গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে সিদ্ধান্ত নিন অংশীজনদের সঙ্গে বসে

প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ২২: ৫২
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান ছয় মাস বা এক বছরেও সম্ভব নয় বলে অর্থমন্ত্রী যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে সত্যতা রয়েছে। এজন্য সর্বনিম্ন দুই বছর লাগবে বলে তাঁর বক্তব্যও বাস্তবতার একটা প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞদের অনেকেও তাঁর মতো করে বলছেন।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ‘অতীত থেকে পাওয়া’ বলে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে দ্বিমত করা কঠিন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ শাসনামলে বিশেষত গ্যাস খাতকে অনেকখানি আমদানিনির্ভর করা হয়েছিল। সেটা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এটা বিদ্যুৎ সংকটেরও কারণ; যদিও এ খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। আর বিদ্যুৎ খাতে স্থাপিত সক্ষমতা ব্যবহৃত হচ্ছে না পর্যাপ্ত উপকরণ সংগ্রহ করা যাচ্ছে না বলে। এজন্য আবার দায়ী সরকারের অর্থ সংকট।

নতুন সরকারের ছয় মাস হয়ে গেছে। এ সময়ে যে সংকট সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে, সেটা জ্বালানি সংক্রান্ত। একটা সময় পর্যন্ত গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকলেও চাহিদা বৃদ্ধির চাপে আমরা হয়েছি আমদানিনির্ভর। আওয়ামী সরকারের আমলে স্থল ও জলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানে জোর না দেওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতাটি আবার ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। সেটা একবার বোঝা গেছে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। অধিকতর তীব্রভাবে বোঝা গেল ইরান যুদ্ধে এর সরবরাহটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ায়। সরকার তাও অধিক দামে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি এনে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেছে। সেটাও ঝুলে গেল দুর্ঘটনায় একটি এলএনজি টার্মিনাল অকার্যকর হয়ে পড়ায়। সেটা মেরামতেও দীর্ঘ সময় লেগেছে। এর মধ্যে আবহাওয়াজনিত কারণে আরেকটি টার্মিনালে এলএনজি প্রবেশ করানোতেও দেখা দেয় সংকট।

এমন পরিস্থিতি আর কখনো মোকাবিলা করতে হয়নি। এর চাপ স্বভাবতই গিয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাসাবাড়ি থেকে শিল্পাঞ্চলও নজিরবিহীন জ্বালানি পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। খাদ্যপণ্য সরবরাহ কমে যাওয়ার শঙ্কার কথাও জানাচ্ছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। এতে মূল্যস্ফীতির আরও অবনতি হতে পারে। গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাও স্বাভাবিক। এমনিতেও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে খারাপ। গণঅভ্যুত্থানের প্রভাবও এর মধ্যে পড়েছে।

প্রত্যাশা ছিল, নির্বাচিত সরকার এলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ধারায় কাজের সুযোগ বাড়লে হতাশা কেটে যাবে। এ ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ঘটেছে বরং বিপরীতটি। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যেও কাজের সুযোগ বাড়ছে না। এদিকে গ্যাসের ঘাটতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্রামাঞ্চলে গড়ে ওঠা ক্ষুদে উদ্যোগগুলোও মার খাচ্ছে। সেখানেও বেড়েছে কর্মহীনতা। প্রবাসী আয়ের জোরালো প্রবাহ কত দিন বহাল থাকবে, সেটা বলাও কঠিন।

এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে যা বললেন, তাতে হতাশা বাড়লেও এটা রূঢ় বাস্তবতা বৈকি। তবে সংকটের মধ্যেও কাজ চালানোর মতো একটা ব্যবস্থা করতে যে তারা সক্রিয়, সেই খবরও দিয়েছেন। নতুন এলএনজি টার্মিনাল প্রতিষ্ঠায় সরকার উদ্যোগী। স্থলভাগে এর স্টোরেজ সুবিধাও বাড়াতে চাইছে সরকার, যাতে দুর্ঘটনা কিংবা আবহাওয়াজনিত কারণে পরিস্থিতি জটিল না হয়। স্থল ও জলভাগে নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলোও রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার গ্যাস খাতে কিছু প্রশ্নবিদ্ধ চুক্তি বাতিল করলেও জরুরি ভিত্তিতে সংকট মোকাবিলায় অর্থবহ উদ্যোগ নেয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিশেষজ্ঞরাও তখন ছিলেন বলা যায় উদাসীন। এখন বিশেষ পরিস্থিতিতে সবাই উচ্চকণ্ঠ হলেও দ্রুত সুফল পাওয়ার মতো সমাধান হাতে নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সুবিধা পেতেও অনেকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। তারপরও আমরা দেখতে চাইব গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে সরকার নতুন কী সিদ্ধান্ত নেয়। আবারও একই কথা, অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে সিদ্ধান্ত নিন অংশীজনদের সঙ্গে বসে