আলাদা বাস ভালো, নিরাপদ গণপরিবহন চাই

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু করেছে বিআরটিসি। নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর পরিচালিত এই বাসে শুধু নারী যাত্রী থাকবেন। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ার ১৩টি রুটে ১৪টি বাস দিয়ে শুরু হয়েছে সেবা। নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ যাতায়াতের পাশাপাশি পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির দিক থেকেও উদ্যোগটি ইতিবাচক। একে স্বাগত জানানোই উচিত।

এর আগেও দেশে নারীদের জন্য বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ১৯৮০ সালের দিকে ছিল প্রথম প্রয়াস। ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এবং ২০০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া সেই পরিষেবা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। বাসের সংখ্যা কমে যাওয়া, অনিয়মিত চলাচল ও দীর্ঘ অপেক্ষার অভিযোগ ছিল। ২০০৯ সালেও আবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আগের উদ্যোগগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে এবার কোনো পর্যালোচনা হয়েছে? সেগুলো যেন আর না হয় তার কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? শুধু উদ্বোধন করলেই হবে না। নিয়মিত, পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করা হবে বড় পরীক্ষা।

আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। পিংক বাস নারীদের জন্য একটি সাময়িক নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। কিন্তু সাধারণ বাসে নারীর নিরাপত্তার দায় এতে কমে যেতে পারে না। একজন নারী পিংক বাসের অপেক্ষায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে সেটি না পেয়ে সাধারণ বাসে উঠলেন। সেখানে তিনি হয়রানির শিকার হলে তাঁকে যেন কেউ না বলেন, ‘নারীদের বাসে উঠলেন না কেন?’ একজন নারী কোন বাসে উঠবেন, সেটি তাঁর ওপর হয়রানির কারণ হতে পারে না। তিনি যে বাসেই উঠুন, নিরাপত্তা তাঁর নাগরিক অধিকার।

নারীকে অনিরাপদ পরিবহন থেকে সরিয়ে নেওয়া আর পরিবহনকে নিরাপদ করা এক কথা নয়। পিংক বাসের প্রয়োজনীয়তা আসলে আমাদের গণপরিবহনের একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। নারী এখনো স্বাভাবিকভাবে চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পান না। তাই আলাদা বাসের পাশাপাশি সাধারণ বাসেও হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, চালক ও সহকারীদের জবাবদিহি, অভিযোগ জানানোর সহজ পথ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

নারীর কাজের ক্ষেত্র প্রসারিত করাও এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। নারী চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু তাঁদের নিয়ে যেন বিদ্রুপ, অবজ্ঞা বা নেতিবাচক প্রচার না চলে।

পিংক বাস তাই সমাধান নয়, সমাধানের পথে একটি পদক্ষেপ। এটিকে আগের উদ্যোগগুলোর মতো ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। আবার এমন ব্যবস্থায় পরিণত করাও যাবে না যেখানে নারীকে নিরাপত্তার অজুহাতে ‘আলাদা বাস’ দেখিয়ে সাধারণ গণপরিবহনের অনিরাপদ বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া হয়।

আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন গণপরিবহন যেখানে নারী পিংক বাসে উঠলে যেমন নিরাপদ বোধ করবেন, তেমনি প্রয়োজন হলে সাধারণ বাসেও উঠতে ভয় পাবেন না। একজন নারী যেন বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ভাবতে পারেন—‘যে বাসই আসুক, আমি নিরাপদে যেতে পারব।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

আলাদা বাস ভালো, নিরাপদ গণপরিবহন চাই