সার নীতিমালায় সংস্কার: উদ্দেশ্য ভালো, বাস্তবতা কঠিন

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২১: ৩৩
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

সার বিতরণ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়মে জড়িয়ে আছে। এতে রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে বলেও অভিযোগ জোরালো। সরকার-নির্ধারিত মূল্যে জোগানোর কথা থাকলেও স্তরে স্তরে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক প্রায়ই বাড়তি দামে সার কিনতে বাধ্য হন। এমন পরিস্থিতির অবসান ঘটানোর কথা বলেই সরকার নতুন সার বিতরণ নীতিমালা এনেছে। সেখানে সাব-ডিলার প্রথা বাতিল হয়েছে, পারিবারিক ব্যবসা বন্ধে যুক্ত হয়েছে কড়া শর্ত এবং ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের জন্য পৃথক সংস্থার দ্বৈত ব্যবস্থা একীভূত করা হয়েছে। ঘোষিত উদ্দেশ্য ভালো। তবে এর বাস্তবায়ন কঠিন বলেই ধারণা।

নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সাব-ডিলার তথা খুচরা বিক্রেতা প্রথার বিলুপ্তি। সরকারের যুক্তি, মধ্যবর্তী স্তর কমলে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং সার সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছাবে। তবে এই যুক্তির ফাঁকে একটি বড় বাস্তবতা উপেক্ষিত মনে হয়। কৃষকেরা সাধারণভাবে নিকটবর্তী সাব-ডিলারের ওপরই নির্ভরশীল ছিলেন। সেই পরিচিত বিক্রয়কেন্দ্র উঠে গেলে তাকে বেশি দূরত্ব পাড়ি দিতে হবে। পরিবহন খরচ বাড়বে; সময় নষ্ট হবে। বিশেষত যিনি কম সার কেনেন, তার প্রকৃত খরচ বেড়ে যাবে। দাম না বাড়লেও কৃষকের পকেট থেকে বেশি অর্থ খসবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রত্যেক ডিলার তার মূল গুদামের বাইরে দুটি বিক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করবেন। কিন্তু সাব-ডিলারের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের বদলে মাত্র তিনটি কেন্দ্র দিয়ে একটি উপজেলার সব কৃষকের চাহিদা পূরণ কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

নতুন নীতিমালায় ডিলার হতে ৫০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম এবং ১০ লাখ টাকার ব্যাংক সচ্ছলতার সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই শর্ত ছোট ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে দূরে ঠেলে দিতে পারে। তার জায়গায় কারা আসবেন? উচ্চ আর্থিক শর্তযুক্ত ব্যবসায় প্রবেশের সুযোগ পান স্বভাবতই বড় পুঁজির মালিক কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীরা। নীতিমালায় সরকারি কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদের ডিলারশিপ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু তাদের ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে ‘ভাড়াটে ডিলার’ প্রথা চালুর শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পুরোনো অনিয়ম নতুন রূপে ফিরে আসার ইতিহাস এ দেশে রয়েছে।

সিন্ডিকেটের প্রশ্নটিও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। ডিলারের সংখ্যা কমে গেলে বাজারে যারা থাকবেন, তাঁদের পক্ষে হয়তো আরও সহজে সংঘবদ্ধ হয়ে সংকট তৈরি করা সম্ভব। অতীতে গুদামে সার মজুদ রেখে ‘সারের সাপ্লাই নেই’ বলে দেওয়ার ঘটনা বারবার ঘটেছে। প্রতিযোগিতা কমলে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।

সারের মতো পণ্যের বিতরণ ব্যবস্থায় ত্রুটি দূর করতে সংস্কারের প্রয়োজন ছিল, সন্দেহ নেই। তবে সংস্কার সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ে তদারকির ওপর। স্বচ্ছভাবে ডিলার নিয়োগ, নিয়মিত ও নিবিড় মনিটরিং এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত পদক্ষেপ না থাকলে এই নীতিমালা কৃষকের সমস্যা সমাধানে সক্ষম হবে না। উল্টো নতুন সমস্যা তৈরির শঙ্কা থাকবে।

বোরো মৌসুমের পাশাপাশি সারা বছরই কৃষক ব্যস্ত থাকেন মাঠে। চাষাবাদের উপকরণ হিসেবে ইউরিয়াসহ নানা ধরনের সার তার পাওয়া চাই ন্যায্য দামে ও সঠিক সময়ে। সরকারও সম্ভাব্য সব উৎস থেকে সার সংগ্রহ ও সরবরাহ করে কৃষকের মনে স্বস্তি জোগাতে ব্যগ্র। বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি কিংবা জটিলতায় সেই উদ্দেশ্য যেন বানচাল না হয়, সেটা অবশ্যই দেখতে হবে। এর সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটিও সরাসরি জড়িত।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

সার নীতিমালায় সংস্কার: উদ্দেশ্য ভালো, বাস্তবতা কঠিন