বিচারের পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়াটাই কাম্য

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলনে দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িতদের বিচারে দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা জানালেও প্রতিশোধ গ্রহণের বিপক্ষে তাঁর সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সবাই এজন্য তাঁর প্রশংসা করবেন। বাংলাদেশের সঙ্গে বিভিন্নভাবে সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এতে আশ্বস্ত হবে।

সত্যি বলতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেরই চূড়ান্ত পর্যায়; যা কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ পায়। সাধারণ ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত দাবিকে বানচাল করতে গিয়ে সরকার যে দমনাভিযান শুরু করে, তার প্রতিবাদে এক পর্যায়ে সর্বস্তরের মানুষ নেমে আসে রাজপথে। তারা ছিল গণতান্ত্রিক অধিকারবঞ্চিত এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা ও অপমানের শিকার। সেই আন্দোলন দমনে হাসিনা সরকার তার অনুগত প্রশাসন ও দলীয় শক্তির চরম অপব্যবহার করেও টিকে থাকতে পারেনি। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলীয় নেতৃত্বকে কার্যত দেশ থেকে পালাতে হয়। তবে তার আগে এদের হাতে ঘটে নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড, যার শিকার হয়েছেন হাজারের অধিক মানুষ। জাতিসংঘের হিসাবে, কমপক্ষে ১৪০০ মানুষ নিহত হয় অল্প ক’দিনে। অন্তর্বর্তী শাসনামল পর্যন্ত ৮৪৪ জন শহীদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছিল।

বর্তমান সরকারের উচিত তালিকাটি দ্রুত সম্পূর্ণ করা। গণঅভ্যুত্থানে ভয়াবহভাবে হতাহতদের তালিকাও দীর্ঘ। চোখসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারিয়ে অনেকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কম ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও সঠিকভাবে হওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আন্দোলনে হতাহত সবার স্বীকৃতি, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পুনর্বাসন করা হবে। অনেকের চিকিৎসা এখনো সম্পন্ন হয়নি; কার্যকর সহায়তা প্রাপ্তিতেও অভিযোগ কম নেই। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল বিপুল। বিদেশে অবস্থান করলেও দলটির নেতা তারেক রহমান নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এতে। জুলাই-আগস্টে হতাহতদের বিষয়টি সন্তোষজনকভাবে ‘অ্যাড্রেস’ করা তাঁর পক্ষে কঠিনও নয়। তিনি সেটি নিশ্চিত করবেন বলে বারবার আশ্বস্তও করছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিশোধের পক্ষপাতী না হলেও গুরুতর অপরাধে জড়িতদের বিচারে কোনোরকম ছাড় দেওয়া হবে না বলেই জানাচ্ছেন তিনি। এমনটিও বলেছেন, কিছুটা সময় লাগলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।

হাসিনা সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান এজেন্ডা ছিল তিনটি— বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। নির্বাচন মোটামুটি গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন হলেও সংস্কারে অগ্রগতি হয়নি আর বিচার রয়েছে অসম্পূর্ণ। এত সব অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ অনুপস্থিতও বটে। আর সংস্কার চলমান প্রক্রিয়া বলে বিবেচিত। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মতভেদও রয়েছে। তবে জুলাই আন্দোলন দমনসহ বিগত সময়ে সংঘটিত অপরাধে জড়িতদের বিচারে কোনো পক্ষেরই আপত্তি নেই। এমন অঙ্গীকার অবশ্য মাঠে থাকা প্রধান সব দলের ছিল যে, সুনির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত না থাকা ব্যক্তিদের ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’-এর মাধ্যমে সমাজ ও রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ করে দেওয়া হবে। অন্তর্বর্তী শাসনামলে এমন উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার এখন বিচারের পাশাপাশি উদ্যোগটি নিতে পারে। এতে গুরুতর অপরাধের বিচার চলমান রাখার সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিরপরাধ অংশটিকে জাতীয় উন্নয়নে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ দেওয়া যাবে। এমনকি নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী সেই অনুষ্ঠানে সবকিছুর পরও সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে বার্তা দিয়েছেন, সেটি রাষ্ট্রনায়কোচিত। এটা তো ঠিক, গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের প্রতিটি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সবার ন্যূনতম চাওয়া ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ। এটি অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াসের চেয়ে বড় কিছু নেই।

Ad 300x250

সম্পর্কিত