জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিশেষ সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আহমেদুল কবির

রাষ্ট্রের দায়িত্ব নারীকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৬, ০৮: ৫৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

বিএনপি সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আহমেদুল কবির। তবে তিনিও মনে করেন, শুধু সহায়তা কর্মসূচির মধ্যে নারীকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বরং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নারীকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা।

অধ্যাপক আহমেদুল কবির ইবসেনের তিনটি নাটক– ‘A Doll’s House’, ‘Peer Gynt’ ও ‘The Wild Duck’– এর নির্দেশনা দিয়েছেন। এসব নাটকে নারীর প্রতি সহিংসতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির নানা বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে।

ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক আহমেদুল কবির বলেছেন, নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব ধীরে ধীরে সামাজিকীকরণ হয়। এখনো অনেক পরিবার মনে করে–উচ্চশিক্ষিত নারীদের চাকরি করা উচিৎ নয়। ফলে নারীর সম্ভাবনার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিরহাজুল শিবলী–

ঢাকা স্ট্রিম: উনিশ শতকে ইউরোপীয় সমাজে ইবসেন সামাজিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে নাটক লিখেছেন। তাঁর নাটকে নারী স্বাধীনতার প্রশ্নকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আহমেদুল কবির: ইবসেন সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যক্তিসত্তা— বিভিন্ন মাত্রায় মানুষের জীবনকে দেখেছেন। তাঁর বিস্তৃত পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী ও নারীর স্বাধীনতার প্রশ্ন। আমি তাঁর তিনটি নাটক থেকে তিন ধরনের নারী চরিত্র বেছে নিয়েছি। ‘আ ডল’স হাউস’-এর নারী বিবাহিত; ‘ওয়াইল্ড ডাক’-এ কিশোরী এবং ‘পিয়ার গিন্ট’-এর নারী একজন মা। তিন অবস্থান থেকে আমরা নারীর জীবন ও অভিজ্ঞতার ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা দেখতে পাই।

আমি শুধু ইবসেনের টেক্সটে সীমাবদ্ধ থাকিনি। আমাদের সমাজ, বিশেষ করে ঢাকা শহর ও বাংলাদেশের সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে চরিত্রগুলোকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছি। সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা সংসারে নারীরা কীভাবে বিভিন্ন সহিংসতা ও বৈষম্যের মুখোমুখি হয়, তা নাটকে অন্বেষণের চেষ্টা করেছি।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– নারীর প্রতি সহিংসতা সব সময় ভাষার মধ্য দিয়ে ঘটে না। অনেক সময় ভাষাহীন আচরণ, দৃষ্টি কিংবা সামাজিক নিয়মের মধ্যেও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য প্রকাশ পায়। মেয়েরা শৈশব থেকে কৈশোরে যাওয়ার সময় সমাজের নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের মুখোমুখি হয়। বিবাহিত নারী সংসারে টিকে থাকার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যায়। মা সন্তানকে নিয়ে যে উদ্বেগ-আকুতি বয়ে বেড়ান, এসব অভিজ্ঞতা নাটকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

ঢাকা স্ট্রিম: নারীর স্বাধীনতা কেবল পারিবারিক পরিসরে নাকি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত?

আহমেদুল কবির: অবশ্যই এটি বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিবেচনা করলে নারীর অবস্থান শুধু সামাজিক নয়; এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে, নির্যাতন কেবল নারীর ক্ষেত্রেই ঘটে– এমন নয়। সমাজে পুরুষও বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার। বাস্তবতা হলো আমাদের সমাজে নারীরা বেশি বৈষম্যের মুখোমুখি হয়। তাই নারীকে সম্মান করা এবং তাঁর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

নাটকগুলোর প্রযোজনার মূল উদ্দেশ্য– সমাজের অগ্রগতির জন্য নারীর প্রতি সম্মান অপরিহার্য। নারী ও পুরুষ উভয়ে সমানভাবে সমাজে অবদান রাখতে পারে। আমরা যদি নারীদের সুযোগ না দিই এবং তাদের ওপর আধিপত্য বজায় রাখি, তাহলে সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়।

ঢাকা স্ট্রিম: ‘ডল’স হাউস’-এ পরিবারে নারীর যে অবস্থান দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের পরিবারব্যবস্থায় কি তা এখনো বিদ্যমান?

আহমেদুল কবির: অনেক ক্ষেত্রে আছে। ইবসেন যেভাবে নোরা চরিত্রকে উপস্থাপন করেছেন, সেই বাস্তবতা আমাদের সমাজেও বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়। এখনো অনেক পরিবারে নারীর স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ সীমিত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও পুরুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। আমাদের সমাজে ধরে নেওয়া হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব পুরুষের। কিন্তু বাস্তবে নারীরাও সমানভাবে যুক্তিসংগত ও পরিণত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাঠামোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। আমার প্রযোজনায় আমি ইবসেনের নাটকের সমাপ্তিকে একটু ভিন্নভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছি। ‘ডল’স হাউস’-এ নোরা শেষ পর্যন্ত ঘর ছেড়ে চলে যায়। আমি দেখাতে চেয়েছি– নারী ও পুরুষ একে অপরকে ছেড়ে নয় বরং পারস্পরিক সম্মান ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে একসঙ্গে থেকে নতুন সমাজ নির্মাণ করতে পারে।

ঢাকা স্ট্রিম: মধ্যবিত্ত সমাজে নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পারিবারিক দায়িত্বের দ্বন্দ্ব কতটা প্রকট বলে আপনি মনে করেন?

আহমেদুল কবির: এর সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক মনোভাব ধীরে ধীরে সামাজিকীকরণ হয়। তাই নারীর জন্য সুশিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যবিত্ত সমাজে অনেক সময় দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত নারীও পারিবারিক চাপে কর্মজীবনে অংশ নিতে পারেন না। অনেক পরিবার এখনো মনে করে, পরিবারের নারীরা চাকরি করবে না। ফলে একজন শিক্ষিত নারীও তাঁর সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে পারে না। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

ঢাকা স্ট্রিম: রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

আহমেদুল কবির: বাংলাদেশের ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার আরেকটি দিক হলো– সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে এখনো পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব বেশি কাজ করে। আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, নারীরাও সুচিন্তিত মতামত দিতে পারে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে এই উপলব্ধি সমাজে শক্তিশালী হলে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবে বাড়বে।

ঢাকা স্ট্রিম: আইন থাকার পরেও নারীর প্রতি সহিংসতা কমছে না কেন?

আহমেদুল কবির: শুধু আইন করে সমাজ পরিবর্তন করা যায় না। পরিবর্তনের সূচনা হতে হবে পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে। শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন থেকেই তাকে শেখাতে হবে– নারী ও পুরুষ সমানভাবে সমাজে অবদান রাখতে পারে। আমরা একটি প্রজন্মকে এই মূল্যবোধের মধ্যে বড় করতে পারলে সামাজিক আচরণেও পরিবর্তন আসবে।

ঢাকা স্ট্রিম: নারীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চাল করেছে বিএনপি সরকার। নারীর ক্ষমতায়নে এটি কতটা কার্যকর বলে মনে করেন?

আহমেদুল কবির: এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু সহায়তা কর্মসূচির মধ্যে নারীকে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নারীদের স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে নারীরা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে। তখন তাদের কোনো সহায়তা কর্মসূচির ওপর নির্ভর করতে হবে না।

ঢাকা স্ট্রিম: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আহমেদুল কবির: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত