মতামত

ইটভাটা বন্ধে সরকারের অবস্থান কতটুকু সঠিক?

পরিবেশ প্রশ্নে ইটভাটা ভেঙে ফেলা যেমন যৌক্তিক, ঠিক তেমনি ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। বেকার শ্রমিকদের পরিবেশ বান্ধব ব্লক ইট তৈরি প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি ইটভাটা মালিকদের ব্লক ইট তৈরির ব্যাপারে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

ড. বিভূতিভূষণ মিত্র
ড. বিভূতিভূষণ মিত্র

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেছেন, পরিবেশ রক্ষায় সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বায়ু দূষণ রোধে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। নভেম্বর ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ১১টি অবৈধ ইটভাটা সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে অদ্যাবধি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫টি মামলা এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদে কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আফজাল হোসেনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা জানালেও সম্প্রতি ইটভাটা নিয়ে এমন কিছু সংবাদ বিভিন্ন মিডিয়াতে এসেছে, যা ইটভাটার ভয়াবহ চিত্রকেই সামনে এনেছে।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় সাত গ্রামের পাঁচ শতাধিক একর জমির ধান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ০১ মে ২০২৬ তারিখে একটি নিউজ পোর্টালের এমন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বহুরিয়া ও ভাওড়া ইউনিয়নের চার শতাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এমন অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা উপজেলা পরিষদ চত্বরে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা বলেন, ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় সাত গ্রামের সহস্রাধিক একর জমির ধান পুড়ে গেছে।

আরেকটি পত্রিকার ৩০ এপ্রিল প্রকাশিত সংবাদ মতে, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় একটি ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ায় প্রায় ৮০ বিঘা জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ৩০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। স্থানীয় কৃষকেরা এই ঘটনার প্রতিবাদে অবিলম্বে ইটভাটা বন্ধের জন্য বিক্ষোভ করেছেন। কৃষকদের অভিযোগ, সেখানকার তানজিলা নামক ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় ও গ্যাসে ফসলি জমির ধান গাছ ঝলসে গেছে।

ইট ভাটার কারণে শুধু বায়ু দূষণই হচ্ছে না। ইট তৈরির জন্য মাটির প্রয়োজন পড়ে। ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে। ফসলি ক্ষেতের মাটির উপরের অংশেই মূলত সার থাকে। কৃষকেরা না বুঝে মুনাফার লোভে মাটি বিক্রয় করে দিচ্ছেন।

বাংলাদেশে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড-নিয়ন্ত্রণে গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় ২০ নভেম্বর ২০১৩ সালে ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ নামের একটি আইন পাস করা হয়। এটি পরে আদেশ নং ২/২০১৮ দ্বারা সংশোধিত হয়।

এই আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট হতে লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া কোন ব্যক্তি ইট প্রস্তুত করতে পারবে না। ৪ক ধারায় বলা হয়েছে ইটভাটা ব্যতীত কোথাও ইট প্রস্তুত করা যাবে না।

আইনে মাটি ব্যবহার সংক্রান্ত কথাও বলা আছে। এতে বলা হয় কোন ব্যক্তি ইট তৈরি করবার জন্য কৃষি জমি, পাহাড়, বা টিলা থেকে মাটি কেটে ইট তৈরি করতে পারবে না। তবে জলো প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে মজা পুকুর, খাল বিল, দিঘি, নদ-নদী, হাওর-বাওর, চরাঞ্চল বা পতিত জায়গা থেকে মাটি কেটে তা ইটের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে।

এই আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে কোন জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করতে পারবে না। ৮ ধারায় বলা হয়েছে ছাড়পত্র থাকুক বা না থাকুক আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকায়, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা উপজেলা সদর, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বন, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষি জমি, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সীমানার ভিতরে কোন ইট ভাটা স্থাপন করা যাবে না।

এই সমস্ত বিধি লঙ্ঘন করলে শাস্তিরও বিধান রাখা হয়েছে। ১৪ ধারায় বলা হয়েছে লাইসেন্স ছাড়া কোন ব্যক্তি ইট ভাটা স্থাপন করলে, পরিচালনা বা চালু রাখলে ১ বৎসরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লক্ষ টাকা অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

এছাড়া ১৫ ধারা মতে কৃষি জমি, পাহাড়, বা টিলা থেকে মাটি কেটে সংগ্রহ করে ইটের কাঁচামালা হিসেবে ব্যবহার করলে বা জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া ইট তৈরির জন্য পুকুর, খাল, বিল, দিঘি, নদী, হাওর-বাওর, চরাঞ্চল, পতিত জায়গা থেকে মাটি কাটলে অনধিক ২ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। এছাড়া ইট ভাটায় জ্বালানি কাঠ ব্যবহার করলে ৩ বৎসরের কারাদণ্ড বা ৩ লক্ষ টাকা অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, ধলেশ্বরী নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা দূষণকারী ইটভাটা বন্ধে উদ্যোগ নেবেন। তিনি অবৈধ ইটভাটা বন্ধেও মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানান।

গত জানুয়ারি ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ধলেশ্বরী নদীর দুইপাড়ের অবৈধভাবে পরিচালিত ৩৬টি ইটভাটায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৮টি ইটভাটা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এভাবে সারাদেশে অবৈধ ইটভাটা শনাক্ত করে ভেঙে দেয়া প্রয়োজন। ইটভাটার কারণে এখন শুধু বায়ু দূষণ হচ্ছে না বরং সরাসরি কৃষকের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশ প্রশ্নে ইটভাটা ভেঙে ফেলা যেমন যৌক্তিক, ঠিক তেমনি ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। বেকার শ্রমিকদের পরিবেশ বান্ধব ব্লক ইট তৈরি প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি ইটভাটা মালিকদের ব্লক ইট তৈরির ব্যাপারে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

ভয়াবহ বায়ুদূষণের অন্যতম তিনটি প্রধান কারণের একটি ইট ভাটা। বাংলাদেশে যত্রতত্রই ইটভাটা রয়েছে। একটি তথ্য মতে এর সংখ্যা প্রায় ৮ হাজার। আর এর অর্ধেকই অবৈধ। অবৈধ ইট ভাটা বন্ধে হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশ উচ্চ আদালতে বেশ কয়েকটি রিট করেছে। এতে কিছুটা সফলতা আসলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি।

ইট ভাটার কারণে শুধু বায়ু দূষণই হচ্ছে না। ইট তৈরির জন্য মাটির প্রয়োজন পড়ে। ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে। ফসলি ক্ষেতের মাটির উপরের অংশেই মূলত সার থাকে। কৃষকেরা না বুঝে মুনাফার লোভে মাটি বিক্রয় করে দিচ্ছেন। এতে ফসলি জমির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশে হাজারেরও বেশি ইট ভাটা রয়েছে যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হয়। এতে অসংখ্য কাঠের প্রয়োজন পড়ে। যা গাছ কেটে জ্বালানি তৈরি করা হয়। ইট ভাটার জন্য এইভাবে অসংখ্য গাছ কাটার কারনে পরিবেশের ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় ইটভাটায় অনিরাপদ কর্মপরিবেশও শ্রমিকদের ঝুঁকিতে ফেলছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৯ সাল থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৩০৯টি ইটভাটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। ১১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। এই অবস্থায় শ্রমিকরা কর্মহীন হয়েও পড়ছেন। ২০২৩ সালের জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা ৭ হাজার ৮৮১টি। এর মধ্যে ৪ হাজার ৬৩৩টি ইটভাটা অবৈধ।

বর্তমানে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। এই সব ইটভাটায় কাজ করছে প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিক। গত ৭ বছরে কাজ হারিয়েছে প্রায় ৬ লাখ শ্রমিক। সরকারকে বেকার শ্রমিকদের নিয়েও ভাবতে হবে। অবৈধ ইটভাটা বন্ধের সাথে সাথে শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থান করা যায় কিনা তা সরকারকে নজরে আনতে হবে।

পরিবেশ প্রশ্নে ইটভাটা ভেঙে ফেলা যেমন যৌক্তিক, ঠিক তেমনি ইটভাটায় কর্মরত শ্রমিকদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। বেকার শ্রমিকদের পরিবেশ বান্ধব ব্লক ইট তৈরি প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি ইটভাটা মালিকদের ব্লক ইট তৈরির ব্যাপারে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লকই সঠিক বিকল্প। এতে ইটভাটা মালিকদের অনিশ্চয়তা কাটবে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তৈরি হবে বিকল্প বাজার। পরিবেশও থাকবে দূষণমুক্ত ।

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র: পরিবেশ বিষয়ক লেখক

সম্পর্কিত