ড. সালেহউদ্দীন আহমেদের সাক্ষাৎকার

আর্থিক খাত থেকে রাজনীতিকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে হবে

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন। ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। দেশের ব্যাংকিং খাতের সিন্ডিকেট ভাঙা, অর্থ পাচার রোধ, এনবিআর সংস্কারসহ আর্থিক খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের নানা পদক্ষেপ ও তাদের রেখে যাওয়া ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেছেন তিনি।

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৬: ২৮
ড. সালেহউদ্দীন আহমেদ

স্ট্রিম: আপনি বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ, পরিকল্পনা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এই দায়িত্বে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাটি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। আমরা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং একটি সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম। তখন দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল বেশ জটিল ছিল। অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংক, বাণিজ্য ও এনবিআর খাতে সংকট ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি দেশে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা ছিল আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে আমরা বিভিন্ন খাতে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছি। কিছু কাজ আমরা সম্পন্ন করতে পেরেছি। বাকিগুলো বাস্তবায়নের ভার বর্তমান সরকারের ওপর থাকবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সব মিলিয়ে মনে করি, আমাদের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল, তা আমরা যথাযথভাবে পালন করতে পেরেছি। এটা অত্যন্ত সন্তুষ্টির একটি বিষয়।

স্ট্রিম: দায়িত্ব ছাড়ার আগে আপনি আপনার উত্তরসূরিদের জন্য কোন সুপারিশ বা পরামর্শ রেখে এসেছেন? সেগুলো কী ছিল?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: আমার সুপারিশগুলো মূলত অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি—এই দুটি মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে ছিল। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশাল পরিসরের কাজগুলোকে আমি চারটি প্রধান ভাগে ভাগ করে পরামর্শ দিয়েছি:

প্রথম, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। এর আওতায় ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট), বাজেটের আকার নির্ধারণ এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দ্বিতীয়, সম্পদ আহরণ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর আধুনিকায়ন। এনবিআরকে শক্তিশালী করতে এর কাঠামোকে দুটি ভাগে বিভক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে করনীতিকে ব্যবসাবান্ধব করে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা। দেশের অভ্যন্তরে বন্ড ও সঞ্চয়পত্র বিক্রি এবং বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। আমরা কী পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেব, তা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য আমরা একটি 'ঋণ টেকসইকরণ' পর্যালোচনা করেছি। অর্থাৎ, গৃহীত ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং সুদের হার ও পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণের জন্য একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে।

চতুর্থ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের উন্নয়ন। এই খাতে শুধু ব্যাংক নয়, বিমা, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে পুঁজিবাজারও অন্তর্ভুক্ত। বিমা খাতটি বিশাল হলেও অবহেলিত। ক্ষুদ্রঋণ খাতটিও দেশের মুদ্রানীতির সঙ্গে পুরোপুরি সম্পৃক্ত নয়। আর পুঁজিবাজারের অবস্থা ছিল খুবই নাজুক। সেখানে সুশাসনের অভাব ছিল। আমাদের সময়ে আমরা বেশ কিছু বিধিমালা প্রণয়ন করেছি এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছি। অনিয়মের জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। পুঁজিবাজারকে উন্নত করা গেলে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমবে, যা বৈদেশিক ঋণ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) ওপর চাপ কমাবে। এই বিষয়গুলোই আমি আমার সুপারিশে উল্লেখ করেছি। এর বিস্তারিত নথিপত্রে রয়েছে।

স্ট্রিম: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য আপনার সুপারিশগুলো কী ছিল?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনেক বড় হলেও এর কার্যক্রম ততটা দৃশ্যমান নয়। এই মন্ত্রণালয়কে আরও কার্যকর ও দৃশ্যমান করার জন্য আমি কিছু পরামর্শ দিয়েছি।

এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিল্পের সঙ্গে গবেষণার সংযোগ। আমাদের বিজ্ঞান গবেষণাগার, বিশেষ করে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনেক নতুন জ্ঞান ও পেটেন্ট তৈরি হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসা বা শিল্প খাতে এগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহার নেই বললেই চলে। আমি এই সংযোগটি শক্তিশালী করার কথা বলেছি।

বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এক মন্ত্রণালয় অন্য মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে না, যা প্রকল্পের বাস্তবায়নে মারাত্মক বিলম্ব ঘটায়। মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে এই সমন্বয়ের অভাব দূর করতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখবে না।

সেই সঙ্গে আছে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি। পুরোনো কর্মীদের পাশাপাশি নতুন ও যোগ্যদের আকৃষ্ট করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুন করে সাজাতে হবে।

বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপারটি প্রণিধানযোগ্য। প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল প্রকল্পটি দ্রুত চালু করা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোভিড ও অর্থ পরিশোধ সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজে কিছুটা দেরি হলেও এখন এর সমাধান হয়েছে। আমার শেষ আলোচনা অনুযায়ী, ‘রিঅ্যাক্টর-১’ পুরোপুরি প্রস্তুত এবং শীঘ্রই জ্বালানি লোড করে আংশিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। আশা করা যায় শিঘ্রই প্রথম পর্যায়ে ৩০০-৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। দ্বিতীয় রিঅ্যাক্টরের কাজও প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হলে এই প্রকল্প দেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি বিশাল ভূমিকা রাখবে। এই প্রকল্পটির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলেছি।

স্ট্রিম: এই প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনকালে এমন কিছু কাজের কথা বলুন যা করতে পেরে আপনি সন্তুষ্ট।

সালেহউদ্দীন আহমেদ: প্রথমত, আমি আর্থিক খাতে একটি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেরে সন্তুষ্ট। বিশেষ করে, সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় আইবেস প্লাস প্লাস-এর মতো আধুনিক সফটওয়্যার চালুর মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি কম্পিউটারাইজড করা হয়েছে। এখন অর্থের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, বাজেটের তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এর গুণগত মানও উন্নত হয়েছে। বাজেটে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আসায় খেয়ালখুশিমতো ব্যয়ের সুযোগ হ্রাস পেয়েছে।

তৃতীয়ত, এনবিআরের কার্যক্রমে ডিজিটালাইজেশন আনা হয়েছে। ‘ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালু হওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। এছাড়া ই-রিটার্ন ও ই-ট্যাক্স ব্যবস্থা চালু করা এবং কাস্টমসে আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা ছিল উল্লেখযোগ্য অর্জন।

ব্যাংকিং খাতেও বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও কমে এসেছে। পাশাপাশি, পুঁজিবাজার ও বিমা খাতে সুশাসন ও নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে একটি ভালো সূচনা করা গেছে। আমি মনে করি, আগের চেয়ে দেশের আর্থিক খাত এখন অনেক বেশি স্থিতিশীল ও সুসংহত।

স্ট্রিম: আপনার কি কোনো হতাশা বা আক্ষেপ রয়েছে যে কোনো কাজ করতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: হ্যাঁ। আমার একটি বড় আক্ষেপ হলো এনবিআরকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানোর কাজটি আমরা সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা চেয়েছিলাম এনবিআরের ‘করনীতি’ এবং ‘কর আদায়’— এই দুটি বিভাগকে পুরোপুরি আলাদা করতে। এ সংক্রান্ত আইনও পাস হয়েছিল। করনীতি, কর ছাড় ও ভ্যাট নির্ধারণের বিষয়গুলো আলাদা একটি বিভাগের অধীনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু প্রশাসনিক পর্যায়ে আশানুরূপ সহযোগিতা না পাওয়ায় এবং জনবল কাঠামো চূড়ান্ত করতে না পারায় এই সংস্কার কাজটি শেষ করা যায়নি। এটি আমাদের জন্য একটি হতাশার বিষয়।

আমরা আইন প্রণয়ন পর্যন্ত এগিয়েছিলাম। শুধু দুটি শাখায় জনবল বণ্টনের মতো প্রশাসনিক কাজ বাকি ছিল। সত্যি বলতে, প্রশাসন থেকে আমরা এ বিষয়ে খুব বেশি সহযোগিতা পাইনি। তারা সম্ভবত এত বড় একটি পরিবর্তন চাইছিল না। তবে আমি বিশ্বাস করি, এই সংস্কার দীর্ঘ সময় আটকে রাখা যাবে না। বর্তমান সরকারের উচিত এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা।

স্ট্রিম: সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া হলো। এই প্রক্রিয়াটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: কাকে পদে রাখা হবে বা হবে না, সেটি সম্পূর্ণ সরকারের এখতিয়ার। তবে তাঁকে অত্যন্ত অনুরোধ করে এই দায়িত্বে আনা হয়েছিল। দায়িত্ব পালনকালে তাঁর নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে হয়তো কেউ কেউ অসন্তুষ্ট ছিলেন। তবে সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়। আমার মতে, তাঁকে এভাবে হঠাৎ করে সরিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। এর চেয়ে ভালো হতো যদি তাঁকে ডেকে তাঁর অসমাপ্ত জরুরি কাজগুলো শেষ করতে বলা হতো। তারপর তিনি নিজ থেকেই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ পেতেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদটি অত্যন্ত সম্মানজনক। বড় কোনো কেলেঙ্কারি বা গুরুতর অভিযোগ ছাড়া এভাবে কাউকে বিদায় দেওয়া হয় না। ড. মনসুরের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না। এই ঘটনাটি আর্থিক খাতে একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়। এর ফলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তি এই পদে আসতে দ্বিধা বোধ করতে পারেন।

স্ট্রিম: অনেকে বলছেন, ব্যবসায়ী গভর্নর নিয়োগের ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম এবং বিশ্বে বিরল। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: আমি নতুন গভর্নরকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে তাঁর বৃত্তান্ত থেকে জেনেছি, তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ক্যাপিটাল মার্কেটেও কাজ করেছেন। তাই আর্থিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে তাঁর ধারণা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তিনি সেই জ্ঞান কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে পারেন।

আমরা যে কাজগুলো করে এসেছি সেগুলোকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করা হোক। সেখানে কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন হলে অবশ্যই তা করা যেতে পারে। কিন্তু আগের সব কাজ বাতিল করে নতুন করে শুরু করলে দেশেরই ক্ষতি।

একজন গভর্নরের মূল কাজ সব বিষয়ে পারদর্শী হওয়া নয়। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করবেন এবং নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর মধ্যে সেই নেতৃত্বদানের গুণাবলি আছে কি না সেটিই মূল প্রশ্ন। মেরিল লিঞ্চের সাবেক প্রধান বা ল্যারি সামারসের মতো আর্থিক খাতের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এসেছেন। পুরোপুরি ব্যবসায়ী থেকে গভর্নর হওয়ার উদাহরণ কম। তবে তা অসম্ভব কিছু নয়। ব্যবসায়ীরা অর্থনীতির প্রায়োগিক দিকগুলো ভালো বোঝেন। ব্যবসা করতে গিয়ে আর্থিক খাতে তাঁরা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন, সেই অভিজ্ঞতা যদি তিনি কাজে লাগাতে পারেন এবং সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে পারেন। এমন হলে তা দেশের অর্থনীতিতে তা একটি বড় অবদান রাখবে।

স্ট্রিম: সার্বিক সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব আয় কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যয় করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাতও বেশ কম। বর্তমান সরকারের এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: এ ক্ষেত্রে সরকারের কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, এনবিআরের চলমান ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া এবং কর আদায় ও করনীতি বিভাগকে পৃথক করার কাজটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। করনীতি যদি খামখেয়ালি বা অ্যাডহক ভিত্তিতে প্রণীত হয়, তবে তা বাস্তবায়নে ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েন। তাই একটি যৌক্তিক ও স্থিতিশীল করনীতি প্রণয়ন করা হলে কর আদায় এবং কর-জিডিপি অনুপাত উভয়ই বাড়বে। জনগণের কর প্রদানের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের কর কাঠামোর দুর্বলতা ও আদায় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। আমরা বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকি। বেশিরভাগ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা ঠিকভাবে যাচাই করা হয় না, প্রকল্পের ব্যয় সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয় না। অনেক সময় দাতাদের নির্দেশনায় প্রকল্প গ্রহণ করতে হয়। এ কারণেই পাঁচ বছরের প্রকল্প শেষ হতে দশ বছর লেগে যায়। এই দুর্বলতাগুলো অবিলম্বে দূর করতে হবে।

তৃতীয়ত, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এক মন্ত্রণালয় অন্য মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করে না, যা প্রকল্পের বাস্তবায়নে মারাত্মক বিলম্ব ঘটায়। মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে এই সমন্বয়ের অভাব দূর করতে না পারলে আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখবে না।

স্ট্রিম: মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী ধরনের সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে? এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় কী?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় এর প্রভাব আমাদের ওপর সরাসরি পড়ছে। আমাদের আমদানির প্রধান উৎস চীন ও ভারত হলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে জ্বালানির দাম বাড়বে। এর ফলে ওই দেশগুলোর উৎপাদন খরচও বেড়ে যাবে। আমাদের আমদানি ব্যয় বাড়াবে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানি খাতে। আমরা বিদেশ থেকে এলএনজি এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি করি। আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলোর দাম বাড়লে আমাদের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎস সীমিত। ফলে আমদানিকৃত তেল-গ্যাসের ওপর আমাদের শিল্প খাত নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রভাবে একদিকে যেমন আমাদের পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে, তেমনি জ্বালানির অভাবে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হতে পারে। উৎপাদন কমে গেলে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে, আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ব। তাই সরকারের উচিত জ্বালানি, রপ্তানি ও উৎপাদন খাতে সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

স্ট্রিম: এর ফলে কি প্রবাসী আয়েরওপর কোনো প্রভাব পড়তে পারে?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: হ্যাঁ, অবশ্যই। মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের প্রবাসী আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সেখানকার দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সংকোচন দেখা দিলে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা রয়েছে। নতুন কর্মী নিয়োগের হারও কমে যেতে পারে। এর ফলে আমাদের প্রবাসী আয়ের প্রবাহ, যা বর্তমানে বেশ ভালো অবস্থায় আছে, তা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক বাস্তবতা যে, এক সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের সব কাজ, এমনকি ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেয়। এই ‘ভাঙা-গড়ার’ প্রবণতার কারণে সময় ও অর্থ—দুটোরই অপচয় হয়। আমরা এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমাদের প্রয়োজন সমন্বয় ও ধারাবাহিকতা। কোনো নীতি দেশের জন্য ক্ষতিকর হলে তা অবশ্যই বাতিল করা উচিত। কিন্তু ঢালাওভাবে সবকিছু ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

স্ট্রিম: আপনি একাই দুটি বড় মন্ত্রণালয় সামলেছেন। বর্তমানে এই দায়িত্ব পালনের জন্য একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং একজন উপদেষ্টা রয়েছেন। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: তাঁদের প্রতি আমার কয়েকটি সুস্পষ্ট পরামর্শ থাকবে।

প্রথমত, তিনজন মিলে দেশের সবচেয়ে জরুরি সমস্যাগুলো, যেমন—ব্যাংকিং খাত, এনবিআর, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিময় হার চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তাঁদের কাজের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় থাকতে হবে। তিনজন যদি তিনটি ভিন্ন কথা বলেন, তবে তা দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনবে। তাঁদের উচিত হবে একমত হয়ে, প্রয়োজনে বাইরের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে, একটি অভিন্ন পথে কাজ করা।

তৃতীয়ত, আমলাতন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে, কারণ তারাই সরকারের নীতি বাস্তবায়ন করে। যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সঠিক জায়গায় পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

চতুর্থত, আর্থিক খাত একটি পেশাদার বিষয়। এখানে সব সিদ্ধান্ত পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিতে হবে এবং রাজনীতিকে এর থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে হবে।

স্ট্রিম: কিন্তু গভর্নর বা বিএসইসি চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে তো রাজনীতিই প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: রাজনৈতিক প্রভাব থাকবেই। তবে এর একটি সীমা থাকা উচিত। ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলের একটি নির্বাচনি ইশতেহার থাকে। সেই অনুযায়ী তারা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যেমন দেশে কতগুলো ব্যাংক থাকবে বা বিমা কোম্পানি থাকবে, এটি একটি নীতিগত বিষয়। কিন্তু কোন ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া হবে, কোন ব্যাংকের বোর্ডে কে থাকবেন—এ ধরনের ক্ষুদ্র বিষয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকা উচিত নয়। দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশে এই দ্বিতীয় ধরনের প্রভাবটাই বেশি, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক রাজনৈতিক পক্ষপাত দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করে।

স্ট্রিম: শোনা যাচ্ছে, আপনার সময়ে আর্থিক খাতে যেসব সংস্কার আনা হয়েছিল, সেগুলোর কিছু কিছু পর্যালোচনার মাধ্যমে পরিবর্তন আনার কথা ভাবা হচ্ছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সালেহউদ্দীন আহমেদ: আমি এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখছি না। আমার পরামর্শ থাকবে, আমরা যে কাজগুলো করে এসেছি সেগুলোকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করা হোক। সেখানে কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন হলে অবশ্যই তা করা যেতে পারে। কিন্তু আগের সব কাজ বাতিল করে নতুন করে শুরু করলে দেশেরই ক্ষতি।

বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক বাস্তবতা যে, এক সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের সব কাজ, এমনকি ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেয়। এই ‘ভাঙা-গড়ার’ প্রবণতার কারণে সময় ও অর্থ—দুটোরই অপচয় হয়। আমরা এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আমাদের প্রয়োজন সমন্বয় ও ধারাবাহিকতা। কোনো নীতি দেশের জন্য ক্ষতিকর হলে তা অবশ্যই বাতিল করা উচিত। কিন্তু ঢালাওভাবে সবকিছু ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত