জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা হোক প্রথম করণীয়

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ৩৫
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজভাঙা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় দুর্ঘটনায় যেসব শ্রমিক মারা গেছেন, তাদের জন্য গভীর শোক জানানোর পাশাপাশি আমরা আশা করব, সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। যদিও এভাবে মারা যাওয়ার ক্ষতি কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা সম্ভব নয়। জাহাজ কাটার সময় বিপজ্জনক গ্যাস নিঃসরণের শিকার হয়ে যারা হাসপাতালে আছেন, তাদের সুচিকিৎসার দাবিও থাকবে। এ ধরনের দুর্ঘটনায় চিকিৎসার ব্যয়ভার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরই বহন করার কথা। প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে এটা নিবিড়ভাবে মনিটর করার।

বাংলাদেশে জাহাজভাঙা শিল্পের ইতিহাস কয়েক দশকের। ঘটনাচক্রে এ খাতে আমরা যাত্রা করলেও ধীরে ধীরে এটা শিল্প হিসেবেই গড়ে উঠেছে। শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিকভাবে সনদপ্রাপ্ত হয়ে; নির্ধারিত নিয়মবিধি মেনে এখানে জাহাজ ভেঙে এর উপকরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমন বক্তব্যই দেওয়া হচ্ছে খাত সংশ্লিষ্টদের তরফ থেকে। তবে এ তথ্য উদ্বেগজনক, ১৯৮০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারেরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে জাহাজ ভাঙার কাজ করতে গিয়ে। আর যেসব দেশে বাংলাদেশের মতোই অধিক হারে জাহাজ ভাঙা হয়, সেখানেও দুর্ঘটনায় মৃত্যু কি এত বেশি? আমরা বলব, জাহাজভাঙা শিল্প বিপজ্জনক শিল্পগুলোর একটি বলে এ খাতে নিজেদের সতর্কতা সন্তোষজনক পর্যায়ে তুলতে যা যা প্রয়োজন করতে হবে। দেশ বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। শিল্প খাত পড়েছে নজিরবিহীন সংকটে। এ অবস্থায় সীতাকুণ্ড থেকে দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মারা যাওয়ার যে খবর মিলল, তাতে সবাই আরও বিচলিত বোধ করবে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে ছয় মাস হতে চলল। তাদেরকে এখন এসব বিপজ্জনক শিল্পের দিকে নিবিড়ভাবে দৃষ্টি দিতে হবে, যাতে শৃঙ্খলার ঘাটতি দ্রুত দূর করা যায়।

যেসব শ্রমিকের করুণ মৃত্যু হয়েছে; তাদের কাউকে কাউকে বাঁচানো যেত বলে অনেকের মত। দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে বিবেচিত এসব প্রতিষ্ঠানে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা থাকার কথা। সেটা ছিল কিনা, দেখতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেগুলো আহত শ্রমিকদের জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। মালিকপক্ষের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, শুক্রবার বন্ধের দিন ‘সেফটি বিভাগের লোকজন’ কাজ করার সময় দুর্ঘটনা ঘটে। তবে সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়, শ্রমিকরা নিয়মিত কাজ করছিলেন আর তখনই ঘটে দুর্ঘটনা। কী ধরনের গ্যাস নিঃসরণের শিকার তারা হয়েছেন, মানসম্মত তদন্ত হলেই সেটা বেরিয়ে আসবে। একটি এলএনজি পরিবহনকারী পরিত্যক্ত জাহাজ কাটার কাজ চলছিল সেই ইয়ার্ডে। এ ধরনের জাহাজের বিভিন্ন অংশ কাটা যে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা বলাই বাহুল্য। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই নিশ্চিত করা চাই শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও ব্যক্তিগত সুরক্ষা। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ নামের প্রতিষ্ঠানটি ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হিসেবেই তালিকাভুক্ত। তবে গেল মাসেই নিরাপত্তা ত্রুটির অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবর রয়েছে। মামলা হলে তো মালিকপক্ষের আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বনের কথা। মর্মান্তিক ওই ঘটনার পর এটাই বরং বলা যায়, সেখানে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ অসত্য নয়।

জাহাজভাঙা শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি এতে মাটি, পানি তথা পরিবেশের ক্ষতির দিকটিও অ্যাড্রেস করার কথা। অন্যতম প্রধান পরিবেশ দূষণকারী শিল্প বলে জাহাজভাঙা শিল্পের এক ধরনের বদনামও রয়েছে। আমরা এখান থেকে উপকৃত হচ্ছি, সন্দেহ নেই। বিকাশমান স্টিল মিলগুলো সরাসরি উপকৃত হচ্ছে এ শিল্প থেকে কাঁচামাল পেয়ে। আরও কিছু খাতও উপকৃত। প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ কর্মসংস্থানও কম নয়। তবে এসব যুক্তিতে শ্রমিকদের সুরক্ষার বিষয়ে আপস করার কোনো সুযোগ নেই। এটা আমরা জোরালোভাবেই বলতে চাই সীতাকুণ্ডে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাটির পর।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা হোক প্রথম করণীয়