আবুল কাসেম ফজলুল হক

শ্রদ্ধার আসনটি থাকবে অক্ষয়

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

পরিণত বয়সে চলে গেলেও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যু আমাদের গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। তাঁকে যারা জানতেন এবং দীর্ঘদিন তাঁর চলার পথটি যারা খেয়াল করতেন, তারা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রবীণ শিক্ষক ও লেখকের মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হবেন। তিনি ছিলেন সুবক্তাও। তাঁর সময়ে এমন আরও কয়েকজন অধ্যাপক ছিলেন, যারা অভিন্ন এসব গুণের প্রকাশে আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছেন যুগের পর যুগ। ক্রমে এমন এক সময় এসে উপস্থিত হয়েছে, যখন প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একে একে তাঁদের হারাচ্ছি আমরা। একটা শূন্যতা অনুভব করছি আর কেবলই মনে হচ্ছে, এটা বোধকরি পূরণ হওয়ার নয়।

অধ্যাপকরা অবসর গ্রহণ করেন না। আর কিছু অধ্যাপক সবার শিক্ষক হয়ে ওঠেন। আর শিক্ষকরা তো সজীব বৃক্ষের মতো; পাতা ঝরে গেলেও নতুন করে সজ্জিত হন। ছাত্রদের কাছে তাঁদের চাহিদা কখনো ফুরায় না। আবুল কাসেম ফজলুল হক হয়ে উঠেছিলেন তেমন একজন শিক্ষক। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, সেখানেই টানা শিক্ষকতা করেছেন চার দশক। আর সুনির্দিষ্ট সেই বিভাগেই নয়; তিনি বিচরণ করেছেন গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে। পরিচিত সাদাসিধা পোশাকে ক্রমেই তাঁকে আরও সক্রিয় হতে দেখা গেছে জাতীয় পর্যায়ে। একজন মুক্তবুদ্ধির চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখেছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং তাঁর কাজে আমরা দেখতে পাই নীতিনিষ্ঠা ও ধারাবাহিকতা। রাজনৈতিক ইস্যুগুলোও তিনি গভীরভাবে অনুসরণ করে ব্যক্ত করতেন সুচিন্তিত মত। সব ধরনের গণমাধ্যমে ক্রমে তাঁর উপস্থিতি হয়েছে উজ্জ্বল। তিনি যেসব বিশিষ্ট অধ্যাপকের শিক্ষা এবং সহকর্মী হিসেবে যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন অকাতরে। তাঁদের কারও কারও প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের দায়িত্বভারও তিনি পালন করে গেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে।

যুগের তাগিদ থেকেই সম্ভবত আবুল কাসেম ফজলুল হক আকৃষ্ট হয়েছিলেন বাম মতাদর্শে। তাঁর গবেষণা, সাহিত্য সমালোচনা ও সমাজ বিশ্লেষণে সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ আমরা লক্ষ করেছি। তবে এ ক্ষেত্রে মতান্ধতার ঝোঁক এড়িয়েছেন সাবধানতার সঙ্গে, যেটা তাঁকে বৈশিষ্ট্য দান করেছে। বিপন্ন বিশ্ব পরিস্থিতিতেও এর আশাব্যঞ্জক দিকগুলো তিনি তুলে ধরতেন দৃঢ়তার সঙ্গে। দেশীয় সমাজ ও রাজনীতিতে চলমান নীতিহীনতায় গভীরভাবে পীড়িত বোধ করলেও আশা রাখতেন তরুণ সমাজের ওপর। চলমান বুদ্ধিজীবিতার বিষয়েও তাঁর সমালোচনা কম ছিল না। অক্লেশে তিনি প্রকাশ করতেন জ্ঞানীদের দলীয় আনুগত্যের বিপজ্জনক দিকগুলো। আর এর বাইরে অবস্থান করে সীমিত সাধ্যে যেটুকু করার, সেটা করে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এ তাগিদ থেকেই তিনি অনেকটা একক প্রচেষ্টায় চালিয়ে গেছেন ‘লোকায়ত’ নামে একটি মননশীল পত্রিকার প্রকাশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এ কারণেও তিনি ছিলেন সাধারণভাবে পরিচিত ও প্রিয়।

আবুল কাসেম ফজলুল হকের সন্তান ফয়সাল আরেফিন দীপনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল পথভ্রষ্ট জঙ্গিবাদীরা। তিনি ছিলেন পিতার আদর্শেই একজন ভিন্নধর্মী প্রকাশক। পিতার জন্য ভয়াবহ সেই হত্যাকাণ্ডের পরও আমরা আবুল কাসেম ফজলুল হকের রাজনীতিসচেতন, জ্ঞানোদীপ্ত ও প্রত্যয়ী প্রতিক্রিয়া দেখেছিলাম তখন। সেটাও তাঁকে নতুনভাবে সামনে এনেছিল তাদের কাছে, যারা তাঁর বিষয়ে তেমন জানতেন না। আবুল কাসেম ফজলুল হক পদক পেয়েছেন; পদও পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর মূল প্রাপ্তি হলো সচেতন মানুষের শ্রদ্ধা। সেই আসন অক্ষয় হয়ে থাকবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত