লিখেছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ

আপসহীন গণশিল্পী কামরুদ্দীন আবসারের প্রয়াণ ও আমাদের দায়বদ্ধতা

প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ২০: ৩৫
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

কামরুদ্দীন আবসারের (১৯৫৪-২০২৬) সঙ্গে আমার পরিচয় সত্তরের দশকের শেষ দিকে। তিনি তখন লেখক শিবির ও গণসঙ্গীতের দলে সক্রিয়, আর আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, লেখক শিবিরে কেবল যুক্ত হয়েছি। সেই থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত আমরা সাংগঠনিকভাবে একসঙ্গে কাজ করেছি। এরপরও তিনি অসুস্থ না হওয়া পর্যন্ত বহুরকম কাজে কথায় আমরা একসাথে ছিলাম।

অসুস্থ হবার পরও আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। আমি কয়েক দফা লেখক শিবিরের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি, আর আবসার ভাই ছিলেন সাংস্কৃতিক ও গণসঙ্গীত সম্পাদক। এই সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে আমরা একসঙ্গে সাংগঠনিক সফরে গেছি। সংস্কৃতিসহ সংগঠনের বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশের কাজেও তাঁকে পেয়েছি সাথে। বহু সভা-সমাবেশে আবসার ভাইএর দৃপ্ত কণ্ঠে গান শোনার পাশাপাশি তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা দেখার দুর্লভ সুযোগ আমার হয়েছে। দেখেছি সংগঠনের ভেতরে ও বাইরে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা।

আশির দশকে কামরুদ্দীন আবসার চাইলে খুব সহজেই মূলধারার গণমাধ্যমে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারতেন। তার ছিল ভরাট কণ্ঠ, সুরের ওপর অসাধারণ দখল আর নিজস্ব গীত রচনার ক্ষমতা। কিন্তু সেই সময় দেশজুড়ে চলছে স্বৈরাচারবিরোধী তীব্র আন্দোলন, বেতার-টেলিভিশন তখন সম্পূর্ণভাবে স্বৈরাচারের দখলে। সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে যাওয়াটা রাজনৈতিকভাবে শুধু অসম্মানজনকই নয়, বরং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করার শামিল বলে আমরা মনে করতাম। আবসার ভাইয়ের অবস্থানও ছিল এমনই আপসহীন। স্বৈরাচারের সাথে আপস করে তিনি মূলধারার মিডিয়ায় যাননি। হয়তো সেখানে গেলে তার গান আরও অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাত, কিন্তু তার চরিত্রের যে আপসহীন ও সংগ্রামী রূপ আমরা দেখেছি, তা হয়তো ঢাকা পড়ে যেত।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে তিনি নিজে অনেক গান রচনা করেছেন এবং সুর দিয়েছেন। বাংলাদেশে কিংবদন্তি শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গণসঙ্গীতের যে বিস্তৃতি ও পরিচিতি, তা মূলত কামরুদ্দীন আবসারের মাধ্যমেই হয়েছিল। এর বাইরেও দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলের গান, তেভাগা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ের অসংখ্য গান তিনি এদেশের মানুষের কাছে নিয়ে এসেছিলেন।

তবে কেবল গান গাওয়াই তাঁর একমাত্র কাজ ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সংগঠকও, নিজেকে রাজনৈতিক কর্মী বলতেন। লেখক শিবিরের পাশাপাশি কৃষক মজুর ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনসহ কৃষক-শ্রমিকদের নানা সভা-সমাবেশে তিনি ছুটে যেতেন, সংগঠনের কাজ করতেন। সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ-নিপীড়ন, আধিপত্যবাদ কিংবা সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিটি লড়াইয়ে তিনি ছিলেন ভীষণ সজাগ ও সক্রিয়। আদর্শ ও সংগঠনের কাজে জীবনের ঝুঁকি নিতেও তিনি পিছপা হননি।

আর্থিক অবস্থা তাঁর কখনোই খুব একটা সচ্ছল ছিল না। পেশাগতভাবে তিনি ছিলেন একজন গানের শিক্ষক। অসংখ্য ছেলেমেয়েকে তিনি গান শিখিয়েছেন খুবই আন্তরিকতা দিয়ে। বর্তমান সময়ের অনেক শিল্পীর ওস্তাদ তিনি। এই গান শেখানোই ছিল তার আয়ের একমাত্র উৎস। এর পাশাপাশি তিনি ‘দীপ্র প্রকাশনী’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা গড়ে তোলেন। পুরানা পল্টন মোড়ে বাসস অফিসের নিচে খোলা জায়গায় বড় দুটি র‌্যাক বসিয়ে তিনি বই বিক্রি করতেন। সেখানে আমার বইসহ প্রগতিশীল অনেক ছোট বড় প্রকাশনা স্থান পেতো। আর সেই ছোট্ট বইয়ের দোকানটিই হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের এক মিলনমেলা। সেখানে বসেই চলত বহু তরুণ কর্মীর আলোচনা, তর্ক বিতর্ক ও পথ খোঁজার কাজ।

১৯৯২-৯৩ সালের দিকে গণআদালতে অভিযুক্ত হবার পর যখন ফতোয়াবাজ ও যুদ্ধাপরাধীরা নতুন করে আস্ফালন শুরু করে, তখন তাদের আক্রমণের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু হয় প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। আবসার ভাইয়ের সেই বইয়ের দোকানটিও ফতোয়াবাজ ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের হামলার শিকার হয়। তিনি নিজেও আক্রান্ত হন, আহত হন। একদিকে স্বৈরশাসনের চাপ, অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের হামলা-হুমকি এবং ব্যক্তিগত আর্থিক দৈন্য—কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর ঐতিহাসিক দায়িত্ব থেকে টলাতে পারেনি। তিনি বরাবর জনগণের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামকে শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে গেছেন।

লেখক শিবিরের পর তিনি 'সৃজন' এবং 'গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট' নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। গান, পাঠচক্র, আলোচনা সভা ও প্রকাশনার মাধ্যমে মানুষের সাংস্কৃতিক চৈতন্যকে সমাজ পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। ফুলবাড়ী আন্দোলন সহ জাতীয় কমিটির কাজেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানের পর এই লড়াই নিয়ে মহসিন শস্ত্রপাণির একটি কবিতা সুর দিয়ে গান গেয়ে তাকে স্থায়ী করেছেন আবসার ভাই। তাঁর রসবোধ ও যোগাযোগ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত বহু মানুষ তাঁর কাছে আসতো দিকনির্দেশনা আর অনুপ্রেরণার খোঁজে।

আর্থিক দৈন্যের কারণে নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি তাঁর একধরনের অবহেলা ছিল। ২০১১ সালে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁর স্ট্রোক হয়। এরপর আর তিনি তাঁর প্রিয় সঙ্গীত বা সাংগঠনিক জীবনে ফিরতে পারেননি। ২০১১ থেকে ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে এক অসম্ভব ভূমিকা পালন করেছেন তাঁর স্ত্রী কবি ফেরদৌসী বেগম। গানের দলের সূত্রেই তাঁদের পরিচয়, প্রেম ও বিয়ে। ফেরদৌসী বেগম তার নিজের চাকরি, সংসার সামলে অসুস্থ আবসার ভাইকে পরম মমতায় আগলে রেখেছিলেন শেষ দিন পর্যন্ত।

শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে পড়লেও আবসার ভাই মানসিকভাবে ছিলেন অত্যন্ত সজীব। যতদিন কথা বলতে পেরেছেন, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, নতুন কাজের পরিকল্পনা করেছেন। বামপন্থী নেতাদের আদর্শচ্যুতি ও বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে তার তীব্র ঘৃণা ছিল। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে কামরুদ্দীন আবসার ছিলেন এক অপরাজেয় সত্তা।

ব্যক্তিগত লাভ, খ্যাতি বা সুযোগ-সুবিধার প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। চাইলেই তিনি অর্থ-বিত্তের মালিক হতে পারতেন, কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গীকারকেই তিনি তাঁর প্রধান শক্তি বলে মেনেছেন। তিনি যে সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, জীবনকালে তা তিনি পাননি। আজ কামরুদ্দীন আবসার আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন। মানুষের মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু মানুষের মুক্তির লড়াইয়ের স্বার্থেই তাঁর কাজ ও আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব। তাঁর দুটি ক্যাসেট আছে, এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গানগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁর জীবন নিয়ে আরও লেখা প্রকাশ করা জরুরি। এগুলো করতে হবে যাতে বর্তমান প্রজন্ম এই আপসহীন গণশিল্পীর জীবন থেকে অনুপ্রেরণা ও পথের দিশা খুঁজে পায়।

প্রচার ও অর্থের মোহকে পরাজিত করে জনগণের মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত প্রাণ এই অপরাজেয় শিল্পীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

আনু মুহাম্মদ: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

সম্পর্কিত