিণামহীনতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বার্তা।
লেখক: সাংবাদিক; শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস

ঈদে মুক্তি পাওয়া নতুন সিনেমা, হলভর্তি দর্শক, পর্দায় হিরো—এলোমেলো চুল, মুখভর্তি গোঁফ-দাড়ি এবং হাতে সেই বন্দুক। চিনতে পেরেছেন তো, কোন বন্দুকের কথা বলছি! যেটা ‘অ্যানিমেল’-এ রণবীর কাপুরের হাত থেকে এবার সরাসরি ‘মালিক’-এর আরিফিন শুভর হাতে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে! এর আগে ‘তুফান’-এ ছিল, ‘তাণ্ডব’-এ ছিল, গেল ঈদে ‘রাক্ষস’-এও ছিল। সিনেমা পাল্টায়, নায়ক পাল্টায়, কিন্তু বন্দুক সেই একই। এই বন্দুক এখন আর নেহাতই প্রপস নেই, এটা একটা ব্র্যান্ড। কিন্তু এই ব্র্যান্ড দর্শককে কি বার্তা দিচ্ছে?
২০২৩ সালে সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা পরিচালিত ‘অ্যানিমেল’ সিনেমাটি মুক্তি পায় এবং বক্স অফিসে ঝড় তোলে। সেই সঙ্গে সোশাল মিডিয়ায় আলোচনারও ঝড় ওঠে - সিনেমাটি কি স্পষ্টভাবেই নারীবিদ্বেষী? রণবীরের চরিত্র কি পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতার গৌরবগাঁথা? পরিচালক জবাব দেন, এটা একটা ‘চরিত্র বিশ্লেষণ’, নৈতিকতার পাঠ দেওয়া তাঁর কাজ নয়। কিন্তু সিনেমা কখনোই নিরীহ ও নিরপেক্ষ হয় না।
চলচ্চিত্র তত্ত্বে একটি মৌলিক ধারণা হলো উপস্থাপনা। স্টুয়ার্ট হলের বিশ্লেষণে উপস্থাপন মানে শুধু ‘কী দেখানো হচ্ছে’ নয়, বরং ‘দেখানোর মাধ্যমে কোন অর্থ তৈরি হচ্ছে।’ হল তাঁর ‘রিপ্রেজেন্টেশন: কালচারাল রিপ্রেজেন্টেশনস অ্যান্ড সিগ্নিফায়িং প্র্যাক্টিসেস’ (১৯৯৭) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে মিডিয়া সংস্কৃতি কিছু ইমেজের পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে একটি ডিসকোর্স তৈরি করে - যা ধীরে ধীরে ‘সত্যি’ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, ‘মালিক’ বা ‘তুফান’-এর মতো সিনেমায় নায়ক যখন বারবার একইভাবে উপস্থাপিত হন, তখন এই ইমেজটি সমাজে একটি ডিসকোর্স তৈরি করে যে পুরুষত্ব মানেই হাতে বড় বন্দুক।
পর্দায় একজন পুরুষ যত বেশি ধ্বংস করে, দর্শক তাকে তত বেশি “শক্তিশালী” হিসেবে পড়তে শেখে। এই পাঠই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
সমাজবিজ্ঞানী আর ডব্লিউ কনেল তাঁর ‘ম্যাসকুলিনিটিজ’ (১৯৯৫) গ্রন্থে হেজিমোনিক ম্যাসকুলিনিটি বা আধিপত্যশীল পুরুষত্বের ধারণা দিয়েছিলেন। কনেলের মতে, প্রতিটি সমাজেই পুরুষত্বের একটি ‘আদর্শ মডেল’ থাকে যেটি অন্য সব ধরনের পুরুষত্ব, যেমন: নরম, সংবেদনশীল, যত্নশীল - হাস্যকর বা হীন হিসেবে দেখায়। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমায় পুরুষত্বের যে নতুন মডেল তৈরি হয়েছে সেখানে - নায়ক কাঁদে না, নায়ক আলোচনা করে না, নায়ক গুলি করে আর দর্শক হাততালি দেয়।
এই হাততালির ভেতরে একটা নীরব সম্মতি লুকিয়ে থাকে। আমরা সম্মতি দিচ্ছি যে এটাই শক্তি, এটাই আদর্শ। ফ্রয়েডিয়ান মনোবিশ্লেষণে অস্ত্রকে দীর্ঘকাল ধরেই ফ্যালিক প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ বন্দুক কেবল হত্যার যন্ত্র নয়, এটি পুরুষালি কর্তৃত্বের চাক্ষুষ ঘোষণা। চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক লরা মালভি তাঁর প্রবন্ধ ‘ভিজ্যুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ (১৯৭৫)-এ বলেছিলেন, মূলধারার সিনেমা এমন একটি “মেল গেজ” বা পুরুষালি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্মিত যেখানে পর্দার সব কিছু পুরুষের আনন্দ ও ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ‘মালিক’, ‘রাক্ষস’ বা ‘তাণ্ডব’-এ পুরুষের তার বন্দুকই সবকিছুর কেন্দ্রে।
এবার সরাসরি প্রশ্নটা করেই ফেলি - এই সিনেমাগুলো কি বাস্তব সহিংসতাকে উস্কে দেয়?
২০১৯ সালে আমেরিকান জার্নাল পিএলওএস ওয়ানে এ প্রকাশিত ব্র্যাড বুশম্যান এবং তাঁর সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে হলিউডের শীর্ষ ব্যবসাসফল ছবিগুলোতে বন্দুক সহিংসতার দৃশ্য প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। আর এই অস্ত্রের প্রতিটি উপস্থাপনা ছিল গ্ল্যামারাস, পরিণতিশূন্য এবং আকাঙ্ক্ষিত। গবেষকরা বলছেন, এই ধরনের উপস্থাপনা দর্শকের মনে, বিশেষত কিশোরদের মনে, অস্ত্রকে স্বাভাবিক এবং কাম্য করে তোলে। বাংলাদেশে এই গবেষণার সরাসরি প্রয়োগ না থাকলেও, সামাজিক বাস্তবতা বলছে - যে দেশে পারিবারিক সহিংসতার হার উদ্বেগজনক, যেখানে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মামলা প্রতিবছর বাড়ছে, সেখানে সিনেমার পর্দায় প্রদর্শিত এই “শক্তিমান পুরুষ”দের প্রভাব একেবারে শূন্যের কোঠায় নয়।
বেল হুকস তাঁর ‘দ্য উইল টু চেঞ্জ: মেন, ম্যাসকুলিনিটি, অ্যান্ড লাভ’ (২০০৪)-এ লিখেছেন - পুরুষরা আবেগ দেখালে দুর্বল হয়ে পড়বে, এই মিথটা পপুলার কালচার তৈরি করে এবং টিকিয়ে রাখে। এই মিথের শিকার পুরুষ নিজেও, কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন যাঁরা তার আশেপাশে থাকেন।
এখানেই উপস্থাপনার মাধ্যমে ডিসকোর্স নির্মাণের ভূমিকাটা স্পষ্ট হয়। মিশেল ফুকো ডিসকোর্স বলতে বুঝিয়েছিলেন এমন একটি কাঠামো যা নির্ধারণ করে কোন কথা বলা যাবে, কোনটা বলা যাবে না, কোনটা ‘সত্যি’ আর কোনটা ‘অস্বাভাবিক’। সিনেমা যখন বারবার একই ধরনের পুরুষকে নায়ক করে, তখন এমন একটি ডিসকোর্স তৈরি করে, যা বলে, সংবেদনশীল পুরুষ নায়ক নয়, যে পুরুষ আলোচনা করে সে দুর্বল, ভালোবাসায় বিশ্বাসী পুরুষ বোকা। এই ডিসকোর্সে বড় হওয়া একটি প্রজন্ম স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে সেই ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করে। যে ছেলেটি “মালিক” দেখে হল থেকে বের হচ্ছে, সে শুধু একটা সিনেমা দেখে বের হচ্ছে না - সে একটা শিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে। শিক্ষাটা হলো: রাগই পৌরুষ, অস্ত্রই উত্তর।
বাংলাদেশি সিনেমার এই প্রবণতাকে বলিউডের অন্ধ অনুকরণ বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ এই অনুকরণের পেছনে একটা সচেতন বাণিজ্যিক যুক্তি আছে। প্রযোজকরা জানেন কী বিকোয়। জ্যাকসন কাটজ তাঁর তথ্যচিত্র “টাফ গাইস টু” (২০১৩)-এ দেখিয়েছেন কীভাবে বিনোদন শিল্প পুরুষালি সহিংসতাকে একটি পণ্য হিসেবে বিক্রি করে এবং সেই বিক্রির চাপেই নির্মাতারা আরো বেশি সহিংসতা পরিবেশন করতে বাধ্য হন। এটি একটি চক্র - দর্শক চান, নির্মাতা বানান, আরো বেশি দর্শক অভ্যস্ত হন, আরো বেশি চান। কিন্তু এই চক্রে কেউ প্রশ্ন করেন না: দর্শক আসলে কি এটাই চাইছেন, নাকি তাঁদের এটাই চাইতে শেখানো হয়েছে?
নারীচরিত্রের কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। “অ্যানিমেল” থেকে শুরু করে এই ঘরানার বাংলাদেশি ছবিগুলোতে নারী মূলত তিনটি ভূমিকায় আসেন - উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা ভিকটিম, নায়কের পুরুষত্বের যোগ্যতার ‘পুরস্কার’, অথবা নিয়ন্ত্রণে রাখার বস্তু। এই তিনটি ভূমিকাই নারীকে একজন মানুষ না করে একটি উপকরণ করে তোলে। মালভির ভাষায়, নারী এখানে “টু-বি-লুকড-অ্যাট” - দেখার বস্তু, ক্রিয়াশীল সত্তা নয়। এই উপস্থাপনা যে ডিসকোর্স তৈরি করে তা বলে: নারীর নিরাপত্তা তার নিজের হাতে নয়, পুরুষের বন্দুকের নলের ডগায়।
তাহলে কি সিনেমায় সহিংসতা দেখানো যাবে না? অবশ্যই তেমনটা নয়। সমস্যা সহিংসতা দেখানোয় নয়, সহিংসতাকে মহিমান্বিত করায়। ‘গডফাদার’-এ সহিংসতা আছে, কিন্তু তার পরিণাম আছে। ‘মালিক’ বা ‘তান্ডব’-এর নায়ক যখন গুলি করেন, তখন কোনো পরিণাম নেই - শুধু আছে দর্শকের আমোদিত হর্ষধ্বনি। এই পরিণামহীনতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক বার্তা।
লেখক: সাংবাদিক; শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস

১৯৮০ সালের পহেলা জুন মিডিয়া মোগল টেড টার্নার আটলান্টা শহর থেকে বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদচ্যানেল সিএনএন চালু করলেন। চার দশকেরও বেশি সময় পর এসে দেখা গেল, টার্নারের সেই ‘নেটওয়ার্ক’ বিশ্ব সংবাদব্যবস্থার ডিএনএ বদলে দিয়েছে।
৬ ঘণ্টা আগে
কামরুদ্দীন আবসার ভাই কেবল একজন সাধারণ সংস্কৃতিকর্মী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এদেশের গণসাংস্কৃতিক আন্দোলনের একজন নিবেদিতপ্রাণ মহীরুহ। একাধারে তিনি ছিলেন গণসংগীতের অসাধারণ এক কণ্ঠশিল্পী, তীক্ষ্ণ লেখনীর অধিকারী, গুণী সুরকার এবং সর্বোপরি গণসংগীতের একজন প্রকৃত ওস্তাদ।
২০ ঘণ্টা আগে
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছেন। কিন্তু তাদের বড় একটি অংশই চাকরির বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছেন না। ফলে উচ্চশিক্ষা কেবল একটি 'সার্টিফিকেট-নির্ভর' ব্যবস্থায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
২০ ঘণ্টা আগে
পদ্মা ব্যারেজ হয়তো আঞ্চলিক পানি সংকট মেটানোর সুযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং, এটি উপমহাদেশে একতরফা আধিপত্য বিস্তার বা অপরিকল্পিত বাঁধ বানানোর অশুভ প্রতিযোগিতাকে আরও উসকে দিতে পারে। সঠিক কোনো চুক্তির অভাব থাকায় দক্ষিণ এশিয়া এখন বাঁধ নির্মাণের এক বিপজ্জনক যুগে ঢুকছে।
২১ ঘণ্টা আগে