পাকিস্তানের লাভ, উপসাগরের হিসাব আর নীরব প্রশ্নগুলো

স্ট্রিম গ্রাফিক

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর আলোচনার পথ খুলেছে। যুদ্ধবিরতির পর চলছে রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা। এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে আশ্বস্ত করছে, ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি তাদের নিরাপত্তা ও স্বার্থের বিনিময়ে করা হবে না।

ঘটনাগুলো কেবল কূটনৈতিক নয়। এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস। আছে অর্থনীতি। রয়েছে নিরাপত্তা। রয়েছে জ্বালানি রাজনীতি এবং রয়েছে রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষমতা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার প্রশ্ন।

প্রথম প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কী পেল?

চার মাস ধরে ইসলামাবাদ আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগের একটি কার্যকর সেতু হিসেবে কাজ করেছে। এমন সময়ে তারা এই ভূমিকা পালন করেছে, যখন ওয়াশিংটন অন্য অনেক মধ্যস্থতাকারীর ওপর আস্থা রাখতে পারছিল না। পাকিস্তানের একটি বিশেষ সুবিধা ছিল। তারা যেমন আমেরিকার মিত্র, তেমনি ইরানের সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। ফলে দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তারা সামনে আসে।

কূটনীতিতে এটিই বড় অর্জন। কিন্তু কূটনৈতিক অর্জন আর অর্থনৈতিক অর্জন এক জিনিস নয়। পাকিস্তানের অর্থনীতি এখনও গভীর সংকটে। দেশটি আইএমএফের ঋণনির্ভর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দুর্বল। শিল্প খাত স্থবির। রপ্তানি সীমিত। কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে। অর্থাৎ মধ্যস্থতা করে আন্তর্জাতিক প্রশংসা পাওয়া সহজ। কিন্তু সেই প্রশংসাকে রুটি-রুজিতে রূপান্তর করা কঠিন।

এখানেই পাকিস্তানের আসল চ্যালেঞ্জ। অবশ্য কিছু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদি ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তাহলে অনেক বছর ধরে ঝুলে থাকা ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প আবার সচল হতে পারে। বেলুচিস্তান সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য বাড়তে পারে। জ্বালানি আমদানির খরচ কমতে পারে। আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালী হতে পারে। তবে এ সবই এখনও সম্ভাবনা। বাস্তবতা নয়। কারণ ইতিহাস বলে, পাকিস্তান এর আগেও ভূ-রাজনৈতিক সাফল্যকে অর্থনৈতিক উন্নয়নে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছে। ২০০১ সালের ৯/১১-এর পর আমেরিকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ পাকিস্তান ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের একটি। সেই সময় ইসলামাবাদ শত শত কোটি ডলারের সহায়তা পেয়েছিল। ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা পেয়েছিল। আন্তর্জাতিক সমর্থন পেয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত কী হয়েছে? অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। দারিদ্র্য কমেনি প্রত্যাশিত হারে। রপ্তানি বিপ্লব ঘটেনি। রাষ্ট্রের আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ ভূ-রাজনীতি সাময়িক অক্সিজেন দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি রোগ সারাতে পারে না। এ কারণেই পাকিস্তানের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, তারা কি এই নতুন সুযোগকে অর্থনৈতিক সংস্কারে ব্যবহার করবে, নাকি অতীতের মতো আবারও বাহবা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে?

আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে কে? রাষ্ট্র? জনগণ? নাকি পাক সামরিক বাহিনী? ঘটনাগুলো খেয়াল করলে উত্তর খুব কঠিন নয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রশংসা করেছেন। মার্কিন প্রশাসনের বিভিন্ন বক্তব্যেও তার ভূমিকাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এটি কেবল ব্যক্তিগত সৌজন্য নয়। এটি রাজনৈতিক বার্তা। ওয়াশিংটন জানে, পাকিস্তানে প্রকৃত ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়। কথাটি নতুন নয়। পাকিস্তানের ৭৮ বছরের ইতিহাসের বড় অংশই সামরিক প্রভাবের ইতিহাস। সরাসরি সামরিক শাসন হোক বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ– রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কখনোই অনুপস্থিত ছিল না। আজও সেই বাস্তবতা বহাল।

পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সেই শিক্ষাই মনে করিয়ে দেয়। একদিকে কূটনৈতিক সাফল্য। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। একদিকে আন্তর্জাতিক প্রশংসা। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বৈষম্য। একদিকে সামরিক প্রতিষ্ঠানের উত্থান। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই পাকিস্তান এগোচ্ছে।

তাই যখন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সাফল্যের গল্প লেখা হচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে, এর রাজনৈতিক লভ্যাংশ কার ঝুলিতে যাচ্ছে? যদি সাধারণ মানুষ এর সুফল না পায়, তাহলে এই সাফল্য শেষ পর্যন্ত কাগজের সাফল্য হয়ে থাকবে। কারণ জনগণের কাছে উন্নয়নের সংজ্ঞা খুব সহজ। তারা গ্যাস চায়। বিদ্যুৎ চায়। চাকরি চায়। মূল্যস্ফীতি কম দেখতে চায়। তারা কূটনৈতিক করতালি দিয়ে বাজারের আগুন নেভাতে পারে না।

আমেরিকার ভূমিকাও গভীরভাবে লক্ষ করার মতো। ওয়াশিংটন এখন একদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে। অন্যদিকে উপসাগরীয় মিত্রদের আশ্বস্ত করছে। এটি আসলে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার কৌশল।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি আর আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা– আমেরিকা যদি কেবল পারমাণবিক বা সামরিক প্রশ্নে সমঝোতা করে, তাহলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার বৃহত্তর বিষয়গুলো অমীমাংসিত থেকে যাবে। সেই কারণেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বারবার বলছেন, উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না।

এমন বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদার এখনও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো। তাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি ওয়াশিংটন নিতে পারবে না। তবে এখানেও একটি বাস্তবতা আছে। আমেরিকার স্বার্থ আর উপসাগরীয় দেশগুলোর স্বার্থ সবসময় এক নয়।

ওয়াশিংটনের প্রধান লক্ষ্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। কিন্তু উপসাগরের কিছু দেশ ইরানকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে। ফলে যে কোনো চুক্তি বাস্তবায়নের সময় এই দ্বন্দ্ব সামনে আসবে। আর সেই কারণেই বর্তমান আলোচনা সহজ হবে না।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো তথ্য ও গণমাধ্যম। যুদ্ধ, শান্তি, কূটনীতি ও ভূ-রাজনীতি নিয়ে জনমত গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিশ্বের অনেক দেশে গণমাধ্যম ক্রমে স্বাধীনতা হারাচ্ছে। রাষ্ট্রের প্রচারণা ও তথ্যের মধ্যে পার্থক্য মুছে যাচ্ছে। এ অবস্থায় জনগণ সত্য জানতে পারে না। ফলে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঝুঁকি বাড়ে।

প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক ওয়ালটার লিপম্যান বলেছিলেন, ‘সংবাদ ও সত্য এক জিনিস নয়। সংবাদ কোনো ঘটনা সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করে আর সত্য লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে সামনে আনে।’ এই কথার গুরুত্ব আজ আরও বেড়েছে। অন্যদিকে জোসেপ পুলিৎজার একবার সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘একটি নিন্দুক, ভাড়াটে ও জনবিচ্ছিন্ন সংবাদমাধ্যম শেষ পর্যন্ত নিন্দুক, ভাড়াটে ও জনবিচ্ছিন্ন জনগণই তৈরি করবে।’

এটি কেবল সাংবাদিকতার কথা নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের কথা। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন অনেকবার বলেছেন, কার্যকর গণতন্ত্রে স্বাধীন সংবাদমাধ্যম দুর্ভিক্ষ ও বড় মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ স্বাধীন তথ্যপ্রবাহ সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখে। অর্থাৎ গণমাধ্যম যদি ক্ষমতার মুখপাত্র হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা নিজেদের তৈরি প্রতিধ্বনির ঘরে বন্দি হয়ে যান। তখন ভুল নীতি তৈরি হয়। ভুল যুদ্ধ শুরু হয়। ভুল শান্তিচুক্তিও হয়।

আজ পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সেই শিক্ষাই মনে করিয়ে দেয়। একদিকে কূটনৈতিক সাফল্য। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। একদিকে আন্তর্জাতিক প্রশংসা। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বৈষম্য। একদিকে সামরিক প্রতিষ্ঠানের উত্থান। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির প্রশ্ন। এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই পাকিস্তান এগোচ্ছে।

সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যও এগোচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকা-ইরান সমঝোতা সফল হবে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ কতটা দূর হবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। ইরান-পাকিস্তান পাইপলাইন বাস্তবায়িত হবে কিনা, তাও অজানা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। কূটনীতি কখনও নিজে নিজে জনগণের ভাগ্য বদলায় না। ভাগ্য বদলায় সুশাসন। ভাগ্য বদলায় অর্থনৈতিক সংস্কার। ভাগ্য বদলায় জবাবদিহি। আর এসব নিশ্চিত করতে প্রয়োজন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন রাজনীতি, স্বাধীন গণমাধ্যম। তা না হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যত করতালিই পাওয়া যাক– সাধারণ মানুষের জীবন অপরিবর্তিতই থেকে যায়। ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা সেটাই।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Ad 300x250

সম্পর্কিত