স্ক্রল, স্ট্রেস আর সারভাইভাল— ‘মুখটা ব্যাজার’ অর্থনীতি

মুক্তবাজার অর্থনীতির ভেতরে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শ্রম, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম কীভাবে ধীরে ধীরে পণ্যে রূপ নিচ্ছে? বিশ্বায়ন, আয়বৈষম্য, মুদ্রাস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং মিডিয়ার ভিউ-ক্লিকনির্ভর বাস্তবতার মধ্যে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার চাপ কেমন এখন? মুক্তবাজারের চকচকে গল্পের ভেতরে কীভাবে জীবন, শ্রম, সম্পর্ক, সংস্কৃতি—সবই ধীরে ধীরে পণ্যে বদলে যাচ্ছে। উন্নয়নের গ্রাফ উপরে উঠলেও, দাম, চাপ আর অনিশ্চয়তায় সাধারণ মানুষের মুখে হাসির বদলে জমছে ব্যাজার ভাব—এই লেখায় তা বিশ্লেষণ করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক রাজীব নন্দী।

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৩: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সরকার নতুন বেতন কাঠামোর ফাইলটা যখন নড়াচড়া শুরু করে, তখন দেশের একটা নির্দিষ্ট অংশে হঠাৎ করেই “পকেট ক্যালকুলেটর অর্থনীতি” চালু হয়ে যায়। কারও মুখে হাসি, কারও কপালে ভাঁজ—আর বেসরকারি অফিসগুলোতে ইতিমধ্যেই অদৃশ্যভাবে এক ধরনের নীরব মিটিং চলছে: “এইবার বাজার অনুযায়ী আমরা কীভাবে সার্ভাইভ করব?” এই ঘোষণা তাই শুধু একটি প্রশাসনিক আপডেট না; এটা এমন এক অর্থনৈতিক ওয়াই-ফাই রিফ্রেশ, যার সিগন্যাল সরকারি চাকরিজীবীদের কাছে ফুল বার, কিন্তু প্রাইভেট সেক্টরের অনেক ডেস্কে গিয়ে লো নেটওয়ার্ক দেখায়।

মুক্তবাজার অর্থনীতির গল্পটা আমাদেরকে অনেকদিন ধরেই একধরনের “স্বাধীনতার স্বপ্ন” হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে—যেখানে বাজার খোলা, প্রতিযোগিতা ন্যায্য, আর মানুষ তার পরিশ্রমের পূর্ণ মূল্য পায়। কিন্তু বাস্তবতার স্ক্রিনে স্ক্রল করলে দেখা যায় অন্য এক ফিড: দাম বাড়ে, বেতন থামে, আর জীবনের প্রায় সবকিছুই ধীরে ধীরে “পণ্য” হয়ে ওঠে। এই ব্যবস্থায় স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেটা সবার জন্য না—কারও জন্য অফার, কারও জন্য ওভারপ্রাইসড সাবস্ক্রিপশন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে শুধু উন্নয়ন নয়; একইসঙ্গে অসমতার দ্রুত বিস্তার। শহরের গ্লাস টাওয়ার আর গ্রামের অনিশ্চিত শ্রম—এই দুই বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু কখনো একই ফ্রেমে সমানভাবে ধরা পড়ে না। উন্নয়ন হয় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন হলো—কার জন্য? কার জীবনে সেই উন্নয়ন “ডেলিভারি” হচ্ছে, আর কে শুধু বিজ্ঞাপনের পোস্টার দেখছে?

বিশ্বায়ন এই ব্যবস্থাকে আরও স্মার্ট করেছে, কিন্তু একইসঙ্গে আরও নিষ্ঠুরও। এখন বাজার শুধু দেশের ভেতরে নয়—গ্লোবাল। ফলে প্রতিযোগিতা আর শুধু স্থানীয় শ্রমিকের সঙ্গে না, পুরো বিশ্বের সস্তা শ্রমের সঙ্গে। এই চাপের মধ্যে মানুষ আর নাগরিক থাকে না, ধীরে ধীরে হয়ে যায় “রিসোর্স”—যার মূল্য নির্ধারণ হয় গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের এক্সেল শিটে।

এই কারণেই বলা যায়, মুক্তবাজার অর্থনীতি অনেক সময় “মুক্ত” কম, আর “বাজার” বেশি। যেখানে সবকিছু কেনা-বেচার যোগ্য—সময়, শ্রম, মনোযোগ, এমনকি সম্পর্কও। কিন্তু এই লেনদেনের ভিড়ে মানুষ নিজেই একসময় নিজের কাছে অচেনা হয়ে যায়।

এদিকে গণমাধ্যমও এই অর্থনীতির বাইরে না। বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ আর ভিউ-ক্লিকের অর্থনীতিতে সংবাদও অনেক সময় “কনটেন্ট” হয়ে যায়। যে খবর বেশি বিক্রি হবে, সেটাই বেশি দেখা যাবে; যে বাস্তবতা কম বাজারজাতযোগ্য, সেটা ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাবে। ফলে জনপরিসর আর তথ্যের জায়গা না থেকে হয়ে উঠছে মনোযোগ কেনাবেচার বাজার। কার্ল মার্ক্স যেটাকে বলেছিলেন ‘কমোডিটি ফেটিসিজম’ (মানুষে-মানুষে যে সামাজিক শ্রম ও সম্পর্ক আছে, তা লুকিয়ে গিয়ে পণ্যকে যেন স্বতন্ত্র ও “নিজস্ব মূল্যসম্পন্ন” কিছু হিসেবে দেখা শুরু করা)—মানে আমরা ধীরে ধীরে মানুষকে না দেখে “পণ্য” দেখি, আর পণ্যের ভেতরে লুকানো মানুষের শ্রম আর সম্পর্কগুলো আর চোখে পড়ে না—মুক্তবাজার অর্থনীতি সেই খেলাটা গণমাধ্যমে একদম পারফেক্টভাবে খেলায়। নিউজ আর নিউজ থাকে না; অনেক সময় সেটা হয়ে যায় ভিউ, ক্লিক আর ট্রেন্ডের হিসাব। কোন ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা ঠিক হয় না তার সামাজিক গুরুত্ব দিয়ে—ঠিক হয় সেটা কতটা “শেয়ারেবল” বা “ভাইরালেবল”।

এর ফলটা একটু সিম্পল কিন্তু ভয়ংকর: দারিদ্র্য, শ্রম, অসমতা—এইগুলো রিয়েলিটির অংশ হলেও মিডিয়া ইকোনমিতে অনেক সময় “লো-এনগেজমেন্ট কনটেন্ট” হয়ে যায়। আর অন্যদিকে যা দ্রুত স্ক্রল থামায়, যা ইমোশনাল রিঅ্যাকশন আনে—সেটাই হেডলাইন হয়। ফলে বাস্তব সমাজ না, আমরা আসলে দেখি সমাজের একটা এডিটেড, অ্যালগরিদম-চালিত ভার্সন।

এই একই লজিক জনসমাজেও ঢুকে যায়। মানুষ মানুষকে আর পুরো মানুষ হিসেবে দেখে না—দেখে ইনকাম, লাইফস্টাইল, ব্র্যান্ড ভ্যালু, সোশ্যাল স্ট্যাটাস হিসেবে। সম্পর্কও অনেক সময় “কানেকশন” না থেকে হয়ে যায় “নেটওয়ার্কিং অপারচুনিটি”। কে কী পরে, কোথায় যায়, কী খায়—এসবই পরিচয়ের শর্টকাট হয়ে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে মানুষ নিজেও নিজের পরিচয় বুঝতে শুরু করে একটা প্রোডাক্টের মতো—যার আপডেট লাগাতে হয়, ইমেজ ঠিক রাখতে হয়, আর মার্কেটে ভ্যালু ধরে রাখতে হয়।

সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একই গল্প। আগে যেখানে গান, সিনেমা বা সাহিত্য ছিল অভিজ্ঞতা ও অভিব্যক্তির জায়গা, এখন অনেক ক্ষেত্রেই তা কনটেন্ট ইন্ডাস্ট্রির প্রোডাক্ট। ট্রেন্ড, ভাইরালিটি, অ্যালগরিদম—এই তিনটি শব্দ ঠিক করে দিচ্ছে কী জনপ্রিয় হবে আর কী হারিয়ে যাবে। সংস্কৃতি তাই অনেক সময় নিজের গভীরতা হারিয়ে শুধু “এনগেজমেন্ট” বাড়ানোর টুল হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা ঘটে মানুষের মুখে। মুখটা ধীরে ধীরে ব্যাজার হয়ে যায়—কারণ প্রতিদিনের জীবন একধরনের অর্থনৈতিক চাপের রিপিটেড নোটিফিকেশন। দাম বাড়ে, সুযোগ কমে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়, আর সবকিছুর ওপরে দাঁড়িয়ে থাকে এক স্থায়ী উদ্বেগ। এই উদ্বেগ শুধু ব্যক্তিগত না—এটা কাঠামোগত।

বিশ্বায়ন এই ব্যবস্থাকে আরও স্মার্ট করেছে, কিন্তু একইসঙ্গে আরও নিষ্ঠুরও। এখন বাজার শুধু দেশের ভেতরে নয়—গ্লোবাল। ফলে প্রতিযোগিতা আর শুধু স্থানীয় শ্রমিকের সঙ্গে না, পুরো বিশ্বের সস্তা শ্রমের সঙ্গে। এই চাপের মধ্যে মানুষ আর নাগরিক থাকে না, ধীরে ধীরে হয়ে যায় “রিসোর্স”—যার মূল্য নির্ধারণ হয় গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের এক্সেল শিটে।

এই কারণেই বলা যায়, মুক্তবাজার অর্থনীতি অনেক সময় “মুক্ত” কম, আর “বাজার” বেশি। যেখানে সবকিছু কেনা-বেচার যোগ্য—সময়, শ্রম, মনোযোগ, এমনকি সম্পর্কও। কিন্তু এই লেনদেনের ভিড়ে মানুষ নিজেই একসময় নিজের কাছে অচেনা হয়ে যায়। নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা আসতে যাচ্ছে—এটা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক ধরনের “রিলিফ আপডেট”, যেখানে ইনফ্লেশনের চাপের সঙ্গে বেতন সামঞ্জস্য করার চেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু অর্থনীতির ইকোসিস্টেমে এই সিদ্ধান্তটা একমুখী না—এর ঢেউ সরাসরি বেসরকারি খাতে গিয়ে লাগে। প্রাইভেট সেক্টর, যেখানে আগে থেকেই মার্জিন চাপা, প্রতিযোগিতা তীব্র এবং চাকরির অনিশ্চয়তা বেশি, সেখানে সরকারি বেতন বৃদ্ধির পর স্বাভাবিকভাবেই তুলনামূলক চাপ তৈরি হয়—বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাসের দাবি, ট্যালেন্ট ধরে রাখার খরচ বৃদ্ধি, এবং ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত কস্ট প্রেসার। ফলে একদিকে রাষ্ট্রীয় চাকরিতে স্থিতিশীলতা কিছুটা “আপগ্রেড” হলেও, অন্যদিকে প্রাইভেট সেক্টরে ইনফ্লেশন বনাম ইনকাম গ্যাপ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে—যেটা দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজারে এক ধরনের ভারসাম্যহীন প্রতিযোগিতা তৈরি করে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত এখন তৈরি পোশাক খাতকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই একটি খাত থেকে এবং এতে কাজ করেন প্রায় ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিক, যাদের বড় অংশ নারী। পাশাপাশি প্রতি বছর ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স আসে প্রবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে, যা দেখায় অর্থনীতি শুধু দেশের ভেতরের উৎপাদনের ওপর নয়, বরং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের ওপরও গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই কাঠামোতে শ্রম ক্রমশ একটি “গ্লোবাল কমোডিটি”তে পরিণত হয়—যার মূল্য নির্ধারণ হয় বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলের শর্তে, মানুষের বাস্তব জীবনমানের সমানুপাতে নয়।

অন্যদিকে, এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভেতরেই বৈষম্য ও চাপও স্পষ্ট। একই সময়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুদ্রাস্ফীতি প্রায়ই ৭%–১০% বা তার বেশি পর্যায়ে ওঠানামা করেছে, ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক সময় আয় বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যায়। এই চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিডিয়ার কমার্শিয়াল লজিক, যেখানে সংবাদ ও কনটেন্ট এখন অনেকটাই ভিউ, ক্লিক ও বিজ্ঞাপন-নির্ভর; ফলে বাস্তব সামাজিক সংকটগুলো অনেক সময় জনপরিসরে কম দৃশ্যমান থেকে যায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুক্তবাজার অর্থনীতির ভেতরে পণ্য-পূজা প্রবণতা ধীরে ধীরে আরও দৃশ্যমান। এখানে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি আর রেমিট্যান্সের গ্রাফ যতই উপরের দিকে উঠুক, ততই অনেক মানুষের দৈনন্দিন জীবন “দাম” আর “চাহিদা”র হিসাবের ভেতরে আটকে যাচ্ছে। শহরে গার্মেন্টস শ্রমিকের শ্রম থেকে শুরু করে গ্রামের কৃষকের উৎপাদন—সবকিছুই গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের একটা অংশ হিসেবে মূল্যায়িত হয়, কিন্তু সেই শ্রমের মানবিক বাস্তবতা অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়। গণমাধ্যমে উন্নয়নের গল্প যতটা জোরে শোনা যায়, ততটা জোরে শোনা যায় না জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি বা অনিশ্চিত আয়ের চাপ। এর ফলে সমাজে এক ধরনের “ডুয়াল রিয়েলিটি” তৈরি হয়—একদিকে উন্নয়নের ন্যারেটিভ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার লড়াই। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশি জনসমাজ ধীরে ধীরে নিজের জীবনকেও বাজারের ভাষায় ভাবতে শুরু করে—কে কত আয় করছে, কার জীবন কতটা “সফল”—এটাই হয়ে ওঠে মূল মাপকাঠি, যেখানে মানবিক সম্পর্কের জায়গাটা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত, “মুখটা ব্যাজার অর্থনীতি” কোনো কৌতুক না—এটা এক সামাজিক অনুভব। এমন এক ব্যবস্থা যেখানে উন্নয়নের গ্রাফ উপরে ওঠে, কিন্তু সাধারণ মানুষের মুখের অভিব্যক্তি নিচে নেমে যায়। কারণ, সবকিছু যখন পণ্য হয়ে যায়, তখন হাসিটাও আর বিনামূল্যে থাকে না।

  • রাজীব নন্দী: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি রিসার্চ স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত