রানা প্লাজার ১৩ বছর: কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড ও উপেক্ষিত শ্রমিকের অধিকার

প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ২০: ৩৩
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

রানা প্লাজা ‘দুর্ঘটনা’র ১৩ বছর পূর্ণ হলো। এটি বাংলাদেশে শুধু নয় বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শিল্প দুর্ঘটনা। একে নিছক ‘দুর্ঘটনা বললে ভুল হবে, এটি একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। বেআইনি ভবন, ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো, আর মালিকপক্ষের লোভ আর জোরজবরদস্তির কারণে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। শিল্প খাতে এত বড় কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের নজির পৃথিবীতেই পাওয়া কঠিন। রানা প্লাজায় ১১০০-এর বেশি শ্রমিক নিহত হন। আহত বা চিরতরে পঙ্গু হওয়া শ্রমিকের সঠিক হিসাব আজও অজানা।

প্রায় ১০০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি পোশাক কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। সেখানে নিহতের সংখ্যা রানা প্লাজার তুলনায় ছিল অনেক কম। কিন্তু সমাজে তা প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও জনমতের চাপে সেখানকার রাষ্ট্রব্যবস্থা নড়েচড়ে বসে। শ্রম আইনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং কারখানার নিরাপত্তায় যুগান্তকারী সংস্কার সাধিত হয়।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে রানা প্লাজার মতো এত বড় একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের পরও তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের দেশে এই ঘটনার পর জনমতের দিক থেকে যেরকম প্রবল চাপ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। অন্যদিকে, রাষ্ট্র বা সরকারের দিক থেকেও এমন কোনো জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। শ্রম পরিদর্শকদের ক্ষমতা বাড়ানো, কারখানার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন কঠোর করা, শ্রম অধিকার নিশ্চিত করা—এসব প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা ছিল, তার কিছুই পূরণ হয়নি।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশে রানা প্লাজার মতো এত বড় একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের পরও তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের দেশে এই ঘটনার পর জনমতের দিক থেকে যেরকম প্রবল চাপ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। অন্যদিকে, রাষ্ট্র বা সরকারের দিক থেকেও এমন কোনো জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।

পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক জনমতের চাপে বিদেশি দুটো সংস্থার প্রত্যক্ষ ভূমিকায় তৈরি পোশাক খাতের ভবনগুলোতে কিছু সংস্কার কাজ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে সামগ্রিক নিরাপদ কারখানা/কর্মস্থল/ভবন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় দুর্বলতা রয়েই গেছে। এর প্রমাণ আমরা বারবার দেখেছি। পুরান ঢাকায় একের পর এক কেমিক্যাল কারখানাসহ ঢাকার বিভিন্ন ভবনে আগুন কিংবা রূপগঞ্জের হাশেম ফুডসের অগ্নিকাণ্ড চোখে আঙুল দিয়ে সেই ব্যর্থতাই দেখিয়ে দেয়।

তাজরীন ফ্যাশনসের মতোই হাশেম ফুডসেও অনেক শ্রমিক পুড়ে মারা গেছেন। হাশেম ফুডসের ঘটনার পর আমরা একটি গণতদন্ত কমিটি করেছিলাম। সেখানে দেখেছি, ভবনের গঠন, ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিদর্শন ও তদারকি—সবকিছুতেই ভয়াবহ ত্রুটি আর দুর্নীতি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর চরম দায়িত্বহীনতার কারণেই শ্রমিকদের এমন করুণ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। অপরাধীদের বিচার হয়নি।

এই অবস্থা আজও অব্যাহত আছে। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত ও সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পের শ্রমিকরা আজও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। কারখানার নিরাপত্তা বিধানে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন দরকার ছিল, তা এখনো হয়নি।

সবচেয়ে লজ্জাজনক ব্যাপার হলো, রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এর জন্য দায়ী অপরাধীদের বিচারকাজ আজও শেষ হয়নি। যে শ্রমিকরা সেদিনের ঘটনায় আহত হয়েছিলেন, তাদের অধিকাংশই আর কখনোই কারখানায় ফিরতে পারেননি। শারীরিক পঙ্গুত্বের পাশাপাশি মানসিক ট্রমায় তাদের জীবন ও জীবিকা সাংঘাতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সেসময় পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে আহত ও কর্মহীন শ্রমিকদের সকলের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু তারা সেই কথা রাখেনি। আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসাও যথাযথভাবে হয়নি। আমাদের রাষ্ট্র, সরকার, শ্রম পরিদর্শন, শ্রম আইন বা শ্রম আদালতের কাঠামোর মধ্যেই এমন গলদ রয়ে গেছে যার কারণে শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা আর অনিশ্চয়তায় জীবন কাটাতে হয়। সরকার পরিবর্তন হলেও শ্রমিকদের অবস্থার গুণগত কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। সেকারণে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এত বছর পরও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নতি হয়নি। কারখানায় জীবনের ঝুঁকি থাকলে কাজ প্রত্যাখ্যান করার মতো কোনো সুযোগ বা অধিকার আজও শ্রমিকদের নেই। কারণ, এই অধিকার আদায়ের প্রধান হাতিয়ার যে ট্রেড ইউনিয়ন, তার পথে শত সহস্র বাধা।

সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আমরা দেখেছি, দেশের বিভিন্ন স্থানে মব জাস্টিস বা সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে সরকার নমনীয় থাকলেও শ্রমিকদের বেলায় তারা কঠোর ছিল। শ্রমিকরা যখন তাদের বকেয়া মজুরির জন্য পথে নেমেছেন, অন্যায় ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদ করেন বা মালিকপক্ষের দুর্ব্যবহারের বিচার চান, তখন শিল্প পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়। এমনকি সেসময় শ্রমিকদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটেছে। পাওনার কথা বলতে গিয়ে গুলিতে নিহত হয়েছেন শ্রমিক।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মালিকদের প্রতি সবসময় নমনীয় থাকে, কিন্তু শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকারের প্রশ্নে তারা চরম বৈরী আচরণ করে। একদিকে শিল্প পুলিশ শ্রমিকদের ওপর হামলা করছে, অন্যদিকে মালিকদের পালিত মাস্তান বাহিনী শ্রমিকদের ঘরবাড়ি ছাড়া করছে। কোনো শ্রমিক ন্যায্য দাবি তুললেই তার চাকরি চলে যাচ্ছে বা তার ওপর হামলা হচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার পাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।

আমাদের একাধিক তদন্তে বারবার উঠে এসেছে যে শিল্প পুলিশ, শ্রম আদালত এবং শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার—এই পুরো কাঠামোর মধ্যেই ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মালিকদের প্রতি সবসময় নমনীয় থাকে, কিন্তু শ্রমিকদের ন্যূনতম অধিকারের প্রশ্নে তারা চরম বৈরী আচরণ করে। একদিকে শিল্প পুলিশ শ্রমিকদের ওপর হামলা করছে, অন্যদিকে মালিকদের পালিত মাস্তান বাহিনী শ্রমিকদের ঘরবাড়ি ছাড়া করছে। কোনো শ্রমিক ন্যায্য দাবি তুললেই তার চাকরি চলে যাচ্ছে বা তার ওপর হামলা হচ্ছে। এর কোনো প্রতিকার পাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই।

এখন এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, শ্রমিকদের অধিকার তাহলে নিশ্চিত হবে কীভাবে? এর জন্য ন্যূনতম কয়েকটি কাজের দাবি তোলা দরকার।

প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। শ্রম আইনে মজুরি ও সংগঠনসহ শ্রমিকদের সকল অধিকারের পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ ও কঠোর শ্রম পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিকদের কেন বকেয়া মজুরির জন্য রাস্তায় নামতে হবে? মজুরি তাদের ন্যায্য পাওনা। এমনিতেই তাদের মজুরি খুব কম, তার ওপর মাসের পর মাস সেটি বকেয়া রাখা হয়। এটি নিশ্চিত করা তো শ্রম পরিদর্শকদেরই দায়িত্ব। তৃতীয়ত, শিল্প পুলিশের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। শ্রমিকরা ন্যায্য দাবিতে আন্দোলন করলে তারা আক্রমণ করে। কিন্তু কোনো মালিক যখন মাসের পর মাস বেতন আটকে রাখেন বা শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন চালান, তখন কোনো শিল্প পুলিশ বা প্রশাসনকে সেই মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। এর পরিবর্তন বা শিল্প পুলিশের অবলুপ্তি দরকার। চতুর্থত, বিজিএমইএ-কে বাধ্য করতে হবে যাতে তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে। মালিকদের এই বার্তা দিতে হবে যে, তারা অনিয়ম করলে, শ্রমিকদের সাথে দুর্ব্যবহার করলে বা মজুরি বকেয়া রাখলে তাদেরও কঠোর শাস্তি পেতে হবে।

কারখানায় নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার নিশ্চিত করে শ্রম আইন করা, সেই আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং মালিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত হলেই কেবল কারখানাগুলোতে একটি গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হতে পারে। রানা প্লাজায় কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পার হয়ে এগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় দাবি। এসবের বাস্তবায়ন না হলে এই কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডগুলো কখনোই থামবে না।

আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

সম্পর্কিত