ড. জাইদি সাত্তারের সাক্ষাৎকার
ড. জাইদি সাত্তার, বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বিশেষজ্ঞ। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, আগামী জাতীয় বাজেট, রাজস্ব সংস্কারসহ নানা বিষয় নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্ট্রিম প্রতিবেদক

স্ট্রিম: আসন্ন বাজেট ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাজস্ব সংস্কার এবং রাজস্ব বৃদ্ধি। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সম্ভবত বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারের রাজস্ব খাতের ঠিক কোন কোন জায়গায় সংস্কার আনা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ড. জাইদি সাত্তার: আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থায় মূলত তিনটি খাত বা স্তর রয়েছে। প্রথমটি হলো ‘প্রত্যক্ষ কর’। এর মধ্যে করপোরেট কর, ব্যক্তিগত আয়কর এবং সম্পদ কর অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়টি হলো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং তৃতীয়টি হলো বাণিজ্য শুল্ক বা কর। এই তিনটি খাতেই এখন ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংস্কারটি হওয়া প্রয়োজন করের আওতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর এবং ভ্যাটের ক্ষেত্রে আমাদের করের আওতা অত্যন্ত সংকীর্ণ। এর প্রধান কারণ হলো মাত্রাতিরিক্ত কর অব্যাহতির সুবিধা, যা এখন যৌক্তিকীকরণ করা অত্যন্ত জরুরি। সব ধরনের কর অব্যাহতি বাতিলের কথা বলছি না। তবে পরিসংখ্যান দেখলে বিস্মিত হতে হয়—আমাদের রাজস্ব আয় যেখানে জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ, সেখানে কর অব্যাহতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ! অর্থনীতিতে এটিকে 'ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার' বলা হয়। এত বিপুল পরিমাণ ছাড় দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এগুলো যৌক্তিকীকরণ করা হলে করের আওতা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, কেবল তাদের ওপরই বাড়তি চাপ প্রয়োগ করে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত করের আওতা সম্প্রসারণ করা। বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ কর, ভ্যাট বা বাণিজ্য কর—সব ক্ষেত্রেই করের হার অনেক বেশি। তাই নতুন করে করের হার বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সব মনোযোগ দিতে হবে ট্যাক্স বেইজ বাড়ানোর দিকে।
স্ট্রিম: করের আওতা বাড়ানো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা যেতে পারে? বিশেষ করে আমাদের সনাতনী কর ব্যবস্থা এবং করদাতাদের হয়রানির যে অভিযোগ রয়েছে, তা দূর করতে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?
ড. জাইদি সাত্তার: করের আওতা বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি যে সংস্কারটি প্রয়োজন, তা হলো আধুনিকায়ন। আমরা এখনো অত্যন্ত সেকেলে বা প্রাচীন ধারার কর ব্যবস্থা ব্যবহার করছি। পুরো ব্যবস্থাকে দ্রুত ডিজিটাইজ করতে হবে এবং এর সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযুক্তি ঘটাতে হবে। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে, অথচ আমরা সাধারণ কম্পিউটারাইজেশনের দিক থেকেও অনেক পিছিয়ে আছি। কিন্তু সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তবে এই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন কিছু নয়। আমি মনে করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হলে দেশে 'ট্যাক্স টেরোরিজম' বা জোরপূর্বক হয়রানি করে কর আদায়ের মতো প্রথার বিলুপ্তি ঘটবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সনাতনী পদ্ধতির সম্পূর্ণ অবসান ঘটিয়ে কর আদায়ে শতভাগ এআই-এর ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। এর মাধ্যমে কর ফাঁকির প্রবণতা নিমিষেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
আমাদের দেশে এখন জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এই এনআইডির সাথে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরের (টিন) সফল সমন্বয় ঘটিয়ে আরও বেশি মানুষকে করের আওতায় আনা সম্ভব। বাকি কাজটুকু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই করতে পারবে। আমাদের আরেকটি মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন, তা হলো—করদাতা এবং কর আদায়কারীর মধ্যকার সরাসরি যোগাযোগ বা ইন্টারঅ্যাকশন একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। উন্নত বিশ্বে মানুষ ঘরে বসে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেন। আমাদের দেশেও অনলাইনে রিটার্ন জমার সিস্টেমে এআই যুক্ত করা যায়। ধরুন, ১ লাখ মানুষ রিটার্ন জমা দিলেন। এর মধ্যে যদি ৫ হাজার মানুষ তথ্য গোপন বা কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন, এআই দ্রুত তাদের শনাক্ত করতে পারবে। তখন কর্তৃপক্ষ কেবল ওই ৫ হাজার মানুষের ওপরই নজরদারি করবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও আমাদের আরও উন্মুক্ত হতে হবে। এ জন্য কাস্টমস ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অটোমেটেড করা জরুরি। আমাদের কাছে ইতোমধ্যেই 'অ্যাসাইকুডা'-এর মতো উন্নত আন্তর্জাতিক সিস্টেম রয়েছে।
স্ট্রিম: কিন্তু এটা তো পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না?
ড. জাইদি সাত্তার: একদমই তাই। ব্যবহার হচ্ছে না কারণ, এর ভেতরেই এক ধরনের প্রবল বাধা বা রেজিস্ট্যান্স রয়েছে। ভেতরের অনেকেই চান না যে এই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হোক।
অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের মাধ্যমে 'প্রি-শিপমেন্ট সাবমিশন' সম্ভব। অর্থাৎ, আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগেই কর সংক্রান্ত যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা অনলাইনে সম্পন্ন করে ফেলা যায়। পণ্য আসার সাথে সাথেই তা দ্রুত খালাস বা রিলিজ হয়ে যাওয়া উচিত। এরপর প্রয়োজন হলে 'পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট' করা যেতে পারে। প্রতিদিনের হাজার হাজার ট্রানজ্যাকশন ম্যানুয়ালি চেক করার কোনো প্রয়োজন নেই। এখানেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যায়। এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করে বলে দেবে কোন ২ শতাংশ ট্রানজ্যাকশনে সন্দেহজনক কর ফাঁকির ঝুঁকি আছে। কেবল সেগুলোরই অডিট বা ইন্সপেকশন হওয়া উচিত।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই আধুনিক ব্যবস্থাটি অবিলম্বে কার্যকর করা প্রয়োজন। এর ফলে আমাদের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্য সম্প্রসারণের সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাণিজ্য ১ শতাংশ বাড়লে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ০.৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই সাথে, বাণিজ্য উন্মুক্ত হলে বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দামও কমে আসে। পরিসংখ্যান বলছে, এতে পণ্যের দাম ০.৩ থেকে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বর্তমান শুল্ক ব্যবস্থা এবং বাণিজ্য নীতি এই পথে এখনো বড় অন্তরায় হয়ে আছে।
স্ট্রিম: অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে শুল্কহার অনেক বেশি। এই উচ্চ শুল্ক ব্যবস্থার কারণে দেশের মূল্যস্ফীতিতে কি কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে?
ড. জাইদি সাত্তার: নিশ্চিতভাবেই পড়ছে। আমাদের দেশে আমদানি করা জিনিসপত্রের ওপর, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চহারে শুল্ক বসানো আছে। ধরুন, কোনো আমদানি পণ্যের ওপর যদি ৭০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, তবে দেশীয় বাজারে মুনাফাসহ সেই পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ১০০ শতাংশ বা দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মানে হলো, সাধারণ ভোক্তাদের বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক দামের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হচ্ছে।
এই উচ্চ শুল্ক বসানোর পেছনে মূলত রাজস্ব আদায়ের প্রবণতা কাজ করে। আমাদের রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা মূলত বাণিজ্য শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাণিজ্য করের ওপর এত বেশি নির্ভরশীলতা দেখা যায় না। আমাদের দেশে এটি করা হয় কারণ আমদানি পর্যায়ে কর বসিয়ে রাজস্ব আদায় করাটা বেশ সহজ। সৌভাগ্যবশত আমরা রপ্তানি পণ্যের ওপর কর বসাইনি, তা না হলে দেশের রপ্তানি খাত হয়তো ধ্বংসই হয়ে যেত! আগামীতে আমাদের এই বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরশীলতা অবশ্যই কমাতে হবে।
আমাদের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সক্ষমতা অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। বর্তমানে এটি ৭ শতাংশে আছে। রাতারাতি এটি ১৫ শতাংশে নেওয়া সম্ভব নয়। অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে। তবে মধ্যমেয়াদে, অর্থাৎ আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে একে ১০ থেকে ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এর জন্য বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে আমাদের রাজস্ব আয়ের ৭০ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর (ভ্যাট ও বাণিজ্য কর) থেকে, আর প্রত্যক্ষ কর থেকে আসে মাত্র ৩০ শতাংশ। পরোক্ষ কর মূলত দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের ওপর বেশি চাপ ফেলে। তাই আগামী ১০ বছরের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অনুপাত ৫০:৫০-এ নামিয়ে আনতে হবে।
স্ট্রিম: কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভেতরে যে তীব্র বিরোধিতা রয়েছে, তাতে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সংস্কার না করে কি এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব? আপনারা তো সংস্কারের অনেকগুলো প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো তো বাস্তবায়িত হয়নি।
ড. জাইদি সাত্তার: আপনি একদম ঠিক বলেছেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে ভেতরে প্রচুর বাধা রয়েছে। আর এই বাধা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলা করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বড় দায়িত্ব। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে, জনসেবা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো খাতগুলোতে বিপুল বিনিয়োগের জন্য আমাদের রাজস্ব প্রয়োজন। সবকিছু ঋণ নিয়ে করা সম্ভব নয়, আবার বৈদেশিক নির্ভরতাও আমাদের কমাতে হবে। তাই এখানে একটি 'জাতীয় প্রতিশ্রুতি' দরকার, যা মূলত একটি রাজনৈতিক কাজ।
আমরা কারিগরি দিক থেকে হয়তো বলে দিতে পারি কী করা উচিত। যেমন, আমরা বলছি করের হার বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। সরকারের মন্ত্রীরাও বলেছেন যে তাঁরা করের হার বাড়াবেন না, যা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু করের আওতা বা ট্যাক্স বেইজ বাড়াতে যথেষ্ট জোর দিতে হবে। রাজস্ব আদায়ে সংস্কারের যে বাধা আসবে, তাকে রাজনৈতিকভাবেই অপসারণ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, একটি রাজনৈতিক সরকারের সেই সক্ষমতা রয়েছে।
স্ট্রিম: আপনারা কর নীতি প্রণয়ন (ট্যাক্স পলিসি) এবং কর আদায় (ট্যাক্স কালেকশন) বিভাগ দুটিকে আলাদা করার সুপারিশ করেছিলেন। সারা পৃথিবীতে এমন ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের এখানে তা করা হয়নি। আপনার কি মনে হয় এটি করা জরুরি?
ড. জাইদি সাত্তার: অবশ্যই জরুরি। উন্নত বিশ্বে যেখানে কার্যকর কর ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে এই দুটি বিভাগ আলাদা। সেসব দেশে মানুষ অনলাইনে রিটার্ন জমা দেন এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা গৃহীত হয়। আমাদের দেশেও এটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। যারা কর নীতি নির্ধারণ করবেন, তাঁরাই আবার কর আদায়কারী হতে পারেন না—এটি সরাসরি স্বার্থের সংঘাত। আমরা গত ২০ বছর ধরে এই কথাটি বলে আসছি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার এটি করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের তো পর্যাপ্ত রাজনৈতিক সমর্থন বা সক্ষমতা থাকে না। নীতিগতভাবে কেউ কিন্তু বলছে না যে এই সংস্কারটি করা উচিত নয়। কিন্তু যেহেতু এটি একটি বিশাল বড় সংস্কার, তাই এর বিরুদ্ধে ভেতরের রেজিস্ট্যান্সও অনেক বেশি। আমি আবারও বলব, এই বাধাকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে এবং একটি রাজনৈতিক সরকারই এটি করতে সক্ষম।
স্ট্রিম: গত দু-তিন বছর ধরে বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই আমরা মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামাতে পারছি না। এটি নিয়ন্ত্রণে না আসার মূল কারণ বা দুর্বলতাটি আসলে কোথায়?
ড. জাইদি সাত্তার: আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি মূলত দুটি কারণে ঘটছে। প্রথমটি হলো চাহিদা বৃদ্ধিজনিত কারণ, আর দ্বিতীয়টি হলো ব্যয় বৃদ্ধিজনিত কারণ। এর সূত্রপাত হয় ২০২২-২৩ সালে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট হয়, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল।
ঠিক একই সময়ে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন করতে হয়। প্রশ্ন আসতে পারে, হঠাৎ কেন এত অবমূল্যায়ন করা হলো? এর কারণ হলো, গত ১০ বছর ধরে ডলারের দাম ৮৫ টাকায় কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। যখন ধাক্কাটি এলো, তখন ডলার ৮৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ১০০, তারপর ১১০ এবং বর্তমানে ১২২ টাকায় এসে ঠেকেছে। টাকার এই বিশাল অবমূল্যায়ন মূল্যস্ফীতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। আইএমএফ-এর পরিসংখ্যানেও তা প্রমাণিত। এর সাথে ২০২৩ সালের দিকে জ্বালানির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই দুটি বিষয় মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
স্ট্রিম: এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের নীতিগত পদক্ষেপগুলো কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ড. জাইদি সাত্তার: মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে দুটি পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। প্রথমত, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা, যেখানে সুদের হার একটি বড় হাতিয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে পলিসি রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, এটি কমানো যায় না কেন? সমস্যা হলো, পলিসি রেট ১০% আর মূল্যস্ফীতি ৯% হলে, প্রকৃত সুদহার দাঁড়ায় মাত্র ১ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য হলো প্রকৃত সুদহার ৩ শতাংশে নিয়ে আসা। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি কমে ৭ শতাংশে নামলে তবেই পলিসি রেট কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কষ্টদায়ক একটি প্রক্রিয়া। সত্তর দশকের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পল ভলকার সুদের হার ২০-২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিলেন। টানা তিন বছর এমন পরিস্থিতি সহ্য করার পর মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নেমে আসে এবং পরবর্তী ২০ বছর তা ওই ২ শতাংশেই স্থির ছিল। সুতরাং, মুদ্রানীতির মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা একটি অপরিহার্য শর্ত হলেও, এটিই যথেষ্ট নয়।
সাপ্লাই সাইড বা সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে। টাকার ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম না বাড়লেও দেশে আমদানি পণ্যের দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া। এর ওপর রয়েছে উচ্চ শুল্ক। আমি দেখেছি, গত তিন বছরে এনবিআর আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের (ইনভয়েস ভ্যালু) চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি শুল্কায়ন মূল্য (অ্যাসেসেবল ভ্যালু) ধরে কর আদায় করছে। ফলে আমদানি পর্যায় থেকেই পণ্যের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।
স্ট্রিম: এর পাশাপাশি রাজস্ব নীতির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বিশেষ করে বাজেটের বড় ঘাটতি মেটাতে সরকার যে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়, তা সামগ্রিক অর্থনীতি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেমন প্রভাব ফেলছে?
ড. জাইদি সাত্তার: আমাদের রাজস্ব নীতির বড় দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের বাজেটে বড় ঘাটতি থাকে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার তিনটি কাজ করতে পারে—ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া, অথবা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া কঠোর হাতে বন্ধ রেখেছেন। কারণ, এটি সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। আবার সরকার যদি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। আর সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিলে সরকারকে উচ্চহারে সুদ গুনতে হয়। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার প্রত্যেকটিরই নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
বাজেট ঘাটতি মেটানোর আরেকটি উপায় হলো বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা বা এআইআইবি-এর মতো সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এগুলো এখনো বেশ সস্তা। অনেকেই বৈদেশিক ঋণের বোঝা নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের শঙ্কা প্রকাশ করেন। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর হিসাবমতে, আমরা এখনো 'মধ্যম সারির ঋণগ্রস্ত' দেশ। যদিও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর ঋণের সুদহার কিছুটা বাড়বে, তবুও আমাদের ঋণ নিতে হবে। কারণ, অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে জিডিপির অন্তত ৩০-৩২ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা কেবল রাজস্ব আয় দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এর জন্য সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে এফডিআই জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ, যা অন্তত ২ থেকে ৪ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের বর্তমান বাণিজ্য নীতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হচ্ছেন না।
স্ট্রিম: বিদেশি বিনিয়োগ না এলে তো বেসরকারি বিনিয়োগও হচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরে আমরা বিনিয়োগের অত্যন্ত খারাপ অবস্থা দেখছি। অথচ সরকার চাইছে আগামী ৫ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করতে। বিনিয়োগ ছাড়া এই বিপুল কর্মসংস্থান কীভাবে সম্ভব?
ড. জাইদি সাত্তার: একদমই সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান কোনোভাবেই হতে পারে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেবল বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য আসেন না। তারা মূলত রপ্তানিমুখী বিনিয়োগ নিয়ে আসেন। অর্থাৎ, তারা আমাদের সস্তা শ্রম ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে চান। তাদের আকর্ষণ করার জন্য আমাদের বাণিজ্য নীতিতে ব্যাপক সংস্কার এনে তা আরও উন্মুক্ত ও বিনিয়োগবান্ধব করা অত্যন্ত জরুরি।
স্ট্রিম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ড. জাইদি সাত্তার: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ড. জাইদি সাত্তার, বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান। বাংলাদেশের বাণিজ্য নীতি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বিশেষজ্ঞ। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, আগামী জাতীয় বাজেট, রাজস্ব সংস্কারসহ নানা বিষয় নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
স্ট্রিম: আসন্ন বাজেট ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাজস্ব সংস্কার এবং রাজস্ব বৃদ্ধি। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা সম্ভবত বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন। এই প্রেক্ষাপটে, সরকারের রাজস্ব খাতের ঠিক কোন কোন জায়গায় সংস্কার আনা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ড. জাইদি সাত্তার: আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থায় মূলত তিনটি খাত বা স্তর রয়েছে। প্রথমটি হলো ‘প্রত্যক্ষ কর’। এর মধ্যে করপোরেট কর, ব্যক্তিগত আয়কর এবং সম্পদ কর অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়টি হলো মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট এবং তৃতীয়টি হলো বাণিজ্য শুল্ক বা কর। এই তিনটি খাতেই এখন ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সংস্কারটি হওয়া প্রয়োজন করের আওতা বৃদ্ধি। বিশেষ করে প্রত্যক্ষ কর এবং ভ্যাটের ক্ষেত্রে আমাদের করের আওতা অত্যন্ত সংকীর্ণ। এর প্রধান কারণ হলো মাত্রাতিরিক্ত কর অব্যাহতির সুবিধা, যা এখন যৌক্তিকীকরণ করা অত্যন্ত জরুরি। সব ধরনের কর অব্যাহতি বাতিলের কথা বলছি না। তবে পরিসংখ্যান দেখলে বিস্মিত হতে হয়—আমাদের রাজস্ব আয় যেখানে জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ, সেখানে কর অব্যাহতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ! অর্থনীতিতে এটিকে 'ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার' বলা হয়। এত বিপুল পরিমাণ ছাড় দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এগুলো যৌক্তিকীকরণ করা হলে করের আওতা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে আমরা দেখতে পাই, যারা নিয়মিত কর দিচ্ছেন, কেবল তাদের ওপরই বাড়তি চাপ প্রয়োগ করে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত করের আওতা সম্প্রসারণ করা। বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ কর, ভ্যাট বা বাণিজ্য কর—সব ক্ষেত্রেই করের হার অনেক বেশি। তাই নতুন করে করের হার বাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আমাদের সব মনোযোগ দিতে হবে ট্যাক্স বেইজ বাড়ানোর দিকে।
স্ট্রিম: করের আওতা বাড়ানো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা যেতে পারে? বিশেষ করে আমাদের সনাতনী কর ব্যবস্থা এবং করদাতাদের হয়রানির যে অভিযোগ রয়েছে, তা দূর করতে প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?
ড. জাইদি সাত্তার: করের আওতা বাড়ানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি যে সংস্কারটি প্রয়োজন, তা হলো আধুনিকায়ন। আমরা এখনো অত্যন্ত সেকেলে বা প্রাচীন ধারার কর ব্যবস্থা ব্যবহার করছি। পুরো ব্যবস্থাকে দ্রুত ডিজিটাইজ করতে হবে এবং এর সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযুক্তি ঘটাতে হবে। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব পেরিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে, অথচ আমরা সাধারণ কম্পিউটারাইজেশনের দিক থেকেও অনেক পিছিয়ে আছি। কিন্তু সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে, তবে এই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন কিছু নয়। আমি মনে করি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হলে দেশে 'ট্যাক্স টেরোরিজম' বা জোরপূর্বক হয়রানি করে কর আদায়ের মতো প্রথার বিলুপ্তি ঘটবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সনাতনী পদ্ধতির সম্পূর্ণ অবসান ঘটিয়ে কর আদায়ে শতভাগ এআই-এর ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। এর মাধ্যমে কর ফাঁকির প্রবণতা নিমিষেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
আমাদের দেশে এখন জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। এই এনআইডির সাথে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বরের (টিন) সফল সমন্বয় ঘটিয়ে আরও বেশি মানুষকে করের আওতায় আনা সম্ভব। বাকি কাজটুকু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই করতে পারবে। আমাদের আরেকটি মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন, তা হলো—করদাতা এবং কর আদায়কারীর মধ্যকার সরাসরি যোগাযোগ বা ইন্টারঅ্যাকশন একেবারে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। উন্নত বিশ্বে মানুষ ঘরে বসে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেন। আমাদের দেশেও অনলাইনে রিটার্ন জমার সিস্টেমে এআই যুক্ত করা যায়। ধরুন, ১ লাখ মানুষ রিটার্ন জমা দিলেন। এর মধ্যে যদি ৫ হাজার মানুষ তথ্য গোপন বা কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন, এআই দ্রুত তাদের শনাক্ত করতে পারবে। তখন কর্তৃপক্ষ কেবল ওই ৫ হাজার মানুষের ওপরই নজরদারি করবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও আমাদের আরও উন্মুক্ত হতে হবে। এ জন্য কাস্টমস ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অটোমেটেড করা জরুরি। আমাদের কাছে ইতোমধ্যেই 'অ্যাসাইকুডা'-এর মতো উন্নত আন্তর্জাতিক সিস্টেম রয়েছে।
স্ট্রিম: কিন্তু এটা তো পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে না?
ড. জাইদি সাত্তার: একদমই তাই। ব্যবহার হচ্ছে না কারণ, এর ভেতরেই এক ধরনের প্রবল বাধা বা রেজিস্ট্যান্স রয়েছে। ভেতরের অনেকেই চান না যে এই প্রযুক্তির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হোক।
অ্যাসাইকুডা সিস্টেমের মাধ্যমে 'প্রি-শিপমেন্ট সাবমিশন' সম্ভব। অর্থাৎ, আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর আগেই কর সংক্রান্ত যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা অনলাইনে সম্পন্ন করে ফেলা যায়। পণ্য আসার সাথে সাথেই তা দ্রুত খালাস বা রিলিজ হয়ে যাওয়া উচিত। এরপর প্রয়োজন হলে 'পোস্ট ক্লিয়ারেন্স অডিট' করা যেতে পারে। প্রতিদিনের হাজার হাজার ট্রানজ্যাকশন ম্যানুয়ালি চেক করার কোনো প্রয়োজন নেই। এখানেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা যায়। এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ করে বলে দেবে কোন ২ শতাংশ ট্রানজ্যাকশনে সন্দেহজনক কর ফাঁকির ঝুঁকি আছে। কেবল সেগুলোরই অডিট বা ইন্সপেকশন হওয়া উচিত।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এই আধুনিক ব্যবস্থাটি অবিলম্বে কার্যকর করা প্রয়োজন। এর ফলে আমাদের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্য সম্প্রসারণের সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাণিজ্য ১ শতাংশ বাড়লে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ০.৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। একই সাথে, বাণিজ্য উন্মুক্ত হলে বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দামও কমে আসে। পরিসংখ্যান বলছে, এতে পণ্যের দাম ০.৩ থেকে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বর্তমান শুল্ক ব্যবস্থা এবং বাণিজ্য নীতি এই পথে এখনো বড় অন্তরায় হয়ে আছে।
স্ট্রিম: অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে শুল্কহার অনেক বেশি। এই উচ্চ শুল্ক ব্যবস্থার কারণে দেশের মূল্যস্ফীতিতে কি কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে?
ড. জাইদি সাত্তার: নিশ্চিতভাবেই পড়ছে। আমাদের দেশে আমদানি করা জিনিসপত্রের ওপর, বিশেষ করে ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উচ্চহারে শুল্ক বসানো আছে। ধরুন, কোনো আমদানি পণ্যের ওপর যদি ৭০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়, তবে দেশীয় বাজারে মুনাফাসহ সেই পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ১০০ শতাংশ বা দ্বিগুণ হয়ে যায়। এর মানে হলো, সাধারণ ভোক্তাদের বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক দামের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হচ্ছে।
এই উচ্চ শুল্ক বসানোর পেছনে মূলত রাজস্ব আদায়ের প্রবণতা কাজ করে। আমাদের রাজস্ব আদায় ব্যবস্থা মূলত বাণিজ্য শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। বিশ্বের অন্যান্য দেশে বাণিজ্য করের ওপর এত বেশি নির্ভরশীলতা দেখা যায় না। আমাদের দেশে এটি করা হয় কারণ আমদানি পর্যায়ে কর বসিয়ে রাজস্ব আদায় করাটা বেশ সহজ। সৌভাগ্যবশত আমরা রপ্তানি পণ্যের ওপর কর বসাইনি, তা না হলে দেশের রপ্তানি খাত হয়তো ধ্বংসই হয়ে যেত! আগামীতে আমাদের এই বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরশীলতা অবশ্যই কমাতে হবে।
আমাদের অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সক্ষমতা অনুযায়ী কর-জিডিপি অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া উচিত। বর্তমানে এটি ৭ শতাংশে আছে। রাতারাতি এটি ১৫ শতাংশে নেওয়া সম্ভব নয়। অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে। তবে মধ্যমেয়াদে, অর্থাৎ আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে একে ১০ থেকে ১২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এর জন্য বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর ও ভ্যাটের আওতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে আমাদের রাজস্ব আয়ের ৭০ শতাংশই আসে পরোক্ষ কর (ভ্যাট ও বাণিজ্য কর) থেকে, আর প্রত্যক্ষ কর থেকে আসে মাত্র ৩০ শতাংশ। পরোক্ষ কর মূলত দরিদ্র ও নিম্নবিত্তের ওপর বেশি চাপ ফেলে। তাই আগামী ১০ বছরের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অনুপাত ৫০:৫০-এ নামিয়ে আনতে হবে।
স্ট্রিম: কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভেতরে যে তীব্র বিরোধিতা রয়েছে, তাতে এই প্রতিষ্ঠানটিকে সংস্কার না করে কি এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব? আপনারা তো সংস্কারের অনেকগুলো প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো তো বাস্তবায়িত হয়নি।
ড. জাইদি সাত্তার: আপনি একদম ঠিক বলেছেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে ভেতরে প্রচুর বাধা রয়েছে। আর এই বাধা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে মোকাবিলা করা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের বড় দায়িত্ব। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে যে, জনসেবা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো খাতগুলোতে বিপুল বিনিয়োগের জন্য আমাদের রাজস্ব প্রয়োজন। সবকিছু ঋণ নিয়ে করা সম্ভব নয়, আবার বৈদেশিক নির্ভরতাও আমাদের কমাতে হবে। তাই এখানে একটি 'জাতীয় প্রতিশ্রুতি' দরকার, যা মূলত একটি রাজনৈতিক কাজ।
আমরা কারিগরি দিক থেকে হয়তো বলে দিতে পারি কী করা উচিত। যেমন, আমরা বলছি করের হার বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। সরকারের মন্ত্রীরাও বলেছেন যে তাঁরা করের হার বাড়াবেন না, যা খুবই ইতিবাচক। কিন্তু করের আওতা বা ট্যাক্স বেইজ বাড়াতে যথেষ্ট জোর দিতে হবে। রাজস্ব আদায়ে সংস্কারের যে বাধা আসবে, তাকে রাজনৈতিকভাবেই অপসারণ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, একটি রাজনৈতিক সরকারের সেই সক্ষমতা রয়েছে।
স্ট্রিম: আপনারা কর নীতি প্রণয়ন (ট্যাক্স পলিসি) এবং কর আদায় (ট্যাক্স কালেকশন) বিভাগ দুটিকে আলাদা করার সুপারিশ করেছিলেন। সারা পৃথিবীতে এমন ব্যবস্থা থাকলেও আমাদের এখানে তা করা হয়নি। আপনার কি মনে হয় এটি করা জরুরি?
ড. জাইদি সাত্তার: অবশ্যই জরুরি। উন্নত বিশ্বে যেখানে কার্যকর কর ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে এই দুটি বিভাগ আলাদা। সেসব দেশে মানুষ অনলাইনে রিটার্ন জমা দেন এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা গৃহীত হয়। আমাদের দেশেও এটি প্রয়োগ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। যারা কর নীতি নির্ধারণ করবেন, তাঁরাই আবার কর আদায়কারী হতে পারেন না—এটি সরাসরি স্বার্থের সংঘাত। আমরা গত ২০ বছর ধরে এই কথাটি বলে আসছি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার এটি করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের তো পর্যাপ্ত রাজনৈতিক সমর্থন বা সক্ষমতা থাকে না। নীতিগতভাবে কেউ কিন্তু বলছে না যে এই সংস্কারটি করা উচিত নয়। কিন্তু যেহেতু এটি একটি বিশাল বড় সংস্কার, তাই এর বিরুদ্ধে ভেতরের রেজিস্ট্যান্সও অনেক বেশি। আমি আবারও বলব, এই বাধাকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে এবং একটি রাজনৈতিক সরকারই এটি করতে সক্ষম।
স্ট্রিম: গত দু-তিন বছর ধরে বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কোনোভাবেই আমরা মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নামাতে পারছি না। এটি নিয়ন্ত্রণে না আসার মূল কারণ বা দুর্বলতাটি আসলে কোথায়?
ড. জাইদি সাত্তার: আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি মূলত দুটি কারণে ঘটছে। প্রথমটি হলো চাহিদা বৃদ্ধিজনিত কারণ, আর দ্বিতীয়টি হলো ব্যয় বৃদ্ধিজনিত কারণ। এর সূত্রপাত হয় ২০২২-২৩ সালে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। এতে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রকট হয়, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল।
ঠিক একই সময়ে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন করতে হয়। প্রশ্ন আসতে পারে, হঠাৎ কেন এত অবমূল্যায়ন করা হলো? এর কারণ হলো, গত ১০ বছর ধরে ডলারের দাম ৮৫ টাকায় কৃত্রিমভাবে আটকে রাখা হয়েছিল। যখন ধাক্কাটি এলো, তখন ডলার ৮৫ টাকা থেকে লাফিয়ে ১০০, তারপর ১১০ এবং বর্তমানে ১২২ টাকায় এসে ঠেকেছে। টাকার এই বিশাল অবমূল্যায়ন মূল্যস্ফীতি বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। আইএমএফ-এর পরিসংখ্যানেও তা প্রমাণিত। এর সাথে ২০২৩ সালের দিকে জ্বালানির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই দুটি বিষয় মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
স্ট্রিম: এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের নীতিগত পদক্ষেপগুলো কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ড. জাইদি সাত্তার: মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে দুটি পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। প্রথমত, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা, যেখানে সুদের হার একটি বড় হাতিয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে পলিসি রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করেছে। অনেকেই প্রশ্ন করেন, এটি কমানো যায় না কেন? সমস্যা হলো, পলিসি রেট ১০% আর মূল্যস্ফীতি ৯% হলে, প্রকৃত সুদহার দাঁড়ায় মাত্র ১ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য হলো প্রকৃত সুদহার ৩ শতাংশে নিয়ে আসা। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি কমে ৭ শতাংশে নামলে তবেই পলিসি রেট কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা বেশ কষ্টদায়ক একটি প্রক্রিয়া। সত্তর দশকের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রে যখন ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান পল ভলকার সুদের হার ২০-২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিলেন। টানা তিন বছর এমন পরিস্থিতি সহ্য করার পর মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশে নেমে আসে এবং পরবর্তী ২০ বছর তা ওই ২ শতাংশেই স্থির ছিল। সুতরাং, মুদ্রানীতির মাধ্যমে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা একটি অপরিহার্য শর্ত হলেও, এটিই যথেষ্ট নয়।
সাপ্লাই সাইড বা সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়েও আমাদের কাজ করতে হবে। টাকার ৪০ শতাংশ অবমূল্যায়নের অর্থ হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম না বাড়লেও দেশে আমদানি পণ্যের দাম ৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া। এর ওপর রয়েছে উচ্চ শুল্ক। আমি দেখেছি, গত তিন বছরে এনবিআর আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের (ইনভয়েস ভ্যালু) চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি শুল্কায়ন মূল্য (অ্যাসেসেবল ভ্যালু) ধরে কর আদায় করছে। ফলে আমদানি পর্যায় থেকেই পণ্যের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়।
স্ট্রিম: এর পাশাপাশি রাজস্ব নীতির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বিশেষ করে বাজেটের বড় ঘাটতি মেটাতে সরকার যে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়, তা সামগ্রিক অর্থনীতি এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেমন প্রভাব ফেলছে?
ড. জাইদি সাত্তার: আমাদের রাজস্ব নীতির বড় দুর্বলতা রয়েছে। আমাদের বাজেটে বড় ঘাটতি থাকে। এই ঘাটতি মেটাতে সরকার তিনটি কাজ করতে পারে—ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া, সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া, অথবা সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নেওয়া কঠোর হাতে বন্ধ রেখেছেন। কারণ, এটি সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়ায়। আবার সরকার যদি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। আর সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিলে সরকারকে উচ্চহারে সুদ গুনতে হয়। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার প্রত্যেকটিরই নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।
বাজেট ঘাটতি মেটানোর আরেকটি উপায় হলো বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা বা এআইআইবি-এর মতো সংস্থাগুলো থেকে ঋণ নেওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় এগুলো এখনো বেশ সস্তা। অনেকেই বৈদেশিক ঋণের বোঝা নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের শঙ্কা প্রকাশ করেন। কিন্তু বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর হিসাবমতে, আমরা এখনো 'মধ্যম সারির ঋণগ্রস্ত' দেশ। যদিও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর ঋণের সুদহার কিছুটা বাড়বে, তবুও আমাদের ঋণ নিতে হবে। কারণ, অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে জিডিপির অন্তত ৩০-৩২ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা কেবল রাজস্ব আয় দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এর জন্য সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে এফডিআই জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ, যা অন্তত ২ থেকে ৪ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের বর্তমান বাণিজ্য নীতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হচ্ছেন না।
স্ট্রিম: বিদেশি বিনিয়োগ না এলে তো বেসরকারি বিনিয়োগও হচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরে আমরা বিনিয়োগের অত্যন্ত খারাপ অবস্থা দেখছি। অথচ সরকার চাইছে আগামী ৫ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরি করতে। বিনিয়োগ ছাড়া এই বিপুল কর্মসংস্থান কীভাবে সম্ভব?
ড. জাইদি সাত্তার: একদমই সম্ভব নয়। বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান কোনোভাবেই হতে পারে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেবল বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রির জন্য আসেন না। তারা মূলত রপ্তানিমুখী বিনিয়োগ নিয়ে আসেন। অর্থাৎ, তারা আমাদের সস্তা শ্রম ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে চান। তাদের আকর্ষণ করার জন্য আমাদের বাণিজ্য নীতিতে ব্যাপক সংস্কার এনে তা আরও উন্মুক্ত ও বিনিয়োগবান্ধব করা অত্যন্ত জরুরি।
স্ট্রিম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ড. জাইদি সাত্তার: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে আদর্শিক অবস্থানের সাথে বাস্তবতার এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছে, তার ধারাবাহিকতায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক ‘কেস স্টাডি’ হিসেবে ধরা যায়।
৮ ঘণ্টা আগে
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ অভিযানের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতির মুখ দেখেছিল। পরবর্তীতে এপ্রিলের শেষভাগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত করার ঘোষণা দিলেও, মাঠপর্যায়ের বর্তমান বাস্তবতা এক ভিন
৮ ঘণ্টা আগে
বৈশ্বিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও জ্বালানি প্রবাহের এক সম্মিলন বিন্দুতে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান। এই জলরাশি কেবল বাংলাদেশের নয়; বরং গোটা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানির সিংহভাগই এই উপসাগর নির্ভর, যা একইসঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক সহজ ও বিকল্প মাধ্যম।
১ দিন আগে
দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি সরকারের তিন মাস পেরিয়েছে। রাজনৈতিক যোগাযোগের ভাষায় নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণত ‘মধুচন্দ্রিমা সময়’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়—যে সময়ে জনগণ নতুন নেতৃত্বকে বাড়তি আস্থা, রাজনৈতিক সুযোগ এবং প্রত্যাশার সুবিধা দেয়। বাংলাদেশের রাজনীতির এক অস্থির সন্ধিক্ষণে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচ
২ দিন আগে