মৌলভীবাজারের হাওরে ফসল রক্ষার লড়াই, রোদেও কাটেনি অনিশ্চয়তা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মৌলভীবাজার

প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬, ১৪: ৪৯
মৌলভীবাজারের হাওরে রোদে ধান রক্ষার চেষ্টা করছেন চাষিরা। স্ট্রিম ছবি

কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টি পর বুধবার (৬ মে) সকাল থেকে রোদের দেখা পাওয়াকে ফসল রক্ষার শেষ সুযোগ মনে করছেন মৌলভীবাজারের হাওরের ধান চাষিরা। সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরে ডুবে যাওয়া ধান কাটছেন তাঁরা। একই সঙ্গে নেমেছেন ভেজা ধান শুকানোর যুদ্ধে। তবে এখনো অনিশ্চয়তা কাটেনি।

উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রোদ উঠতেই শুরু হয়েছে কৃষকদের লড়াই। কেউ কোমরজলে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন, কেউ নৌকায় করে সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন উঁচু জমিতে। আবার কেউ ভেজা ধান মাড়াই করছেন— যতটুকু বাঁচানো যায় সেই আশায়।

এর আগে কোথাও কাটা ধান স্তূপ করে রাখা হলেও তাতে ধরেছে পচন। কোথাও সেই স্তূপ ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে পানির নিচে। নৌকার অভাবে অনেক কৃষকের কাটা ধান পানিতে থেকেই নষ্ট হওয়ার দিকে যাচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, জেলার সাতটি উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যে পচে নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজার কৃষক। মাঠপর্যায়ে এখনো ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চলছে।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, মাত্র দুদিন আগেও যেসব জমিতে পানি ছিল না, সেখানে এখন বুকসমান পানি। এ অবস্থায় ধান তোলার খরচও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। ৪০ থেকে ৫০ আঁটি ধান আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা। দৈনিক শ্রমিকের মজুরি গুনতে হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা।

মৌলভীবাজারের হাওরে রোদের দেখা পেয়ে ধান রক্ষার চেষ্টা করছেন চাষি। স্ট্রিম ছবি
মৌলভীবাজারের হাওরে রোদের দেখা পেয়ে ধান রক্ষার চেষ্টা করছেন চাষি। স্ট্রিম ছবি

অন্তেহরি গ্রামের কৃষক নিলয় কান্তিদাস জানান, কাউয়াদীঘি হাওরে তাঁর ১২ কিয়ার (বিঘা) জমির ফসলের বেশিরভাগই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ‘মাত্র ২ কিয়ার কোনো মতে তুলতে পেরেছি। এখন এটাই সম্বল। বাকিটা হারিয়ে ধারদেনা করেই চলতে হবে,’ বলেন তিনি।

বর্গাচাষি রনেন্দ্র সূত্রধরের একই অবস্থা। ৫ কিয়ার (বিঘা) জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেছিলেন তিনি। প্রতি কিয়ার জমি চাষ করতেই তাঁর খরচ হয়েছিল ১০ হাজার টাকার বেশি। বৃষ্টিপাতরে পর পানির নিচ থেকে মাত্র চার শতাংশ জমির ধান তুলতে পেরেছেন। ছয়জন শ্রমিক দিয়ে সেই ধান তুলতেই খরচ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। একইভাবে বুড়িকোনা গ্রামের রহিম মিয়া তাঁর ২০ কিয়ার জমির মধ্যে মাত্র ৪ কিয়ার ধান তুলতে পেরেছেন। তাও ভালো অবস্থায় নেই। ‘এখন আর কেউ বুকসমান পানিতে নামতে চায় না। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি,’ বলেন তিনি।

বিরইমাবাদ এলাকার কৃষক মফিজ মিয়া বলেন, ‘সারা বছরের খোরাকি পানির নিচে চলে গেছে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না। বুকসমান পানির নিচ থেকে ধান তুলেও লাভ নাই।’ পাশে দাঁড়ানো কৃষক শফিক মিয়া বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। সব ধান নষ্ট হয়ে গেছে। এখন খাব কী? সব খেত পানির নিচে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন জানান, ‘কাউয়াদীঘি হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেচ কার্যক্রম চালু থাকলেও ভারী বর্ষণের কারণে দ্রুত পানি নামানো সম্ভব হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে।’

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত