আমীন আল রশীদ

বাংলায় আমরা বলি সড়ক দুর্ঘটনা। ইংরেজিতে সেটিকে লেখা হয় ‘রোড ক্র্যাশ’। ক্র্যাশের বাংলা দুর্ঘটনা হয় না। উপযুক্ত বাংলা পাওয়া যায় না বলেই হয়তো দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু আপনি যখন কোনো ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে উল্লেখ করবেন বা মেনে নেবেন, তখন সেখানে কাউকে দায়ী করা যায় না। মনে হয় সেখানে কারও দায় নেই। এটা প্রাকৃতিক কারণে বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হয়েছে।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার নামে যেসব প্রাণহানি হয়, সেগুলোর কারণের ধরণ কী? সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা ও অসতর্কতা, যার হার প্রায় ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ। তুলনায় যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ। প্রাকৃতিক কারণ যেমন কুয়াশা বা ঝড়ে ঘটে মাত্র ৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ । বুয়েট এআরআই, বিআরটিএ এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। অধিকাংশ ঘটনাই মানবসৃষ্ট। সুতরাং এটিকে দুর্ঘটনা বলে দায় এড়ানো বা কাউকে দায়মুক্ত করার সুযোগ নেই। বরং এগুলো হত্যাকাণ্ড এবং আত্মহত্যা।
কোনটা হত্যা আর কোনটা আত্মহত্যা, সেই ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে সবশেষ ঘটনার উল্লেখ করা দরকার।
বুধবার বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস। এই নিবন্ধটি লেখা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৬। সংবাদমাধ্যম বলছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা বাসটি দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। হঠাৎ এটি চলতে শুরু করে। চালক তখন আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। এটি পন্টুন পেরিয়ে উল্টে পদ্মায় পড়ে সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, ফেরিতে ওঠার জন্য অপেক্ষায় থাকা বাসটি হঠাৎ চলতে শুরু করলো কেন? তখন কি চালকের আসনে কেউ ছিলেন না? তার মানে কি বাসটি চালু ছিল এবং চালকের আসনে কেউ ছিলেন না? সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ লিখেছেন, বাসটি তখন চালিয়ে ফেরিতে ওঠানোর চেষ্টা করছিলেন বাসের হেলপার। চালক তখন চা খাচ্ছিলেন। যদি এই ঘটনা সত্যি হয় তাহলে এখানে অপরাধ দুটি। ফেরিতে ওঠার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে চালক তার সিটে ছিলেন না এবং হেলপারকে দিয়ে তিনি বাস চালাচ্ছিলেন।
সঠিক ও নির্মোহ তদন্ত করে দেখতে হবে সত্যিই ফেরিতে ওঠার সময় চালকের আসনে কে ছিলেন বা আদৌ কেউ ছিলেন কি না? যদি এমন হয় যে বাসটি চালু ছিল কিন্তু চালকের আসনে কেউ ছিলেন না, সেটি আরেকটি অপরাধ। তার মানে এখানে যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন, তার পুরো দায় চালকের।
আবার যদি সত্যিই চালক দক্ষ হয়ে থাকেন আর বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার সময় তিনি তার আসনে থেকে থাকেন, তাহলে বাসটি কেন নদীতে পড়ে গেলো? এখানে ফেরিঘাটের অব্যবস্থাপনা বা ঘাটের কোনো ত্রুটি দায়ী কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। যদি ঘাটের অব্যবস্থাপনা দায়ী হয় তাহলে ঘাট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আরেকটি জরুরি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেটি হলো, বাস যখন ফেরিতে ওঠে, তখন যাত্রীদের বাসের ভেতরে বসে থাকার কথা নয়। পদ্মা সেতু হওয়ার আগে ঢাকা থেকে বরিশালে যাতায়াতের সময় দেখেছি, বাস ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রীরা নেমে যান। বাসের হেলপারও যাত্রীদের নেমে যেতে বলেন। কিন্তু দৌলতদিয়ায় যে বাসটি নদীতে পড়ে গেলো, সেই বাসের হেলপার কি যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যেতে বলেছিলেন? যাত্রীরাই বা কেন ফেরিতে ওঠার সময় বাসে বসেছিলেন? এটুকু সচেতনতা তাদের মধ্যে তৈরি হল না কেন?
নিহতদের প্রতি সমব্যথি হয়েই এ কথা বলা দরকার যে, অনেক ‘দুর্ঘটনার’ পেছনে যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতাও দায়ী। অনেক সময় বাস জোরে চালানোর জন্য চালককে প্ররোচিত করেন যাত্রীরা। আবার অনেক সময় চালক যদি বেপরোয়া গতিতে চালান তখন অনেক যাত্রী তার প্রতিবাদ করেন না। একসঙ্গে সবাই প্রতিবাদ করলে কোনো চালকের পক্ষে বেপরোয়া গতিতে চালানো সম্ভব নয়।
গত ১৯ মার্চ ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা থেকে বাসে বরিশাল যাই। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে যাত্রাবিরতির জন্য একটি রেস্টুরেন্টে থামার সময় আমাদের বাস সামনের বাসকে মোটামুটি জোরে ধাক্কা দেয়। তাতে বাসের সামনের কাঁচ ভেঙে যায়। সামনের বাসটির পেছনের অংশও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পরে হেলপার বাসের চালককে বলছিলেন, ‘ওস্তাদ একটু মুখে পানি দেন।’ মানে, বাসের চালক ক্লান্ত ছিলেন। ঈদযাত্রার কারণে তিনি নিশ্চয়ই অতিরিক্ত ডিউটি করেছেন। হয়তো আগের রাতে গাড়ি চালিয়ে পরদিন সকালে আবার রওনা হয়েছেন। ঘুমঘুম চোখ আর শরীরের ক্লান্তি নিয়ে তিনি প্রায় ৪০ জন যাত্রী নিয়ে রওনা হয়েছেন মহাসড়কে। যাত্রাবিরতির জন্য দুটি বাসের গতিই কম ছিল। কিন্তু আমাদের বাসটি যদি দ্রুত গতিতে থাকতো এবং সেই অবস্থায় সামনের বাসটিকে ধাক্কা দিতো তাহলে কত লোকের প্রাণহানি হতো তা বলা মুশকিল।
এই ঘটনার পরে চালক দাবি করেছেন, ব্রেক ফেইল করেছে। যদি তাই হয় তাহলে বাস কর্তৃপক্ষকে এই প্রশ্ন করতে হবে যে, মহাসড়কে বাস পাঠানোর আগে তারা কি প্রতিটি বাসের ফিটনেস পরীক্ষা করেন? ব্রেক ঠিক আছে কি না, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বাসগুলো স্ট্যান্ড থেকে ছাড়া হয়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সম্ভবত খুব সন্তোষজনক কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।
ঈদের সময় মহাসড়কের অধিকাংশ বাসের চালকরাই অতিরিক্ত ডিউটি করেন বা করতে বাধ্য হন। কেননা তখন একসঙ্গে অনেক মানুষ বাড়ির দিকে রওনা হয় এবং ঈদ শেষে একসঙ্গে অনেক মানুষ কর্মস্থলে ফেরে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিবহনের দরকার হয়। কিন্তু সেই অনুপাতে বাসের চালক থাকে না। যে কারণে অনেকেই সারা রাত গাড়ি চালিয়ে পরদিন ভোরে আবার রওনা হন। দেখা যায় কেউ কেউ হয়তো টানা ২৪ ঘণ্টাই চালকের আসনে বসে আছেন। তার না আছে ঘুম, না আছে বিশ্রাম। তার সঙ্গে আছে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বাসের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সব মিলিয়ে ঈদের সময় দূরপাল্লার বাসে ওঠা মানে এক অনিশ্চিত যাত্রা। এক কোটি মানুষের মধ্যে যদি ১০০ মানুষেরও প্রাণহানি হয়, সংখ্যার বিচারে সেটি যাই হোক না কেন, ওই ১০০ লোকের পরিবার জানে এর কী যন্ত্রণা!
সড়ক পরিবহন খাতের সামগ্রিক সংকট ও বিশৃঙ্খলার পরিণতি এইসব নির্মম মৃত্যু। অতএব এগুলোকে দুর্ঘটনা বলে কাউকে দায়মুক্তি দেয়ার সুযোগ নেই। এগুলো সিস্টেম্যাটিক হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। রাষ্ট্র যদি কোনো একটি খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে অপরাধ ও দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে। রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত না পরিবহন সেক্টরকে জবাবদিহি আর স্বচ্ছতার মধ্যে আনতে পারবে; যতক্ষণ না এখানে পেশাদারির চর্চা শুরু হবে; যতক্ষণ না দক্ষ ও শিক্ষিত চালকদের হাতে স্টিয়ারিং তুলে দেয়া যাচ্ছে—ততক্ষণ সড়ক মহাসড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু থামানো যাবে না।
শেষ করা যাক আত্মহত্যার প্রসঙ্গ দিয়ে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, সড়ক মহাসড়কে যতগুলো মোটর সাইকেল দুর্ঘটনার মানুষ নিহত হয়, তার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ঘটে চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা ও অসতর্কতার কারণে। মহাসড়কে উঠলেই মোটর সাইকেলের গতি উঠে যায় একশোতে। এত দ্রুত কেন চালাতে হবে? আপনি যত দ্রুতই মোটর সাইকেল চালান না কেন, যিনি ধীরে চালাচ্ছেন, তার চেয়ে দশ মিনিট বা আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছাবেন। আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছাতে গিয়ে যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করলেন, তার জন্য দায়ী কে? দায়ী চালক নিজেই। এগুলো স্পষ্টতই আত্মহত্যা।
সড়কে কাঠামোগত হত্যা এবং আত্মহত্যা বন্ধ হোক। তা বন্ধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সর্বত্র সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শুধু কঠোর আইন করলেই হয় না, সেই আইন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অভিপ্রায় দরকার এবং যারা আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সৎ হতে হয়। সেখানে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও বিরাট শূন্যতা রয়ে গেছে।

বাংলায় আমরা বলি সড়ক দুর্ঘটনা। ইংরেজিতে সেটিকে লেখা হয় ‘রোড ক্র্যাশ’। ক্র্যাশের বাংলা দুর্ঘটনা হয় না। উপযুক্ত বাংলা পাওয়া যায় না বলেই হয়তো দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু আপনি যখন কোনো ঘটনাকে ‘দুর্ঘটনা’ বলে উল্লেখ করবেন বা মেনে নেবেন, তখন সেখানে কাউকে দায়ী করা যায় না। মনে হয় সেখানে কারও দায় নেই। এটা প্রাকৃতিক কারণে বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হয়েছে।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার নামে যেসব প্রাণহানি হয়, সেগুলোর কারণের ধরণ কী? সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা ও অসতর্কতা, যার হার প্রায় ৮০ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ। তুলনায় যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ। প্রাকৃতিক কারণ যেমন কুয়াশা বা ঝড়ে ঘটে মাত্র ৩ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ । বুয়েট এআরআই, বিআরটিএ এবং যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। অধিকাংশ ঘটনাই মানবসৃষ্ট। সুতরাং এটিকে দুর্ঘটনা বলে দায় এড়ানো বা কাউকে দায়মুক্ত করার সুযোগ নেই। বরং এগুলো হত্যাকাণ্ড এবং আত্মহত্যা।
কোনটা হত্যা আর কোনটা আত্মহত্যা, সেই ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে সবশেষ ঘটনার উল্লেখ করা দরকার।
বুধবার বিকেলে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস। এই নিবন্ধটি লেখা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২৬। সংবাদমাধ্যম বলছে, কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা বাসটি দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার অপেক্ষায় ছিল। হঠাৎ এটি চলতে শুরু করে। চালক তখন আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। এটি পন্টুন পেরিয়ে উল্টে পদ্মায় পড়ে সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যায়।
প্রশ্ন হলো, ফেরিতে ওঠার জন্য অপেক্ষায় থাকা বাসটি হঠাৎ চলতে শুরু করলো কেন? তখন কি চালকের আসনে কেউ ছিলেন না? তার মানে কি বাসটি চালু ছিল এবং চালকের আসনে কেউ ছিলেন না? সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ লিখেছেন, বাসটি তখন চালিয়ে ফেরিতে ওঠানোর চেষ্টা করছিলেন বাসের হেলপার। চালক তখন চা খাচ্ছিলেন। যদি এই ঘটনা সত্যি হয় তাহলে এখানে অপরাধ দুটি। ফেরিতে ওঠার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে চালক তার সিটে ছিলেন না এবং হেলপারকে দিয়ে তিনি বাস চালাচ্ছিলেন।
সঠিক ও নির্মোহ তদন্ত করে দেখতে হবে সত্যিই ফেরিতে ওঠার সময় চালকের আসনে কে ছিলেন বা আদৌ কেউ ছিলেন কি না? যদি এমন হয় যে বাসটি চালু ছিল কিন্তু চালকের আসনে কেউ ছিলেন না, সেটি আরেকটি অপরাধ। তার মানে এখানে যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন, তার পুরো দায় চালকের।
আবার যদি সত্যিই চালক দক্ষ হয়ে থাকেন আর বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার সময় তিনি তার আসনে থেকে থাকেন, তাহলে বাসটি কেন নদীতে পড়ে গেলো? এখানে ফেরিঘাটের অব্যবস্থাপনা বা ঘাটের কোনো ত্রুটি দায়ী কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে হবে। যদি ঘাটের অব্যবস্থাপনা দায়ী হয় তাহলে ঘাট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আরেকটি জরুরি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সেটি হলো, বাস যখন ফেরিতে ওঠে, তখন যাত্রীদের বাসের ভেতরে বসে থাকার কথা নয়। পদ্মা সেতু হওয়ার আগে ঢাকা থেকে বরিশালে যাতায়াতের সময় দেখেছি, বাস ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রীরা নেমে যান। বাসের হেলপারও যাত্রীদের নেমে যেতে বলেন। কিন্তু দৌলতদিয়ায় যে বাসটি নদীতে পড়ে গেলো, সেই বাসের হেলপার কি যাত্রীদের বাস থেকে নেমে যেতে বলেছিলেন? যাত্রীরাই বা কেন ফেরিতে ওঠার সময় বাসে বসেছিলেন? এটুকু সচেতনতা তাদের মধ্যে তৈরি হল না কেন?
নিহতদের প্রতি সমব্যথি হয়েই এ কথা বলা দরকার যে, অনেক ‘দুর্ঘটনার’ পেছনে যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতাও দায়ী। অনেক সময় বাস জোরে চালানোর জন্য চালককে প্ররোচিত করেন যাত্রীরা। আবার অনেক সময় চালক যদি বেপরোয়া গতিতে চালান তখন অনেক যাত্রী তার প্রতিবাদ করেন না। একসঙ্গে সবাই প্রতিবাদ করলে কোনো চালকের পক্ষে বেপরোয়া গতিতে চালানো সম্ভব নয়।
গত ১৯ মার্চ ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকা থেকে বাসে বরিশাল যাই। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে যাত্রাবিরতির জন্য একটি রেস্টুরেন্টে থামার সময় আমাদের বাস সামনের বাসকে মোটামুটি জোরে ধাক্কা দেয়। তাতে বাসের সামনের কাঁচ ভেঙে যায়। সামনের বাসটির পেছনের অংশও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পরে হেলপার বাসের চালককে বলছিলেন, ‘ওস্তাদ একটু মুখে পানি দেন।’ মানে, বাসের চালক ক্লান্ত ছিলেন। ঈদযাত্রার কারণে তিনি নিশ্চয়ই অতিরিক্ত ডিউটি করেছেন। হয়তো আগের রাতে গাড়ি চালিয়ে পরদিন সকালে আবার রওনা হয়েছেন। ঘুমঘুম চোখ আর শরীরের ক্লান্তি নিয়ে তিনি প্রায় ৪০ জন যাত্রী নিয়ে রওনা হয়েছেন মহাসড়কে। যাত্রাবিরতির জন্য দুটি বাসের গতিই কম ছিল। কিন্তু আমাদের বাসটি যদি দ্রুত গতিতে থাকতো এবং সেই অবস্থায় সামনের বাসটিকে ধাক্কা দিতো তাহলে কত লোকের প্রাণহানি হতো তা বলা মুশকিল।
এই ঘটনার পরে চালক দাবি করেছেন, ব্রেক ফেইল করেছে। যদি তাই হয় তাহলে বাস কর্তৃপক্ষকে এই প্রশ্ন করতে হবে যে, মহাসড়কে বাস পাঠানোর আগে তারা কি প্রতিটি বাসের ফিটনেস পরীক্ষা করেন? ব্রেক ঠিক আছে কি না, অন্যান্য যন্ত্রপাতি ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, সেগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বাসগুলো স্ট্যান্ড থেকে ছাড়া হয়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সম্ভবত খুব সন্তোষজনক কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।
ঈদের সময় মহাসড়কের অধিকাংশ বাসের চালকরাই অতিরিক্ত ডিউটি করেন বা করতে বাধ্য হন। কেননা তখন একসঙ্গে অনেক মানুষ বাড়ির দিকে রওনা হয় এবং ঈদ শেষে একসঙ্গে অনেক মানুষ কর্মস্থলে ফেরে। ফলে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি পরিবহনের দরকার হয়। কিন্তু সেই অনুপাতে বাসের চালক থাকে না। যে কারণে অনেকেই সারা রাত গাড়ি চালিয়ে পরদিন ভোরে আবার রওনা হন। দেখা যায় কেউ কেউ হয়তো টানা ২৪ ঘণ্টাই চালকের আসনে বসে আছেন। তার না আছে ঘুম, না আছে বিশ্রাম। তার সঙ্গে আছে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বাসের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সব মিলিয়ে ঈদের সময় দূরপাল্লার বাসে ওঠা মানে এক অনিশ্চিত যাত্রা। এক কোটি মানুষের মধ্যে যদি ১০০ মানুষেরও প্রাণহানি হয়, সংখ্যার বিচারে সেটি যাই হোক না কেন, ওই ১০০ লোকের পরিবার জানে এর কী যন্ত্রণা!
সড়ক পরিবহন খাতের সামগ্রিক সংকট ও বিশৃঙ্খলার পরিণতি এইসব নির্মম মৃত্যু। অতএব এগুলোকে দুর্ঘটনা বলে কাউকে দায়মুক্তি দেয়ার সুযোগ নেই। এগুলো সিস্টেম্যাটিক হত্যাকাণ্ড এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। রাষ্ট্র যদি কোনো একটি খাতে সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেখানে অপরাধ ও দুর্ঘটনা বাড়তেই থাকবে। রাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত না পরিবহন সেক্টরকে জবাবদিহি আর স্বচ্ছতার মধ্যে আনতে পারবে; যতক্ষণ না এখানে পেশাদারির চর্চা শুরু হবে; যতক্ষণ না দক্ষ ও শিক্ষিত চালকদের হাতে স্টিয়ারিং তুলে দেয়া যাচ্ছে—ততক্ষণ সড়ক মহাসড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু থামানো যাবে না।
শেষ করা যাক আত্মহত্যার প্রসঙ্গ দিয়ে। অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, সড়ক মহাসড়কে যতগুলো মোটর সাইকেল দুর্ঘটনার মানুষ নিহত হয়, তার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ঘটে চালকের বেপরোয়া গতি, অদক্ষতা ও অসতর্কতার কারণে। মহাসড়কে উঠলেই মোটর সাইকেলের গতি উঠে যায় একশোতে। এত দ্রুত কেন চালাতে হবে? আপনি যত দ্রুতই মোটর সাইকেল চালান না কেন, যিনি ধীরে চালাচ্ছেন, তার চেয়ে দশ মিনিট বা আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছাবেন। আধা ঘণ্টা আগে পৌঁছাতে গিয়ে যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করলেন, তার জন্য দায়ী কে? দায়ী চালক নিজেই। এগুলো স্পষ্টতই আত্মহত্যা।
সড়কে কাঠামোগত হত্যা এবং আত্মহত্যা বন্ধ হোক। তা বন্ধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সর্বত্র সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শুধু কঠোর আইন করলেই হয় না, সেই আইন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অভিপ্রায় দরকার এবং যারা আইন বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সৎ হতে হয়। সেখানে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও বিরাট শূন্যতা রয়ে গেছে।

হ্যাঁ আমরা সেই কম হেঁটে যাওয়া মানুষের পথে হেঁটেছিলাম। যে পথ ভয়ের, ক্ষয়ের, ত্যাগের এবং অস্তিত্বের সেই পথেই আমরা হেঁটেছি। ১৯৭১ সাল; বাঙালি হেঁটেছে অস্তিত্বের পথে। জীবনের সহজ সুখের সমস্ত পথ রুদ্ধ করে, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর জীবনের মায়া ত্যাগ করে স্বাধীনতার কণ্টকাকীর্ণ পথ বেছে নিয়েছিল অজস্র যুবা
৮ ঘণ্টা আগে
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে বর্বরোচিত সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম সুপরিকল্পিত ও নৃশংস নিধনযজ্ঞ হিসেবে চিহ্নিত।
২০ ঘণ্টা আগে
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক, উভয় পর্যায়েই সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা মোটেই গ্রহণযোগ্য বা সন্তোষজনক নয়। প্রাথমিকে প্রায় পুরোটাই সরকারি দায়িত্বে পরিচালিত হয়। মাধ্যমিকে সরকারি স্কুলের সংখ্যা কম হলেও এমপিওভুক্ত স্কুলগুলো মূলত সরকারি অর্থায়নেই চলে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলোর...
১ দিন আগে
আমার বাবা এদেশের একজন প্রখ্যাত কবি। সংসারে আমরা ছিলাম ছয় ভাইবোন। বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, মা সামলাতেন ঘর। নিম্ন মধ্যবিত্তের সেই জীবনে বিলাসিতার কোনো জায়গা ছিল না। নতুন জামার জন্য অপেক্ষা করতে হতো, কখনো হতো না-ও। কিন্তু একটি জায়গায় বাবা কোনো দিন কার্পণ্য করেননি। সেটি, বই।
১ দিন আগে